প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে ভাঙচুরের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে সাতটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। তারা বলছে এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর হামলা।
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে মারার ঘটনায়ও উদ্বেগ জানানো হয় বিবৃতিতে।
সোমবার রাতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে।
বিবৃতিতে এসব সমন্বিত সহিংস কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপর হামলা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বলেছে, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী, শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা, বিশেষত ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বেড়ে গেছে, তখন আইনের শাসনের অবক্ষয় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক আলোচনা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে আসা উদ্বেগজনক।
‘আমরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন, যাচাইকৃত খবরগুলো এই আভাস দিচ্ছে যে দুটি সংবাদমাধ্যমের জ্বলন্ত প্রাঙ্গণের (ভবনে) মধ্যে সাংবাদিক ও কর্মীরা আটকা পড়েছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের হয়রানি ও শারীরিক আঘাতের ভয় দেখানোটা যারা রাষ্ট্রের কার্যকর সুরক্ষার অনুপস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে চায় তাদের বেপরোয়া ভাব বাড়তে থাকার বিষয়টিকে তুলে ধরে।’
তারা বলছে, ছায়ানটের ওপর হামলা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতি বৈরিতার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। যা শিল্পীসত্তার প্রকাশ ও মতের বৈচিত্র্যের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ পরিবেশকে উন্মোচিত করে।
এসব ঘটনা অনলাইন ও অফলাইন সহিংসতার একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে, যার সঙ্গে যুক্ত আছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পরিকল্পিত হয়রানি এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত নজরদারির চর্চা, যা দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।
বছরজুড়ে আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার করে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত, বাউল, সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, শিল্পীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং তাদের ওপর হামলার একটি ধারা দেখা গেছে।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদসহ (আইসিসিপিআর) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক দায়বদ্ধতা রয়েছে। বলে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বিবৃতিতে।
পাশাপাশি সংবিধানেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
এসব দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ, সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ঘটনার তদন্ত করা, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার দিতে যুক্তিসংগত সবকিছু করতে রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
সংগঠনগুলো বলছে একদিকে দমননীতি, অন্যদিকে নিষ্ক্রিয়তা, এর কোনোটিই বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীন থাকা দায়বদ্ধতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বেশ কিছু আহ্বান জানিয়েছে।
তারা বলছে অবিলম্বে সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে হুমকি আছে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটের হামলাসহ অন্যান্য সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও শিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনার দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধী, পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ভুক্তভোগী বা তার নিকটাত্মীয়দের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি তৈরি হতে যাচ্ছে এমন ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা, পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ ও সময়োচিত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে হবে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই অনলাইন ও অফলাইনে সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সংবিধান ও আইসিসিপিআরসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন, নীতি ও চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
যে সাতটি সংগঠন যৌথ বিবৃতি দিয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অনলাইনে নাগরিক অধিকার রক্ষায় কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন অ্যাকসেস নাউ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা বৈশ্বিক সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিন, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা বৈশ্বিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি), জার্নালিস্ট ফর ডেমোক্রেসি ইন শ্রীলঙ্কা (জেডিএস) ও টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট (টিজিআই)।



