বিপিএল মানে 'বিতর্ক প্রিমিয়ার লিগ' এবারেও ব্যতিক্রম নেই

শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের নতুন আসর, ২০২৫-২৬ সেশনের বিপিএলের প্রথম ম্যাচ হবে শুক্রবার সিলেট ও রাজশাহীর মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে। 

তবে মাঠের বাইরের খেলা শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। 

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) শুরু থেকেই মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাতেই বেশি আলোচনায় এসেছে। ফলে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, বিপিএল মানেই বিতর্ক। এই কথাটার পেছনে কয়েকটি ধারাবাহিক ও কাঠামোগত কারণ আছে।

প্রায় প্রতি আসরেই কোনো না কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশি খেলোয়াড়দের বেতন না পাওয়া, হোটেল বিল বকেয়া থাকা কিংবা শেষ মুহূর্তে দল ছেড়ে দেওয়া, এসব ঘটনা নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। এতে টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন  হয়েছে।

আর এবারে এসব ঘটনা ঘটছে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই। 

বিতর্ক-১ টাকা নেই, তাই সরে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম 

বিপিএল থেকে সরে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম রয়্যালস, এটি এবার অংশ নেওয়া চারটি নতুন দলের একটি।

বিপিএলের নিলামে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস। তারা সর্বোচ্চ ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় ওপেনার মোহাম্মদ নাঈমকে দলে ভিড়িয়ে বড়সড় বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে পুরো চিত্রটাই বদলে যায়।

বিপিএল শুরুর এক দিন আগে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকানা ছেড়ে দেয় ট্রায়াঙ্গুল সার্ভিস। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধে অক্ষমতা এবং প্রত্যাশিত স্পন্সর না পাওয়াকে কারণ দেখিয়ে স্বত্বাধিকারী আবদুল কাইয়ুম গভর্নিং কাউন্সিলের কাছে বিপিএল থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেন। বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে চুক্তি হলেও তাদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

এমনিতেই বিপিএলে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক সময়মতো না পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪–২৫ মৌসুম থেকেই নয়, এর আগের আসরগুলোরও অনেক খেলোয়াড় ও কোচ এখনো পুরো টাকা পাননি।

২০১২ সালে বিপিএল শুরুর পর প্রথম দিকের কয়েকটি আসরেই পেমেন্ট সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। 

২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল। 

তবে গত মৌসুমে আবার এই সমস্যা সামনে আসে। 

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল, দুর্বার রাজশাহীর খেলোয়াড়রা বকেয়া ভাতা ও হোটেল বিলসহ বিভিন্ন পাওনার দাবিতে একটি অনুশীলন ও একটি ম্যাচ বর্জন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সরকার হস্তক্ষেপ করার পর মালিকপক্ষ টাকা পরিশোধ করে।

এ ছাড়া নিলামের আগে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং নিলামে দল পাওয়া কয়েকজন বিদেশি খেলোয়াড় টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে শ্রীলঙ্কার নিরোশন ডিকওয়েলা, পাকিস্তানের আবরার আহমেদ ও আয়ারল্যান্ডের পল স্টার্লিং রয়েছেন। 

এতে প্রতিযোগিতার মান কিছুটা কমছে, আর খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে যে অনিশ্চয়তা আছে, তা শিগগিরই কাটবে, এমন সম্ভাবনাও কম।

বিতর্ক-২, বল নেই তাই সরে দাঁড়িয়েছেন নোয়াখালীর কোচ

সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের দল পৌঁছায়। আগামীকাল এখান থেকেই বিপিএল শুরু হবে। সে কারণে সব দলের অনুশীলন চলছে এই স্টেডিয়ামে।

বাস থেকে নেমে নোয়াখালীর ক্রিকেটাররা মাঠে গেলেও কিছুক্ষণ পর হঠাৎ স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যান জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের প্রধান কোচ খালেদ মাহমুদ। তাঁকে ঘিরে সাংবাদিকরা জানতে চান কেন তিনি চলে যাচ্ছেন।

শুরুর দিকে কথা বলতে না চাইলেও পরে খালেদ মাহমুদ জানান, দলের লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, তিনি কোনোভাবেই বিপিএলে কাজ করতে চান না।

দলের কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। পরে সহকারী কোচ তালহা জুবায়েরকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিতে করে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন।

খালেদ মাহমুদ জানান, তিনি নোয়াখালী এক্সপ্রেসের কোচের দায়িত্বে থাকতে চান না। দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অন্য কেউ দায়িত্ব নিতে পারবেন।

বিতর্ক-৩, ফিক্সার সন্দেহে এবার নেই ৯ ক্রিকেটার

গত মৌসুমের বিপিএল নিয়ে করা দুর্নীতি তদন্তের ৯০০ পৃষ্ঠার বেশি একটি প্রতিবেদন এখনো বড় উদ্বেগ হয়ে আছে। স্বাধীন তদন্ত কমিটি দুই মাস আগে এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে জমা দিলেও বিসিবি এখনো এতে নাম থাকা ক্রিকেটারদের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

তবে গত মাসে বিপিএলের খেলোয়াড় নিলামে নয়জন ক্রিকেটারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এদের কয়েকজন প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন, এমনকি একজন বিসিবির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ফলে এই মৌসুমের বিপিএলে তারা খেলতে পারছেন না, যা তাদের ক্যারিয়ারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিসিবি তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে।

নিলামের সময় বিসিবি নিজের অবস্থানে অনড় থাকলেও বিতর্ক থামেনি। কারণ, যাদের নাম প্রতিবেদনে সন্দেহজনক হিসেবে উঠে এসেছে বলে শোনা যায়, তাদের কয়েকজনকে নিলামে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির টেবিলে বসে থাকতে দেখা গেছে। এসব ব্যক্তি মূলত দলগুলোর কর্মকর্তা এবং তারা এখনও ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে যুক্ত আছেন।

এদিকে, ৯০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে আসলে কী রয়েছে তা নিয়েও কৌতূহল ও প্রশ্ন বাড়ছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিপিএলের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন চলতেই থাকবে, ম্যাচ মাঠে গড়ালেও।

বিতর্ক-৪, নানা লীগের মাঝে কোণঠাসা বিপিএল

বিপিএলের সূচি একই সময়ে পড়েছে বিগ ব্যাশ লিগ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলটি২০ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০-এর মতো টুর্নামেন্টের সঙ্গে। এ ছাড়া বিপিএলকে ঘিরে অস্থিরতার ধারণাও রয়েছে। এসব কারণে অনেক পরিচিত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি তারকা এবার বিপিএলে খেলছেন না।

তবে এর ইতিবাচক দিক হলো, নতুন ও অনক্যাপড খেলোয়াড়দের সামনে নিজেদের প্রমাণ করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিলামে বেশ কয়েকজন দেশীয় অনক্যাপড ক্রিকেটার নিজেদের ভিত্তিমূল্যের চেয়ে বেশি দামে দলে জায়গা করে নিয়েছেন।

এদের মধ্যে ওপেনার হাবিবুর রহমান সোহান বড় শট খেলার ক্ষমতার জন্য আলোচনায় আছেন। পাশাপাশি টেপটেনিস ক্রিকেট থেকে উঠে আসা অলরাউন্ডার আবদুল গাফফার সাকলাইন তার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিয়ে নজর কেড়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে উঠছেন অলরাউন্ডার এস এম মেহেরবও।

এ ছাড়া রংপুরকে ইতিমধ্যেই দুটি ঘরোয়া শিরোপা এনে দেওয়া অধিনায়ক আকবর আলীর দিকেও বাড়তি নজর থাকবে। নেতৃত্বের সেই সাফল্য তিনি বিপিএলেও মাঠের পারফরম্যান্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে দর্শক মাঠে টানার বড় নিয়ামক তারকা ক্রিকেটার, সেই ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্সের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ নিঃসন্দেহে মিস করবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা।

বিতর্ক-৫, যোগ হয়েছে নিরাপত্তা শঙ্কাও

টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নাম সরিয়ে নিয়েছেন সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজের ক্রিকেটার- অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। যদিও লংকান তারকা ক্রিকেটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছেন তবে সংবাদমাধ্যমে এসেছে নিরাপত্তার কারণেই তিনি আসছেন না। 

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও শঙ্কায় আছে কিছুটা, যদিও খোলাসা করেননি কেউ, তবে আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, তাদের মূল লক্ষ্য হলো মাঠের ক্রিকেট যেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়। নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন এবং তাদের দেওয়া নির্দেশনা ও পরামর্শ মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতির যে কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয় এবং খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।