বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়েও গোলশূন্য ম্যাচ।
১০৬ মিনিট। পুরো স্পেন তখন অপেক্ষা করছে একটি মুহূর্তের। কে হবেন সেই মুহূর্তের নায়ক।
বেঞ্চের দিকে তাকালেন কোচ। ডাক পড়লো ফেরান তোরেসের। কয়েক মিনিট পর বল জড়িয়ে গেলো জালে।
স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। স্টেডিয়াম গর্জে উঠলো।
আর সেই গর্জনের মাঝেই যেন হারিয়ে গেলো বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সব ট্রল, সব ব্যর্থতা, সব অপমান। কারণ এই গোলের গল্প শুরু হয়নি ফাইনালে। শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে।
ম্যানচেস্টার সিটি থেকে বড় অংকের ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন ফেরান তোরেস। প্রত্যাশাও ছিলো আকাশছোঁয়া। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ভারই যেন ধীরে ধীরে তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। সহজ সুযোগ মিস করতেন। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতেন। আর প্রতিটি ভুলের পরই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হতো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ।
একটা সময় ছিলো, ফেরান তোরেস গোল মিস করলেই সেটি কয়েক মিনিটের মধ্যে মিম হয়ে যেতো। বার্সেলোনার সমর্থকদের অনেকেই বলতেন, ক্লাবের উচিত তাকে বিক্রি করে দেওয়া।
কেউ কেউ মজা করে লিখতেন, “এক বস্তা আলুর বিনিময়েও তাকে ছেড়ে দেওয়া যায়।”
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বার্সেলোনার জার্সিতে যতটা সমালোচিত ছিলেন, স্পেনের জার্সিতে গল্পটা ছিলো ঠিক উল্টো। জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিকভাবেই গোল করে গেছেন ফেরান। বিশ্বকাপের আগে ৪১ ম্যাচে ২০ গোল করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ ক্লাবে যতই কঠিন সময় যাক না কেন, লা রোজার জার্সিতে তিনি ছিলেন স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলদা স্কোরারদের একজন। কিন্তু ফুটবলে অনেক সময় পরিসংখ্যানের চেয়ে মিমের আওয়াজই বেশি শোনা যায়। বার্সেলোনায় মিস করা সুযোগগুলোর ভিডিও এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, অনেকেই ভুলেই গিয়েছিলেন যে স্পেনের হয়ে ফেরান আসলে কতটা কার্যকর।
কিন্তু এত সমালোচনা শুধু মাঠের পারফরম্যান্সেই প্রভাব ফেলেনি। আঘাত করেছিল তার আত্মবিশ্বাসেও। একাধিক সাক্ষাতকারে ফেরান নিজেই স্বীকার করেন, এমন একটা সময় এসেছিল যখন নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।
নিজের মানসিক শক্তি ফিরে পেতে তিনি নিয়মিত স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের সাহায্য নিয়েছেন। তার ভাষায়, একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় লড়াই অনেক সময় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, নিজের বিপক্ষেও হতে পারে।
অনেক ফুটবলার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। ফেরান করেননি।
বরং দেখিয়েছেন, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। কখনও কখনও সেটাই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম ধাপ।
বার্সেলোনায় সমালোচনার মধ্যেই বিশ্বকাপের জন্য স্পেনের স্কোয়াড ঘোষণা করেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও সহজভাবে নেননি সমর্থকরা।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, “ফেরান তোরেস কেন?”
সামাজিক মাধ্যমে অনেকে লিখেছিলেন, তার জায়গায় অন্য কোনো ফরোয়ার্ডের সুযোগ পাওয়া উচিত ছিলো। তখন হয়তো খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর এই ফেরান তোরেসই হয়ে উঠবেন পুরো স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বদলি খেলোয়াড়।
তবুও সমালোচনা থামেনি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিলো, সমালোচনা শুধু অপরিচিতদের কাছ থেকেই আসেনি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এক সাক্ষাতকারে ফেরানের দাদা বলেছিলেন, তিনি নাকি ফেরানের খেলা দেখতে বিশেষ আগ্রহী নন। এমনকি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এই বিশ্বকাপে ফেরান গোল করতে পারবেন কিনা। ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকের কাছে হয়তো সেটি ছিলো মজার একটি সাক্ষাতকার।
বিশ্বকাপের শুরুতে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে স্পেন তখন বড় ব্যবধানে এগিয়ে। অবশেষে বল জালে পাঠালেন ফেরান। কিন্তু অফসাইড। গোল বাতিল। উদযাপন করার বদলে ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক অন্য দৃশ্য। ফেরান আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন প্রার্থনা করছেন, কিউ সি গোল… কিউ সি গোল... “গোলটা যেন গণনা হয়।…”, হয়নি।
সেই মুহূর্তটা যেন একজন স্ট্রাইকারের ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি ছিলো। যে ফুটবলার একসময় গোল করতে অভ্যস্ত ছিলেন, তিনি এখন শুধু চাইছিলেন, একটা গোল যেন গণনা হয়।
গ্রুপ পর্ব শেষেও তার নামের পাশে কোনো গোল ছিলো না। ধীরে ধীরে প্রথম একাদশ থেকেও হারিয়ে গেলেন তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপটা হয়তো এখানেই শেষ হয়ে গেলো ফেরান তোরেসের। কিন্তু স্পেনের কোচ তাকে হারিয়ে যাওয়া একজন ফুটবলার হিসেবে দেখেননি।
বরং খুঁজে পেলেন নতুন এক অস্ত্র। পুরো বিশ্বকাপে আট ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন ফেরান। বাকি সাত ম্যাচেই মাঠে নেমেছেন বদলি হিসেবে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন স্পেনের ‘সুপার সাব’। বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মানুষ।
ঠিক তখনই সামনে আসে তার আরেকটি পরিচয়। এল টিবুরোন - ‘দ্য শার্ক’।
বার্সেলোনায় কঠিন সময়ে কোচ জাভি হার্নান্দেজ এই ডাকনামটি জনপ্রিয় করে তোলেন। পরে ফেরান নিজেই এই পরিচয়কে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নেন। তার কাছে “দ্য শার্ক” শুধু একটি ডাকনাম নয়। এটি একটি মানসিকতা। ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করা। সুযোগ এলেই নির্ভুলভাবে আঘাত করা। আর সেই সুযোগের জন্য প্রতিদিন নীরবে নিজেকে প্রস্তুত করা।
তিনি একবার বলেছিলেন, মানুষ শুধু ৯০ মিনিটের খেলাটাই দেখে।
কিন্তু দেখে না জিমে কাটানো অতিরিক্ত সময়, পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা কিংবা স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের সঙ্গে নিজের মনকে আরও শক্ত করে তোলার কাজ। গোল করার পর দুই হাত দিয়ে হাঙরের পাখনার মতো যে উদযাপন করেন, সেটিও সেই মানসিকতার প্রতীক।
সেই মানসিকতার পরীক্ষাই শুরু হয় নকআউট পর্বে।
রাউন্ড অব সিক্সটিনে পর্তুগালের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের একমাত্র গোলের অ্যাসিস্ট করেন তিনি। সেই অ্যাসিস্টেই শেষ হয়ে যায় পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযান।
কোয়ার্টার ফাইনাল। আবার বদলি।
সেমিফাইনাল। আবার বদলি।
প্রতিবারই স্পেনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মাঠে নেমেছেন। প্রতিবারই নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্পেনের সমর্থকদের কাছে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক নতুন পরিচয়ের মানুষ। সুপার সাব।
তারপর আসে ফাইনাল। আবারও বেঞ্চে ফেরান। আবারও স্পেনের দরকার একজন নায়ক।
১০৬ মিনিট। আবার ডাক পড়লো সেই মানুষটির, যিনি পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই প্রমাণ করেছেন, শুরুর বাঁশি নয়, শেষ বাঁশির আগের মুহূর্তগুলোই তার সময়।
একটি দৌড়। একটি নিখুঁত ফিনিশ। একটি গোল। এই গোল আর বাতিল হয়নি।
সবকিছু ঘটেছিল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। লামিন ইয়ামালের পা থেকে শুরু হওয়া আক্রমণ। মাঝমাঠে পেদ্রো পোরোর নিখুঁত পাস। ডান দিক থেকে ভেসে আসা বলের পেছনে প্রাণপণ ছুটেছিলেন নিকো উইলিয়ামস।
অনেকেই ভেবেছিলেন, বলটি হয়তো মাঠের বাইরেই চলে যাবে। কিন্তু নিকো হাল ছাড়েননি। বক্সের বাঁ দিক থেকে লাফিয়ে উঠে হেড করে বলটি ফিরিয়ে দিলেন গোলমুখে। আর ঠিক যেখানে একজন শিকারির থাকার কথা, সেখানেই ছিলেন ফেরান তোরেস। এক মুহূর্তও নষ্ট করেননি। গোলরক্ষক ঝাঁপ দেওয়ার আগেই বল তুলে দিলেন তার মাথার ওপর দিয়ে। বল জালে।
এই গোলই স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছে। আর এটাই ছিলো স্পেনের জার্সিতে ফেরান তোরেসের ৪৯ তম ম্যাচে করা ২১তম গোল।
আগের ২০টি গোল হয়তো তাকে লা রোজার নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড বানিয়েছিল। কিন্তু ২১তম গোলটি তাকে অমর করে দিলো। যে ফুটবলার কয়েক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের বিপক্ষে একটি গোল গণনা হোক বলে প্রার্থনা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই করলেন সেই গোল, যেটি শুধু গণনাই হয়নি, একটি দেশের ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।
ফুটবলে সব নায়ক শুরু থেকেই নায়ক হন না। কেউ কেউ বারবার ব্যর্থ হন। ট্রলের শিকার হন। নিজের জায়গা হারান। নিজের ওপর বিশ্বাস হারান। তারপর আবার নিজেকেই নতুন করে গড়ে তোলেন। বেঞ্চে বসে থাকেন। আর ঠিক যখন পুরো দেশ একজন ত্রাতার অপেক্ষায় থাকে, তখন উঠে দাঁড়ান।
ফেরান তোরেসের গল্পটা ঠিক তেমনই।