মায়ামি বিচের নোনা বাতাসে ভেসে এল ‘ম্যাজিক মেরিনো’

মায়ামি বিচে সন্ধ্যা নামছিল ধীরে। আটলান্টিকের দিক থেকে আসা বাতাসে ছিল নোনা গন্ধ আর বড় পর্দার সামনে জমে ওঠা ফুটবল উন্মাদনায় ছিল বিশ্বকাপের স্পন্দন। স্পেন–বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর পোশাক, মুখের রং, পতাকা আর আবেগ মিলেমিশে যেন সমুদ্রের চেয়ে বড়ো ঢেউয়ের সৃষ্টি করছিলো।   

কেউ লাল-হলুদ স্প্যানিশ জার্সিতে, কেউ আবার কালো-হলুদ-লাল বেলজিয়ান পতাকা কাঁধে। কয়েকজনের মাথায় ষাঁড়ের শিংয়ের টুপি, আবার বেলজিয়ান সমর্থকদের কেউ কেউ মুখে এঁকেছেন জাতীয় পতাকার রং। সমুদ্রের ঢেউ আর ফুটবল সমর্থকদের গর্জন—দুটোই যেন পাল্লা দিয়ে আছড়ে পড়ছিলো।

খেলার শেষ দিকে যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে। তখনই আবার হাজির মিকেল মেরিনো। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে জয়সূচক গোল করেছিলেন। এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষেও শেষ মুহূর্তে জালের ঠিকানা খুঁজে পেলেন। স্পেন জিতল ২-১ ব্যবধানে, আর মেরিনো হয়ে উঠলেন স্পেনের নতুন ‘শেষ মুহূর্তের নায়ক।’

গোলটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ামির সেই ওয়াচ পার্টি যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। স্প্যানিশ সমর্থকরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। কারও হাতে বিয়ার, কারও হাতে পতাকা, কিন্তু সবার চোখে একই উচ্ছ্বাস।

মাদ্রিদ থেকে কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসা স্প্যানিশ সমর্থক কার্লোস মার্তিনেজ বললেন, “মেরিনো এখন শুধু একজন ফুটবলার নয়, সে আমাদের আশা। দুই ম্যাচে দুই জয়সূচক গোল, এটা কাকতালীয় নয়। বড় খেলোয়াড়েরা বড় মুহূর্তেই নিজেদের চিনিয়ে দেয়।”

তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যালেন্সিয়ায় জন্ম নেয়া মারিয়া গার্সিয়ার কণ্ঠে ছিল আবেগ, “স্পেনের এই দল আমাকে ২০১০ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়। তারা শেষ পর্যন্ত লড়তে জানে। মেরিনো সেই বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠছে।”

অন্যদিকে হারের কষ্ট নিয়েও বেলজিয়ান সমর্থকেরা দলকে নিয়ে গর্বিত। ব্রাসেলসের থেকে আসা থমাস ফন ডের হোফেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। আমরা স্পেনকে কঠিন পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটুখানি ভুল সবকিছু বদলে দিল।”

আরেক বেলজিয়ান সমর্থক সোফি ডেলাক্রোয়া বললেন, “হেরে যাওয়ার কষ্ট আছে। তবে স্পেনকে অভিনন্দন। মেরিনো আজ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।”

খেলার পরও কেউ দ্রুত বাড়ি ফেরেনি। সমুদ্রের ধারে আলো ঝলমলে রাত নেমেছে। বড় পর্দায় তখনো ম্যাচের হাইলাইটস চলছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ সামাজিক মাধ্যমে গোলের ভিডিও পোস্ট করছে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে উত্তপ্ত ফুটবল আলোচনায় মগ্ন।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। খেলা হচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলিসে, কিন্তু তার আবেগ ছড়িয়ে পড়ছে তিন হাজার মাইল দূরে মায়ামির সমুদ্রতীরেও। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এক নতুন নায়ক—মিকেল মেরিনো। পরপর দুই ম্যাচে জয়সূচক গোল করে তিনি শুধু স্পেনকে সেমিফাইনালে তুলেননি, ফুটবলপ্রেমীদের মনেও লিখে ফেলেছেন নিজের নাম।

স্পেনের স্বপ্নযাত্রা চলছেই, আর সেই যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ এখন মেরিনো।