বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির মহাকাব্য: এক ট্রফির চেয়েও বড় যে উত্তরাধিকার

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে লিওনেল মেসি যখন মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন হয়তো তার হাতে ছিল না আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হার মানে মেসির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও শেষ।

তবে এই পরাজয়কে অনেকেই মেসির বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখলেও, পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক রেকর্ড আছে, যেগুলো এখন কার্যত লিওনেল মেসির নামের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে।

ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মেসি মোট ৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন, যা পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই ম্যাচগুলোর ২৩টিতে জয় পেয়েছে তার দল। নকআউট পর্বে খেলেছেন ১৭টি ম্যাচ, এটিও একটি রেকর্ড।

গোলের সংখ্যাতেও তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা। ছয়টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে মেসির গোল ২১টি, অ্যাসিস্ট ১২টি। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড। গোল এবং অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ৩৩টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি, যা একই সময়ের মধ্যে আর কোনো ফুটবলার পারেননি।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসির প্রভাব আরও স্পষ্ট। সাতটি গোল ও ১০টি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে নকআউটে তার ১৭টি গোল অবদানও একটি রেকর্ড। এছাড়া নকআউটে ১০টি অ্যাসিস্টও বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিশ্বকাপে ১৫টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে গোল করেছেন মেসি, এটিও আর কোনো ফুটবলার করতে পারেননি। বক্সের বাইরে থেকে তার ছয়টি গোলও সর্বোচ্চ।

তার ধারাবাহিকতাও আলাদা করে চোখে পড়ে। একসময় টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতা থামে ২০২৬ সালের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে। আবার টানা নয়টি ম্যাচে গোল করার রেকর্ডও তার দখলে। বিশ্বকাপের নকআউটে টানা ছয় ম্যাচে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও তিনি।

মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের আরেকটি বিশেষ দিক হলো দীর্ঘস্থায়িত্ব। ২০০৬ সালে কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেক। এরপর বিশের দশক এবং ত্রিশের দশক—তিনটি ভিন্ন বয়সপর্বেই বিশ্বকাপে গোল করেছেন তিনি। এমন কীর্তি বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর কারও নেই।

বিশ্বকাপের ছয়টি আসরেই অন্তত একটি করে অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। এটিও অনন্য একটি রেকর্ড। তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা দ্বিতীয় পুরুষ ফুটবলারও তিনি। এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু ব্রাজিলের সাবেক অধিনায়ক কাফুর।

বিশ্বকাপের-মঞ্চে-মেসির-মহাকাব্য-এক-ট্রফির-চেয়েও-বড়-যে-উত্তরাধিকার-3.jpg

ছয় বিশ্বকাপ, ছয়টি ভিন্ন গল্প

২০০৬ সালে জার্মানিতে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় মেসির। প্রথম আসরেই একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গোল না পেলেও সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছিলেন নিয়মিত। আর্জেন্টিনা উঠেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে।

২০১৪ সালে ব্রাজিলে মেসি যেন একাই টেনে নিয়েছিলেন দলকে। চার গোল ও এক অ্যাসিস্টে আর্জেন্টিনাকে তুলেছিলেন ফাইনালে। যদিও শিরোপা জেতা হয়নি, তবে টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জিতেছিলেন তিনি।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় আর্জেন্টিনার হতাশাজনক অভিযানে একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেন মেসি। দল বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকেই।

এরপর আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। সাত গোল, তিন অ্যাসিস্ট এবং ফাইনালে জয়ের মাধ্যমে পূরণ হয় তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। বিশ্বকাপের পাশাপাশি দ্বিতীয়বারের মতো জেতেন গোল্ডেন বল।

অনেকে ধারণা করেছিলেন, সেখানেই হয়তো বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানবেন তিনি। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সেও ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরেছিলেন মেসি।

এবারও ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট করেন। তৈরি করেন ২৫টি গোলের সুযোগ। শেষ পর্যন্ত জেতেন সিলভার বল ও সিলভার বুট। তবে ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা আর জেতা হয়নি।

বিশ্বকাপের-মঞ্চে-মেসির-মহাকাব্য-এক-ট্রফির-চেয়েও-বড়-যে-উত্তরাধিকার-2.jpg

সংখ্যার বাইরে যে গল্প

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, শিরোপা জিতেছেন, গোল করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন।

কিন্তু ছয়টি বিশ্বকাপজুড়ে প্রায় দুই দশক ধরে একই ধারাবাহিকতায় নিজের দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, তিনটি ফাইনালে ওঠা এবং একের পর এক রেকর্ড গড়ে যাওয়ার নজির খুব কম।

ফুটবলে 'সর্বকালের সেরা' নিয়ে বিতর্ক হয়তো কখনও শেষ হবে না। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কের সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

কারণ কখনও কখনও একটি ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একজন ফুটবলারের পুরো যাত্রাপথ। আর সেই যাত্রার নাম, লিওনেল মেসি।