গত ১৬ই ডিসেম্বর আইপিএলের মিনি অকশনে কলকাতা নাইট রাইডার্স নয় কোটি বিশ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে কিনে নিয়েছিলো। এটা ছিলো আধুনিক ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাটারফ্লাই এফেক্টের শুরু। এখান থেকে ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ পর্যন্ত পুরো ক্রিকেট বিশ্ব একটা ভয়ানক তোলপাড়ের ভেতর দিয়ে গেল। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, আইসিসি; এমনকি আশেপাশের আরও অনেক ক্রিকেট বোর্ড নানাভাবে এই তোলপাড়ে সংশ্লিষ্ট হল।
অবশেষে ৯ তারিখে ‘লাহোর বৈঠক’-এর পর আইসিসির একটা প্রেস রিলিজের ভেতর দিয়ে এই পুরো ব্যাপারটার সমাপ্তি ঘটলো। সেই প্রেস রিলিজে আইসিসি বললো বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপ খেললো না সেজন্য বাংলাদেশের কোন শাস্তি হবে না বরং তারা কিছু বাড়তি সহায়তা পেতে যাচ্ছে আইসিসির কাছ থেকে। তাদেরকে আইসিসির ডিসপুট রেজুলেশন কমিটিতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে মামলায় রায় পক্ষে গেলে ওখানে আরও কিছু ক্ষতিপূরণ পাবে বাংলাদেশ। সেই সাথে বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের আগেই আরেকটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আয়োজক করা হবে বলে আইসিসি প্রেস রিলিজে জানালো।
এই প্রেস রিলিজ সংকটের শেষ করলো- প্রশ্নের নয়। এই একই বৈঠকের পর আইসিসি একটা প্রেস রিলিজ দিয়েছে, বিসিবি একটা প্রেস রিলিজ দিয়েছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একটা প্রেস রিলিজ দিয়েছে। প্রতিটা প্রেস রিলিজে আলাদা আলাদা বিষয় আলোচনা হয়েছে। যা প্রত্যেককে এটা ভাবার সুযোগ দিয়েছে- আমি জিতেছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে এখন এই প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি আলোচিত- বাংলাদেশ কী হারলো, নাকি জিতলো? এই পুরো ব্যাপারটা বাংলাদেশের কি কূটনৈতিক ব্যর্থতা? নাকি আদৌ কোন লাভ হলো?
সমস্যা হলো, এই পুরো সময়ে আসলে দুটি পাশাপাশি ঘটনা ঘটেছে, যার ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। ফলে এক শব্দে ‘জিতেছি’ বা ‘হেরেছি’ বলার কোনো উপায় নেই। এরচেয়ে আমরা যদি এই শোরগোলটাকে দু’ভাগে ভাগ করে নেই, তাহলে হিসেব সহজ হবে- একটা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলা এবং অন্যটা আইসিসিকে আলোচনার টেবিলে বসে বাংলাদেশের পক্ষে কিছু কথা বলতে বাধ্য করা।
প্রথম পর্বে অবশ্যই বাংলাদেশ সর্বাত্মক ব্যর্থতার শিকার হয়েছে। মুস্তাফিজুর রহমানকে ভারতীয় সরকারের নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স কোনরকম যুক্তি ছাড়া তাদের দল থেকে রিলিজ করে দিল। কোনো পরিষ্কার কারণ, আজও পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলো, কারণটা নিরাপত্তা শঙ্কা।
মুস্তাফিজ দল পাওয়ার পর কিছু ছোট ছোট গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া শুরু করলো, মুস্তাফিজকে কলকাতার হয়ে খেলতে দেওয়া হবে না। ইডেনে সে খেলতে নামলে খেলা পণ্ড করা হবে, উইকেট খুঁড়ে ফেলা হবে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে ব্যাপারটা ঘটলো যে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা প্রকাশ্য জনসভায় বললেন, যে মুস্তাফিজ যদি ভারতের মাটিতে পা রাখে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। সরাসরি সহিংস হুমকি দেওয়া হল।
এই ব্যাপারগুলোতে কিন্তু আমরা ভারত সরকারের কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। এমনিতেই ভারত- বাংলাদেশের একটা কূটনৈতিক টানাপোড়েন গত প্রায় দেড় বছর ধরে বা তারও বেশি সময় ধরে চলছে। তার মধ্যেও একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদকে এভাবে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হবে, তারপরেও ওই দেশের সরকার কোন কথাবার্তা বলবে না; এটা আসলে সভ্য বিশ্বের জন্য নজিরবিহীন একটা ব্যাপার।
উল্টো দেখা গেলো, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে একটা প্রেস রিলিজ দিয়ে জানানো হলো যে তারা কেকেআরকে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশী ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সেটার জন্য তারা কারণ উল্লেখ করেছেন যে ‘সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি’। একটাই ব্যাখ্যা দাঁড়ায় যে চারদিকে এই হুমকি-ধমকি সরকারের লোকজনই দিচ্ছেন, ফলে তারা ভীত হয়ে মুস্তাফিজকে ছেড়ে দিছেন। তারা মনে করছেন, মুস্তাফিজকে নিরাপত্তা দেওয়া তো দূরে থাক, মুস্তাফিজ এলে আইপিএলের নিরাপত্তাই তারা নিশ্চিত করতে পারবেন না। এছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা বের করা খুবই কঠিন, খুবই কঠিন।
এই ঘটনার দু-একদিনের মধ্যে পত্রপত্রিকায় দেখা গেল যে আইপিএল এর কর্মকর্তারা, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা তারা মুস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে আগে কিছু জানতেন না। এইরকম একটা প্রেস রিলিজ দেওয়া হচ্ছে এটা বিসিসিআই-এর জেনারেল সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া ছাড়া কেউ জানতেন না।
এই পর্যায়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় একটা কূটনৈতিক ভুল চাল দিলো। যেটা আসলে আমাদেরকে একটা গন্তব্যবিহীন পথে নিয়ে গেছে। তারা শুরুতেই বললো- বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ।
মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পরে বাংলাদেশে একটা তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। এই তীব্র ক্ষোভের একটা বড় দাবি ছিল যে মুস্তাফিজকে যদি আইপিএলে ফিরিয়ে নেওয়া না হয় তাহলে বাংলাদেশ ইন্ডিয়াতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না। এই দাবিটার বৃহদাংশ জুড়ে ছিল রাজনৈতিক একটা উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে তো গত বেশ কিছুকাল ধরে ভারত বিরোধিতা একটা জনপ্রিয় ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশকে অবশ্যই মুস্তাফিজ ইস্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে হতো। আমার দেশের অন্যতম বড় ক্রিকেট তারকাকে যদি নিরাপত্তা দেওয়া না যায়, তার উপস্থিতি যদি পুরো আইপিএলকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়; তাহলে মাস খানেকের মধ্যে সেই দেশেই বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়াটা অবশ্যই নিরাপত্তা শঙ্কার ব্যাপার।
মূল দুশ্চিন্তা ছিলো দর্শকদের নিয়ে। এমনিতেই ভারতের ভিসা পাওয়া নিয়ে আমাদের সমর্থকদের একটা সমস্যা হতো, সমর্থকরা আদৌ খেলা দেখতে খুব বেশি যেতে পারতেন কিনা সন্দেহ। তারপরও সমর্থকদের চিন্তাটা কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য খুব বড় দুশ্চিন্তা। কারণ এরআগেও আমরা দেখছি যে আমাদের সমর্থকরা রাজনৈতিক সরকার থাকা অবস্থায়ও ভারতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। আমাদের একজন সুপার ফ্যানকে আহত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিলো। যদিও পরে সে অভিযোগ বাতিল করেছিলো ইন্ডিয়ান পুলিশ।
আরেকটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার ছিলেন সাংবাদিকরা। বাংলাদেশ থেকে প্রায় দুই’শ সাংবাদিক এক্রেডিশনের জন্য আবেদন করলেন, ১৪৫ জনের মতো অনুমোদন পেলেন। এই সমর্থক-সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কী হবে?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই সময় কোনো আলাপই চালাতে পারছিলো না। সরকার আগে থেকে ‘ভারতে যাবো না’ বলে ফেলায়, দর-কষাকষির আর কোনো সুযোগ ছিলো না। ওদিকে আইসিসি কার্যত ভারতীয় সরকারের একটা বধির্ত অংশে পরিণত হলো; তাদের চেয়ারম্যান, ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে জয় শাহ। ফলে এই অবস্থায় কোনো আলোচনা, বিকল্প ভাবা বা কিছু হলোই না।
আইসিসি বারবার বলছিলো যে, আমাদের একটা স্ট্যান্ডার্ড সিকিউরিটি প্রটোকল আছে সেটা যথেষ্ট। এসব ক্ষেত্রে আমরা চিরকাল দেখে আসছি যে আয়োজক যারা থাকেন, এখানে আইসিসি, তারা বলে আমরা একটা ‘থার্ড পার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ করাচ্ছি নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে। বা তোমাদের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসো ভারতে। আমরা দেখি ওই জায়গায় কী অবস্থা। এসব কিছুই হয়নি।
কার্যত আইসিসি বাংলাদেশের দুশ্চিন্তাগুলো খুব একটা শোনেইনি; বাংলাদেশও নো-রিটার্ন পয়েন্ট থেকে আলোচনা শুরু করায় বিকল্প কিছু প্রস্তাব টেবিলে আনতে পারছিলো না। হ্যাঁ, আইসিসির দুজন কর্মকর্তা আমাদের এখানে এসেছিলেন। তারাও এসে দফায় দফায় একই কথা বারবার বলছেন- আইসিসির একটা সুন্দর প্রটোকল আছে, ওটা যথেষ্ট।
বাংলাদেশ একটাই বিকল্প তখন দেখাতে পারছিলো যে, আমাদের খেলা শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাও। সেজন্য কিছু প্রস্তাবনা ছিলো আয়ারল্যান্ডের বদলে বাংলাদেশকে গ্রুপ চেঞ্জ করে খেলানো যায় কিনা, বাংলাদেশের গ্রুপের সবগুলো ম্যাচ সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা; এগুলো আইসিসি বিবেচনাতেই নেয়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বোর্ড মিটিংএ অংশগ্রহণ করলেন। সেখানে তার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলো। পরের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বাংলাদেশের কাছে দ্বিতীয় কোন ব্যাখ্যা না চেয়েই বাংলাদেশকে ছেঁটে ফেলা হলো। এখানে একটা পর্বের সমাপ্তি হলো। এরপর বাংলাদেশের দু’টো করণীয় ছিল। বাংলাদেশ আইসিসির ডিসপুট রেজুলেশন কমিটিতে যেতে পারতো বিচারের জন্য। সেখানেও বিচার না পেলে বাংলাদেশ যেতে পারতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে। এই দুটো জায়গায় গিয়ে বলতে পারতো আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি। এই কাজটা করার সুযোগ ছিল এবং করলে হয়তো কূটনৈতিকভাবে কিছু অর্জন করতে পারতাম। এই ধরণের মামলা করলে ব্যাক ডোর ডিপ্লোমেসিটা অন্তত আইসিসি শুরু করতে বাধ্য হতো।
কিন্তু বাংলাদেশ সেসব আইনি পথে হাঁটলোই না। হঠাৎ করেই জানালো, তারা এই বিষয় নিয়ে এগোবে না। খুব হাস্যকর পরিস্থিতি। প্রথমত অতি সাহস দেখানো, পরে একদমই লড়াই থেকে পালিয়ে যাওয়া। কোন রকম কোন যুক্তি ব্যাখ্যা ছাড়া রাতের বেলা পাঁচ-ছয় ঘন্টা মিটিং করে জানানো যে, আমরা আইসিসির বিরোধিতা করব না। সেক্ষেত্রে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন যদি বিরোধিতা নাই করেন, তাহলে শুরু করেছিলেন কেন? এরকম একটা কথা বলেছিলেন কেন যে আমরা খেলতে যাব না? খেলতে যাব না বলে আপনারা লড়াইটা করবেন না?
এই লড়াইয়ের শুরু ও শেষটা ছিলো ভয়ানক বিপর্যয়ের। এটাকে একটা কূটনৈতিক বিপর্যয় বলাই যায়। রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক বিপর্যয়, ক্রিকেটীয় কূটনৈতিক বিপর্যয়। এখানে আসলে বাংলাদেশের অধ্যায়টা শেষ। কারণ, এরপরের পর্যায়ে আমরা যা দেখেছি, সেটা ছিলো পাকিস্তানের বীরত্ব প্রদর্শনের অধ্যায়। পাকিস্তানের একটা দারুণ কূটনৈতিক জয় হয়েছে সেটার ফলে বাংলাদেশের কিছু প্রাপ্তি ঘটছে।
ভারত-পাকিস্তানের শত্রুতাটা ক্রিকেটে পাকিস্তানের প্রতি একটা অত্যাচারে পরিণত হয়েছে গত কিছুকাল ধরে। ২০০৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান প্রতিনিয়ত ভারত নিয়ন্ত্রিত আইসিসিতে উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। পাকিস্তান তাদের নিয়ম মেনে ভারতে এসে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো খেলছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালেও ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলছে। কিন্তু ভারত কখনোই পাকিস্তানে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট খেলতে যায় না। দ্বিপাক্ষিক সফর বিনিময়তো বন্ধই । শেষ মুহূর্তে তারা যুক্তি দেয় যে- না, সরকার আমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছে না।
সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও সেই একই কাজ হলো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আয়োজক ছিল এককভাবে পাকিস্তান। সেখানে শেষ মুহূর্তে ভারত বললো- সরকারের অনুমতি নেই, আমরা পাকিস্তানে খেলতে যাব না। লক্ষনীয় যে, ঠিক একই যুক্তি কিন্তু বাংলাদেশ দিয়েছিলো। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে যেটা করা হলো তড়িঘড়ি করে একটা হাইব্রিড মডেল ঠিক করা হলো। ভারত খেলবে তার ম্যাচগুলো দুবাইতে এবং সেক্ষেত্রে ভারত একটা ভয়াবহ সুবিধা পেয়ে গেল। বাকি টিমগুলো যেরকম বিভিন্ন ভেন্যুতে ভ্রমণ করে করে খেলছিল, ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে খেলছিলো; তা ভারতকে করতে হলো না। ভারত শুধু দুবাইতেই খেললো, স্পিন সহায়ক উইকেটে খেললো, একগাদা স্পিনার নিয়ে গেলো। তারা একরকম ঘরে বসে অন্য দেশের বিশ্বকাপ খেললো। এমনকি হোস্ট পাকিস্তান তাদের ভারতের বিপক্ষের ম্যাচটা খেলতে দুবাইতে চলে আসলো।
পুরো ব্যাপারটা পাকিস্তানকে একটা ভয়াবহ হীনমন্যতার মধ্যে এবং অপমানকর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিনের পর দিন ধরে ঠেলে দিচ্ছিল। তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলো, আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিকভাবে অবমাননার শিকার হচ্ছিলো। এর কিছুদিন পরে আবার একটা ঘটনা ঘটলো। এশিয়া কাপে হঠাৎ করেই সরকারের নির্দেশ হোক বা যেকোনো কারণে হোক ভারতের ক্রিকেটাররা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলালো না। এটা ক্রিকেটের ইতিহাসে অত্যন্ত লজ্জার একটা উদাহরণ হয়ে থাকলো। এরপর ওই টুর্নামেন্টটা জিতলো ভারত। ট্রফি জয়ের পর এসিসি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ট্রফি নেওয়া নিয়ম।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের যিনি চেয়ারম্যান- মহসিন নাকভি। তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে। এই ভদ্রলোকের কাছ থেকে ট্রফি নিতে ইন্ডিয়ান দল অস্বীকৃতি জানালো। এতরকম নাটকীয়তা এবং অবমাননার পরে ভদ্রলোক ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রফিটা নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে লকার রুমে ট্রফিটা আটকে রাখলেন।
ফলে পাকিস্তানের ক্ষোভতো অত্যন্ত যৌক্তিক। এটার একটা বিস্ফোরণ ঘটলো এই বাংলাদেশ পর্বের পরে এসে। বাংলাদেশ যখন লড়াই থেকে সরে আসলো, তারপরে হুট করে পাকিস্তান ঘোষণা দিল, তারা বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। এই ঘোষণাটা আসলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের তরফ থেকে। পাকিস্তান সরকার একটা টুইট করে জানালো যে তারা ১৫ই জানুয়ারি ভারতের বিপক্ষে কলম্বোতে যে ম্যাচটা খেলার কথা এই ম্যাচটা তারা খেলবে না।
দু-তিন দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের একটা ফুটেজ প্রকাশিত হলো টুইটার হ্যান্ডেলে। সেখানে শাহবাজ শরীফ পরিষ্কার করে বললেন যে আমরা হিন্দুস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা খেলবো না। বাংলাদেশের প্রতি, আমাদের ভাই বাংলাদেশের প্রতি যে অন্যায়টা হয়েছে আমরা এটার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে চাই। তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এই ম্যাচটা আমরা বয়কট করছি। এই সময় ওখানে শাহবাজ শরীফের সামনে যারা ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি কর্মকর্তা ছিলেন সবাই টেবিল চাপড়ে এটাকে সমর্থন করলেন।
বাংলাদেশ কিন্তু অফিসিয়ালি এই পর্যায়ে আর কোন গেম প্লেয়ার না; গেম প্লেয়ার পাকিস্তান। তখন শুরু হলো পাকিস্তানকে ওই ম্যাচটা খেলানোর জন্য দেন-দরবার। সারা ক্রিকেট দুনিয়া এটাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। কারণ ওই একটা ম্যাচ না হলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হতো ছয় হাজার পাঁচশ কোটি টাকা। আর এর সঙ্গে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ালো যে আইসিসির যারা ব্রডকাস্ট পার্টনার- ইন্ডিয়াতে জিও স্টার, ইংল্যান্ডে-আয়ারল্যান্ডে স্কাই স্পোর্টস- সবাই বিরক্তি প্রকাশ করা শুরু করলো। এরা এক ধরনের জানান দিয়ে দিলো যে এই ম্যাচটা যদি আইসিসি আয়োজন করতে না পারে তাহলে তারা আগামী ২০২৭-৩১ চক্রে আইসিসির স্বত্তের জন্য আর যাবে না। সেক্ষেত্রে আইসিসি একটা দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়তো। একইসঙ্গে এই ম্যাচের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ব্রডকাস্টাররা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। ফলে আইসিসির আসলে এই ম্যাচটা আয়োজন না করার কোন বিকল্প ছিল না।
আমরা যেটা দেখলাম যে একটা ইমার্জেন্সি বোর্ড মিটিং হলো। বোর্ড মিটিংএ একটা অলিখিত সিদ্ধান্ত আসলো যে এই পুরো ব্যাপারটা থেকে আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহকে সরিয়ে রাখা হবে; তিনি তো আবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে। এই পুরো ব্যাপারটা সামলালেন আইসিসির ডেপুটি চেয়ার উসমান খাজা।
একটা পর্যায়ে একটা সমঝোতা হলো পাকিস্তানের সঙ্গে ; নিশ্চয়ই কিছু প্রাপ্তির বিনিময়ে পাকিস্তান ম্যাচে সম্মতি দিলো। গুঞ্জন আছে যে পাকিস্তানকে একটা গ্লোবাল ইভেন্ট দেওয়া হবে, পাকিস্তানের রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এমনকি পাকিস্তানে একটা সংক্ষিপ্ত সফরে ভারত যাবে, এরকম একটা প্রলোভনও তাদের দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান মোটামুটি এই সবে রাজি হয়ে গেল।
এই সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান মহসিন নাকভি একটা খেলা খেললেন। তিনি আইসিসিকে বললেন যে এই সমঝোতা বৈঠকটা তখনই হবে, যখন আমার পাশে বিসিবি প্রেসিডেন্ট আমিনুল ইসলাম থাকবেন। তাকে উপস্থিত রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আমি রাজি হব খেলতে। এই গেমটা বাংলাদেশের জন্য খুব কাজে লাগছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল গভীর রাতে লাহোরে উড়ে গেলেন। সেখানে আইসিসির কর্মকর্তারা আসলেন। আইসিসির কিছু কর্মকর্তা ভার্চুয়ালি যুক্ত হলেন। সব মিলিয়ে একটা সমঝোতা হলো। পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং আইসিসির অনুমোদনের পর একটা প্রেস রিলিজ দিয়ে আইসিসি জানালো যে বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ এই ম্যাচটা বিশ্বকাপটা খেলতে যায়নি এবং বাংলাদেশকে আইসিসি কীভাবে মিস করছে সেটা খুব কাব্যিক ভাষায় বলা হলো। বলা হলো যে বাংলাদেশ যেখানে অংশগ্রহণ করেনি তাতে তাদের কোন শাস্তি হওয়া বা ভবিষ্যতে তাদের ক্রিকেটের কোন ক্ষতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং তারা তাদের পুরো পার্টিসিপেশন মানি বুঝে পাবে এবং আইসিসি অনুশোচনা করেছে। তারা বলেছে, সবকিছুর আরও ভালো সমাধান হতে পারতো। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে, এখানে বিপিএল এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, এগুলোতে আরো উন্নয়নের জন্য আইসিসির যে যে ভূমিকা রাখার আছে সেগুলো রাখা শুরু হবে। একইসঙ্গে একটা বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো যে ২০৩১ সালের আগেই বাংলাদেশ আরো একটা আইসিসির গ্লোবাল ইভেন্ট পাবে কম্পেনসেশন হিসেবে।
একইসঙ্গে প্রেস রিলিজে বলা হলো যে বাংলাদেশের জন্য ডিসপুট রেজুলেশন কমিটিতে যাওয়ার যে দুয়ার সেটা বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ যেকোনো সময় চাইলে মামলা করতে পারে। মানে এখানে আইসিসি বলছে যে তোমরা মামলা করো, মামলা করলে আমরা ওখানে আত্মপক্ষ সমর্থন করব না। তাহলে ডিসপুট রেজুলেশন কমিটি আইসিসির বিপক্ষে একটা রায় দেবে যে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দাও। সেটাও আইসিসি দিতে প্রস্তুত আছে।
যদি বস্তুগত প্রাপ্তির কথা ভাবেন তাহলে বাংলাদেশের অনেক বস্তুগত প্রাপ্তি হলো। বিশ্বকাপ খেললে এত আর্থিক এবং আয়োজানগত প্রাপ্তি হতো না।
সমস্যা হচ্ছে, এখানে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি- একটা আরেকটাকে মুছে দিতে পারছে না। প্রথমে পর্বে আমরা নিজেদের ব্যর্থতা ও আইসিসির গোয়ার্তুমিতে বিশ্বকাপটা মিস করেছি। ১৯৯৯ সালে আমরা বিশ্বকাপ খেলা শুরু করেছি। আজ পর্যন্ত কোন ফরম্যাটের কোন বিশ্বকাপ আমরা মিস করিনি। ফলে এটা তো আমাদের ইতিহাসে একটা বিরাট কালো দাগ হয়ে থাকলো, হতাশার ব্যাপার হয়ে থাকলো। এই বিশ্বকাপ দলে যারা ছিলেন এরভিতরে অনেকে হয়তো আর কখনো কোন বিশ্বকাপ দলে ডাক পাবেন না। ফলে তাদের জীবনের জন্য এটা একটা দুঃখগাঁথা হয়ে থাকলো। এটা অপূরণীয় ক্ষতি এবং এই পর্বটা আসলেই বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক একটা বিপর্যয় ছিল।
কিন্তু যদি আমরা একেবারে শেষ ফলাফল দেখি তাহলে দেখবো যে বাংলাদেশ আসলে বিশ্বকাপ খেলা বাদে যা যা সর্বোচ্চ পাওয়া সম্ভব ছিল সেটা পেয়েছে। সেটাকে আমি বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিজয়ও আবার ঠিক বলতে রাজি না। কারণ এটা আসলে পাকিস্তানের একটা কূটনৈতিক বিজয় হয়েছে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে এগুলো পাইয়ে দেওয়ার ভেতর দিয়ে যেটা প্রমাণ করলো, তারা বড় হয়ে গেছে। ভারত প্রতিটা ব্যাপারে বলবে আমাকে বা আমার আশেপাশে কাউকে, আমরা সেটা মেনে নেবো না। বরং আমিও এখন একটা অন্যরকম বড় ভাই। আমার কথায় কেউ কেউ চলে এবং তার সুবিধা অসুবিধা আমি দেখি। তারা এখন আইসিসি রিফরমেশনের দাবি তুলছে। পুরো ব্যাপারটা পাকিস্তানের একটা দুর্দান্ত কূটনৈতিক বিজয় হয়েছে।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত নিজেকে একটু সুবিধাভোগী বলে দাবি করতে পারে। এর চেয়ে বেশি কিছু না।