সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিউজ পোর্টাল, সবখানেই একটি নাম নিয়ে তোলপাড়, ঐশ্বরিয়া রাজেশ। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী গত কয়েকদিন ধরে সার্চ ইঞ্জিনগুলোর ট্রেন্ডিং লিস্টের শীর্ষের দিকে আছে।
তবে এই আলোচনার কারণ কোনো নতুন সিনেমার ট্রেইলার বা বক্স অফিস সাফল্য নয়। বরং একটি পডকাস্টে নিজের ক্যারিয়ারের শুরুতে মুখোমুখি হওয়া এক শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার বর্ণনাই তাকে স্পটলাইটে এনেছে।
ঐশ্বরিয়ার জবানিতে উঠে এসেছে এক ফটোগ্রাফারের সেই ‘অশালীন’ আচরণের বিস্তারিত, যা এখন নেটিজেনদের আলোচনার মূল খোরাক।
ডার্ক রুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
ঘটনাটি তখনকার, যখন ঐশ্বরিয়া সবে ক্যারিয়ার শুরুর চেষ্টা করছেন। এক নামজাদা ফটোগ্রাফারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন স্রেফ কিছু প্রফেশনাল ছবি তোলার জন্য। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
পডকাস্টে ঐশ্বরিয়া বলেন, ওই ফটোগ্রাফার তাকে সরাসরি প্রস্তাব দেন, "আমি তোমার শরীর দেখতে চাই।" ঐশ্বরিয়াকে সেই ফটোগ্রাফার আরও প্রশ্ন করেন, তিনি শর্টস বা টু-পিস বিকিনি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন কি-না।
এমনকি ফটোগ্রাফার দাবি করেন, তাকে যদি পর্দায় ‘হট’ এবং ‘সেক্সি’ দেখাতে হয়, তবে তাকে আরও বেশি ‘খোলামেলা’ হতে হবে।
কিন্তু ঐশ্বরিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তিনি কেবল তার অভিনয় প্রতিভা দেখাতে এসেছেন, শরীর নয়। সেই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন এবং বলেন যে ক্যারিয়ারের দীর্ঘ লড়াইয়ে কখনোই নিজের সম্মানের সাথে আপস করেননি।
হেমা কমিটি: দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ‘প্যান্ডোরার বাক্স’
ঐশ্বরিয়া রাজেশের এই সাহসী স্বীকারোক্তি এমন এক সময়ে এলো যখন পুরো ভারত ‘হেমা কমিটি’র রিপোর্টে কাঁপছে। ২০১৭ সালে মালয়ালম সিনেমার একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে চলন্ত গাড়িতে অপহরণ করে যৌন নিগ্রহ করা হয়েছিল।
ওই ঘটনার পর ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেরালা সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কে. হেমা’র নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
কয়েক বছরের তদন্ত ও কয়েকশত নারী কর্মীর সাক্ষ্য নেওয়ার পর সম্প্রতি প্রকাশিত সেই রিপোর্টে উঠে এসেছে যে পুরো ইন্ডাস্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করে ১০ থেকে ১৫ জন প্রভাবশালী পুরুষের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী, যাদেরকে বলা হয়েছে ‘দ্য পাওয়ার গ্রুপ’। এদের সন্তুষ্ট না করলে কোনো নারী শিল্পী বা কলাকুশলীর টিকে থাকা অসম্ভব।
যদি কোনো নারী এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন বা ‘আপস’ করতে রাজি না হন, তবে তাকে অলিখিত নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হয় । যাকে এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ‘শ্যাডো ব্যান’।
রিপোর্টে দেখা গেছে, শুটিং সেটে নারী শিল্পীদের জন্য টয়লেট বা পোশাক বদলানোর ব্যবস্থাও থাকে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি না খেয়ে থাকার মতো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তাদের।
এই রিপোর্ট প্রকাশের পর কেরালা ছাড়িয়ে তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশের সিনেমা জগতেও ‘মি টু’ আন্দোলনের নতুন জোয়ার এসেছে। ঐশ্বরিয়া রাজেশের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি মূলত এই আন্দোলনেরই অংশ, যা প্রমাণ করে যে অন্ধকার কেবল কেরালা নয়, বরং পুরো দক্ষিণ ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে আছে।
গায়ের রঙ থেকে ‘লেডি সুপারস্টার’: ঐশ্বরিয়ার লড়াই
ঐশ্বরিয়া রাজেশ কেন আজ এত জনপ্রিয়, তা বুঝতে হলে তার পেছনের লড়াইটাও প্রাসঙ্গিক। ভারতীয় সিনেমা মানেই যেখানে তথাকথিত উজ্জ্বল ত্বকের নায়িকাদের জয়জয়কার, সেখানে ঐশ্বরিয়াকে শুরু থেকেই যুদ্ধ করতে হয়েছে নিজের গায়ের রঙ নিয়ে। ডার্ক স্কিন টোন হওয়ার কারণে তাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
পডকাস্টে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওই ফটোগ্রাফারের মতো অনেকেই মনে করতেন, গায়ের রঙ চাপা হলে পর্দার জৌলুস বাড়াতে শরীর প্রদর্শন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ঐশ্বরিয়া প্রমাণ করেছেন অভিনয় দক্ষতাই শেষ কথা। ‘কাকা মুত্তাই’ বা ‘ফারহানা’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে তিনি আজ তামিল সিনেমার প্রভাবশালী একজন অভিনেত্রী।
ইন্ডাস্ট্রির রহস্যময় নীরবতা ও ভক্তদের ক্ষোভ
ঐশ্বরিয়ার এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের রাজনীতিও সামনে চলে এসেছে। বড় বড় পুরুষ তারকারা যখন এই স্পর্শকাতর বিষয়ে অদ্ভুত নীরবতা পালন করছেন, তখন সাধারণ মানুষ ঐশ্বরিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন, কেন আজও একজন অভিনেত্রীকে ক্যারিয়ারের শুরুতে এমন হীন প্রস্তাব শুনতে হবে? কেন সেই ফটোগ্রাফারের নাম আড়াল করা হচ্ছে?
সার্চ ট্রেন্ডে ঐশ্বরিয়া রাজেশের আসার পেছনে দেখা যাচ্ছে মানুষ মূলত সেই প্রভাবশালী ফটোগ্রাফারের পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। আর ঐশ্বরিয়া যেভাবে নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়টি কোনো রাখঢাক না করে তুলে ধরেছেন, সেই জেদই তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ঐশ্বরিয়া রাজেশের এই স্বীকারোক্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জৌলুসপূর্ণ পর্দার আড়ালের এক কুৎসিত সত্যের প্রতিচ্ছবি।
হেমা কমিটির রিপোর্ট আর ঐশ্বরিয়ার এই বয়ান মিলেমিশে এখন ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত ‘পাওয়ার হাউস’গুলোর ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিবাদের ঝড়ে সিস্টেমের কোনো বদল আসবে, নাকি জৌলুসের আড়ালে ঢাকাই পড়ে থাকবে এমন শত শত ‘ডার্ক রুম’ স্টোরি?