কী বার্তা দিচ্ছে শীর্ষ নেতাদের হলফনামা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হলফনামা জমা দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। আলোচিত দলীয় প্রধানের মধ্য থেকে তারেক রহমান, শফিকুর রহমান, নাহিদ ইসলাম, জিএম কাদের, নুরুল হকের হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে আলাপ। যেখানে উঠে এসেছে তথ্যের ঘাটতিসহ নানান ইস্যু।

কী বার্তা দিচ্ছে শীর্ষ নেতাদের হলফনামা? প্রশ্ন উঠেছে হলফনামা কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা? নাকি প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা আছে? প্রার্থীরাই বা হলফনামাকে কতটা গুরুত্ব দেন? এসব নিয়ে বিশ্লেষকরাই বা কি বলছেন? 

তারেক রহমান: সম্পদের বর্তমান মূল্য অজানা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার হলফনামায় স্থাবর সম্পদ ক্যাটাগরিতে নিজের নামে গাজীপুর, কক্সবাজার এবং বগুড়ায় ২ একরের কিছু বেশি অকৃষি জমি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
যার ক্রয় মূল্য উল্লেখ করেছেন ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি ২.৯ শতাংশ জমির ওপর রয়েছে একটি ভবন। যা তিনি উপহার পেয়েছেন।
এছাড়া যৌথ মালিকানায় তারেক রহমানের রয়েছে ১১১.২৫ শতাংশ জমি এবং ৮০০ বর্গ ফুটের একটি দোতলা ভবন। 
তার এসব সম্পদের কোনোটিরই বর্তমান আনুমানিক মূল্য উল্লেখ করেননি। হলফনামার ওই ঘরটিতে তিনি লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নহে’।
তারেক রহমানের হলফনামায় জমির বর্তমান মূল্য না থাকার বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি।
আলাপকে তিনি বলেন, “জমির কেনা মূল্য বলা থাকলে তা থেকে আপনি আজকের মূল্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। তা ছাড়া জমি বিক্রয় না হওয়া পর্যন্ত এর মূল্য ঠিক করা কঠিন।”
এখন প্রশ্ন করাই যেতে পারে তাহলে হলফনামায় ‘বর্তমান আনুমানিক মূল্য’ এই ঘরটি নির্বাচন কমিশন কেন রেখেছে? আর অন্য যারা নিজেদের সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য সম্পর্কে জানিয়েছেন তারা কেন এ তথ্য দিবেন?
জমির বর্তমান মূল্য জানা কঠিন, জেসমিন টুলির এই কথার সঙ্গে একমত হলেও নতুন গণমাধ্যম চর্চা’র উপদেষ্টা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার হলফনামায় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সামনে এনেছেন নীতি নৈতিকতার প্রসঙ্গটি।
তিনি আলাপকে করেন, “জমির বর্তমান মূল্য কীভাবে চ্যালেঞ্জ করবেন? সেটা যদি দান বা উপহার হয় তবে তা ঠিক করা আরও কঠিন। আসলে হলফনামার বড় অংশই নীতি নৈতিকতার।”

ডাক্তার শফিকুর রহমান: আয় করেন কৃষি আর দান থেকে

ঢাকা-১৫ আসন (মিরপুরের একাংশ ও কাফরুল) থেকে নির্বাচন করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি যে হলফনামা জমা দিয়েছেন সেখানে নিজের পেশা চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন। 
ডাক্তার শফিকুর রহমান সবশেষ করবর্ষে তার আয় দেখিয়েছেন ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যার মধ্যে ৩ লাখ টাকা আয় হয়েছে কৃষিখাত থেকে আর বাকি ৬০ হাজার টাকা এসেছে দান থেকে। 
অর্থাৎ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমিরের পেশ করা হলফনামা অনুযায়ী তার মাসিক আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা। 
যদিও হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তার। এর মধ্যে নগদ অর্থের পরিমাণ ৬০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
তবে, নির্বাচনের জন্য তিনি খরচ করবেন ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজ তহবিল থেকে ১০ লাখ আর বাকি ২৫ লাখ টাকা নেবেন নিজের দলীয় তহবিল থেকে। 

নাহিদ ইসলাম: নিজের খরচ ১ লাখ, ক্রাউড ফান্ডিং ৪৪ লাখ

জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম আগামী নির্বাচনে খরচ করবেন ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবেন ১ লাখ টাকা। বাকী টাকা আসবে ৪৪ লাখ টাকা আসবে ক্রাউড ফান্ডিং বা গণচাঁদা থেকে। 
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান যেখানে বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা, সেখানে নাহিদ ইসলাম তার গত বছরের আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ টাকা। যে টাকার পুরোটাই ‘পরামর্শক’ হিসেবে তিনি আয় করেছেন। 
হলফনামা অনুযায়ী, বর্তমানে তার সম্পদের আনুমানিক মূল্য ত্রিশ লাখ টাকা। এছাড়া তার স্ত্রীর নামে ১৫ লাখ টাকার সম্পদ আছে।

জিএম কাদের: এমপি হিসাবে ৮০ শতাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বা জিএম কাদের এর আগেও একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন।
হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন, ভোটারদের তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন তার ৮০ শতাংশই পূরণ করেছেন।
‘পূর্ববর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত হইবার আগে ভোটারদের কাছে করা আমার প্রতিশ্রুতি এবং পূরণকৃত প্রতিশ্রুতির বিবরণ’ এই অংশটি কীভাবে বিচার করা সম্ভব? একজন সংসদ সদস্য কতটুকু তার ওয়াদার কতটুকু পূরণ করেছেন তাই বা একজন রিটানিং কর্মকর্তা কীভাবে বিচার করবেন?
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি মনে করেন, “একজন প্রার্থী ভোটের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন করেছেন তা বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই নির্বাচন কমিশনের। এটা বিবেচনা করবেন ওই এলাকার ভোটাররা।” 

নুরুল হক নুর: সোনা নেই, তবে প্রায় কোটিপতি ব্যবসায়ী

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি মোঃ নুরুল হক নুর নির্বাচনি হলফনামায় নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ী হিসাবে। 
তার বার্ষিক আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা। এই আয়ের মধ্যে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৬ টাকা আসে ব্যাবসা থেকে। বাকি টাকাটা অন্যান্য খাত থেকে আয় দেখিয়েছেন নুরুল হক নুর।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৫১২ টাকা আয়কর দেওয়া নুর, আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ৯০ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬১ টাকার।
যদিও তার হলফনামায় কোনো স্বর্ণালংকার নেই বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। 

হলফনামা গুরুত্বপূর্ণ নাকি আনুষ্ঠানিকতা

সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংবলিত 'হলফনামা' একটি শক্তিশালী দলিল। 
২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে প্রার্থীদের এসব তথ্য সংগ্রহ ও তা জনসমক্ষে প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
তখন হলফনামায় প্রার্থীর বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, সম্পদ, মামলাসহ ৮ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
তবে আগামী সংসদ নির্বাচনে আয়করের সর্বশেষ তথ্য ও নির্ভরশীলদের পেশার তালিকা যোগ করে ১০ ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ ছাড়া সম্পদের তথ্যে বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রায় দুই দশক আগে হলফনামা জমা দেওয়ার রীতি চালু হলেও বিষয়টি এখনো কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমিত বলে মনে করছেন সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার।
তিনি বলেন, “হলফনামায় কি রয়েছে, প্রার্থী নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে তার খুব একটা গুরুত্ব আছে- এমনটা আমার মনে হয় না। গণমাধ্যম বা কিছু মানুষ হয়ত এ নিয়ে ভাবেন কিন্তু বেশিরভাগের কাছেই এর তেমন গুরুত্ব নেই। হলফনামা কেবল একটি নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রয়ে গেছে। যা মূলত প্রার্থীদের নীতি নৈতিকতা তুলে ধরে।”
এ কারণে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হলফনামা নিয়ে সচেতন থাকলেও নির্বাচনি এলাকার ভোটার বা প্রান্তিক এলাকার প্রার্থীরা এ নিয়ে খুব একটা ভাবেন বলে তিনি মনে করেন না।
যদিও শাকিল আনোয়ারের সাথে একমত নন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি।
তিনি মনে করেন, “কেউ যখন নোটারি পাবলিক করে কোনো ঘোষণা দিচ্ছেন আমরা ধরে নিতে পারি তিনি দায়িত্ব নিয়েই সেটা দিচ্ছেন। কারণ তথ্য গোপন করা হলে বা ভুল তথ্য দিলে মনোনয়ন বাছাই প্রক্রিয়ায় তা বাদ পড়বে। সেটা না হলেও অন্য কেউ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারে। কিংবা অভিযোগ না উঠলেও, যদি পরেও (কোনো সময়) জানা যায় প্রার্থী ভুল তথ্য দিয়েছেন বা তথ্য গোপন করেছেন তখনও নির্বাচন বাতিল হতে পারে। তাই এটাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।”
তা ছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে হলফনামা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি পোস্টার বা অন্যান্য প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 
২০১০ এর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বপালনের সময় জেসমিন টুলি প্রার্থীদের হলফনামা প্রচারের জন্য বেছে নিয়ে ছিলেন পোস্টার।