ফ্রান্সকে নিয়ে উদ্বেগের কারণ শুধু তাদের ভয়ংকর গোল করার ক্ষমতা নয়। এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন তাদের ঐক্য, আত্মবিশ্বাস আর পারস্পরিক বন্ধন। আর সুইডেনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে সেটাই আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কিলিয়ান এমবাপ্পের অসাধারণ প্রথম গোলের পর যে দৃশ্য দেখা গেল সেটি ছিল আবেগঘন। গোল করার পর তিনি সরাসরি ছুটে গেলেন কোচ দিদিয়ের দেশঁর কাছে। কয়েকদিন আগে মায়ের মৃত্যুর কারণে দেশঁ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন এবং এই ম্যাচেই আবার বেঞ্চে ফিরেছেন। এমবাপ্পের সঙ্গে পরে পুরো দলও যোগ দেয়। সবাই মিলে একসঙ্গে উদযাপন করে।
ম্যাচ শেষে দেশঁ বললেন, এই দল একসঙ্গে থাকে, একে অন্যের পাশে থাকে। দলীয় ঐক্য একা ম্যাচ জেতায় না, কিন্তু সেটা না থাকলে অনেক ম্যাচ হারতে হয়। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি দল হিসেবেই খেলা।
মিডফিল্ডার অরেলিয়েন শুয়ামেনিও বললেন, কোচ কঠিন সময়ের মধ্যে আছেন। আমরা চাই মাঠে সর্বোচ্চটা দিয়ে তাকে খুশি করতে।
মাঠে সেই প্রতিফলনও দেখা গেছে। ব্র্যাডলি বারকোলা দ্বিতীয় গোল করেন। এরপর এমবাপ্পে নিজের দ্বিতীয় গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসির সমতায় পৌঁছে যান।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগ দেখে সাবেক ফুটবলাররাও মুগ্ধ। তাদের মতে এই দলের আক্রমণ থামানো এখন প্রায় অসম্ভব। অনেকে বলছেন, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় দাবিদার এখন ফ্রান্স।
শুধু গোল নয়, পুরো দল যেন ছন্দে আছে। মাইকেল অলিজে আবারও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন। টানা পাঁচ বিশ্বকাপ ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করা প্রথম দল হয়েছে ফ্রান্স।
চার বছর আগে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারের হৃদয়ভাঙা পরাজয় এখনও স্মৃতিতে আছে। এবার যেন সেই আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্য নিয়েই খেলছে ফরাসিরা।
সুইডেনের বিপক্ষে তারা ২৫টি শট নেয়, যা বিশ্বকাপে ১৯৯৮ সালের পর এক ম্যাচে তাদের সর্বোচ্চ। চার ম্যাচে ফ্রান্সের গোলসংখ্যা এখন ১৩।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও অসাধারণ। ব্যালন ডি অর জয়ী উসমান দেম্বেলের চার গোল ও দুই অ্যাসিস্ট মিলিয়ে অবদান ছয়টি। অলিজের অ্যাসিস্ট পাঁচটি।
তবে সবচেয়ে আলোচনায় এমবাপ্পে। নিজের সেরা সময়টা যেন এখনই কাটাচ্ছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির থেকে তিনি মাত্র এক গোল দূরে।
বিশ্বকাপের সাতটি আলাদা ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করেছেন এমবাপ্পে। এই অর্জন আর কারও নেই।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগ নিয়ে বিশ্লেষকদের ভাষায় এটি এমন এক লাইন আপ যা যে কোনো রক্ষণভাগের জন্য দুঃস্বপ্ন।
সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটারও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, এই ফ্রান্সের কাছে হারাটা লজ্জার কিছু নয়। তিনি এর চেয়ে ভালো দল এই টুর্নামেন্টে দেখেননি।
এদিকে মাইকেল অলিজে নিজেও হয়ে উঠেছেন বড় আলোচনার নাম। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলার এখন ফ্রান্সের আক্রমণের অন্যতম চালিকাশক্তি। কোচ দেশঁর মতে, অলিজে আক্রমণ আর রক্ষণকে যুক্ত রাখার গুরুত্বপূর্ণ সেতু। মাঠের বাইরে শান্ত হলেও মাঠে তিনি অন্য রকম।
এমবাপ্পে আর দেম্বেলের বোঝাপড়াও ইতিহাস গড়ছে। বিশ্বকাপে তাদের যৌথ অবদান ইতোমধ্যে ছয় গোল যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
তবু এত প্রশংসার মধ্যেও সতর্ক থাকতে চাইছেন দেশঁ।
তার ভাষায়, ধীরে চলুন। এখনও অনেক পথ বাকি। সবকিছু নিখুঁত হয়নি। আমরা শেষ ষোলোতে উঠেছি, এটুকু উপভোগ করি। সামনে আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আমাদের শান্ত থাকতে হবে।