বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও র‍্যাংকিং নাম্বার ওয়ান: প্রথম ম্যাচের অভিশাপ কাটাতে পারবে আর্জেন্টিনা?

যুক্তরাষ্ট্র ৪-১ প‍্যারাগুয়ে।
ব্রাজিল ১-১ মরক্কো।
উরুগুয়ে ১-১ সৌদি আরব।

উপরের তিনটি ফলাফলই আপনারা এরইমধ্যে জানেন। তারপরও আবার মনে করিয়ে দেওয়ার কারণ হলো- একটা মিল আছে উপরের তিন খেলায়। সেটা হলো তিনটি লাতিন আমেরিকার দলই হোঁচট খেয়েছে এবারের বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম‍্যাচে। 

প‍্যারাগুয়ে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরেছে অনেকটা অনুমিতভাবেই, যদিও তাদেরকে এভাবে একেবারে উড়িয়ে দেবে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র সেটা নিশ্চয় কেউই ভাবেননি। 

তবে বড় চমক দিয়েছে আফ্রিকার মরক্কো। হেক্সার মিশনে আসা বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল ধাক্কা খেয়েছে শুরুতেই।

আর এরপর লাতিন আমেরিকার আরেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সাথে সমানতালে লড়ে পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়েছে এশিয়ার জায়ান্ট সৌদি আরব। 

প্রথম ম‍্যাচের ক্ষত: শুভ নাকি অশুভ?

যদিও সৌদি আরব তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা ‘প্রথম ম‍্যাচ’টা খেলে ফেলেছে ২০২২ সালে কাতারে। সেই ম‍্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিলো আর্জেন্টিনা। যারা একেবারে শেষ ম্যাচটিও জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেটা যেমন সত‍্যি, তেমনি আলবিসেলেস্তেদের ওই প্রথম ম‍্যাচের ক্ষতটাও তো সত‍্যি।

তার সাথে যোগ করুন এবারের বিশ্বকাপে কনমেবল অঞ্চলের দলগুলোর প্রথম ম‍্যাচে খাবি খাওয়ার দশা! নিশ্চয়ই সেই একই পুরনো পথে হাঁটতে চাইবে না আর্জেন্টিনা। কারণ বারবার কি আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে? 

আলজেরিয়া নয় আর্জেন্টিনার ভাবনা নিজেদের নিয়েই! 

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোই এবারের বিশ্বকাপ মিশন আর্জেন্টিনার। ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ হয়েছে, লিওনেল মেসিও ওই সোনালি ট্রফি নিজের করে নিয়েছেন। এবারের চ‍্যালেঞ্জটা তাই সেটা ধরে রাখার। 

যেটা এর আগে করতে পেরেছে মোটে দুটি দেশ। প্রথমটা ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে। আর সবশেষ উদাহরণ ৬৪ বছর আগে ব্রাজিলের, ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপ জয়। 

“আমাদের গত বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা তো আছেই। প্রথম ম‍্যাচ অবশ‍্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেখানেই কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় না।” 

কথাগুলো মেসির পর আর্জেন্টিনার ফুটবলে সবচেয়ে পূজনীয় ব‍্যক্তি যিনি আরেক লিওনেল, কোচ স্কালোনির।

আচ্ছা এতো কথা যে বলছি, আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষের নামই তো বলা হয়নি। অবশ‍্য বাংলাদেশের সবাই তো জানেনই-আলজেরিয়া। এই সবার মধ‍্যে অর্ধেক হচ্ছে যারা এই ম‍্যাচে আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, আর বাকি অর্ধেক… বুঝে নেন। 

তবে এটুকু সহজেই বোঝা যায়, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ পুরোপুরি শুরু হচ্ছে আজকে। অর্ধেকের শুরু হয়েছে দুদিন আগে, যেদিন ব্রাজিল মাঠে নামে, বাকি অর্ধেকের আজ।

এর সাথে আরেক ফেভারিট ফ্রান্সও নামছে আজ রাতে। আবার ২৪ ঘণ্টার আগেই মাঠে নেমে যাবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। বিশ্বকাপ এখন তাই জমে ক্ষীর। 

ম্যাচটা আর্জেন্টিনার কম মেসির বেশি! 

কারণ লিওনেল মেসির ২০০তম ম‍্যাচ হতে যাচ্ছে এটি আকাশি-সাদা জার্সিতে।

তবে কোনো কারণ আসলে লাগে না, ৪ বছর আগেও দলের সবাই সবসময় জপেছেন যে আমরা মেসির জন‍্য খেলি। আর্জেন্টিনার চেয়েও বেশি শোনা গিয়েছিল মেসিকে বিশ্বকাপ জিততে হবে। সেই মেসি ইফেক্ট এবার অবশ‍্য অতটা প্রকট নয়। হয়তো গ্রুপপর্বে সব ম‍্যাচ মেসি ৯০ মিনিট খেলবেনও না। কিন্তু তারপরও আরও একবার যেন আর্জেন্টিনার সবকিছু আবর্তিত মেসিকে ঘিরেই। 

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন-ও-র_্যাংকিং-নাম্বার-ওয়ান-প্রথম-ম্যাচের-অভিশাপ-কাটাতে-পারবে-আর্জেন্টিনা-2.jpg

যদিও এবার মাঝমাঠে তার সঙ্গী অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা ম‍্যাকঅ‍্যালিস্টার। বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত ডি পল তো থাকছেনই। 

বহুবছর পর কনমেবল থেকে গ্রুপ সেরা হয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা। আর এই বাছাইপর্বে মোট ৮ টি গোল করেছেন এলএমটেন। 

ফলে তিনি নিজে তো গোল করবেনই, সেই সাথে যাদের দিয়ে গোল করাবেন সেই লাউতারো ও আলভারেজ দুজনই আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। 

তবে একটা প্রশ্ন তো উঠেই যায় যে এরপর কে? মানে মেসি কাকে দিয়ে যাবেন আর্জেন্টিনার আর্মব‍্যান্ড? 

“ব‍্যক্তিগতভাবে আমি স্বপ্ন দেখি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার, তবে তিনি হলেন সর্বকালের সেরা!” কথাগুলো গত বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়ার এনজো ফার্নান্দেজের। এবারে আরেকটু পরিণত হয়ে আরও একবার বিশ্বকাপ মিশনে প্রস্তুত তিনি। 

মেসির শেষ বিশ্বকাপ। আর এই শেষ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার আগে তিনি খানিকটা নস্টালজিক হতেই পারেন। কারণ আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার ক‍্যারিয়ারের প্রথম জোড়া গোল এই আলজেরিয়ার সাথেই। ২০০৭ সালে ওই একবারই মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়া। প্রীতি ম‍্যাচটি ৪-৩ গোলে জিতেছিল মেসির দল। 

স্কালোনির মধুর সমস্যা

লিওনেল মেসিকে রাইট উইংয়ে রেখে ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই দল সাজাবেন লিওনেল স্কালোনি। বামে অ‍্যাটলিকোর থিয়াগো আলমাদা। কিন্তু মাঝখানে কে? এইখানেই মধুর সমস‍্যা কোচের। 

লাউতারো মার্টিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ দুজনই এত দারুণ ফর্মে রয়েছেন যে কাকে রেখে কাকে খেলাবেন সেটার জন‍্য শেষ পর্যন্ত টস করতে হতে পারে তাকে। একজন ইন্টারের নির্ভরযোগ্য ফিনিশার, আরেকজন অ‍্যাটলেটিকোর হয়ে গোলের পর গোল করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় প্রথম একাদশে লাউতারোর থাকার সম্ভাবনাই বেশি। 

দলে একটাই ইনজুরির খবর। লেফটব্যাক তাগলিয়াফিকো নেই, এখন তার জায়গায় মনটিয়েল নাকি মেদিনা? ডিফেন্সের বাকি তিনজন নিশ্চিত বলা যায়-মলিনা, ওটামেন্ডি ও রোমেরো।

আঙুলের ব‍্যথা কাটিয়ে গোলবারে থাকা নিশ্চিত হয়েছে আর্জেন্টিনার প্রিয় দিবু এমিলিয়ানো মার্টিনেজের। 

ব‍েঞ্চে আছেন নিকো পাজের মতো তরুণ। এছাড়া সিমিওনে, বারকো, লিসান্দ্রোরা থাকবেন সুযোগের অপেক্ষায়। 

দ‍্য ডেজার্ট ফক্স

আলজেরিয়াকে মরুভূমির শেয়াল বলার যথাযথ কারণ আছে।

তাদের খেলার স্টাইল হলো ডিফেন্সের দেয়াল গড়ে কাউন্টার অ‍্যাটাকে দ্রুত ওপরে উঠে যাওয়া। 

বাছাইপর্বের ১০ ম‍্যাচে ২৪ গোল করে এসেছে দলটি। বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম‍্যাচে নেদারল‍্যান্ডসকে হারিয়েছে। বলিভিয়া, উরুগুয়ের সঙ্গে খেলে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। 

দলের সবচেয়ে বড় তারকা নিঃসন্দেহে রিয়াদ মাহারেজ। দীর্ঘদিন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে আর্জেন্টিনার মেইন থ্রেট হতে পারেন আক্রমণভাগে ওলফসবার্গের মোহামেদ আমুরা। 

২০১৪ সালে ব্রাজিলে রাউন্ড অব সিক্সটিন খেলা আলজেরিয়া দুই আসর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে। যাদের হারানোর কিছু নাই, বরং পাওয়ার আছে অনেক কিছুই। আর্জেন্টিনার সাথে অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে নিয়ে গড়া এই গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যাওয়ার আশা তারা করতেই পারে। 

অন‍্যদিকে আর্জেন্টিনা পথটা অনেক লম্বা করতে এসেছে। সেক্ষেত্রে শুরুতেই স্লিপ করতে নিশ্চয় চাইবে না দলটি।