ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিমের সাথে দেখা করতে সোমবার সন্ধ্যায় তার বাসায় গেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এর আগে রবিবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় যান তিনি।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিরোধী নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করে দেশের রাজনীতিতে ভিন্ন এক বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। সমর্থকদের কাছে এটি উদারতার দৃষ্টান্ত, সমালোচকদের কাছে কৌশলগত ইমেজ নির্মাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি কী কেবল তাৎক্ষণিক কৌশল নাকি ভবিষ্যতের রাজনীতিতে সহনশীলতার নতুন ধারা, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজয়ের পর এই ধরনের সৌজন্য সাক্ষাৎ কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক সংকেত।
একদিকে বিরোধীদের অভিযোগ ও সমালোচনাকে নরম করার চেষ্টা, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ও সহনশীল নেতৃত্বের ইমেজ তুলে ধরা, দুই দিকই এখানে কাজ করতে পারে। ফলে ঘটনাটি কেবল শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। মঙ্গলবার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক কৌশল
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিরোধী নেতাদের বাসায় গিয়ে দেখা করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান নতুন এক রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেউ এটিকে কৌশলগত ইমেজ ম্যানেজমেন্ট বলছেন, কেউ দেখছেন গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে। তবে প্রায় সবাই একমত যে এটি দেশের রাজনীতিতে অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন একটি ঘটনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী বলেন, রাজনীতিবিদরা যা করেন সবই রাজনীতিরই অংশ। তিনি বলেন, তারেক রহমান সম্পর্কে তরুণদের একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। সেটা তিনি ভাঙতে চান।
“আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে, জেন জির পক্ষ থেকে একটা প্রোপাগান্ডা আছে। তারেক রহমান সেটা কাউন্টার করতে চান”
কামরান রেজা চৌধুরী বলেন, “তারেক রহমান বোঝাতে চান, আমি জয়ী হওয়ার পরেও অপজিশনের কাছে গিয়ে দেখা করছি এবং দেশকে সবাইকে নিয়ে চলার মতো রাজনৈতিক ব্যবস্থা করতে চাই।”
গবেষক আলতাফ পারভেজও এই শিষ্টাচারকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চান। তিনি বলছেন, “উনার অন্তরে কী আছে তা তো আমরা জানি না। কিন্তু এটা ভালো রাজনীতি।”
বিএনপির নির্বাচন পরিচলানা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, “বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক ইতিহাস সেটা বরাবরই সংঘাতময়। এক ধরনের একটি রাজনৈতিক দলের সাথে আরেকটি রাজনৈতিক দলের বিভেদের ইতিহাস। কিন্তু আমরা এই বিভেদের ইতিহাসের মধ্যে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় সেটা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।”
অন্যদিকে তারেক রহমান যা করেছেন তা স্বাভাবিক কাজ বলে মন্তব্য করেছেন রাজনীতি পর্যবেক্ষক রেজাউল করিম রনি। তিনি বলেন, “এটা উনি করবেনই। গণতান্ত্রিক চর্চারই অংশ। প্রশ্ন হচ্ছে উনার প্রতিপক্ষ ও
বিরোধীপক্ষ হিসেবে যারা আছে, তারা কতখানি ডেমোক্রেটিক আচরণ করে তা নিয়ে।”
তিনি মনে করেন, এটা একজন ডেমোক্রেটিক লিডারের সাধারণ আচরণ এবং পরবর্তী সময়ে এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
বিরোধীপক্ষকে মোকাবিলা
গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করাই ভালো রাজনীতি। নির্বাচনের ফল নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির আপত্তির প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, “জামায়াত ইসলামী যে কয়েকটি আসন নিয়ে আপত্তি তুলছিল, সামগ্রিকভাবে তারেক জয়ী হলো, তারপর বিরোধীদের বাসায় গেল। ইতিবাচকভাবেই সমালোচনা মোকাবিলা করেছেন তিনি।”
“যেকোনো নীতিবাচক প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করতে হবে, এটাই ভালো রাজনীতি”, যোগ করেন তিনি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে এনসিপি জামায়াত যে নেতিবাচক কথা বলছে তারেক রহমানের এই শিষ্টাচার সেটারও ভালো ‘কাউন্টার’ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন কামরান রেজা চৌধুরী।
তিনি বলেন, “তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারেক রহমান বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেন। তিনি উদার ইমেজ তৈরি করেছেন।”
এই ঘটনার পর জেন জির তরুণরা তারেক রহমানকে নিয়ে কথা বলতে চিন্তা ভাবনা করবে বলেও মত দেন এই রাজনীতি পর্যবেক্ষক।
“তারেক রহমান আসার পর নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেছিল, আমরা নমরুদকে পেলাম, জালিম এসেছে। কিন্তু তার এই কথা তো আর এখন ভ্যালিড নাই”, যোগ করেন এই সিনিয়র সাংবাদিক।
তিনি বলেন, “নাহিদের বাসায় তারেক রহমান যাওয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও একটি আলাপ উঠছে। নাহিদের বাসা নিয়ে অনেকে মন্তব্য করছেন যে মাত্র এক বছরের মধ্যে কীভাবে এত আলিশান বাসায় থাকতে পারেন নাহিদ।”
নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিরোধী নেতার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করার নজির জাতীয় রাজনীতিতে আগে দেখা যায়নি। তারা মনে করছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচলানা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, “আমাদের যে সুস্থ রাজনীতির ধারা শুরু হচ্ছে সেটি ইঙ্গিত করে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান যিনি সরকার গঠন করছেন, যিনি ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী তিনি যখন এই ধরনের টলারেন্স এবং ইনক্লুসিভিটি দেখান, শুধু কথায় না কাজেও দেখাচ্ছেন, সেটা একটি আশাব্যঞ্জক বিষয়।”
দেশের রাজনীতিতে এটা একটা ভিন্ন মাত্রা উল্লেখ করে কামরান রেজা চৌধুরী বলেন, “আমরা কখনো আগে এমন দেখি নাই যে মেজরিটি পাওয়ার পরও কেউ তার অপজিশনের বাসায় চলে গেছেন। এরপর সুন্দর পলিটিকাল পরিবেশ আশা করতে পারেন।”
আলতাফ পারভেজ বলেন, “তিনি যদি রাজনীতিক হিসেবে করে থাকেন সেটাও ভালো, অন্তর থেকে করে থাকলেও ভালো। এটি অভিনন্দনযোগ্য।”
আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতিতে এমন চর্চা নেই উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, “এর আগে তো আমরা এরকম দেখি নাই। স্থানীয় নির্বাচনে অনেক সময় পরাজিতরা জয়ীদের বাসায় অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানাতে যেতেন, কখনো উল্টোটাও হতো। কিন্ত জাতীয় রাজনীতিতে এবারই প্রথম।”
“এটা ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য ভালো উপাদান ও পদক্ষেপ।”
পলিটিশিয়ান আর তারেক রহমান ‘ডিফারেন্ট থিং’ মন্তব্য করে রনি বলেন, “আগে আমরা রেজিমে ছিলাম, এখন তারেক ডকট্রিনে আছি। জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল ডকট্রিন। এখন তারেক রহমান সেই ধারা চালু রাখবেন।”