স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া বোধ হয় একেই বলে। ম্যাচটা শেষ করে একসঙ্গেই মোবাইলে কিছু একটা দেখছিলেন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। হুট করেই তারা একসঙ্গে শুরু করলেন আনন্দ উদ্যাপন। কী দেখছিলেন, তা তখন বুঝতে বাকি নেই কারও।
উরুগুয়ে-স্পেন ম্যাচের ওপর ঝুলে ছিলো তাদের নকআউট ভাগ্য। ওই ম্যাচটা উরুগুয়ে হারলে দ্বিতীয় হয়ে শেষ ৩২-এ যাবে কেপ ভার্দে। হয়েছেও তাই। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথমবারই নকআউটের মঞ্চে পৌঁছে গেছে কেপ ভার্দে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে না এলেও প্রথমবার নকআউটে উঠেছে এমন দল কিন্তু আছে আরও...
কানাডা: স্বাগতিকের স্বপ্নপূরণ
কানাডার বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার খেলেও একটি গোলও করতে পারেনি, পয়েন্টও পায়নি। ২০২২ সালে ফিরে এসেও তিন ম্যাচেই হার। বিশ্বকাপের স্মৃতিগুলো তাদের জন্য সবসময়ই ছিলো কেমন ধূসর। কিন্তু ঘরের মাঠে কী আর তেমন হলে চলে!
বসনিয়ার সঙ্গে ড্র, কাতারের বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানে জয়ে নকআউটটা নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের। শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হার ভাগ্য বদলায়নি তাদের জন্য।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: ১২ বছরের অপেক্ষার পর
২০১৪ সালে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ খেলেছিল বসনিয়া। বাংলাদেশের অনেক সমর্থকেরই তাদের ওই স্মৃতিটা মনে থাকার কথা। কারণ সেবার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তারা মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনার। বসনিয়ার ২-১ গোলে হারের ওই ম্যাচটিতে গোল করেছিলেন লিওনেল মেসি। পরে নাইজেরিয়া ও ইরানের গ্রুপে পড়ে বিদায় নিতে হয়েছিল প্রথম পর্ব থেকেই।
মাঝে দুটি বিশ্বকাপে না থাকা বসনিয়া ফিরে আসে এবার। শুরুটা একদমই ভালো ছিলো না তাদের জন্য। কানাডার সঙ্গে প্রথম ম্যাচে ড্র করার পর সুইজারল্যান্ডের কাছে দ্বিতীয় ম্যাচে হেরে যায় তারা। কিন্তু শেষ ম্যাচে কাতারকে হারিয়ে তারা সেরা তৃতীয় স্থানধারীদের দৌড়ে নিজেদের জায়গা শক্ত করে। সেই সুবাদেই প্রথমবার নকআউটে ওঠার দুয়ার খুলেছে তাদের সামনে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: ২৮ বছর পর অবশেষে
১৯৯৮, ২০০২ ও ২০১০—তিনবারই বিশ্বকাপ খেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১০ সালের ঘটনাটি নিশ্চয়ই অনেকের তরতাজা। শাকিরার ‘দিস টাইম ফর আফ্রিকা’ থিম সংয়ের সেই বিশ্বকাপের স্বাগতিকই যে ছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপের মাঠের লড়াইয়ের শুরুটাও হয়েছিল বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরির সেই লাইনগুলো দিয়ে ‘গোল বাফানা বাফানা, গোল ফর সাউথ আফ্রিকা, গোল ফর অল আফ্রিকা।’
এমন রঙিন শুরুর পরও অবশ্য আগের দুবারের মতো ২০১০ সালেও নকআউটে খেলতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০২৬-এ শুরুটা ছিলো মেক্সিকোর কাছে হার দিয়ে, অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন এবারও তাদের দিয়ে হবে না। কিন্তু এরপর চেকিয়ার সঙ্গে ড্র, আর শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে তারা উঠে এসেছে নকআউটে। ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে এবার।
কেপ ভার্দে: রূপকথার নাম
মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপেও তারা খেলছে এবারই প্রথম। আফ্রিকার বাছাইপর্বে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে আসা দলটাকে নিয়ে প্রত্যাশাও ছিলো কম। কিন্তু একের পর এক রূপকথা লিখে তারা এখন নক আউটে। শেষ ৩২ এ তাদের প্রতিপক্ষ আবার বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা!
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে রুখে দেয় কেপ ভার্দে। স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ ড্রয়ে আশায় বুক বাধে তারা। সৌদি আরবের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও ড্র করে অপরাজিত থেকেই নকআউটে পৌঁছে গেছে তারা। অভিষেক বিশ্বকাপেই সরাসরি রাউন্ড অব ৩২-এ ওঠার এই গল্প টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় বিস্ময়।
মিসর: প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের অপেক্ষায়
আফ্রিকার প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিনিধি ছিলো মিসর। খেলেছে ১৯৩৪, ১৯৯০ ও ২০১৮ বিশ্বকাপে। কিন্তু নকআউট তো দূরের কথা। এই বিশ্বকাপের আগে তারা ম্যাচই জিততে পারেনি কখনো। আফকনের তিনবারের চ্যাম্পিয়ন, মোহাম্মদ সালাহর মতো তারকার জন্ম; সবকিছু ছাপিয়ে তাই মিসরের জন্য বিশ্বকাপে হতাশার গল্পটাই ছিলো বেশি।
এবার বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র, নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে তারা ইতিহাসই লিখেছে। বিশ্বকাপের কেবল দ্বিতীয় আসরেই যে দলটি খেলেছে, শেষ হয়েছে তাদের একটা দীর্ঘ অপেক্ষাও।