কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল ২০২৬ স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছে বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই)। এই নির্দেশের কারণে নিয়ম মেনেই তাকে ছাড়তে হয়েছে কেকেআরকে।
মুস্তাফিজ নিজেই বলেছেন, “যদি আমাকে ছাড়ে, তাহলে আমি কী করবো?” কিন্তু পরিস্থিতির ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বড় কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তিনি।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দল রংপুর রাইডার্স স্পষ্টভাবে মুস্তাফিজের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাকে সমর্থন জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল ২০২৬ থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকরা ঘৃণার রাজনীতি দেখতে পেয়েছেন এবং এতে তারা ব্যথিত হয়েছেন।
গত শনিবার ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিলে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তা কার্যকর করেছে। এর আগে ১৬ই ডিসেম্বর আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে কেকেআর মুস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রূপিতে দলে নিয়েছিল।
উপদেষ্টা ফারুকী তার ফেইসবুকে পোস্টে বলেছেন, ভারতীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, মুস্তাফিজের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার ঘটনাও সেই একই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িত হতে পারে।
তিনি লিখেছেন, “গত কয়েকদিন ধরে ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতনের খবর এসেছে, তার প্রেক্ষিতে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ঘটনাও কি সেই একই প্রভাবের ফল, সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখবে। এছাড়া ভবিষ্যতে আমাদের ক্রিকেট ও ফুটবল দল সেখানে কতটা নিরাপদ থাকবে, তাও বিবেচনা করা হবে।”
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কঠোরভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন।
তিনি তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চাপে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড কেকেআরকে নির্দেশ দিয়েছে মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দিতে। আমি এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।"
বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচারও বন্ধ করার জন্য আমি তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছেন জানিয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল লিখেছেন, "আমরা কোনো অবস্থাতেই আমাদের ক্রিকেটার ও দেশের অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ।”
মুস্তাফিজের বাদ পড়ার পেছনে ভারতীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকিকে মূল কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের সময় কলকাতা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে সাংবাদিকরা বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে আইসিসি, স্বাগতিক দেশ ভারত। আমাদের যদি কোনো যোগাযোগ করতে হয়, সেটা আমরা আইসিসির সঙ্গে করব।”
এবারের বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে স্বাগতিক দেশ হিসেবে রয়েছে শ্রীলঙ্কাও। পাকিস্তান তাদের সমস্ত ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলবে। বিসিবি কি এমন কোনো অনুরোধ আইসিসির কাছে করবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিসিবি মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন বলেন, “এটা আইসিসিই ঠিক করবে কোন ভেন্যু উপযুক্ত হবে।”
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এই ইস্যুতে আইসিসি ও আইপিএল কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ম্যাচ আয়োজনের প্রেক্ষাপটে।
অনলাইনে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু বিশ্লেষক ও ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করছেন, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের কারণে ঘটেছে।
ভারত থেকে যেসব প্রতিক্রিয়া আসছে
বিসিসিআই জানিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরাপত্তা ও জনমতের দিক লক্ষ্য করে মুস্তাফিজকে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেকেআরকে বদলি খেলোয়াড় নেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
কিছু ভারতীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মতামত উঠে এসেছে যেখানে বোর্ড স্থানীয় প্রতিক্রিয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, কেউ বলছেন খেলা ও রাজনীতি আলাদা থাকা উচিত।
কিছু কোচ ও খেলোয়াড় মন্তব্য করেছেন, “ধর্ম বা জাতি পরিস্থিতির তুলনায় বড় নয়” এবং খেলাধুলায় পারস্পরিক সম্মান থাকা উচিত।
কংগ্রেস নেতা ও লোকসভা সদস্য শশী থারুর এই সিদ্ধান্তকে অনুচিত ও রাজনৈতিক প্রভাবিত বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, “মুস্তাফিজ একজন ক্রীড়াবিদ। তার ব্যক্তিগতভাবে কোনও ঘৃণাসূচক মন্তব্য বা হামলার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ক্রীড়াবিদ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মিশিয়ে ফেলাটা সঠিক নয়।”
থারুর আরও বলেছেন, প্রতিবেশি দেশগুলোকে খেলাধূলায় আলাদা করে ফেলার সিদ্ধান্ত কখনোই গঠনমূলক হবে না। তিনি বলেন, “যদি ভারত এমন দেশ হয়ে যায় যে সব প্রতিবেশিকে বিচ্ছিন্ন করে, এ ধরনের মনোভাব কোনও উপকার বয়ে আনবে না। আমাদের বড় মন ও হৃদয় থাকতে হবে।”
মুস্তাফিজকে কলকাতার স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার পর থারুর নিজের এক্স হ্যান্ডলে একটি ভিডিও শেয়ার করে প্রশ্ন তুলেছেন, “এই শাস্তি আসলে কাকে দেওয়া হচ্ছে — একজন ব্যক্তিকে, একটি দেশকে নাকি ধর্মকে? খেলাধূলাকে এভাবে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে?”
১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন লাল, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনুচিত ও রাজনৈতিক প্রভাবিত বলে মন্তব্য করেছেন।
ইন্ডিয়া টুডে-কে তিনি বলেছেন, “বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও নয়। কিন্তু খেলাধূলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে, তা আমি বুঝতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেছেন, মুস্তাফিজ এখানে পরিস্থিতির শিকার। “নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে চাপ ছিল। বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা দুঃখজনক, কিন্তু খেলোয়াড়দের কেন এর মাঝখানে টেনে আনা হচ্ছে?”
তবে ভারতের "জাতীয় আবেগের" প্রভাবও মদন লাল স্বীকার করেছেন।
“কোটি কোটি মানুষ ক্রিকেট ভালোবাসে। দিনের শেষে দেশই সবার আগে, আর সেই অবস্থান থেকেই বোর্ড হয়তো কঠিন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে,” বলছেন সাবেক এই তারকা।
মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজেপি নেতা ও ধর্মীয় গুরু সংগীত সোম।
বার্তা সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, “১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের আবেগকে সম্মান জানিয়ে বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। এটি গোটা দেশের হিন্দুদের জয়।”
মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার পর কেকেআর-এর মালিক শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ ও 'বিশ্বাসঘাতক' আখ্যা দিয়েছিলেন সোম।
“শাহরুখ খান বুঝেছেন যে ভারতে সনাতনীদের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত নয় এবং হাজারো সনাতনীর কারণে তিনি আজ এই অবস্থানে,” বলেন এই বিজেপি নেতা।