বিশ্বকাপের শুরু থেকে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফ্রান্সকে অনেকেই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখছিলেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল অলিসের মতো তারকাদের নিয়ে তাদের আক্রমণভাগ ছিল ভয়ংকর। কিন্তু সেমিফাইনালে সেই ফ্রান্সকেই যেন অসহায় করে দিল স্পেন।
ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখে ২-০ গোলে জিতে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনালে। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারই দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠল স্পেন।
টুর্নামেন্টজুড়ে ফ্রান্স যতটা আলোচনায় ছিল, স্পেন ছিল ঠিক ততটাই নীরব। এমনকি নিজেদের প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দের সঙ্গেও গোলশূন্য ড্র করেছিল তারা। কিশোর তারকা লামিনে ইয়ামালও এখন পর্যন্ত করেছেন মাত্র একটি গোল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সেরাটা বের করে এনেছে লুই দে লা ফুয়েন্তের দল। সাত ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতেই প্রতিপক্ষকে গোল করতে দেয়নি তারা। ফলে রোববারের ফাইনালে, প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা কিংবা ইংল্যান্ড যেই হোক না কেন, স্পেনকেই এগিয়ে রাখছেন অনেক বিশ্লেষক।
অন্যদিকে ফ্রান্সকে এখন সন্তুষ্ট থাকতে হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ নিয়েই। পুরো ম্যাচে তারা লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে মাত্র তিনটি শট। স্পেনের শক্তিশালী মিডফিল্ডের সামনে কার্যত কোনো ছন্দই খুঁজে পায়নি এমবাপ্পেরা।
সাবেক প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন ক্রিস সাটন বলেন, "স্পেন শুধু ফ্রান্সকে হারায়নি, তাদের পুরোপুরি ছাপিয়ে গেছে। এই টুর্নামেন্টে আমরা ফ্রান্সের অনেক প্রশংসা করেছি, কিন্তু স্পেন তাদের সব দিক থেকেই হারিয়ে দিয়েছে।"
রয় কিনের মতে, "ফ্রান্স দল হিসেবে খেলতে পারেনি। দলে অনেক বড় বড় খেলোয়াড় ছিল, কিন্তু তারা দল হয়ে খেলেনি। অন্যদিকে স্পেন ছিল অসাধারণ। তাদের খেলা দেখাই ছিল দারুণ উপভোগ্য।"
অচেনা কোচ থেকে ফাইনালের নায়ক
২০২২ সালের ডিসেম্বরে লুই দে লা ফুয়েন্তে যখন স্পেনের দায়িত্ব নেন, তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই কোচ আবার কে?
এর আগে তিনি মূলত স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর দায়িত্বে ছিলেন। জাতীয় দলের মতো বড় দায়িত্বে তাকে নিয়োগ দেওয়ায় অনেকে অবাকও হয়েছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ। তার অধীনেই ২০২৩ সালে নেশনস লিগ এবং ২০২৪ সালে ইউরো জেতে স্পেন। এবার দলকে তুলেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালেও।
যদি ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারে, তাহলে দুই বছর আগের ইউরো ফাইনালের পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে বিশ্বকাপের ফাইনালেও।
স্পেনের অবিশ্বাস্য সব পরিসংখ্যান
এই জয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ইতালির রেকর্ড স্পর্শ করেছে স্পেন।
বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলে কখনও না হারা ইউরোপীয় ফুটবলারদের তালিকাতেও এখন স্পেনের আধিপত্য। আয়মেরিক লাপোর্তে ২২টি, মিকেল ওইয়ারসাবাল ২০টি, ফাবিয়ান রুইজ ১৬টি, মিকেল মেরিনো ১৪টি এবং লামিনে ইয়ামাল ১৪টি ম্যাচ খেলেও হার দেখেননি।
স্পেনের জার্সিতে ইয়ামাল এখনও কোনো ম্যাচ হারেননি। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে তিনি যে ১২টি ম্যাচে শুরু থেকে খেলেছেন, প্রতিটিতেই জিতেছে স্পেন। এই দুই আসর মিলিয়ে শুরু থেকে খেলে শতভাগ জয়ের এমন রেকর্ড আর কোনো ইউরোপীয় ফুটবলারের নেই।
এবারের বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ ছয়টি ক্লিন শিট রাখার নতুন রেকর্ডও গড়েছে স্পেন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে তারা প্রতিপক্ষকে মাত্র ০ দশমিক ৩ এক্সজি সুযোগ দিয়েছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের পর এত কম সুযোগ আর কোনো দল প্রতিপক্ষকে দেয়নি।
ধীরে শুরু, দুর্দান্ত সমাপ্তি
স্পেনের বিশ্বকাপ যাত্রা মোটেও দাপুটে ছিল না। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর শেষ ষোলোতে পর্তুগালকে হারাতে হয়েছে যোগ করা সময়ের ৯১তম মিনিটের গোলে।
কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে বিদায় করতে হয়েছে ৮৮তম মিনিটে মিকেল মেরিনোর গোলে। কিন্তু সেমিফাইনালে এত অপেক্ষা করতে হয়নি।
প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই মিকেল ওইয়ারসাবালের পেনাল্টি এবং পেদ্রো পোরোর দুর্দান্ত গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন। মজার বিষয়, লক্ষ্যে রাখা তাদের মাত্র দুটি শটই জালে জড়ায়।
সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি বলেন, "এটা হয়তো ইতিহাসের সেরা স্পেন নয়। কিন্তু এই ম্যাচে সেরা দলই জিতেছে। খেলার প্রতিটি মুহূর্ত স্পেন নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমরা জানি তারা কীভাবে খেলে, কিন্তু তারা সেটা এমন নিখুঁতভাবে করেছে যে থামানোই যায়নি।"
বিশ্বকাপজয়ী প্যাট্রিক ভিয়েরা বলেন, "সমষ্টিগতভাবে এটি ছিল স্পেনের অসাধারণ এক ম্যাচ। কৌশলগত দিক থেকেও তারা ফ্রান্সকে পুরোপুরি হারিয়ে দিয়েছে।"
ইয়ান রাইটের ভাষায়, "এটি ছিল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত কাঠামোর জয়। ফ্রান্সকে এত সহজে হারিয়ে দেবে, তা আমি ভাবতেই পারিনি।"
স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিয়েম বালাগ বলেন, "স্পেন দেখিয়ে দিয়েছে দলগত ফুটবল কাকে বলে। তারা ম্যাচের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই ম্যাচ ফুটবল শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত।"
২০১০ সালের সেই চেতনা ফিরে পেয়েছে স্পেন
ম্যাচ শেষে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, "এই দল ফাইনালে ওঠার যোগ্য। তাদের পরিশ্রম, প্রতিভা, আত্মত্যাগ এবং প্রতিদিন নিজেদের আরও ভালো করার মানসিকতার কারণেই আমরা এখানে পৌঁছেছি।"
তার ভাষায়, "আমরা ২০১০ সালের সেই স্পেনের চেতনাকে আবার ফিরিয়ে এনেছি। এই দলের চরিত্র বোঝা যায় এখান থেকেই যে যারা খেলেনি, তারাও ম্যাচ শেষে মাঠে থেকে অনুশীলন করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "এটি দীর্ঘদিনের একটি পরিকল্পনার ফল। আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম সঠিক সময়ে এসে নিজেদের সেরা অবস্থায় পৌঁছাতে।"
রাজা থেকে অভিনন্দন
স্পেনের জয়ের পর দেশজুড়ে শুরু হয় উৎসব। হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে উদযাপন করেন ফাইনালে ওঠা।
দে লা ফুয়েন্তে জানান, ম্যাচ শেষে তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে।
এই কোচের সবচেয়ে বড় শক্তি তার খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক। বর্তমান দলের অনেকেই বয়সভিত্তিক দলে তার অধীনেই বেড়ে উঠেছেন।
২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ ইউরো জয়ের দলে মিকেল মেরিনো, রদ্রি, উনাই সিমন ও মিকেল ওইয়ারসাবালকে নিয়েই শুরু হয়েছিল তার যাত্রা।
বালাগ বলেন, "গত ১০ বছরে এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন দে লা ফুয়েন্তে। তারা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চেনে। পরিবার হয়ে ওঠার এই অনুভূতিই এখন স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা জানে, একসঙ্গে থাকলে তারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।"
সামনে আর্জেন্টিনা নাকি ইংল্যান্ড
ফাইনালে কাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, "আমার কোনো পছন্দ নেই। ইংল্যান্ডকে আমি খুবই ভালো দল মনে করি। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলেছিলাম, তারা অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী।"
বালাগের বিশ্বাস, প্রতিপক্ষ যেই হোক স্পেন নিজেদের পরিচিত ফুটবলই খেলবে।
তার মতে, "স্পেন বলের দখল নিজেদের কাছেই রাখতে চাইবে। যদি আর্জেন্টিনা আসে, তাহলে তাদের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে বের করার সুযোগ থাকবে। স্পেনের হাতে এত ধরনের কৌশল আছে যে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের বদলে নিতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "আমার মনে হয়, প্রকৃত বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে আমরা আজই দেখেছি।"
কৌশলের লড়াইয়ে স্পেনের আধিপত্য
এই ম্যাচে স্পেনের জয় এসেছে তাদের পরিচিত ফুটবল দর্শনের ওপর ভর করেই। বলের দখল, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং ছোট ছোট পাসের সমন্বয়ে তারা পুরো ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমোর মিডফিল্ড ত্রয়ী ফ্রান্সের দুই সদস্যের মিডফিল্ডকে বারবার চাপে ফেলে।
বিশেষ করে ওলমো মাঝমাঠে নিচে নেমে এসে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড়ের সুবিধা তৈরি করেন। ফ্রান্সের ডিফেন্ডাররা তাকে থামাতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন। আর সেই ফাঁকা জায়গাগুলোই কাজে লাগায় স্পেন।
দ্বিতীয় গোলের সময়ও একই চিত্র দেখা যায়। ওলমোর পাস থেকে আক্রমণে উঠে আসা পেদ্রো পোরো গোল করেন। ফ্রান্সের ফুলব্যাকরা একসঙ্গে দুই খেলোয়াড় সামলাতে গিয়ে বারবার বিপাকে পড়েন। সেই কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বই শেষ পর্যন্ত স্পেনকে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপের ফাইনালে।