ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে চার বছর ধরে চলা তদন্তের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে প্রিমিয়ার লিগ গঠিত স্বাধীন কমিশন। প্রায় এক দশক ধরে চলা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ইংলিশ ক্লাবটিকে।
প্রিমিয়ার লিগের আনা ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ক্লাবটি। একইসাথে তদন্তে সহযোগিতা না করার ৪টি নির্দিষ্ট অভিযোগের ৩টিতেও ম্যানচেস্টার সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে কমিশন।
তদন্তে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক স্বচ্ছতা ও উয়েফার ক্লাব লাইসেন্সিং নীতি ভঙ্গের প্রমাণও পেয়েছে কমিশন। ইংলিশ ফুটবলে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে এই রায়। পাশাপাশি ক্লাবটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের নথিপত্রে ম্যানচেস্টার সিটি তাদের স্পনসরশিপ আয় দেখায় প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। তবে তদন্ত শেষে কমিশন জানায়, প্রকৃত স্পনসরদের কাছ থেকে সিটির পকেটে এসেছিল মাত্র ১১৯ মিলিয়ন পাউন্ড। বাকি ৮৩০ মিলিয়ন পাউন্ড সরাসরি বিনিয়োগ করেছিল সিটির আবুধাবিভিত্তিক মালিকপক্ষ। সিটির দেখানো স্পনসর আয়ের ৮৭.৫ শতাংশই ছিল ভুয়া।
কমিশন বলছে, ভুয়া চুক্তির মাধ্যমে সিটি একদিকে যেমন কাগজে আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছে, অন্যদিকে খরচ কম দেখানোর পথ বেছে নিয়েছিল। খেলোয়াড়দের ‘ইমেজ রাইটস’ নিয়ে 'ফোর্ডহ্যাম' নামক একটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি দেখানো হয়, যার মূল অর্থ গোপনে পরিশোধ করেছিল সিটির মালিকপক্ষ আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (এডিইউজি)।
স্পনসরশিপের আড়ালে অর্থায়ন, কোচ ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে গোপন আর্থিক চুক্তি এবং ইমেজ রাইটসের অর্থ গোপন করা মিলিয়ে সিটি মোট ৯০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি অনিয়ম করেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিশন।
এ রায়ের মাধ্যমে সেই ২০০৯ থেকে ২০১৮ সময়কালে সিটি কী করেছিল, তার বাস্তব চিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতার সততা ও সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব’।
ফুটবলের স্বচ্ছতার জন্য এ রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবে বলেও জানিয়েছে।
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই রায় আলোচনা তৈরি করেছে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও। ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম আবুধাবিভিত্তিক মালিকদের অবদানের প্রশংসা করলে সৃষ্টি হয় তীব্র বিতর্কের। দেশটির শ্যাডো স্পোর্টস মিনিস্টার লুই ফ্রেঞ্চ অ্যান্ডির এই মন্তব্যকে ‘প্যানেলকে প্রভাবিত করার সামিল’ বলে মন্তব্য করেন। পরবর্তীতে এই রায়কে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ জানিয়ে বিবৃতি দেয় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। টেন ডাউনিং স্ট্রিট থেকে জানানো হয়, ‘কেউ নিয়মের উর্ধ্বে নয়। অনিয়ম প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে’।
তবে এই রায়কে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন সিটির প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্লাব, মালিক ও সমর্থকদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন সিটির সাবেক ও সফলতম কোচ পেপ গার্দিওলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গার্দিওলা লেখেন, ‘আমি সব সময় ছিলাম, আছি এবং থাকব। আমরা একসঙ্গে এই পরিস্থিতি পার হয়ে যাব’।
নিজেদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ চ্যালেঞ্জ করে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ম্যানচেস্টার সিটি। আপিলে স্পনসরশিপের টাকা ক্লাবের মালিকপক্ষ নয়, বরং আবুধাবি সরকার দিয়েছিলো বলে দাবি করতে পারে তারা।
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আনা ১১৫টি অভিযোগের ১১৪টিতে দোষী সাব্যস্ত হলেও কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হবে প্রিমিয়ার লিগের পৃথক শুনানির মাধ্যমে। আইনি লড়াই সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূল শাস্তি কার্যকর হতেও কিছুটা সময় লাগবে।