বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন নক্ষত্র, তানজিদ তামিম

ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সবুজ পিচ আর প্যাট কামিন্স-মিচেল স্টার্কদের আগুন ঝরানো বোলিং—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশীয় ব্যাটারদের জন্য লাল বলের ক্রিকেট খেলা মানেই যেন আগ্নেয়গিরির ওপর খালি পায়ে হাঁটা। অথচ সেই কঠিন ও রুদ্ধশ্বাস মঞ্চেই নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম।

​পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসে ২৬ ও ৪ রানে আউট হয়ে সমালোচকদের তীব্র কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেই ব্যর্থতার গ্লানি পেছনে ফেলে অজি বোলারদের তোপ সামলে ডারউইনের বুকে ছিনিয়ে আনলেন লাল বলের ক্রিকেটে তার প্রথম শতক!

বগুড়ায় জন্ম নেওয়া এক দূরন্ত ছেলে, ক্রিকেট খেলার জন্য একদা যার বাবাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করাতে হয়েছিল, সেই ছেলে যখন ব্যাট উঁচিয়ে মারারা ওভালের গ্যালারিকে অভিবাদন জানালেন, জন্মদাতা হিসেবে তার বাবার বুক আনন্দে গর্ভে ফুলে ওঠারই কথা। তানজিদও তার এই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি উৎসর্গ করেছেন বাবাকেই, আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন মমতাময়ী মায়ের নাম।

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের পেস আক্রমণে ভয় পাওয়ার মতো উপাদানের অভাব ছিল না। মিচেল স্টার্ক একা হাতেই প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দিতে পারেন, সাথে কামিন্স ও হ্যাজেলউডের মতো বৈশ্বিক তারকাদের উপস্থিতিতে প্রথম টেস্ট দুই দিনে শেষ হবে নাকি আড়াই দিনে, তা নিয়ে খেলা শুরুর আগে মেতে উঠেছিল ক্রিকেটবিশ্ব।

অথচ প্রথম দিনে হাসান মাহমুদের ধারালো স্পেল আর দ্বিতীয় দিনে তানজিদের ব্যাট চড়ে বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতেই হারানোর স্বপ্ন বুনছে। জিম্বাবুয়ের কাছে টেস্টে হারের টাটকা স্মৃতি বয়ে বেড়ানো একটি দল অজিদের মাঠে এভাবে প্রথম দুই দিন দাপট দেখাবে, তা বোধহয় সবচেয়ে অন্ধ ক্রিকেট ভক্তও ভাবেননি!

তানজিদের ১০১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসটি সাজানো ছিল ১৯৭ বলের ধৈর্যশীল লড়াইয়ে, যেখানে ছিল আটটি আকর্ষণীয় চার ও একটি দর্শনীয় ছক্কার মার। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জনের খতিয়ান নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এটিই প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি! ২০০৩ সালে হান্নান সরকারের ৭৬ রান এতদিন ছিল অজিদের ডেরায় সর্বোচ্চ; আর এবার তানজিদের পর নাজমুল হোসেন শান্তর অনবদ্য ৮৪ রান সেই তালিকার দুইয়ে উঠে এসেছে। ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টে শাহরিয়ার নাফিসের সেই বিখ্যাত ১৩৮ রানের পর অজিদের বিপক্ষে টেস্টে সেঞ্চুরির জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ২০টি বছর! কাকতালীয়ভাবে, তানজিদের ক্যারিয়ারের এই রূপান্তরের পেছনে অন্যতম মেন্টর হিসেবে বড় ভূমিকা রেখেছেন সেই শাহরিয়ার নাফিস। নাফিসের কাছ থেকে পাওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সামলানোর টেকনিক ও মানসিক দৃঢ়তার শিক্ষা তানজিদকে এই কঠিন মিশনে অভাবনীয় সাহস জুগিয়েছে। 
 
​শুরুতে বল কিছুটা সুইং ও বাউন্স করলেও তানজিদ নিজের শট নির্বাচনে ছিলেন চরম সংযমী। নিখুঁত টাইমিংয়ে খেলেছেন দৃষ্টিনন্দন ড্রাইভ ও কাট। শর্ট বলে যেভাবে ব্যাকফুটে গিয়ে লেগ সাইডে রান বের করেছেন, তাতে স্পষ্ট যে বিদেশি কন্ডিশনে খেলতে নামার আগে তার প্রস্তুতি কতটা সুপরিকল্পিত ছিল। ক্যাপ্টেন শান্তর সাথে ৯৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি বাংলাদেশকে এক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। 
 
​হোয়াইট বলের ক্রিকেটেই তানজিদের চেনা রূপ আমরা বেশি দেখেছি। ওয়ান ডেতে ৪০টি ও টি-টোয়েন্টিতে ৫৩টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা লাল বলের সংস্করণে তার মানিয়ে নেওয়া সহজ করেছে। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ টি-টোয়েন্টি মৌসুমে দেশের হয়ে ব্যাট হাতে তিনি ছিলেন অনবদ্য ও বিধ্বংসী। এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে রেকর্ড ৭৭৫ রান করা এবং সর্বোচ্চ ৪১টি ছক্কা হাঁকানোর অভূতপূর্ব কীর্তি গড়েছিলেন তানজিদ। বিপিএলেও তাঁর ব্যাটে দেখা গেছে তাণ্ডব, যেখানে রেকর্ড পার্টনারশিপ গড়ার ইতিহাসও রয়েছে। ২০ ওভারের ক্রিকেটের সেই আত্মবিশ্বাস আর শটের ধার তানজিদ এবার বয়ে নিয়ে এলেন ক্রিকেটের আসল অভিজাত সংস্করণ টেস্টে।  

​বিদেশের মাঠে টেস্ট জয়ের ভিত কীভাবে গড়তে হয়, মারারায় তানজিদ হাসানের এই ১০১ রানের ইনিংসটি তারই এক অসাধারণ ও রঙিন রূপরেখা এঁকে দিল। ক্রিকেট কিংবদন্তি অ্যাডাম গিলক্রিস্ট যখন তানজিদের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ওয়েলডান মাই বয়!’, তখন পরিষ্কার হয়ে যায়, ডারউইনের রোদে আজ কেবল এক নতুন ব্যাটারের অভিষেক হয়নি, জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন এক নক্ষত্র!