গ্যাংনাম স্টাইল থেকে প্যারাসাইট, কোরিয়ান সংস্কৃতি কীভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল?

২০১২ সালের ১৫ই জুলাই। যেদিন বদলে গেছে বিশ্ব, বদলে দিয়েছে স্যুট পরা এক কোরিয়ান শিল্পী- যিনি নিজেকে পরিচয় দেন ‘সাই’ নামে।

অদৃশ্য ঘোড়ার পিঠে চড়ে তার লাফানোর মুদ্রা বা হর্স-ডান্স জায়গা করে নিয়েছে আমাদের সবার মনে। দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিলেন উদ্দীপনাময় গানের বিটসের মাধ্যমে। আর মানুষের মাঝে বিপুল প্রচলিত করে দিয়েছিল ‘অ্যায় সেক্সি লেডি’ শব্দত্রয়ীকে।

অবশ্যই বলছি ‘গ্যাংনাম স্টাইল’-এর কথা; ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের সবচেয়ে ভাইরাল গানগুলোর একটি। বছর শেষ হতে না হতেই, ইউটিউবে এই গানের ভিউ পৌছে যায় এক বিলিয়নে- ইউটিউবে এক বিলিয়ন ভিউ হওয়া প্রথম ভিডিও এটি।

শুধু তাই নয়, এই গান আত্মপ্রকাশ করে বিলবোর্ড হট ১০০-এ, ভেঙে দেয় তিন তিনটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এবং অনেকের জন্য এনে দেয় নতুন এক হ্যালোইন কস্টিউম।

কিন্তু, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেপপকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দিয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ কোরিয়ান ভাষায় লেখা এই গানটি। সাইয়ের এই মনোমুগ্ধকর গানটি প্রকাশ পাওয়ার পরই মূলত অন্যান্য দক্ষিণ কোরিয়ান ব্যান্ডগুলোও সারাবিশ্বে খ্যাতি পেতে শুরু করেছে।

বিটিএস এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় কেপপ ব্যান্ড। আর সম্প্রতি প্রথম কেপপ তারকা হিসেবে গ্র্যামিতে রেকর্ড অব দ্য ইয়ার-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর রোজ।

নেটফ্লিক্সের চলচ্চিত্র ‘কেপপ ডিমন হান্টারস’, যা ১২ বছরের নিচে প্রায় সকল ছেলে-মেয়েকে বানিয়ে দিয়েছিলো খাঁটি কেপপ ভক্ত।

এটি ‘হালয়ু’-এর একটা অংশ মাত্র। ‘হালয়ু’ চীনা শব্দ- যার অর্থ ‘কোরিয়ান তরঙ্গ’। সংগীত, চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ফ্যাশন, খাবার- কয়েক দশকের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার পপ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।

'স্কুইড গেম', বং জুন হো-এর 'প্যারাসাইট', কোরিয়ান স্কিনকেয়ার বা ত্বকের যত্নের সামগ্রী, বুলডাক রামেন, এদের শুরু কোরিয়াতে হলেও আজ সারা বিশ্বে পরিচিত।

অন্যান্য দেশে কোরিয়ান পপ সংস্কৃতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটাকে বলা হচ্ছে হালয়ু। অস্ট্রেলিয়ায় কোরিয়ান ও ইংরেজী ভাষায় র‍্যাপ করছে ‘থার্টিন হানড্রেড’- এর মতো কোরিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান হিপ-হপ গ্রুপগুলো।

অস্ট্রেলিয়া স্থানীয় অভিজ্ঞতার সাথে কোরিয়ান পপ সংস্কৃতির রেফারেন্স মিশিয়ে তৈরি করছে তাদের এক নিজস্ব হালয়ু। 

যদিও অনেকেই ‘গোল্ডেন’ গানের তালে তালে নাচছেন, অথবা ভরপুর কিম্চি খেয়ে পেট ভরাচ্ছেন, তবুও খুব কম মানুষই জানে, কেন বা কীভাবে এসবের প্রতি এত আকৃষ্ট হচ্ছেন?

ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ অস্ট্রেলিয়াতে হতে যাচ্ছে এক প্রদর্শনী, যেখানে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। লন্ডনের প্রদর্শনীটি সাজিয়েছেন ড. রোজালি কিম। আর এই ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় আসছে 'হালয়ু! দ্য কোরিয়ান ওয়েভ' নামের এই প্রদর্শনী।

এতে থাকবে হালয়ু অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী কোরিয়ান সংস্কৃতি প্রচারের ইতিহাস এবং অস্ট্রেলিয়ায় কীভাবে এই হালয়ুকে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

‘হালয়ু’ চীনা শব্দ- যার অর্থ ‘কোরিয়ান তরঙ্গ’। সংগীত, চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ফ্যাশন, খাবার- কয়েক দশকের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার পপ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।

হালয়ু’র শুরু 

উপর থেকে যতটা উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় বলে মনে হোক না কেন, হালয়ু’র পেছনে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার অস্থির ইতিহাস। হালয়ু’র শুরু কোরিয়ান যুদ্ধ শেষের দিকে হতে পারে, যে যুদ্ধে কোরিয়া ভাগ হয়ে গিয়েছিলো উত্তর ও দক্ষিণে- এমনটাই মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ামের কিউরেটর কেইট মরশেল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া ভাগ হওয়ার পর দক্ষিণ অংশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর এই দ্রুত শিল্পায়নের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে এলজি, হুন্দাই,স্যামসাংয়ের মতো বড় বড় পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো।

মরশেল বলেন, “আশির দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল একটি উদীয়মান গণতান্ত্রিক এবং সৃজনশীল উৎপাদনের প্রতি দেশটির আগ্রহ বাড়তে থাকে।”

দক্ষিণ কোরিয়ায় সেন্সরশিপ আইন বাতিল ও বাইরের বিশ্বের জন্য দেশটি উন্মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই হালয়ু’র উত্থান। এছাড়াও সৃজনশীল শিল্পগুলোকে সমর্থন করার জন্য কিছু সরকারি নীতিমালা ছিল, আর ছিল- ডিজিটাল অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ।

প্রথমে কোরিয়ান পপ-সংস্কৃতির এই বিস্তার এশিয়ার কিছু অংশে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষে যখন ইন্টারনেটের প্রসার হলো, তখন দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত সেই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার সংস্কৃতিকে আরও ছড়িয়ে দেয়। তাদের লক্ষ্য- বিশ্বে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করে নিতে হবে।

হালয়ু সফল হওয়ার পেছনে মিলেনিয়ালস ও জেন জি- এই দুই প্রজন্মের কৃতিত্ব দেখতে পান ড. রোজালি কিম। কারণ এই দুটি প্রজন্ম হালয়ু’র সাথে সাথেই বেড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, "এই প্রজন্মগুলো সাধারণত বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রতি বেশি সহানুভুতিশীল এবং সামাজিকভাবে আরও সচেতন। অর্থাৎ একদিকে আছে এমন দর্শক- যারা সবসময় নতুন কিছুর জন্য প্রস্তুত।

“অন্যদিকে আছে কোরিয়ান বিনোদন শিল্পের নতুন নতুন সৃষ্টি। আর এ দুটোকে একত্রিত করে কোরিয়ান পপ সংস্কৃতিকে বিশ্ববিখ্যাত করে তুলেছে প্রযুক্তি- এমন এক গতি ও মাত্রা দিয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।”  

লাইক, সাবস্ক্রাইব, স্ট্রিম

হালয়ু আরও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়- যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আবির্ভাব হয়।

কিম বলেন, “টুইটার বা ফেইসবুক আরও বিস্তারিত আলোচনা নিয়ে আসার আগে, শুরুর দিকের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোতে কোরিয়ান ভক্তরা বিদেশে থাকা দর্শকদের জন্য কে-পপ গান এবং কে-ড্রামার সংলাপ অনুবাদ করতেন।” 

তিনি বলেন, এমনকি কোরিয়ান ওয়েবটুনের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্মও বানানো হয়েছিলো। একইসাথে কেপপ তারকারা যাতে সারা বিশ্বে ভক্তদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে- সেজন্য বিশেষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ছিলো। এমন একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল- সিজে এন্টারটেইনমেন্টের এমনেট প্লাস। 

“কোরিয়ানরা এই প্ল্যাটফর্মগুলো আরও আগে থেকেই উপভোগ করত। সেখানে ভার্চুয়াল ফুল কেনা, নিজের অ্যাভাটার বানানো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া যেত, এমনকি কেপপের গান শুনতে শুনতে ভক্তরা তাদের ভ্রমণের গল্প ও ছবি আদানপ্রদান করতে পারতেন।

এসবকিছুই পশ্চিমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আসার আগের ঘটনা, ৯০ এর দশকের শেষ আর এই শতকের শুরুর দিকে।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো- ইউটিউব ছাড়া হালয়ু আজকের এই পর্যায়ে আসতে পারত না। সেই গ্যাংনাম স্টাইলের সময় থেকে- সব কেপপ কন্টেন্টের প্রধান গন্তব্য হয়ে গেছে ইউটিউব।

বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা শেষ করার পর আবারও এক হয়েছে বিটিএস। বিটিএসের গানের ভিডিও ‘ডাইনামাইট’ ইউটিউবে দুই বিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়ে গেছে।

কোরিয়ান অ্যানিমেশন কোম্পানি পিংকফং-এর বানানো গান ‘বাবি শার্ক’- যেটাকে ঠিক কে-পপ বলা যায় না। ইউটিউবে এই গানের ভিউ ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন।

ন্যাশনাল মিউজিয়ামের হালয়ু প্রদর্শনীর কিউরেটর কেইট মরশেল বলেন, “ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সুবাদে কোরিয়ান সিনেমা ও নাটক- বিশেষ করে কেড্রামা পেয়েছে অসংখ্য নতুন দর্শক। নেটফ্লিক্সে এখন কেড্রামার জন্য একটি আলাদা সেকশনই রয়েছে।

“একইভাবে অ্যাপল টিভির জনপ্রিয় সিরিজ 'পাচিনকো' অন্যান্য দেশের দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। এই সিরিজের ভিত্তি ২০১৭ সালের একটি উপন্যাস- যা কাছে কোরিয়ান সংস্কৃতিকে আরও পরিচিত করে তুলেছে।”

অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পাওয়া ইংরেজি ভাষার বাইরে প্রথম সিনেমা হলো- প্যারাসাইট। এই চলচ্চিত্র ছাড়া হালয়ু নিয়ে কোনো আলোচনাই সম্পূর্ণ হবে না।

২০১৯ সালে এই সিনেমা বিশ্বব্যাপী আয় করেছিলো ২৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মরশেল বলেন, "আমরা এমন সাংস্কৃতিক চর্চা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম, যা মূলত আসত পশ্চিমের হলিউড থেকে। আর আসতো যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের নির্দিষ্ট কিছু সংগীতের ধারা থেকে।

“হালয়ু আসলেই সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, অনেকাংশে পাল্টেও দিয়েছে। এটি অন্যান্য সংস্কৃতিকে দেখাচ্ছে যে, কীভাবে তাদের গল্পগুলো বিশ্বের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “হালেয়ু’র মর্মই হলো- নিজেদের গল্পগুলো সবার সামনে তুলে ধরা। তাই হালয়ু’র কখনই দর্শকের অভাব পড়ে না।”