আটচল্লিশ দলের বিশ্বকাপ এখন নেমে এসেছে ১৬ দলের লড়াইয়ে। গ্রুপপর্বের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষ হয়েছে আগেই, নকআউট পর্বের শুরুতেও দেখা গেছে জমজমাট কিছু ম্যাচ। টুর্নামেন্ট যতো এগোবে, নিশ্চিতভাবেই ততো এই রোমাঞ্চটা বাড়বে। শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া শেষ ষোলোর ম্যাচগুলো কেমন হতে পারে তা দেখে নেওয়া যাক এক নজরে…
১. কানাডা–মরক্কো
শেষ ১৬-এর লড়াইটা শুরু হতে যাচ্ছে কানাডা ও মরক্কোর ম্যাচ দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম নকআউট জয়ের স্বাদ পেয়েছে সহ–আয়োজক কানাডা। তাদের শক্তির মূল জায়গা মাঠের পজিশন বদল করা আর গতিময় ফুটবল। আরেকদিকে টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করে দেওয়া মরক্কো গত কয়েক বছর ধরেই দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলার সেই রূপকথার পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে তারা। এক্ষেত্রে মরক্কোর বড় ভরসা জমাট রক্ষণ আর দ্রুত প্রতি আক্রমণে যাওয়ার সামর্থ্য।
লড়াইটা হবে কানাডার তারকা আলফোনসো ডেভিস ও মরক্কোর রাইটব্যাক আশরাফ হাকিমির মধ্যেও। উইংয়ে দুই খেলোয়াড়ের গতি আর আক্রমণাত্মক সামর্থ্য ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।
২. ফ্রান্স–প্যারাগুয়ে
সুইডেনকে ৩–০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট হিসেবেই শেষ ষোলোতে পা রেখেছে ফ্রান্স। অন্যদিকে, ১–১ গোলে ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে শক্তিশালী জার্মানিকে বিদায় করে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক দেখিয়েছে প্যারাগুয়ে।
এই ম্যাচটি মূলত হতে যাচ্ছে প্রথাগত ‘আক্রমণ বনাম রক্ষণের' লড়াই, যেখানে ফ্রান্সের পজিশনাল আধিপত্যের মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ের সুশৃঙ্খল ‘লো-ব্লক’ ডিফেন্স। মাঠের মূল আকর্ষণ থাকবে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের দ্বৈরথ।
৩. ব্রাজিল–নরওয়ে
জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের ৯৫ মিনিটে গোল করে ২–১ ব্যবধানের নাটকীয় জয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। সেলেসাওরা এবার ফাইনাল থার্ডে আক্রমণাত্মক পজিশন আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভরসা রাখছে। তাদের প্রতিপক্ষ নরওয়ে আইভরি কোস্টকে ২–১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে এসেছে। নরওয়ের শক্তির জায়গা তাদের শারীরিক সক্ষমতা, এরিয়াল পাওয়ার আর কাউন্টার অ্যাটাকে কার্যকারিতা।
ম্যাচটা জমজমাট হয়ে উঠবে ফুটবল বিশ্বের এখনকার দুই বড় তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আর্লিং হালান্ডের মুখোমুখি লড়াইয়ের কারণেও। উইংয়ে নরওয়েজিয়ান ডিফেন্ডারদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে ভিনিসিয়ুসের বিরুদ্ধে। আরেকদিকে হালান্ডকে আটকে রাখার কঠিন মিশন থাকবে ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের সামনে, যেকোনো মুহূর্তেই গোল করে ফেলার সামর্থ্য আছে তাঁর।
৪. মেক্সিকো–ইংল্যান্ড
এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলছে মেক্সিকো। আজতেকা স্টেডিয়ামে গ্যালারি ভরা দর্শকের উন্মাদনা বাড়তি উত্তাপ তৈরি করছে তাদের ম্যাচগুলোত। সেখানেই বড় পরীক্ষা দিতে হবে ইংল্যান্ডকে। তারকাবহুল ইংল্যান্ড ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে কোনোমতে টিকে গেছে। এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে মিডফিল্ডের লড়াইয়ে; মেক্সিকো চাইবে হাই–প্রেসিং ফুটবল খেলে ইংল্যান্ডের চেনা বিল্ড–আপ ফুটবলকে বাধাগ্রস্ত করতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইটি হবে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন ও মেক্সিকোর সেন্টার ব্যাকদের মধ্যে। কেইনের নিচে নেমে এসে খেলার প্রবণতা ডিফেন্ডারদের দ্বিধায় ফেলে দেয়। তাকে মার্ক করতে গিয়ে পেছনে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি তাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে উইঙ্গারদের বল পাস করার সুযোগ দেওয়া হবে? মেক্সিকোকে এই জায়গাগুলো সামলাতে হবে খুব ভালোভাবে।
৫. পর্তুগাল–স্পেন
এই ম্যাচটা শেষ ষোলোর সবচেয়ে বড় ‘ব্লকবাস্টার’ লড়াই। অস্ট্রিয়াকে ৩–০ গোলে হারিয়ে নিজেদের চেনা পজিশনাল ফুটবল ও হাই-লাইন প্রেসিংয়ের প্রদর্শনী দেখিয়েছে স্পেন। বিপরীতে পর্তুগালের পথটা সহজ ছিল না; ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ও ম্যাচের ৯৪ মিনিটে গনসালো রামোসের গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ২–১ ব্যবধানে হারায় তারা। স্পেনের পাসিংয়ের সামনে পর্তুগালের ম্যাচ–উইনাররা কতটুকু সুবিধা করতে পারেন, সেটাই দেখার হবে এই ম্যাচে।
আগের ম্যাচেই নকআউটে গোলের খরা কাটানো রোনালদোর দিকে চোখ থাকবে এই ম্যাচেও। স্পেন চাইবে মিডফিল্ডেই পর্তুগালের সাপ্লাই লাইন কেটে দিতে যেন তাদের প্লে-মেকাররা ফাঁকা জায়গায় বল বাড়াতে না পারেন। পর্তুগালকে সফল হতে হলে স্পেনের ওপরে উঠে আসা ফুল–ব্যাকদের পেছনের খালি জায়গা ব্যবহার করতে হবে।
৬. যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে সহজেই শেষ ষোলোতে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই ম্যাচে তারা বড় এক ধাক্কা খেয়েছে— লাল কার্ডের কারণে বেলজিয়ামের বিপক্ষে থাকছেন না দলটির তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান। সেনেগালের বিপক্ষে শেষ বত্রিশে অতিরিক্ত সময়ের চরম নাটকীয় ম্যাচে ১২৪ মিনিটের পেনাল্টি গোলে জয় নিশ্চিত করে বেলজিয়াম।
বালোগান না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আক্রমণভাগ নতুন করে সাজাতে হবে। ইউরি তিলেমান্সের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী বেলজিয়ান মিডফিল্ড ভাঙতে উইঙ্গারদের ক্রিয়েটিভিটির ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নেবেন রোমেলু লুকাকু, যার ফিজিক্যাল প্রেজেন্স ও হোল্ড-আপ প্লে বেলজিয়ামের মূল অস্ত্র।
৭. আর্জেন্টিনা–মিসর
কেপ ভার্দের বিপক্ষে বড় একটা পরীক্ষাই দিতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ মিসর, টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে তারা। আর্জেন্টিনা চাইবে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। মিসর চাওয়া থাকবে ডিফেন্সে দেয়াল তুলে কাউন্টার অ্যাটাকে আঘাত হানতে।
লিওনেল মেসি এখনো আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে ডিফেন্স লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার সামর্থ্যে এখনও তিনি অনন্য। মিসরের মূল কৌশল হবে মেসিকে আটকে রাখার জন্য মাঝমাঠ ও রক্ষণে জটলা তৈরি করা, যেন আর্জেন্টিনাকে উইং দিয়ে খেলতে বাধ্য করা যায়। এরপর দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া।
৮. সুইজারল্যান্ড–কলম্বিয়া
শেষ ষোলোর শেষ ম্যাচটিতে মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া। আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে সুইজারল্যান্ড। মিড-ব্লক ডিফেন্সই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আরেকদিকে জন আরিয়াসের প্রথমার্ধের গোলে ঘানাকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোতে এসেছে তারা।
এই ম্যাচের ফয়সালা হবে মূলত মাঠের ‘হাফ-স্পেস’ (উইং ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের মাঝের জায়গা)–এর লড়াইয়ে। কলম্বিয়ার দলে আছেন জন আরিয়াস ও রিচার্ড রিওসের মতো গতিশীল ও টেকনিক্যাল খেলোয়াড়। প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডের পেছনে জায়গা তৈরি করতে ওস্তাদ তারা। সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্স তাদের দারুণ ল্যাটারাল কভারেজ ও পজিশনাল শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত। তারা কলম্বিয়ার ক্রিয়েটিভ খেলোয়াড়দের বোতলবন্দী করার চেষ্টা করবে। লড়াইটা তাই হবে হাড্ডাহাড্ডি।