জুড বেলিংহামকে ঘিরে এখন যেন চলছে একক প্রদর্শনী। ইংল্যান্ডের জার্সিতে সাম্প্রতিক বড় টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা তার নিজের মানদণ্ডেও অসাধারণ।
কয়েক মাস আগেও প্রশ্ন ছিলো, বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড দলে বেলিংহামের জায়গা হবে কি না। অথচ এখন তিনিই হয়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল যাত্রার অন্যতম বড় নায়ক। অনেকের মতে, এবারের বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার।
এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ছয়টি গোল করেছেন বেলিংহাম। এর মধ্যে নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার দুর্দান্ত দুটি গোল রয়েছে। এছাড়া পানামার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে হ্যারি কেইনের গোলের জন্য তার অসাধারণ অ্যাসিস্টও ছিলো। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড সমর্থকদের মুখে বারবার শোনা যাচ্ছে ২৩ বছর বয়সি এই তারকার নাম।
তবে বেলিংহাম এসব প্রশংসা খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করছেন। কারণ, ছোটোবেলা থেকেই তার প্রতিভা নিয়ে ফুটবল মহলে ছিল ব্যাপক আলোচনা। ২০১৯ সালে পেশাদার ফুটবলে আসার পর থেকেই অনেকেই ধারণা করেছিলেন, একদিন তিনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছাবেন।
১৬ বছর বয়সেই নজর কাড়েন বেলিংহাম
২০১৯ সালের অগাস্টে মাত্র ১৬ বছর ৩৮ দিন বয়সে নিজের শহরের ক্লাব বার্মিংহাম সিটির হয়ে অভিষেক হয় বেলিংহামের। এর মাধ্যমে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন। এর আগে এই রেকর্ড ছিলো ক্লাব কিংবদন্তি ট্রেভর ফ্রান্সিসের দখলে, যিনি ১৯৭০ সালে রেকর্ডটি করেছিলেন।
অভিষেক ম্যাচের পরই ইংল্যান্ডের একটি প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবের স্কাউট রিপোর্টে বেলিংহামের প্রতিভার প্রশংসা করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিলো, তার অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা, লম্বা পা, দৌড়ানোর সৌন্দর্য এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা তাকে আলাদা করে তুলেছে।
তবে স্কাউটদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিলো তার কারিগরি দক্ষতা। প্রতিপক্ষের চাপ থেকে বল বের করে আনা, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা তাকে বিশেষ করে তুলেছিলো।
একটি প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবকে দেওয়া সেই প্রতিবেদনে পরামর্শ ছিলো, দ্রুত বেলিংহামকে দলে নেওয়া, কিছুদিনের জন্য ধারে পাঠানো এবং ১৮ মাসের মধ্যে মূল দলে অন্তর্ভুক্ত করা।
কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বেলিংহামের গন্তব্য হয় জার্মানি। প্রিমিয়ার লিগ নয়, তিনি যোগ দেন বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে। তার জন্য ডর্টমুন্ড খরচ করে প্রায় ২০ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড। বার্মিংহাম সিটি তার ২২ নম্বর জার্সি অবসর দিয়ে দেয়। কারণ মাত্র ৪৪ ম্যাচ খেলেই তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে বিশেষ জায়গা তৈরি করেছিলেন।
ইংল্যান্ডের ফুটবল মহল তখন বুঝতে শুরু করেছিলো, এই তরুণের মধ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু। জার্মান ফুটবলও খুব দ্রুত সেটি বুঝে যায়। ডর্টমুন্ডের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন বেলিংহাম। জার্মান কাপে ডুইসবুর্গের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে দ্বিতীয়টি ছিলো তার।
জাতীয় দলে দ্রুত উত্থান
বেলিংহামের প্রতিভা ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের নজর এড়ায়নি। ডর্টমুন্ডের হয়ে ১১টি ম্যাচ খেলার পর, মাত্র ১৭ বছর বয়সেই জাতীয় দলে ডাক পান তিনি।
২০২০ সালের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ইংল্যান্ডের হয়ে অভিষেক হয় তার।
জার্মান লিগে প্রতিটি ভালো পারফরম্যান্সের পরই বেলিংহামকে নিয়মিত দলে রাখার দাবি জোরালো হতে থাকে। তবে সাউথগেট ধীরে ধীরে তাকে জাতীয় দলে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইউরো ২০২০-এ ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও বেলিংহামকে মাত্র তিনটি ম্যাচে বদলি হিসেবে খেলানো হয়।
পরে দেখা যায়, সাউথগেট খুব পরিকল্পিতভাবেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা পরিচালনা করেছিলেন। দলের সহকারী কোচ স্টিভ হল্যান্ডও বেলিংহামের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, বিশেষ করে তাঁর রক্ষণাত্মক দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে।
তবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর তাঁকে আটকে রাখা যায়নি। ইরানের বিপক্ষে ৬-২ গোলের জয়ে হেডে গোল করে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল করেন বেলিংহাম। এরপর আরও নয়টি গোল যোগ হয়েছে তার নামের পাশে।
ইউরো ২০২৪ এ এসে তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন।
রিয়াল মাদ্রিদের গ্যালাকটিকো থেকে সমালোচনার মুখে
রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর বেলিংহামের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের ইউরোতে তিনি ছিলেন স্প্যানিশ ক্লাবটির বড় তারকা। নিজের প্রথম মৌসুমেই লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দলের হয়ে ১৯ গোল করেছিলেন তিনি।
তবে মাঠের বাইরের কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। ইউরো ২০২৪ এর ফাইনালে স্পেনের কাছে ইংল্যান্ড হারের পর ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থদের থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে যান তিনি। তাঁর বিখ্যাত "কে আর করবে" ধরনের উদযাপনও অনেকের কাছে আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হলেও কেউ কেউ সেটিকে অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।
ইংল্যান্ডের কোচ সাউথগেট এবং দলের কিছু সদস্যও তার এই আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন।
এরপর ইংল্যান্ডের নতুন কোচ থমাস টুখেলের সঙ্গে বেলিংহামের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়। টুখেল একবার বলেছিলেন, তার মা বেলিংহামের মাঠের কিছু আচরণকে "কিছুটা বিরক্তিকর" মনে করেন। পরে টুখেল এই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, শব্দটি তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ার পরও টুখেলের দলে জায়গা হয়নি বেলিংহামের। তখন ইংল্যান্ড ভালো খেলছিলো এবং বেলিংহামও চোট থেকে ফিরে পুরোপুরি ছন্দে ছিলেন না।
টুখেল বলেছিলেন, "সে একজন বিশেষ খেলোয়াড়। বিশেষ খেলোয়াড়দের জন্য কখনো কখনো বিশেষ নিয়মও থাকে। তবে আমরা একই দল ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
তবে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য এসেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, নিজের ফিটনেসের দিকে মনোযোগ দিতে বেলিংহাম নিজেই দলে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এক পর্যায়ে বিশ্বকাপের মূল একাদশে জায়গা পেতে তাকে লড়াই করতে হবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন টুখেল। তখন আলোচনায় ছিল, আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে মরগান রজার্স নাকি বেলিংহাম, কে খেলবেন।
বিশ্বকাপে বদলে গেল গল্প
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন বেলিংহাম।
পানামার বিপক্ষে ইংল্যান্ড যখন গোলের জন্য সংগ্রাম করছিলো, তখন গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি।
গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই তাকে বদলি করা হলেও পারফরম্যান্স ছিলো প্রশংসনীয়। এরপর ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পুরো ম্যাচে দারুণ প্রভাব ফেলেন।
মেক্সিকোর বিপক্ষে স্মরণীয় জয়ে দুটি গোল করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও করেন জোড়া গোল। তার পারফরম্যান্সে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার খুব কাছে পৌঁছে গেছে।
ছয় ম্যাচে চারবার ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেছেন বেলিংহাম।
তবে পুরস্কার পাওয়ার পর তার আচরণেও এসেছে পরিবর্তন। সাক্ষাৎকারে নিজের ভূমিকা ছোট করে দেখিয়েছেন তিনি। দলের ঐক্য, সতীর্থদের পরিশ্রম এবং প্রতিপক্ষের প্রশংসা করেছেন। এমনকি একটি ম্যাচসেরার পুরস্কার প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের দিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।
আগের সেই আত্মবিশ্বাসী উদযাপনের বদলে এখন তিনি বলছেন, গোল করার চেয়ে সতীর্থকে গোল করানো তার বেশি পছন্দ।
মাঠেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিভার পাশাপাশি তার পরিশ্রম এখন বড় শক্তি। মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল ঠেকানোর জন্য তার অসাধারণ ডিফেন্সিভ চ্যালেঞ্জ এর বড় উদাহরণ।
দলের প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো ১০ নম্বর পজিশনে, কখনো ৮ নম্বর পজিশনে খেলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার জন্যও প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। হ্যারি কেইনসহ ইংল্যান্ডের নেতৃত্বের অংশ হয়ে উঠেছেন বেলিংহাম।
টুখেল ও বেলিংহামের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। হয়তো বিষয়টি বড় করে দেখা হয়েছে, অথবা টুখেল দলের সবচেয়ে বড় তারকার নেতৃত্বের ধরন বুঝে সেটি পরিচালনা করার চেষ্টা করেছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপে বেলিংহাম এখন সুখী, আত্মবিশ্বাসী এবং দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাকে পরিণত হতে হয়েছে।
বেলিংহাম এবং হ্যারি কেইন এখন ইংল্যান্ড দলের অপরিহার্য দুই তারকা। সামনে সেমিফাইনালে সুইজারল্যান্ড কিংবা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে আরও বড় মুহূর্ত তৈরি হলে বেলিংহামের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পথ আরও শক্ত হবে।