‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’—ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর পর্দা উঠছে ১১ই জুন। এবারের বিশ্বকাপ কিন্তু শুধু গ্রেইটেস্টই নয়, বিগেস্টও বটে! প্রথমবারের মতো একসাথে তিন দেশ আয়োজক, যার মধ্যে মেক্সিকোর রয়েছে তিনবার হোস্ট হওয়ার রেকর্ড!
যেহেতু সর্বোচ্চ সংখ্যক ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের সংখ্যাও অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে! তিন দেশের ১৬টি ভেন্যুতে ৩৯ দিন ধরে মোট ১০৪টি ম্যাচ এবার!
সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পন্ন, দল ঘোষণা শুরু হবে শিগগিরই। এরমধ্যে আনন্দ বাড়িয়ে দিতে থিম সং নিয়ে ফিরছেন পপস্টার শাকিরা!
টিকিটের মূল্য আকাশছোঁয়া, কিন্তু সেটিও হয়ে পড়েছে সোনার হরিণ! নতুন ফরম্যাটের এই বিশ্বকাপ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ-উত্তেজনা তুঙ্গে! কারণ এমন অনেক কিছুই দেখা যাবে এবার যা কখনো দেখা যায়নি আগে! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসলেই দেখা যাবে তো?
এই সন্দেহ বা প্রশ্নের কারণ, বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে একমাসের মতো বাকি থাকলেও, বাংলাদেশে কোন চ্যানেলে খেলা দেখা যাবে বা কারা খেলা দেখাবে তা নিশ্চিত হয়নি এখনো।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি বা খেলাধুলার চ্যানেল টি স্পোর্টস কেউই এখন বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
আর শুধু বাংলাদেশ নয়, একই অবস্থা চীন এবং ভারতেও, অর্থাৎ বিশ্বের একটা বড় অংশের দর্শক এখনো নিশ্চিত নয় তারা কীভাবে দেখবে প্রিয় দল ও তারকার ফুটবলের যাদু।
ফিফা বিশ্বকাপের রাইটস কার?
ফিফা তাদের বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য টেন্ডার আহ্বান করে এবং তার উন্মুক্ত নিলাম হয়। যেখান থেকে সম্প্রচার স্বত্ব পায় বিভিন্ন দেশ। এটা ওপেন বিড হলেও বাংলাদেশ থেকে কখনোই কাউকে নিলামে অংশ নেয়ার কথা শোনা যায় নি। সাধারণত থার্ড পার্টি কারও কাছ থেকে পরবর্তীতে স্বত্ব কিনে নেয় টিভি চ্যানেলগুলো।
এবারে যেমন বাংলাদেশ অঞ্চলের সম্প্রচার স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরের একটা কোম্পানি স্প্রিংবক। তারাই বাংলাদেশে যে কোনো মাধ্যমে খেলা দেখানোর রাইটস দিতে পারে।
টিভিতে খেলা দেখানোর জন্য দুরকম রাইটস আছে।
প্রথমত টেরেস্ট্রিয়াল রাইটস, যা নিতে পারে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), যারা সরাসরি কোনো ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে বাতাস বা তরঙ্গের মাধ্যমে অ্যান্টেনাযুক্ত টেলিভিশন সেটে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে।
আর রয়েছে স্যাটেলাইট রাইটস—যে কোনো স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য, যারা ডিশ বা কেবল সংযোগের মাধ্যমে সম্প্রচার করে।
এর বাইরে রেডিও ও ডিজিটাল মাধ্যমে খেলা দেখানোর জন্য আলাদা করে স্বত্ব কিনতে হয়।
“আমরা অফার দিয়েছি বিটিভিকে, কিন্তু তারা এখনো কিছু জানায়নি,” গোপাল পাদিয়া, স্প্রিংবকের স্বত্বাধিকারী আলাপ-কে বলেছেন। “এবারে ফিফা থেকেই অনেক বেশি দামে রাইটস কিনতে হয়েছে।”
আর সংকটটাও তৈরি হয়েছে এখানে। বাংলাদেশে ২০২২ বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ বিটিভির পাশাপাশি দেখিয়েছিল টি স্পোর্টস ও গাজী টিভি। এবারও টি স্পোর্টসের আগ্রহ আছে, কিন্তু আকাশচুম্বী দাম শুনে পিছিয়ে আসে তারা।
‘তাদের প্রাইস অনেক বেশি’
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের স্যাটেলাইট রাইটস নেয়ার দৌড়ে টি-স্পোর্টসের পাশাপাশি শোনা যায় স্টার নিউজের নামও।
স্টার নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোখছেদুল কামাল বলছিলেন, “বাংলাদেশের যে মার্কেট সাইজ আর সেই তুলনায় যে প্রাইস, সেটা অনেক বেশি, ভর্তুকি দেওয়া ছাড়া খেলা দেখানো সম্ভব হবে না।”
অনেকটা একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায় টি স্পোর্টস থেকেও। কিন্তু এই যে প্রাইস বেশি বলা হচ্ছে সেটা আসলে কতটা বেশি?
যা জানা যাচ্ছে তা হলো, স্প্রিংবক থেকে স্যাটেলাইটের জন্য আস্কিং প্রাইসটা ১০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের উপর অর্থাৎ কমপক্ষে ১২২ কোটি টাকা। যা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি।
আর টেরেস্ট্রিয়াল রাইটসের জন্য বিটিভির কাছে চাওয়া হয়েছে প্রায় দেড়শো কোটি টাকার মতো, সেটাও আবার ভ্যাট-ট্যাক্স ছাড়াই।
গেল বিশ্বকাপে অর্থাৎ ২০২২ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের স্বত্ব কিনে খেলা দেখায় বিটিভি। বিভিন্ন সূত্রে যেটার অঙ্ক ৯৮ কোটি বলে জানা যায়। আর ২০২২ সালেই মার্কেটে কারসাজি করে দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্যও আরেকটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।
বিটিভির সংকট!
“আমাদের সারা বছরের বাজেট ৩০০ কোটি টাকা, সেখানে ১৫০ কোটি টাকায় কীভাবে খেলা সম্প্রচার করবো,” বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিভির এক শীর্ষ কর্তা।
পৃথিবীর অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সরাসরি ফিফাতে বিড করে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেয়। এতে করে থার্ডপার্টি এড়িয়ে খরচ কমানো যায়। তবে এক্ষেত্রে অবশ্য বিটিভি'র সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন বিটিভির ওই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশে এখনো সবচেয়ে বড় কভারেজ বিটিভি'র। সারা দেশের দর্শকদের কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারে তারা। অনেকেই বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টের সময় চোখ রাখেন বিটিভির পর্দায়।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও প্যাকেজ নীতমালার আওতায় বিটিভিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে খেলা প্রচার করেছে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান, বিনিময়ে বিজ্ঞাপন থেকে এ টাকা উঠিয়ে নিত তারা।
তারও আগে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় বা নামমাত্র মূল্যে খেলা দেখিয়েছে বিটিভি।
এছাড়া প্রয়োজনে বেসরকারি টিভির ক্লিন ফিড যে কোনো সময় নিতে পারবে বিটিভি এমন সরকারি প্রজ্ঞাপনও আছে। যদিও সেটা এই বাণিজ্যের যুগে খুব একটা মানা হয় না।
তাইতো আগে নিয়মিত বিটিভিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখালেও এখন যাদের কাছে স্বত্ব বিক্রি করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), শুধু তারাই খেলা দেখাতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের রাইটস কিনে নেয়া স্প্রিংবক প্রথমেই যোগাযোগ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাথে। এরপর মন্ত্রণালয় সেটি বিটিভির কাছে পাঠায় দরদামের জন্য।
কিন্তু দেড়শো কোটির টাকার বিশাল অঙ্ক শুনে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিটিভি সরাসরি ফিফায় যোগাযোগ করে বিনামূল্যে ফিড পেতে। যার উত্তর এখনো আসেনি।
তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, উত্তর আসার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। সম্প্রচার স্বত্বের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ফিফা। ফ্রি তো দূরের কথা, ‘ফিক্সড প্রাইস’ পলিসি তাদের।
আর ২০২২ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের মার্কেট সম্পর্কে ফিফার ধারণাটাও বদলে দিয়েছে। যদিও সেবার এত বিপুল অঙ্কে বিটিভির রাইটস কেনার বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। সেই সমালোচনার পথে না হাঁটতে বর্তমান সরকার এবার বিশ্বকাপ স্বত্ব কেনার ব্যাপারে অনাগ্রহী।
সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী স্থানীয় এক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’
স্প্রিংবক কী বলছে?
বল এখন বাংলাদেশের কোর্টে। স্যাটেলাইট ও টেরিস্ট্রিয়াল রাইটসের জন্য নিজেদের অফার জানিয়েছে স্প্রিংবক।
যার এখনো কোন উত্তর দেয়নি বিটিভি। আর টি স্পোর্টস যে পালটা দাম হেঁকেছে সেটা অনেক কম ছিল, বলছেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও।
”আমরা নেগোশিয়েশনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এমন একটা অফার দিন যাতে আমরা বসে আলোচনা করতে পারি,” বলেন গোপাল পাদিয়া।
তিনি নিজেই বলছিলেন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দামে ফিফার কাছ থেকে কিনতে হয়েছে তাদের। তবে এখন খুব অল্প লাভ হলেও স্বত্ব বিক্রিতে মরিয়া তারা।
যদিও ফিফার কাছে স্বত্ব সারেন্ডার করার অপশনও খোলা আছে তাদের।
এখন সমাধান কী?
সবচেয়ে সহজ সমাধান হল সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসা। অর্থাৎ এককভাবে কেউ না কিনে সবাই মিলে অঙ্কটা ভাগাভাগি করে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা। বিভিন্ন পক্ষের সাথে কথা বলে সেই সম্ভাবনা বেশ জোরালো মনে হয়েছে। সরকারের দিক থেকেও আছে এমন ইঙ্গিত।
সব পক্ষই শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। এর মধ্যে দরদাম চলবে। তবে প্রতিটি দিনই এখন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিভি রাইটস নেবার পর সেটা আবার বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রির চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত যদি কেউ টিভি রাইটস না কেনে, তাহলে? এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই। আরেকটা দুঃসংবাদ হলো, বাংলাদেশ থেকে এখনো কেউ ডিজিটাল রাইটস কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি।
গত বিশ্বকাপে খেলা দেখানো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টফি এবার স্বত্ব কিনছে না বলে নিশ্চিত করেছে আলাপকে।
তবে সুসংবাদ হল যুগটা এখন ইন্টারনেটের। প্রথম সমাধান হতে পারে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা পাকিস্তানে কোন চ্যানেল রাইটস কিনলে সেটা যদি বাংলাদেশের ক্যাবল লাইনে দেখানোর অনুমতি পায়।
এবার বিশ্বকাপে ইউটিউবের সাথে চুক্তি হয়েছে ফিফার। যারা রাইটস কিনবে তারা তাদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রত্যেক ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট ফ্রি স্ট্রিমিং করতে পারবে।
ফিফার কড়াকড়িতে থার্ড পার্টি কোনো অ্যাপে অবশ্য নির্বিঘ্নে খেলা দেখার সম্ভাবনা খুব কম। তবে এক্ষেত্রে সমাধান হয়ে আসতে পারে ফিফা প্লাস। যে সব অঞ্চলে কোনো রাইটস নেই সেসব অঞ্চলে বিশেষ উপায়ে খেলা দেখানোর পরিকল্পনা আছে ফিফার এই প্ল্যাটফর্মের।