কিছু খেলোয়াড় শুধু গোল করেন না, তারা একটা দেশের অনুভূতি হয়ে ওঠেন। তাদের উপস্থিতি মাঠের হিসাবের বাইরে গিয়ে মানুষের স্মৃতি, আশা আর আবেগকে ছুঁয়ে যায়। ব্রাজিলের জন্য নেইমার এমনই এক নাম।
মায়ামির গরম আর আর্দ্র বিকেলটা ছিলো আরেকটি বিশ্বকাপ ম্যাচের দিন। কিন্তু ব্রাজিলের সমর্থকদের চোখে সেদিন অন্যরকম এক অপেক্ষা ছিলো। মাঠে ম্যাচ চলছিলো, গোল হচ্ছিলো, জয় এগিয়ে আসছিলো। অথচ গ্যালারির বহু মানুষের দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছিল সাইডলাইনের দিকে।
কারণ সেখানে ছিলেন নেইমার।
অনেক দিন পর।
প্রায় তিন বছর পর আবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার অপেক্ষায়।
এক সময় ব্রাজিলের ফুটবল মানেই যেন ছিলো নেইমার। ছোট ছোট ড্রিবল, হঠাৎ গতি বাড়ানো, অসম্ভব জায়গা থেকে সুযোগ তৈরি করা আর এমন এক আত্মবিশ্বাস যা পুরো দলকে বদলে দিতে পারতো। কিন্তু সময় বদলায়। ফুটবলও কাউকে অপেক্ষা করে না।
গত কয়েক বছর নেইমারের জন্য সহজ ছিলো না।
২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ভয়াবহ চোট সবকিছু থামিয়ে দেয়। হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট এবং মেনিস্কাসে আঘাত তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে রাখে। চোট থেকে ফেরার লড়াই, পর্যাপ্ত ম্যাচ ফিটনেসের অভাব, নতুন প্রজন্মের আগমন সব মিলিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তিনি কি আর ফিরতে পারবেন।
অনেকেই মনে করেছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেইমারের অধ্যায় হয়তো শেষ। কিন্তু কিছু ফুটবলার আছেন, যাদের গল্প শেষ হওয়ার আগে আরেকবার ফিরে আসে।
এবারও তাই হলো।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানতেন নেইমারকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত শুধু কৌশলগত নয়, আবেগেরও। ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, নেইমারের আলাদা কোনো অনুপ্রেরণার দরকার হয় না। ব্রাজিলে সবাই তাকে ভালোবাসে। দেশের জার্সি পরাটাই তার জন্য যথেষ্ট।
এই কথার সত্যতা প্রমাণ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে শুরু থেকেই ছন্দে ছিলো ব্রাজিল। নতুন প্রজন্ম নিজেদের শক্তি দেখাতে শুরু করে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দুইবার আঘাত করেন প্রতিপক্ষকে। তারপর মাতেউস কুনিয়া তৃতীয় গোল করে ম্যাচ প্রায় শেষ করে দেন।
স্কোরলাইন বলছিল ব্রাজিল এগিয়ে।
কিন্তু গ্যালারি যেন অন্য কিছুর অপেক্ষায়।
তারপর সেই মুহূর্ত।
নেইমার বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
ওয়ার্ম আপ জ্যাকেট খুললেন।
মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন।
স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে তার নাম ভেসে উঠতেই গ্যালারি যেন বিস্ফোরিত হলো। মানুষ উঠে দাঁড়ালো। চিৎকার, হাততালি, মোবাইলের আলো সব একসঙ্গে মিশে গেলো।
যেন কোনো ফুটবলার নয়, হারিয়ে যাওয়া এক নায়ক ফিরে এসেছে।
তিনি মাঠে নামলেন।
মাত্র বিশ মিনিট খেললেন।
কাগজে কলমে এটা খুব বড় সময় নয়। কিন্তু কখনো কখনো বিশ মিনিটই যথেষ্ট একটা গল্প লিখে দেওয়ার জন্য।
তিনি বল ছুঁলেন কয়েকবার। আক্রমণে অংশ নিলেন। একটি শটও নিলেন লক্ষ্যে। তিনি যে খেলোয়াড়কে বদলি হিসেবে নামলেন, তার কাছাকাছি বল স্পর্শ করলেন অল্প সময়েই।
কিন্তু সংখ্যার হিসাব এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না।
গুরুত্বপূর্ণ ছিলো আরেকটা বিষয়।
নেইমারকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি আবার উপভোগ করছেন।
মুখে ছিল হাসি। শরীরে ছিল স্বস্তি। চোখে ছিলো সেই পুরোনো আগুন।
মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি যেন বলছিলেন, আমি এখনো আছি।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও গল্প শেষ হয়নি।
বড় পর্দায় আবার দেখানো হলো নেইমারকে।
তিনি ধীরে ধীরে গ্যালারির দিকে এগিয়ে গেলেন। সমর্থকদের অভিনন্দন নিলেন। তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের ছোট মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
একটা সাধারণ দৃশ্য।
কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটা অনেক বড় কিছু মনে হচ্ছিল।
এটা ছিলো ফিরে আসার প্রতীক।
ব্রাজিল অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছে।
শেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ২০০২ সালে।
এরপর এসেছে ব্যর্থতা, হতাশা আর অসমাপ্ত স্বপ্ন।
কোপা আমেরিকার শেষ বড় সাফল্যও এখন বেশ পুরোনো স্মৃতি।
নতুন প্রজন্ম আছে, নতুন পরিকল্পনা আছে, নতুন তারকাও আছে।
তবু কিছু নামের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
নেইমার হয়তো আজ আর একা ব্রাজিলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মানুষ নন।
হয়তো এখন আর তাকে ঘিরে পুরো দল তৈরি হয় না।
কিন্তু তার মতো খেলোয়াড়রা অন্য কিছু দেন।
তারা বিশ্বাস দেন।
তারা মনে করিয়ে দেন ফুটবল শুধু গোল আর ট্রফির খেলা নয়।
এটা ফিরে আসার গল্পও।
আর যদি নেইমার সত্যিই নিজের শেষ বিশ্বকাপ যাত্রায় থাকেন, তাহলে ব্রাজিলের সমর্থকেরা নিশ্চয়ই চাইবে এই গল্পের শেষটা সুন্দর হোক।
কারণ তারা এখনো বিশ্বাস করে—
নেইমারকে ভুলে যাওয়া যায়।
কিন্তু নেইমারকে পুরোপুরি শেষ বলা যায় না।