বিপিএল নিয়ে দুর্নীতি, অভিযোগের তীর বিসিবি’র ঘরেই 

“আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধি (২০২৪) লঙ্ঘনের দায়ে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে বিসিবি।” 

এই শিরোনামে মঙ্গলবার বিকালে বিসিবির মিডিয়া বিভাগ থেকে একটা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গণমাধ্যমে চলে আসে। অনেকের নজরে পড়তে থাকে, যাতে কেউ বিস্মিত হয়েছেন, বিরক্ত হয়েছেন‌‌, বা দ্বিধায় পড়ে গেছেন।

তবে এ নিয়ে কানাঘুষা ছিলো আরো আগে থেকেই। মঙ্গলবারই যেমন ক্রিকেটপাড়ায় সকাল থেকেই গুঞ্জন ছিলো এমন কোনো বোমা ফাটতে যাচ্ছে।

কী আছে বিজ্ঞপ্তিতে?

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএলের ১২ তম আসর ঘিরে নানা দুর্নীতির অভিযোগে গঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের তদন্তের ভিত্তিতে এই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

এতে অভিযুক্ত তিনজন হলেন; মোখলেছুর রহমান (শামীম), যিনি ২০২৫ সালে বিসিবির গঠিত অ্যাডহক কমিটিতে পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বিসিবিতে অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

আরেক জন হলেন বিসিবির সাবেক সিকিউরিটি লিয়াজোঁ অফিসার জাকির হোসেন এবং বগুড়া জেলার সাবেক বিসিবি কাউন্সিলর ও অডিট কমিটির সাবেক সদস্য সচিব রকিবুল ইসলাম সানি।

এদের তিন জনের বিরুদ্ধেই বিসিবির অ্যান্টি করাপশন কোডের বেশ কিছু ধারা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। তাদের প্রত্যেককে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিসিবি। অভিযোগের নোটিশ পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে তাদের প্রত্যেককে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জবাব দিতে হবে। এরপর আইসিসির অ্যান্টি-করাপশন কোড অনুযায়ী পরবর্তী শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে অ্যালেক্স মার্শালের নেতৃত্বাধীন বিসিবির ইনটিগ্রিটি ইউনিট।

তিন অভিযুক্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধারায় অভিযোগ এসেছে শামীমের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন কোডের ২.১.১, ২.১.৪, ২.৪.৪ ও ২.৪.৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপিএলে কোনো ম্যাচের ফলাফল, অগ্রগতি, পরিচালনা অথবা অন্যান্য বিষয় বেআইনিভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা কিংবা ফিক্সিং–সংক্রান্ত চুক্তি বা প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত থাকা; প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো অংশগ্রহণকারীকে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে প্ররোচিত করা, উসকানি দেওয়া বা সহায়তা করার অভিযোগ।

এ ছাড়া কোনো দুর্নীতিমূলক প্রস্তাবে সাড়া বা আমন্ত্রণ পাওয়ার পর তা দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তাকে বিস্তারিত না জানানো ও তদন্তের জন্য প্রাসঙ্গিক বা প্রমাণ হতে পারে, এমন কোনো যোগাযোগতথ্য ডিলিট বা ধ্বংস করে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করার অভিযোগও আছে।

অনেকটা একই রকম অভিযোগ বিসিবির সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জাকির হোসেনের বিরুদ্ধেও। তিনটি ধারায় তার বিরুদ্ধে সরাসরি ম্যাচ পাতানোর চেষ্টা, অন্যকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা এবং উপযুক্ত কারণ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তার তদন্ত ও নোটিশে অসহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর সাবেক কাউন্সিলর রকিবুল ইসলাম সানির বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রস্তাব পাওয়ার পরও দ্রুততম সময়ে তা অবহিত না করা এবং তদন্ত কর্মকর্তার চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদান না করে তদন্তে অসহযোগিতা করার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

ঘটনার শুরু

২০১২ সাল থেকে মাঠে গড়ানো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএল ঘিরে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি কখনোই। আর্থিক কেলেঙ্কারি, ক্রিকেটারদের পাওনা থেকে শুরু করে ফিক্সিংকাণ্ড সবই এসেছে আলোচনায়।

তবে গত বিপিএলের ঠিক আগ দিয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই টুর্নামেন্টকে দুর্নীতিমুক্ত করতে একটা উদ্যোগ নেয় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ক্রিকেট বোর্ড। প্রথমবারের মতো গঠিত হয় বিসিবির একটা স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা 'বিসিবি ইন্টিগ্রিটি ইউনিট'।

যার দায়িত্ব দেওয়া হয় আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটের সাবেক প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে। তার রিপোর্টের ভিত্তিতেই গত বিপিএল ড্রাফটের আগ দিয়ে ৯ ক্রিকেটারের একটা তালিকা করে বিসিবি যাদেরকে সন্দেহভাজন হিসেবে ড্রাফটের বাইরে রাখা হয়।

এরপর বিপিএলের ১২তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কমিটির জায়গায় বিসিবির দায়িত্ব আসে তামিম ইকবালের বোর্ডের কাছে। তবে এর মাঝেও স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করে গিয়েছে অ্যালেক্স মার্শালের ইন্টিগ্রিটি ইউনিট।

এর মাঝে গত বিপিএলের সময় জানুয়ারিতে বিসিবি পরিচালক মোখলেসুর রহমানের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তিনি তদন্তের স্বার্থে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

দায়িত্ব নিয়ে কয়েকবারই গত বিপিএল নিয়ে নিজের অসন্তুষ্টি ও নানা অসামঞ্জস্যতার কথা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল। আর এখন এই প্রথমবারের মতো কোন বিসিবি পরিচালক সরাসরি অভিযুক্ত হলেন ফিক্সিং কাণ্ডে।

বিপিএল দুর্নীতিতে অভিযুক্ত শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে জাতীয় দৈনিক দেশ রুপান্তর।  তাদের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে বর্তমানে ইংল্যান্ডে অবস্থান করা বিসিবির সাবেক এই পরিচালক বলেন, “আমার বিপক্ষে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে অথচ আমি কিছুই জানি না। এসব নিয়ে বিসিবি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। সর্বশেষ দেড় মাস আগে অ্যালেক্স মার্শাল আমাকে ডেকেছিলেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে যা জানতে চায়, আমি সব ধরনের সহযোগিতা করেছি।”

“বিপিএলকে সবাই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে”

“বিপিএলকে ক্রিকেটের স্বার্থে কখনোই ব্যবহার করা হয়নি। সবাই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে”- সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক এম এম কায়সার বাংলাদেশ ক্রিকেটের মতো বিপিএলকেও অনুসরণ করে এসেছেন একদম শুরু থেকে, এবং তার আক্ষেপ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএল থেকে সবাই নিজেদের আর্থিক লাভ তোলার আশায় এটাকে ইচ্ছেমতো নিজেদের স্বার্থে বিক্রি করে এসেছেন।

তার মতে সেটা সেই শুরুর আসর ২০১২ সাল থেকেই চলছে, মাঝে একটু কমে গেলেও এখন সেটা ন্যাক্কারজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এম এম কায়সার মনে করেন বিসিবির এখনই সময় একটা দৃষ্টান্ত স্থাপনের।

“যখন একজন বোর্ড পরিচালক জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে তখন আমি মনে করি এই লোকের বিরুদ্ধে শুধু তদন্ত যথেষ্ট নয়, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা উচিত।”

এছাড়া এম এম কায়সার মনে করেন যে আমিনুল ইসলাম ক্রিকেটে সব রকম দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন এত সোচ্চার তারই কমিটির একজন পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের দায় সভাপতি হিসেবে তিনিও এড়াতে পারেন না।

এখন সামনে কী?

বিসিবি জানিয়েছে অভিযুক্ত তিনজনকে সবধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে সাময়িক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন তারা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র হাতে পাওয়ার পর থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ধারা অনুযায়ী নিজেদের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবেন। ততদিন এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলবে না বলে জানিয়েছে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থাটি। তবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাবে অ্যালেক্স মার্শালের নেতৃত্বাধীন বিসিবির স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ইন্টিগ্রিটি ইউনিট।

এরইমধ্যে আপাতত বিপিএল আয়োজন না করার কথা ভাবছে বর্তমান ক্রিকেট বোর্ড। সে লক্ষ্যে আলোচনাও চলমান বিভিন্ন পক্ষের সাথে। বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল এখন আইসিসির ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও। এখন তার মূল চ্যালেঞ্জ নিজ দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগকে দূষণমুক্ত করা।