একদিকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম গোল খাওয়া স্পেন। আরেকদিকে টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল করা ফ্রান্স। একদিকে সবচেয়ে ভালো রক্ষণ, তাদের বিপরীতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যে দুর্দান্ত একটা লড়াই হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কারও সংশয় থাকার কথা নয়।
এই সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে দুই দলের ট্যাকটিকস বা কৌশল। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ দল হয়ে ওঠা ফ্রান্সকে পরপর দুটি টুর্নামেন্টের নকআউটে বিদায় করে দেওয়ার স্মৃতি সঙ্গী হিসেবে আছে স্পেনের।
তবে টুর্নামেন্টগুলোতে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশম তার রক্ষণাত্মক ৪-৩-৩ ফর্মেশনের জন্য বেশ সমালোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার তিনি সেই পুরোনো ধারা ভেঙে বের হয়ে এসেছেন। ফ্রান্স এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। চলতি টুর্নামেন্টে এরই মধ্যে ১৬টি গোল করেছে তারা। এবার তাদের মূল অস্ত্র হাই-প্রেসিং ও গতিময় ৪-২-৩-১ ফর্মেশন।
আরেকদিকে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বল পজিশন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেনা কৌশল ধরে রাখলেও, এখন তাদের রক্ষণও জমাট। পুরো টুর্নামেন্টেই স্পেন মাত্র ১টি গোল হজম করেছে। একদিকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ফ্রান্সের কাউন্টার অ্যাটাকের গতি।
মাঝমাঠের দাবার চাল
স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে মাঝমাঠে। বিশেষ করে ফ্রান্সের অহেলিয়াঁ চুয়ামেনির ফিটনেসের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি পুরোপুরি ফিট না থাকলে মাঝমাঠ সামলানোর দায়িত্ব পড়বে মানু কোনে ও আদ্রিয়েন রাবিওর ওপর।
স্পেনের লক্ষ্য থাকবে ফ্রান্সের এই মাঝমাঠের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। স্প্যানিশ মাঝমাঠের প্রাণ রদ্রি পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করবেন, আর পেদ্রির কাছ হবে আক্রমণভাগে বল পৌঁছে দেওয়া। ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হতে পারেন দানি ওলমো। তিনি ফ্রান্সের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাগুলো ব্যবহার করে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করবেন।
ফ্রান্সের মিডফিল্ডাররা যদি ওলমোকে থামাতে না পারে, তবে তিনি স্পেনের উইঙ্গারদের জন্য দারুণ সব পাস বাড়াতে পারবেন। তাই ফরাসি মিডফিল্ডকে খুব ঠাণ্ডা মাথায় ও কমপ্যাক্ট থেকে রক্ষণ সামলাতে হবে, যেন স্পেন মাঝখান দিয়ে কোনো আক্রমণ করতে না পারে।
দুই প্রান্তের গতি ও ডিফেন্সের ফাঁদ
সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইটা হবে উইংয়ে। স্পেনের দুই ফুলব্যাক পেড্রো পোরো ও মার্ক কুকুরেয়া সাধারণত প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে উপরে চলে আসেন প্রায়ই।
তারা ওপরে এলে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে, ঠিক সেই সুযোগটাই নিতে চাইবে ফ্রান্স। উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানোর মতো বিশ্বমানের ফরাসি ডিফেন্ডাররা বল কেড়ে নিয়েই দ্রুত প্রতিপক্ষের ফাঁকা জায়গায় পাস বাড়িয়ে দেবেন।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে আছেন ওসমানে ডেম্বেলে ও মাইকেল অলিস। গতির দিক থেকে এই আক্রমণভাগ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা। স্পেন যদি বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই ফ্রান্সকে আটকাতে না পারে, তাহলে স্পেনের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি ও আইমেরিক লাপোর্তেকে একা পেয়ে এমবাপ্পে-দেম্বেলে গতির ঝলকে মুহূর্তেই গোল করে ফেলতে পারেন।
ম্যাচের শেষ কথা
স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বল নিজেদের পায়ে রাখার পাশাপাশি ডিফেন্সের ‘পেছনের দরজা’ যেন না খুলে যায়। রদ্রি যদি মাঝমাঠের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফ্রান্সকে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার সুযোগ না দেন, তবে পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে ফ্রান্সকে ক্লান্ত করে দিতে পারবে স্পেন।
তবে ফ্রান্সের নতুন হাই-প্রেসিং কৌশলের চাপে পড়ে যদি রদ্রি বা পেদ্রি মাঝমাঠেই ভুল করে বসেন, তাহলে ফরাসিদের যে বিধ্বংসী গতি আছে, তাতেই ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে স্পেনের। তাদের আক্রমণে বল পজেশনের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে দুই উইংকে।
মাঠে দুই দলের ট্যাকটিক্যাল লড়াইটা তাই দুর্দান্তই হবে।