ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর একটি হচ্ছে ব্যালন ডি’অর। সাত দশকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্যারিসের বাইরে বসেছে এই পুরস্কারের আসর। ২৬এ অক্টোবর ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আয়োজন। আর এই ঐতিহাসিক রাতেই পুরুষদের ব্যালন ডি’অর জিতে নিয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন। দুইবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও কেইনের হাতে তুলে দিয়েছেন এই পুরস্কার। একই সঙ্গে তার হাতে উঠেছে পুরুষদের জার্ড মুলার ট্রফিও, যা গোল করার অসাধারণ দক্ষতা ও ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি। কেইনের জোড়া অর্জন তার রাতটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। তবে তার ব্যালন ডি’অর জয়ের তাৎপর্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা, সাত দশকের ফুটবল ইতিহাস এবং এক আশ্চর্য প্রতীকী যোগসূত্র।
১৯৫৬ সালে প্যারিসে প্রথমবারের মতো দেওয়া হয় ব্যালন ডি’অর। সেই আসরের বিজয়ী ছিলেন ইংল্যান্ডের স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস। সাত দশক পর পুরস্কারটির ৭০তম আসরের মঞ্চ হিসেবে লন্ডনকে বেছে নেওয়া যেন ইতিহাসের সেই শুরুর দিকেই ফিরে তাকানো। আর কেইনের হাতে পুরস্কার ওঠায় প্রথম বিজয়ী ম্যাথিউসের সঙ্গে ৭০তম আসরের বিজয়ীর গল্পটিও মিলে যায় এক প্রতীকী সূত্রে। যে দেশের ফুটবলার প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, সাত দশক পর সেই দেশেরই আরেক ফুটবলারের হাতে উঠলো ট্রফি। মাঝখানে বদলে গেছে ফুটবলের পৃথিবী, কেটে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবু ইতিহাসের এই মিল যেন ব্যালন ডি’অরের দীর্ঘ যাত্রায় পূর্ণ করে দিলো এক বৃত্ত।
গোলের পর অপেক্ষার অবসান
কেইনের এই জয়কে কেবল ইতিহাসের এক প্রতীকী মিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাঠের পারফরম্যান্সেও নিজের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।
২০২৫–২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে জিতেছেন ঘরোয়া লিগ ও কাপের শিরোপা। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে করেছেন ছয় গোল। কেইনের সাফল্য শুধু গোলসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে মাত্র ৯৮ ম্যাচে বুন্দেসলিগায় ১০০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি, ভেঙেছেন ডিয়েটার মুলারের ৪৯ বছর ধরে টিকে থাকা রেকর্ড। মাঠে গোল করার পাশাপাশি দলের প্রয়োজনে রক্ষণেও অবদান রাখা এবং অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
গোল করার ধারাবাহিকতা, বায়ার্নের সাফল্যে অবদান এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর ওঠা তার অসাধারণ মৌসুমেরই স্বীকৃতি। একই রাতে জার্ড মুলার ট্রফিও জিতেছেন তিনি, পেয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি। ভোটের লড়াইয়েও এগিয়ে ছিলেন কেইন। ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরে প্রথম হয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। দ্বিতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পে, তৃতীয় বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামাল। সেরা পাঁচে তাদের পর আছেন রদ্রি ও লিওনেল মেসি। পুরস্কার হাতে নিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেইন।
তবে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় রাতেও ভুলে যাননি শৈশবের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারকে। বক্তব্যের শুরুতেই ক্লাবটিকে ধন্যবাদ জানান ইংল্যান্ড অধিনায়ক। মাত্র ১১ বছর বয়সে টটেনহ্যামে যোগ দেওয়া কেইন মনে করিয়ে দেন, ক্লাবটির অবদান ছাড়া আজকের জায়গায় পৌঁছানো তার পক্ষে সম্ভব হতো না।
টটেনহ্যামে কাটানো উত্থান-পতনের দিনগুলোকে নিজের যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বায়ার্ন মিউনিখের সতীর্থদের পাশাপাশি ধন্যবাদ জানান ইংল্যান্ড দলকেও। ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হাতে নিয়েও কেইনের বক্তব্যে তাই জায়গা করে নেয় তার বেড়ে ওঠার দিনগুলো যে দিনগুলো তাকে বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছে।
কেইনের এই বক্তব্য তার জয়ের রাতকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি হাতে নিয়েও তিনি ফিরে যান নিজের শুরুর দিনে, স্মরণ করেন সেই ক্লাবকে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার বেড়ে ওঠার গল্প।
২৫ বছর পর ইংল্যান্ডের ব্যালন ডি’অর
ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে ব্যালন ডি’অর নতুন কোনো নাম নয়। তবে এই পুরস্কার জেতার অপেক্ষাটা ছিল দীর্ঘ। ১৯৫৬ সালে প্রথম বিজয়ী স্ট্যানলি ম্যাথিউস। এরপর ১৯৬৬ সালে ববি চার্লটন, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে কেভিন কিগান এবং ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েন জেতেন পুরস্কারটি। কিগান দুবার ব্যালন ডি’অর জেতায় কেইনের আগে ইংলিশ বিজয়ী ছিলেন চারজন।
ওয়েনের জয়ের পর কেটে যায় ২৫ বছর। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান কেইন। তার এই অর্জন তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের ফুটবলের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেইনের আগে ইংল্যান্ডের চারজন ফুটবলার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন কিগানের দুটি জয় হিসাব করলে দেশটির মোট জয় ছিল পাঁচটি। কেইনের হাত ধরে এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ছয়ে।
এবারের আয়োজনের স্থান নির্বাচনও ছিল প্রতীকী। ফ্রান্স ফুটবল ১৯৫৬ সালে যে পুরস্কার চালু করেছিল, তার প্রথম বিজয়ী ছিলেন ইংল্যান্ডের ম্যাথিউস। সেই ইতিহাসের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতেই ব্যালন ডি’অরের ৭০তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠান প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ডে, লন্ডনের লন্ডন প্যালাডিয়ামে।
কেইনের জয়ের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসেও। ১৯৯৬ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে ম্যাথিয়াস সামারের জয়ের পর বুন্দেসলিগার কোনো ক্লাবে খেলে ব্যালন ডি’অর জেতা প্রথম ফুটবলারও কেইন।
অর্থাৎ, লন্ডনের ৭০তম আসরে কেইনের হাতে ট্রফি ওঠা শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি ইংল্যান্ডের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, বুন্দেসলিগার জন্য বিরল স্বীকৃতি এবং ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসের সঙ্গে তৈরি হওয়া এক অনন্য যোগসূত্র।
নারী ব্যালন ডি’অরে পুতেয়াসের হ্যাটট্রিক
রাতের আরেক বড় গল্প অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াসের। নারী ব্যালন ডি’অর জিতে নিজের ট্রফি ক্যাবিনেটে যোগ করেছেন তৃতীয়টি। ২০২১ ও ২০২২ সালের পর ২০২৬ সালেও এই পুরস্কার জিতে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন স্পেনের এই মিডফিল্ডার। বার্সেলোনার হয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পর গুরুতর চোট তার ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই ধাক্কা কাটিয়ে আবারও শীর্ষ পর্যায়ে ফিরে আসা পুতেয়াসের জন্য এই জয়কে করে তুলেছে আরও বিশেষ। পুরস্কার গ্রহণের সময় সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার সতীর্থ, কোচ, চিকিৎসক দল ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান তিনি। বার্সেলোনার অধিনায়ক হিসেবে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, এই পুরস্কার তার কাছে ক্লাবটির জন্যও।
বর্তমানে ইংল্যান্ডের লন্ডন সিটি লায়নেসেসে খেলা পুতেয়াসের জন্য লন্ডনের মঞ্চে এই জয় যেন ক্যারিয়ারের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। চোটের বাধা পেরিয়ে তিনবারের নারী ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে তাঁর প্রত্যাবর্তন ফুটবলে অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল গল্প।
এক রাতে আরও যারা জিতলেন
ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরে পুরুষ ও নারী ফুটবলের বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন আরও অনেকে। ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি তরুণ প্রতিভা, গোলরক্ষক, কোচ ও ক্লাবগুলোর সাফল্যও জায়গা করে নিয়েছে এই আয়োজনের মঞ্চে।
পুরুষদের কোপা ট্রফি জিতেছেন লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে টানা তৃতীয়বার পুরস্কারটি জিতে গড়েছেন অনন্য কীর্তি। তিনবার কোপা ট্রফি জেতা প্রথম ফুটবলার হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পুরস্কার গ্রহণের পর সতীর্থ পাও কুবর্সির কথাও ভোলেননি ইয়ামাল। তার মতে, এই পুরস্কার কুবর্সিরও প্রাপ্য ছিল। নিজের অর্জনের রাতেও সতীর্থকে সামনে তুলে ধরার এই মুহূর্তটি তার বক্তব্যে যোগ করে অন্য রকম সৌন্দর্য।
নারীদের বর্ষসেরা তরুণের পুরস্কার জিতেছেন বার্সেলোনার ভিকি লোপেজ। টানা দ্বিতীয়বার এই স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। দুই বিভাগেই তরুণ প্রতিভার পুরস্কার স্প্যানিশ ফুটবলারদের হাতে ওঠা দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ইতিবাচক বার্তা।
নারী ব্যালন ডি’অর জিতেছেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। গোলরক্ষকদের বিভাগে পুরুষদের ইয়াশিন ট্রফি পেয়েছেন উনাই সিমন, আর নারীদের ইয়াশিন ট্রফি জিতেছেন কাতা কোল। সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি জার্ড মুলার ট্রফি উঠেছে হ্যারি কেইনের হাতে। মেক্সিকোর চার্লিন কোরালও এবারের ব্যালন ডি’অরে গড়েছেন ইতিহাস। প্রথম মেক্সিকান ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর আয়োজনে পুরস্কার জিতেছেন তিনি। নারীদের বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের পুরস্কার জিতে দেশের ফুটবলে নতুন এক অধ্যায় লিখেছেন কোরাল।
কোচিং বিভাগে পুরুষদের বর্ষসেরা হয়েছেন স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে, আর নারীদের বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত হয়েছেন বার্সেলোনার পেরে রোমেউ। ক্লাব বিভাগে পুরুষদের বর্ষসেরা হয়েছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন ফুটবল ক্লাব (পিএসজি), নারী বিভাগে বার্সেলোনা। গোলরক্ষক ও কোচিং বিভাগে স্প্যানিশ প্রতিনিধিদের সাফল্যের পাশাপাশি ক্লাব বিভাগে পিএসজি ও বার্সেলোনার স্বীকৃতি রাতটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ফুটবলের বাইরের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সক্রেটিস পুরস্কার পেয়েছেন বুকায়ো সাকা। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ, দাতব্য কাজ এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টার জন্য এই সম্মান পেয়েছেন আর্সেনাল ও ইংল্যান্ডের এই তারকা। পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্যে সাকা রুয়ান্ডার ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চিঠির কথা তুলে ধরেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়া ছেলেটি তার দাতব্য উদ্যোগের সহায়তায় প্রয়োজনীয় চোখের চিকিৎসা পায়। সেই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়ে সাকা জানান, যেসব শিশুকে সাহায্য করা সম্ভব হয়েছে, তাদের সবার পক্ষ থেকেই এই পুরস্কার গ্রহণ করছেন তিনি।
ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে সাকার এই স্বীকৃতি মনে করিয়ে দেয়, ফুটবলারের প্রভাব শুধু মাঠের গোল কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠের বাইরেও মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ থাকে। আর সেই অবদানের স্বীকৃতি ফুটবলের সাফল্যের সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করে।
কখনো কখনো ফুটবল শুধু গোলের হিসাব রাখে না মনে রাখে সময়ের হিসাবও। আর লন্ডনের এই রাত মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের কিছু বৃত্ত পূর্ণ হতে দীর্ঘ অপেক্ষা লাগে। কিন্তু যখন সেই বৃত্ত পূর্ণ হয়, তখন তার সৌন্দর্যও হয়ে ওঠে অনন্য।