দুর্ভাগা ইরানের আক্ষেপ, হতাশা ও অভিযোগের খাতার বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ মানেই আনন্দ, উল্লাস আর স্বপ্ন পূরণের গল্প। কিন্তু প্রতিটি সাফল্যের পেছনে কোথাও না কোথাও থেকে যায় ভাঙা স্বপ্নের শব্দ। কিছু দল শেষ মুহূর্তে হার মানে, কেউ আবার নিজেদের ভুলে বিদায় নেয়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের বিদায়ের গল্প যেন সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।

এবারের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল ইরান। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের লড়তে হয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা, যাত্রা জটিলতা আর প্রস্তুতির সংকটের সঙ্গে। তারপরও দলটি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখান থেকে ইতিহাস গড়া ছিল হাতের নাগালে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় এমন নির্মমভাবে, যা হয়তো বহুদিন মনে রাখবে ইরানের সমর্থকেরা।

গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচও হারেনি ইরান। নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র করার পর শেষ ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে জয় পেলেই নিশ্চিত হতো শেষ বত্রিশের টিকিট।

কিন্তু ম্যাচের শুরুটা ভালো হয়নি। শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে ইরান। এরপর তারা ফিরে আসে দারুণভাবে। মেহদি তারেমির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক। তবু আশা ছাড়েনি দল। রামিন রেজাইয়ানের দারুণ এক ফিনিশিংয়ে সমতায় ফেরে ইরান।

ম্যাচ যখন শেষের দিকে, তখন যেন ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন শোজা খলিলজাদেহ। যোগ করা সময়ের নাটকীয় মুহূর্তে গোলমুখের ভিড় থেকে বল জালে পাঠিয়ে দেন তিনি। পুরো দল উল্লাসে ফেটে পড়ে। উদযাপনের অংশ হিসেবে জার্সিও খুলে ফেলেন তিনি।

কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ টিকেনি।

ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। অফসাইড। ব্যবধান এতটাই সামান্য ছিল যে এক টুকরো শরীরের অবস্থানই বদলে দিল পুরো এক দেশের ভাগ্য।

ম্যাচ শেষ হয় এক এক সমতায়। ইরানের সামনে তখন আর কিছু করার ছিল না। অপেক্ষা করতে হতো অন্য ম্যাচের ফলের জন্য।

এরপর শুরু হয় আরও বড় নাটক।

আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচে যেকোনো একটি দলের জয় দরকার ছিল ইরানের। ম্যাচ এগোচ্ছিল দুই দুই সমতায়, যা ইরানের বিদায় নিশ্চিত করছিল। কিন্তু যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে গোল করে আলজেরিয়াকে এগিয়ে দেন রিয়াদ মাহরেজ।

সেই মুহূর্তে ইরানের সমর্থকেরা আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর কয়েক সেকেন্ড। তাহলেই ইতিহাস।

কিন্তু ফুটবল যেন এবারও নিষ্ঠুর হতে চাইল।

শেষ আক্রমণে উঠে এসে হেডে গোল করেন অস্ট্রিয়ার সাসা কালাইজদিচ। নব্বই ছয়ের মিনিটের সেই গোল বদলে দেয় সব হিসাব।

মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো শেষ মুহূর্তে হাতছাড়া হয় ইরানের নকআউট স্বপ্ন।

গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় বিদায় নিতে হয় তাদের। অথচ সমান তিন ম্যাচ ড্র করেও অন্য দল পরের পর্বে জায়গা করে নেয়।

তবে ইরানের আক্ষেপ শুধু মাঠের ফল নিয়ে নয়।

পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দলটি খেলেছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। প্রস্তুতি শিবির বদল, যাতায়াতের বাধা, সময়মতো অনুশীলন করতে না পারা সব মিলিয়ে তারা নিজেদের পরিস্থিতিকে দেখেছে অন্যায্য হিসেবে।

ম্যাচ শেষে কোচ আমির গালেনোয়ি আবেগ নিয়ে বলেন, তার খেলোয়াড়রা যা করেছে তা ইতিহাসে লেখা থাকার মতো। তিনি অভিযোগ করেন, তাদের যথেষ্ট প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হয়নি, অন্য দলগুলোর মতো স্বাভাবিক পরিবেশও পায়নি ইরান।

তবু হতাশার মধ্যেও তিনি খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন।

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে ইরানের জন্য। কিন্তু তাদের গল্প থেকে গেছে। এমন এক গল্প যেখানে হার নেই, তবু বিদায় আছে। যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আশা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য ছিল অন্য কারও পক্ষে।

এই বিশ্বকাপ ইরানের জন্য হয়তো শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়।

এটি হয়ে থাকবে আক্ষেপ, হতাশা আর না পাওয়া স্বপ্নের এক দীর্ঘ খাতা।