ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংবাদ সম্মেলনের পর রবিবার ফের উত্তাল শাহবাগ। শরিফ ওসমান বিন হাদির খুনিদের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে সর্বাত্মক অবরোধ শুরু করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
রবিবার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানান, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিনই ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় হত্যাকারী শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ দাউদ ওরফে রাহুল এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক মো. আলমগীর শেখ।
জানানো হয়, মূল দুই আসামি ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা শহরে পৌঁছান।
ডিএমপি আরও জানায়, মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করে তারা জেনেছেন, আসামিদের পালাতে সহায়তাকারী পুত্তি ও সামি সেখানে গ্রেফতার হয়েছে। তবে মূল আসামিদের গ্রেফতারের ব্যাপারে কোনো আপডেট দিতে পারেনি ডিএমপি।
এরপর থেকে শাহবাগ ফের উত্তাল হয়ে ওঠে। রবিবার থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে।
আগের দিনই ডাক দেওয়া হয়েছিল বিভাগীয় শহরগুলোতে ‘সর্বাত্মক অবরোধ’ কর্মসূচির। রবিবার থেকে বাংলাদেশের বিভাগীয় শহর গুলোতে অবরোধের এই ডাক দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ জানায়, ডিএমপি কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন পর্যালোচনার পর দুপুর ২টা থেকে ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে তারা।
এদিকে আন্দোলনের স্থানগুলোতে দেখা দিচ্ছে জনদুর্ভোগ। বিশেষ করে শাহবাগ ঘিরে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট।
যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচারে সরকার বদ্ধপরিকর। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলেও রবিবার জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “এই মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সবকিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই হাদি হত্যার বিচার হবে।”
শাহবাগে হাদি হত্যার প্রতিবাদ
আন্দোলনের ভেন্যু হিসেবে বরাবরই বেছে নেয়া হয় শাহবাগকে। হাদি হত্যার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের এই অবরোধের শুরুও হয়েছিল এখান থেকেই।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয় ২৬এ ডিসেম্বর থেকে। যদিও হাদির মৃত্যুর সংবাদ আসার পর থেকেই শাহবাগে জমাট বাঁধতে শুরু করে আন্দোলন। যে আন্দোলনের রেশ ধরে হওয়া সহিংসতায় পুড়ে যায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার।
এদিকে হাদির খুনিদের শনাক্ত করা গেলেও তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার ফলে প্রতিদিন বাড়ছে আন্দোলনের ব্যাপ্তি।
রবিবার সকাল থেকেই শাহবাগ এলাকা ফের উত্তাল। ডিএমপির সংবাদ সম্মেলনের পর তা আরও বেগ পায় ।
এ সময় তারা স্লোগান দেন “আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে”; “দিয়েছিতো রক্ত, আরও দেবো রক্ত”; “রক্তের বণ্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”; “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”।
ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় সদস্য নাঈম ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রশাসনের বক্তব্য ‘আইওয়াশ’ ছাড়া কিছু নয়। তারা সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছে। যেদিন গুলি হয়েছে, সেদিনই জড়িতদের ধরা যেত। কে কাকে চাপ দিচ্ছে, সরকারকে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। তারা বলছে কয়েকজনকে ধরা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত খুনিকে অবশ্যই ধরতে হবে।”
কর্মসূচি অনুযায়ী রবিবার দুপুর ২টা থেকে অবরোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে সকাল ১১টার মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ মোড়ে আসতে শুরু করেন। তারা মোড়ের পাশে সড়কে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে।
এর আগে শনিবার পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও এবং ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলতে শাহবাগে যান। সেখানে তারা বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীরা খুনিরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়তে নারাজ বলে জানিয়ে দেন।
ঢাকার বাইরে অবরোধ
ওসমান হাদির হত্যাকারীসহ জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার চেয়ে শুক্রবার থেকে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখা হয়েছে। মাঝে তারেক রহমানের জন্য কিছুক্ষণের জন্য এবং পরে শনিবার রাতে অবরোধ কর্মসূচি শিথিল করা হয়। রবিবার সকাল থেকেই শাহবাগ বন্দি ইনকিলাব মঞ্চের ‘অবরোধ’ ঘেরাটোপে।
শনিবার দুপুরের পর থেকে থেকে চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মার্কেটে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা।
নিজেদের দাবির পক্ষে জনমত তৈরি এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে শনিবার রাতে নতুন ঘোষণা আসে।
শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের শাহবাগ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই সময় তিনি রবিবার বেলা ১১টা থেকে অবরোধ শুরু হবে বলে জানান। তবে ঘণ্টা খানেক পর কর্মসূচিতে কিছুটা বদল আনে সংগঠনটি।
ফেসবুকে পোস্টে সংগঠনটি জানায়, শনিবার রাতের বাকি সময়ের অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। শাহবাগে রাতে আর কেউ অবস্থান করতে পারবে না।
এতে বলা হয়, “আগামীকাল (রবিবার) ডিএমপি কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন পর্যালোচনার পর দুপুর ২টা থেকে ঢাকাসহ ৮ বিভাগে অবরোধ কর্মসূচি চলবে।”
রবিবার দুপুর ১টায় ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে ‘সর্বাত্মক অবরোধ ’ কর্মসূচির স্থানগুলো জানানো হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেইছে জানানো হয়, ‘সর্বাত্মক অবরোধ ’ এর জন্য সিলেটের চৌহাট্টা পয়েন্ট, রংপুরের শহিদ হাদিচত্ত্বর (ডিসির মোড়), বরিশালের নথুল্লাবাদ, চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ, কুমিল্লার পূবালী চত্বর, কান্দিরপাড় নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে এই কর্মসূচি কোথায় পালিত হবে তার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
আন্দোলনে সংহতি
শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবিতে আন্দোলনরত ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
শনিবার রাতে এনসিপির দফতর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার সই করা এক বার্তায় এই সংহতি জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, “প্রকাশ্য সহিংস হত্যাকাণ্ডের পরও অপরাধীদের ধরতে না পারা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বিলম্ব বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই আরও গভীর করছে, যা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও অনাস্থা সৃষ্টি করছে এবং রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি।”
যদিও হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে এর আগে ১৮ই ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে শাহবাগে অবস্থানরত জনতার সঙ্গে যোগ দিয়ে ছিলেন এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
বিক্ষোভের কারণ
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে এই বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করা হচ্ছে। হাদি গত ১২ই ডিসেম্বর বিজয় নগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন। ১৮ই ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
শনিবার রাতে ডিএমপি কমিশনার জানিয়ে ছিলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সরকার, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে মাঠে নামানো হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক জব্দ করেছে পুলিশ।
তবে শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ (ওরফে দাউদ, ওরফে রাহুল) এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা গেলেও ঘটনার ১৬ দিন পরেও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকায় জনভোগান্তি
রবিবার বেলা দুইটার পর ইনকিলাব মঞ্চ শাহবাগ মোড় বন্ধ করে দেয়। এতে শাহবাগ দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে অবরোধের ফলে শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাব, কারওয়ান বাজার এবং মৎস্য ভবন অভিমুখী রাস্তাগুলোতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা পড়ছেন ভোগান্তিতে।
ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ঘিরে শাহবাগ এলাকায় ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।