‘আমাদের অবস্থান ডানপন্থিদের বামে আর বামপন্থিদের ডানে-উক্তিটি সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার।
তার এই মন্তব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণভোমরা। দেশের মানুষ যে একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল, বিষয়টি বেগম জিয়া ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই উপলদ্ধিই তাকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল এবং বিএনপিকে শক্ত জমিনের ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল।
বিএনপি করে না এমন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষও বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অনুধাবন করছেন ’মধ্যপন্থি রাজনীতি’ ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন। অর্থাৎ দেশে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে সকল মত-পথে বিশ্বাসীদের জন্য স্পেস থাকবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা কতটা পাঠ করতে পারছে?
২.
বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১২ই ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন যাত্রা শুরু করবে। সেই যাত্রার একপাশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, অন্যপাশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। এর বাইরেও কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও, ভোটের মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি এবং জামায়াত জোটের মধ্যে। উভয়পক্ষে দল ও জোটকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
তারেক রহমান দেড় যুগ নির্বাসনে ছিলেন। গত ২৫এ ডিসেম্বর নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন তিনি। সেদিন বাংলাদেশের মানুষ তাকে অকৃত্রিম ভালোবাসায় স্বাগত জানায়। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই (৩১এ ডিসেম্বর) তার মাতৃবিয়োগ ঘটে। অর্থাৎ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। সেদিনও বাংলাদেশের মানুষ বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানায় বেগম জিয়াকে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর নেতাকর্মীরা যেমন নতুন উদ্যমে চাঙ্গা হয়েছিল, তেমনি বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর বিপুল সহানুভূতি পেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু এর ফায়দা বিএনপির পক্ষে কতটা এল তা বোঝা যাবে নির্বাচনের ফলাফলের পর।
তবে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেনো, তার দায়দ্বায়িত্ব তারেক রহমানকেই বইতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
৩.
কারণ, এই নির্বাচনে বিএনপির প্রধান মুখ বা তারকা হলেন তারেক রহমান। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে দলটির রাজনীতি। তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটেছেন, বিরামহীন। যেখানেই গেছেন মানুষের বিপুল ভালোবাসা পেয়েছেন।
কিন্তু জনসভার লোকসমাগম যে ভোটের নিশ্চয়তা নয়, সেটি ভালোই বোঝে বিএনপি। ফলে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে অনলাইন-অফলাইনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ছুটেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ভোটারদের খুশী করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারপরও আশঙ্কা পিছু ছাড়ছে না।
বিএনপি যেমন ছুটছে, তাদের প্রতিপক্ষও বসে নেই। শুরুর দিকে আওয়ামী লীগবিহীন ভোটে যতটা সহজে জয় আসবে ভেবেছিল, বিএনপির জন্য বাস্তবতা ততই কঠিন। কারণ, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১০ দলীয় জোট তাদের জন্য প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে, ঘাম ঝরাতে হচ্ছে দলটির নেতাকর্মীদের।
গতবছরের শেষ সপ্তাহে তারেক রহমান যখন লন্ডন থেকে ফেরেন, তখন দেশ একেবারে খাদের কিনারায়। অভ্যুত্থান পরবর্তী গত দেড় বছরে দেশে অকল্পনীয় সব ঘটনা ঘটেছে। এসবের বেশিরভাগই ফৌজদারি অপরাধ।
কিন্তু ভীতিকর সেসব ঘটনা ঠেকাতে সরকারকে খুব বেশি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বরং জনমানসে এমন ধারণা আছে যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পক্ষে সরকারের একাংশের পক্ষপাত আছে বা ছিল। এসব ঘটনাকে কোনো কোনো গোষ্ঠীর পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প বলে অনেকেই অভিযুক্ত করেছেন।
শত শত মাজার ভাঙা, মব তৈরি করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, নারীর প্রতি নিপীড়ন, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়া, গণমাধ্যমে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ অগণিত ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। দমবন্ধ এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জনআকাঙ্ক্ষা হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ।
৪.
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন হলেই কি মুক্তি মিলবে?
তা হয়ত নয়, তবে মানুষ ভাবছে স্বস্তি মিলবে। বাস্তবতা হচ্ছে, নতুন যে সরকার আসবে তাদের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। মানুষের প্রত্যাশা অনেক, কিন্তু সরকারের সামর্থ্য সীমিত। এ অবস্থায় যারাই নির্বাচিত হয়ে আসুক না কেনো, তাদের অতিক্রম করতে হবে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এজন্য চাই দক্ষ নেতৃত্ব এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।
তারেক রহমান বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধান নেতা। মাঠের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার নেই। কিন্তু ভোটে জিতলে তিনিই হবেন সরকার প্রধান। বহুদিন ধরে তিনি রাষ্ট্র সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কথা বলছেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, খাল খনন, ডিজিটাল অর্থনীতি প্রণয়নসহ ৯ দফা ঘোষণা করেছেন নির্বাচনি ইশতাহারে।
কিন্তু নির্বাচনে জিতলে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ তৈরি করা। কারণ, এবারের ভোটে সর্বোচ্চ সংখ্যক তরুণ/তরুণী ভোট দেবেন।
এছাড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন ও সুসংহত করা, পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা, পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরা এবং নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রশমন করার মতো চ্যালেঞ্জও থাকছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষকে চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের থেকে সুরক্ষা দেয়া, পুরো প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো এবং সেখানে বিরাজনীতীকরণ করা, অর্থাৎ যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদায়ন প্রমোশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের সকল দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং ঋণখেলাপি ও ব্যাংক ডাকাতদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া, স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনাসহ এতসব কাজ করতে হবে যে, এর ফর্দ করলে তা লিখতে কয়েক হাজার শব্দ লেগে যাবে।
বিএনপি ৩১ দফায় এসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু কাগজের ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া বাংলাদেশে সবসময়ই কঠিন। বিএনপির সুবিধা হচ্ছে, দলটির রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে। ইতঃপূর্বে দেশের অনেকগুলো বড় সংস্কার তাদের হাতেই হয়েছে। তারপরও ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কার সবসময়ই কঠিন। ফলে দল জিতুক বা হারুক, তারেক রহমানের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সময়।
৫.
গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, "রাজনীতিবিদদের সামনে চ্যালেঞ্জতো থাকবেই। প্রথমত, উনি (তারেক রহমান) মাঠের রাজনীতিতে অত্যন্ত নবীন। বলা যায়, সবে তার রাজনীতিতে অভিষেক হলো। ১৭ বছর ধরে লন্ডনের একটা ফ্ল্যাট থেকে দল পরিচালনা করেছেন, দলটাকে রক্ষা করেছেন বলা যায়, সাংগঠনিক বিষয়গুলো দেখেছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের যে ব্যবহারিক রাজনীতি, সেখানে তিনি পদার্পণ করলেন মাত্র একমাস। ফলে এখানে তারতো লার্নিংয়ের ব্যাপার আছে। এই ব্যাপারটা স্বীকার করতে হবে।”
“অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ যারা, তারাতো মাঠ পর্যায়ে রাজনীতি করছে বছরের পর বছর ধরে। ফলে এই সীমাবদ্ধতা উনার আছে। আমার মনে হয় সেই সীমাবদ্ধতাই নজরে পড়েছে সবার। দ্বিতীয়ত, দ্রুত উনাকে (তারেক) একেবারে টাফ রাজনৈতিক সিচুয়েশন ফেইস করতে হচ্ছে। নির্বাচন হলো রাজনীতির একটা চরম মুহূর্ত। আর উনার অভিষেকই হলো সেই মুহূর্তের মধ্যে। আমার মনে হয় এটাকে বিবেচনায় নিতে হবে। উনি যখন (দেশে) এসেছিলেন, সেই মুহূর্তে তাকে নিয়ে যে উদ্দীপনা, সেই মুহূর্তটা গোল্ডেন। সেটা থাকবে না, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে, সেটা অস্বাভাবিকও নয়। বা উনার মায়ের মৃত্যুর পর বিএনপির জন্য যে অবস্থা তৈয়ার হয়েছিল, সেটাও আস্তে আস্তে মিইয়ে যাবে, সেটাও অস্বাভাবিক নয়,” বলেন আলতাফ পারভেজ।
৬.
দেশ বা রাজনীতির সাথে যতই যোগাযোগ থাকুক, কোনো একটি জায়গায় ১৭ বছরের শারীরিক অনুপস্থিতি যে কারো জন্যই বিরাট শূন্যতা। তারেক রহমানের মতো নেতার জন্য যে কারো চেয়ে এই বাস্তবতা আরো পীড়াদায়ক। লন্ডনে বসে দল চালানো বা দলকে ধরে রাখা আর সরাসরি মাঠে থেকে দল ও নেতাকর্মীদের ভালোভাবে চেনার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য।
অনেকেই মনে করেন, ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরপরই যদি তিনি দেশে আসতেন, তাহলে বিএনপির অবস্থা আরো সুসংহত হতো। দল ও নেতাকর্মীদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়ত। কিন্তু উনি এমন এক সময়ে দেশে ফিরেছেন যখন দলটাকে নিজের মতো করে গড়ে নেবার সময় নেই। মাতৃশোকের সময় নেই। নির্বাচন একেবারে দোরগোড়ায়। ফলে, দেশে ফিরেই তাকে নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে।
মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হয়েছেন। কিন্তু দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। এর বড় কারণ এবারের নির্বাচনে ৭৯জন বিদ্রোহী প্রার্থী। যাদের কোনোভাবেই নিউট্রালাইজ করতে পারেনি বিএনপি। ফলে এসব আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা হেরে যাবার ঝুঁকিতে আছেন। বিদ্রোহীদের কারণে দলীয় প্রার্থীরা হেরে গেলে তার দায় বর্তাবে দলনেতার ওপরই।
এখনো পর্যন্ত বিএনপিকে দেখে মনে হচ্ছে, দলটির ভাবনায় নির্বাচনে জয় ছাড়া আর কোনো ভাবনা নেই। কিন্তু হেরে গেলে দলটির ভূমিকা কি হবে?
গবেষক আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ হচ্ছে, “বিএনপি আগেও বিরোধীদলে ছিল। বিএনপি একটা মধ্য ডান ঘরানার দল। এবারের নির্বাচনে তারা মধ্যপন্থি অবস্থান নিয়েছে। ডানপন্থি রেটরিক কমিয়ে দিয়েছে। আর নির্বাচনে হেরে গেলে পলিসি রিভিউ করবে যে, পজিশনটা হয়ত কাজ করেনি। আইডোলজিওক্যালি রিভিউ করবে। আমার মনে হয়, বিএনপি বিরোধীদলেও খারাপ করবে না, যদি তারা বিরোধীদলেই যায়। কারণ, তাদের বিপুল নেতা আছে, যাদের বিরোধীদলে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু ওরা আইডোলজিক্যালি রিভিউ করবে। সেটা হবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।”
৭.
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও, বিএনপির মতো বিশাল সংগঠন তাদের নেই। বড় সংগঠনের সুবিধা যেমন আছে তেমনি অসুবিধাও কম না। কেননা দেশব্যাপী এত বড় সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তবে, তারেক রহমানের সুবিধা হচ্ছে, তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠনের নেতা এবং তার রয়েছে রাজনৈতিক লিগ্যাসি। যা তারেক রহমানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বা দেবে। যেটা আবার জামায়াতের নেই।
উপরন্তু জামায়াতের লিগ্যাসি নিয়ে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিপুল প্রশ্ন এবং অস্বস্তি আছে। জামায়াতের সম্পদ হচ্ছে দলটির লাখ লাখ নিবেদিত কর্মীবাহিনী এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য। ফলে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের চোখে তারেক রহমান এই মুহূর্তে ‘লাইট অব দ্য হোপ’। এমনকি তার বিরোধীদের চোখেও। এমন বহু মানুষের সাথে আমাদের কথা হয়েছে বা হচ্ছে, যারা মনে করেন তারেক রহমান দেশে ফেরায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
কিন্তু অস্বস্তির জায়গা হচ্ছে, তারেক রহমান লন্ডনের মতো জায়গা থেকে সমস্যার জঞ্জালে এসে পড়েছেন। দেশের ভেতরের কুৎসিত রাজনীতি, দলীয় কোন্দল, দুর্নীতি, রাহাজানি, অলিগার্কদের ষড়যন্ত্রসহ আরো অসংখ্য সমস্যা মোকাবিলায় তার অনভিজ্ঞতা। বাংলাদেশকে যদি একটি জাহাজ বিবেচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে জাহাজটির সামনে শুধুই প্রতিকূলতা, বিপরীতমুখী তীব্র স্রোত। এ অবস্থায় আসমান-জমিন ভরা প্রতিকূলতাকে সাহসের সাথে মোকবিলা করে জাহাজকে তীরে নোঙর করার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভাগ্য। বিএনপির নেতাকর্মীসহ অনেকেই ভাবছেন তারেক রহমান সেই ক্যাপ্টেন, যিনি ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ নামক জাহাজটিকে তীরে ভেড়াতে পারবেন। মানুষের এই প্রত্যাশার চাপও তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে আগামীতে।
তারেক রহমানকে নিয়ে এমন প্রত্যাশার কারণ কি? জানতে চেয়েছিলাম একজন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীর কাছে। তার স্পষ্ট উত্তর ছিলো “তারেক সাহেবের পলিটিক্যাল লিগ্যাসি।”
৮.
এ কথা সত্য যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হলেও তারেক রহমানের জীবন উত্থান-পতনে ভরা। বিশ্লেষকদের মতে, ক্লাসিক সিনেমার মতো তার জীবন, যার পরতে পরতে ক্লাইম্যাক্স। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক মাছির ওড়াউড়ি, ক্ষমতার উচ্ছিষ্টের জন্য লড়াই এবং ক্ষমতা কাঠামোর নিষ্ঠুরতা দেখেছেন। পদ-পদবির জন্য হামলা-মামলা-হত্যা দেখেছেন। রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার শিকার হয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থেকে ইউরোপের জীবন আর সামাজিক ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন।
অনেকেই মনে করেন, বিএনপির ৩১ দফায় ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার ছাপ আছে। এমনকি তারেক রহমানের ব্যবহার, চালচলন, বেশভূশা, বক্তব্য, শব্দচয়নে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
ফলে তাকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ যেমন ঊর্ধ্বগামী তেমনি হেরে যাওয়ার ভয়ও আছে। কারণ দেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা। সুবিধাবাদিতার আগ্রাসন। উগ্রবাদী রাজনীতির আস্ফালন। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান। বেকারত্ব, দুর্নীতি, সীমিত সম্পদ, রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতাসহ আরো অনেক উদ্বেগ ঘিরে আছে বাংলাদেশকে।
৯.
দেশে ফেরার পর থেকে তিনি বিপুল সমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষী পরিবেষ্টিত হলেও, আদতে তাকে একজন নিঃসঙ্গ মানুষই মনে হচ্ছে। চারপাশে বিপুল জনরাশি, কিন্তু বন্ধুহীন একলব্য। দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে তার সম্পর্ক কতটা মসৃণ তা এখনো পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। তবে, বিএনপির রাজনীতি করতে হলে তারেক রহমানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ছাড়া গত্যন্তর নেই। তারেক রহমান বিএনপিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রথম ও প্রধান নেতা। ফলে, তরুণ নেতাদের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব খুব স্বাভাবিক। তার চারপাশে যারা আছেন, তাদের দিকে তাকালেই এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও, মাঠের নেতা কর্মীরাই আসল এবং দলের প্রধান সম্পদ।
দেশ এখন যে ধরনের ট্রানজিশন এবং রাজনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়া যে কারো জন্যই ভীষণ কঠিন। তবে দলীয় ঐক্য, ক্ষমার রাজনীতি, দেশ ও জনগণের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকলে যে কোনো সংকট মোকাবিলা করা সহজ। দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা ও সংকট চলছে, তা বিরাট সুযোগও এনে দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। এই সুযোগ পারিবারিক ও রাজনৈতিক লিগ্যাসিকে অতিক্রম করার। রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এবং বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার।
১০.
নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক তাসনিম খলিল বলছিলেন, “তিনি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। যাদের নাম, পোর্টফোলিওর ভারই বিশাল। এমনিতেই বড় সন্তানের ওপর বিশাল চাপ থাকে। তারেক রহমানের জন্য তার যে লিগ্যাসি তা সারপ্লাস করা কঠিন। বেগম জিয়ার জানাজায় বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফলে তারেক রহমানের সামনে তার পারিবারিক লিগ্যাসি বিরাট একটা বিষয়। এটাকে ছাড়িয়ে যেতে হলে তাকে নেতা নয়, রাষ্ট্রনায়ক বা স্টেটসম্যান হতে হবে। সেটা তিনি পারবেন কি না ভবিষ্যৎ বলবে।”
তারেক রহমানের পুরো জীবন নানা উত্থান-পতন, ষড়যন্ত্র, প্রোপাগান্ডা, নির্বাসন, রাজকীয় প্রত্যাবর্তন, স্বজন হারানোর বেদনাসহ নানা উপাদানে ভরপুর। তাসনীম খলিল বলেন, শেখ হাসিনার জীবনও তাকে কম শিক্ষা এবং সুযোগ দেয়নি। কিন্তু তিনি কী করেছেন ইটস বিকেইম অ্যা পয়েন্ট। উনি কোনটা পেরেছেন, প্রতিশোধ পরায়ণতার শিক্ষা নিয়েছেন।”
কিন্তু তারেক রহমানকে অনেকেই বাংলাদেশ নামক জাহাজের ক্যাপ্টেন বিবেচনা করছেন। যার ওপর বাজি ধরছে বিএনপিসহ বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী। তাসনিম খলিল বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, নিঃসঙ্গ নাবিক যখন একা সমুদ্রাভিযানে যায়, তখন কেউ দ্বীপ, কেউ দেশ আবিষ্কার করে। আবার কেউ জলদস্যু হয়ে ওঠে। আমি তারেক রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, আমি প্রত্যাশা করি, উনি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা করবেন। প্রতিশোধপরায়ণ নেতা নয়, স্টেটসম্যান হয়ে উঠবেন।”
তারেক রহমান সন্দেহাতীতভাবে এ সময়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। একই সাথে ভালনারেবলও। ১২ তারিখের ভোটেই প্রমাণিত হবে, তিনি ক্যাপ্টেন হবেন বিএনপি নামক জাহাজের না কি দেশের? দল জিতুক বা হারুক তারেক রহমানের কাঁধে এ মুহূর্তে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার তাগিদ। বেশিসংখ্যক ভোটারদের কেন্দ্রে টেনে আনা, বিরোধীদের আস্থায় নিয়ে তাদের জন্য স্পেস তৈরি করা এবং বাংলাদেশকে একটি মধ্যপন্থী কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র বানানোর দায় তারই।
গত ৯ই ফেব্রুয়ারি বিটিভিতে দেওয়া এক ভাষণে তারেক রহমান এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা শুনিয়েছেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে।
“অতীতে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।”
তারেক রহমান আরো বলেন, “অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারো আমি আপনাদের সমর্থন চাই।”
জনপ্রত্যাশা হচ্ছে, জনকল্যাণে তার বাবা-মাকে ছাড়িয়ে যাবেন তারেক রহমান। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন নতুন প্রজন্মের দিকপাল হিসাবে।
আহরার হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক, আলাপ