বিশ্বকাপে লাল কার্ডসহ ৮টি নতুন নিয়ম, বাড়ছে ভিএআরের ক্ষমতা

আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপেই দেখা যাবে খেলার বেশ কয়েকটি নতুন নিয়ম।

ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড বা আইএফএবি জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০২৭ মৌসুমে কার্যকর হতে যাওয়া নিয়মগুলো বিশ্বকাপ থেকেই প্রথমবারের মতো প্রয়োগ করা হবে। ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা বলেছেন, নতুন নিয়মগুলোর লক্ষ্য হলো বৈষম্য রোধ করা, সময় নষ্ট কমানো, খেলার গতি বাড়ানো এবং খেলোয়াড় ও দর্শকদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করা।

নতুন নিয়মগুলো কী?

মুখ ঢেকে আপত্তিকর মন্তব্য করলে লাল কার্ড

ম্যাচ চলাকালে কোনো খেলোয়াড় যদি বিতর্ক বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কোনো মন্তব্য করেন, তাহলে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হতে পারে। তবে সাধারণ বা বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

এই নিয়ম আনার পেছনে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার প্রভাব রয়েছে। বেনফিকার আর্জেন্টাইন ফুটবলার জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ান্নির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে তিনি মুখ ঢেকে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন। পরে তাকে ছয় ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল উয়েফা।

রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছাড়লে লাল কার্ড

রেফারির কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে খেলোয়াড়রা যদি মাঠ ছেড়ে চলে যান, তাহলে তাদের লাল কার্ড দেখানো হবে। কোনো কোচ বা দলের কর্মকর্তা যদি খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে উসকানি দেন, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া কোনো দলের কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে সেই দলকে পরাজিত বলে গণ্য করা হবে।

আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের এক ফাইনালে পেনাল্টির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগাল দলের মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এই নিয়ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।

থ্রো ইন ও গোল কিকে সময় নষ্টের সুযোগ কমছে

এখন থেকে রেফারি হাত তুলে দৃশ্যমানভাবে পাঁচ সেকেন্ডের কাউন্টডাউন শুরু করবেন। থ্রো ইন নেওয়ার সময় পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে বল খেলায় না আনতে পারলে থ্রো ইন পাবে প্রতিপক্ষ দল। একইভাবে গোল কিক নিতে দেরি হলে প্রতিপক্ষকে কর্নার কিক দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সময় নষ্টের প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বদলি খেলোয়াড় নামানোর নতুন প্রক্রিয়া

সাবস্টিটিউশন বোর্ড প্রদর্শনের পর মাঠ ছাড়তে থাকা খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ত্যাগ করতে হবে। তাকে মাঠের সবচেয়ে কাছের সীমারেখা দিয়ে বের হতে হবে।যদি কোনো খেলোয়াড় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠ না ছাড়েন, তাহলে বদলি খেলোয়াড় সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নামতে পারবেন না। খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর অন্তত এক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে এবং পরবর্তী বিরতিতে রেফারির অনুমতি নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে হবে। তবে চোট কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

চিকিৎসা নিলে কিছু সময় মাঠের বাইরে থাকতে হবে

কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল স্টাফ মাঠে প্রবেশ করলে, খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর তাকে এক মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে। তবে গোলরক্ষকের চোট, গোলরক্ষক ও অন্য খেলোয়াড়ের সংঘর্ষ, সতীর্থদের মধ্যে গুরুতর সংঘর্ষ, মাথায় আঘাত বা কনকাশন এবং পেনাল্টি নিতে যাওয়া খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

ভিএআরের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে

২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। এবার এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্পষ্ট ভুলের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ড দেখানো হলে ভিএআর বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পারবে। ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো হলেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এ ছাড়া ভুলভাবে কর্নার কিক দেওয়া হলে এবং খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার আগেই যদি কোনো ফাউল ঘটে, সেসব ক্ষেত্রেও ভিএআর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ পাবে। আইএফএবি জানিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে ভিএআর রেফারিকে মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে সিদ্ধান্ত পুনরায় দেখতে পরামর্শ দিতে পারবে।

প্রতি অর্ধে থাকবে বাধ্যতামূলক পানি বিরতি

প্রতিটি অর্ধে একবার করে তিন মিনিটের পানি বিরতি থাকবে। সাধারণত অর্ধের মাঝামাঝি, অর্থাৎ প্রায় ২২ মিনিটের সময় এই বিরতি দেওয়া হবে। তবে কোনো খেলোয়াড় আহত হলে বা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে রেফারি প্রয়োজন অনুযায়ী সময় পরিবর্তন করতে পারবেন।

গোলরক্ষকের চিকিৎসার সময় কোচের সঙ্গে আলোচনা নয়

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গোলরক্ষক মাঠে চিকিৎসা নিলে দুই দলের খেলোয়াড়দের কেউই মাঠের বাইরে গিয়ে কোচের সঙ্গে আলাদা আলোচনা করতে পারবেন না। অর্থাৎ গোলরক্ষকের চিকিৎসার সময় অনানুষ্ঠানিক ট্যাকটিক্যাল বিরতির সুযোগ আর থাকবে না।

২০২৬ বিশ্বকাপ হবে এই নতুন নিয়মগুলোর প্রথম বড় পরীক্ষা। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আশা, এসব পরিবর্তনের ফলে খেলার গতি বাড়বে, সময় নষ্ট কমবে এবং মাঠে শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হবে।