তারেক রহমান: শৈশব, রাজনীতি, উত্থান, নির্বাসন, প্রত‍্যাবর্তন

রাজনীতির সঙ্গে যোগসূত্র একেবারে ছোটবেলা থেকে, পারিবারিক পরিমণ্ডলের নিবিড় আবহে, তাই চাইলেই সেখান থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। 

আনুষ্ঠানিকভাবে অনেকটা ‘বড় পরিসরে’ রাজনীতির মাঠে তার যখন আগমন ঘটে, তখন নেতাকর্মী-অনুসারীরা তাকে ডাকতেন ‘ভাইয়া’ বলে।

সেই ‘ভাইয়া’ দেড় যুগ নির্বাসনের পর স্বদেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে, লাখো লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে। তার ফেরা নিয়ে রাজনীতিতে রীতিমতো উন্মাদনা।

প্রায় ১৯ বছর হলো বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতার বাইরে, দমন-পীড়নের শিকার। পাঁচই অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে নতুন করে দেশের রাজনীতির শীর্ষ মঞ্চে ফেরার স্বপ্ন দেখছে দলটি।

ডি ফ্যাক্টো নেতা তারেক রহমানের দেশে ফেরার মধ্যে দিয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আরোহণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার কাছাকাছি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে থাকার সময়েও সার্বক্ষণিক সংযুক্ত ছিলেন দলের সঙ্গে, নেতাকর্মীদের পাশে। দূরে থেকে দুর্দিনে তাদের সাহস দিয়েছেন, দিয়েছেন দিকনির্দেশনা অভিভাবকের মতো। পথ দেখিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

বিএনপিকে ১৭ বছর ধরে ভেঙে চুরমার করে ফেলার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে ততই উপযুক্ত হয়ে উঠেছেন তারেক রহমান, তার দক্ষ নেতৃত্বে সেই বিএনপিই এখন ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে।

অনেকেই মনে করেন, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির ভোটে জয়লাভের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতা হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি এখন বিএনপির যেমন কাণ্ডারি, সম্ভবত বাংলাদেশেরও ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কীভাবে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছালেন বাংলাদেশের পাওয়ার কাপল, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে? এটা কি স্রেফ রাজার ছেলে রাজা হওয়ার ব্যাপার? নাকি কণ্টকাকীর্ণ সুদীর্ঘ এক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে?

সেই সম্মেলনের পর তারেক রহমান অন্যান্য জেলা ইউনিটেও গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহ দেন।

শৈশব থেকে রাজনীতি

বিএনপির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে তারেক রহমানের জন্ম ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন সেইন্ট জোসেফ স্কুল, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ও কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এমন এক পরিবারে জন্ম তারেক রহমানের যেখানে রাজনীতি ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ। বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। আর মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী।

ফলে শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন ক্ষমতা, সংকট, রাষ্ট্র পরিচালনার চাপ এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার কঠিন বাস্তবতা।

তারেক রহমানের শৈশব কেটেছে সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে। রাষ্ট্রপতি পিতার শাসনামল, এরপর আকস্মিক হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনা তার মানসিক গঠনে গভীর ছাপ ফেলে। খুব অল্প বয়সেই তিনি উপলব্ধি করেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়। এটি ঝুঁকি, ত্যাগ এবং ব্যক্তিগত মূল্য চোকানোর উপাখ্যানও।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে মর্মান্তিক এক ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামে হত্যা করা হয়।

বাবাকে হারিয়ে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন কম বয়সি দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। মা বেগম খালেদা জিয়া তখনো রাজনীতিতে আসেননি।

দুই সন্তান কীভাবে বেড়ে উঠবে? নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত তাদের মা। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়ার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য সাংবাদিক ফজলে লোহানী।

সেই সাক্ষাৎকারে জিয়া পরিবারের সাদামাটা জীবনযাপনের চিত্র ফুটে ওঠে। কিশোর তারেক বলেন, তিনি বাবার ব্যবহার করা শার্ট পরে আছেন। আর কোকো যে প্যান্ট পরে আছেন সেটিও তার বাবার, কেটে ছোট করা হয়েছে।

বিএনপির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় ১৯৮৮ সালে। এসময় তিনি পৈতৃক নিবাস বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সদস্য হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে দেখা গেছে তারেক রহমানকে। এরপর আসে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ তখন।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এক দশক কঠিন সময় পার করতে হয়েছিল বিএনপিকে। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয় কয়েকবার। দল ভাঙার চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। তাই ১৯৯১ সালের ভোট ছিল দলের জন্য একটা লিটমাস টেস্ট।

ওই নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রার্থী হন। বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি প্রচার সভাগুলোতে মায়ের সঙ্গে তারেক রহমানকে দেখা যেতে থাকে। খালেদা জিয়া সবগুলো আসনে জয়লাভ করেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড গড়েন খালেদা জিয়া।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দল গোছানোর কাজ চালাতে থাকেন তারেক রহমান। সে সময় বগুড়া জেলা ইউনিট একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনের পেছনের মূল ব্যক্তিটি ছিলেন তারেক রহমান - তিনি সিদ্ধান্ত দেন, বগুড়ায় বিএনপির নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হবে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে।

সেই সম্মেলনের পর তারেক রহমান অন্যান্য জেলা ইউনিটেও গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহিত করতে শুরু করেন।

ডাক্তারি পাশ করার পর এক সময় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারেও যোগ দিয়েছিলেন জুবাইদা। ১৯৯৫ সালে তারেক-জুবাইদা দম্পতির কোল আলো করে আসে তাদের একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান।

তারেক রহমানের বিয়ে

১৯৯৪ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের বিয়ে হয় অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে জুবাইদা খানের সঙ্গে। 

মাহবুব আলী খান ছিলেন বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান। এইচএম এরশাদের আমলে ছিলেন মন্ত্রীও।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন; পোস্টিং ছিল করাচিতে। বাঙালি পরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতি তার আনুগত্য দেখে পাকিস্তান সরকার পরিবারসহ মাহবুব খানকে গৃহবন্দি করে রাখে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও, প্রায় দুই বছর পাকিস্তানে গৃহবন্দি ছিলেন তিনি। পরে দেশে ফেরেন এবং নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পান।

মাহবুব খানের স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু সমাজসেবার জন্য প্রশংসিত। জাতীয় জীবনে অবদানের জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

এই দম্পতির সন্তান জুবাইদার বিয়ে হয় তারেক রহমানের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি পরিচিত হতে থাকেন ডা. জুবাইদা রহমান নামে।

ডাক্তারি পাশ করার পর এক সময় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারেও যোগ দিয়েছিলেন জুবাইদা। ১৯৯৫ সালে তারেক-জুবাইদা দম্পতির কোল আলো করে আসে তাদের একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান।

জাইমা এখন তরুণী, একজন ব‍্যারিস্টার।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রধান বিরোধীদল হয় বিএনপি। তখন কেন্দ্রীয় কোনো পদে না থাকলেও দল গোছানোর কাজ চালিয়ে যান তারেক রহমান।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। এই নির্বাচনের প্রচার ও সাংগঠনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের কেন্দ্রীয় কাঠামোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন তারেক রহমান।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও বিতর্ক

ছাত্ররাজনীতির প্রচলিত পথ ধরে নয়, তারেক রহমানের রাজনীতিতে প্রবেশ ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলের ভেতরে সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য আলাদাভাবে নজরে আসতে শুরু করেন তিনি।

তৃণমূলকে শক্তিশালী করা, জেলা ও থানা পর্যায়ে দল পুনর্গঠন - এসব কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। সাংগঠনিক কার্যক্রম দ্রুত তাকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাতারে নিয়ে আসে।

অনেকের কাছে তিনি পরিচিত হতে থাকেন, দলের ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্রেইন’ হিসেবে, যিনি নীরবে দল গঠনের ছক কষতেন, মাঠের রাজনীতিকে সাজাতেন ভেতর থেকে।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করেন, যেখান থেকে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসনের উপর গবেষণা করা হতো। সেখানে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতেন। লক্ষ্য ছিল দলের তৃণমূলকে ক্ষমতায়িত করা।

ঢাকার বনানীর যে ভবনটিতে এই অফিস ছিল, সেটির নাম ছিল হাওয়া ভবন। পরে নানাভাবে আলোচনায় এসেছে এই ভবন।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের কেন্দ্রীয় কাঠামোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। ২০০২ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক দায়িত্ব পান।

২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন। পরবর্তী এক বছরেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি বড় শহর সফর করেন তিনি। তার সেই অফিস হাওয়া ভবন বিএনপিকে নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

ওই সময়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সাথে মতবিনিময় করেন। সেসময় এই সম্মেলনের নিবন্ধনকারীদের অন্তত ১৮ হাজার চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন তারেক রহমান। এই সময়েই অনেকেই তারেকের মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ছায়া দেখতে শুরু করেন।

দলীয় কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপরিচালনার কেন্দ্রেও তার প্রভাব বাড়ছিল সমান্তরাল গতিতে। রাজনীতিতে উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমান পরিণত হয়ে উঠছিলেন ক্ষমতা, প্রভাব ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।

এটি তাকে একদিকে যেমন শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে বিতর্কিতও করে তুলছিল। সমর্থকরা মনে করেন, তারেক রহমান দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছিলেন।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, ওই সময়েই তাকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্কেরও সূত্রপাত হয়। খালেদা জিয়া যদিও প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন। কিন্তু অনেকেই তখন তারেক রহমানকে দেখছিলেন সমান্তরাল আরেকটি ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসেবে। সমালোচকদের মতে, তারেকের এই ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটি ছিলো তার বনানীর কার্যালয় হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক।

২০০৭ সালের ৭ই মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে।

ওয়ান ইলেভেন, নির্যাতন ও প্রবাস জীবন

বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হলো ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি। ওইদিন সন্ধ্যায় ক্ষমতা নেয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর সেই ঘটনা পরে পরিচিত হয় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে।

নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার প্রথম দুই মাসে দেড়শো' জনের বেশি রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তখনকার রাজনীতির প্রধান দুই নেতা খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে।

২০০৭ সালের ৭ই মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে।

পুলিশের গাড়িতে ওঠানোর আগে তারেক রহমান সেই রাতে বলেছিলেন, “ওরা আমাকে নিতে এসেছে। আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার জন্যে দোয়া করবেন।”

তারেক রহমানকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল র‍্যাব লেখা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট আর মাথায় হেলমেট পরিয়ে। তাকে নেওয়া হয় রিমান্ডে।

ওই সময়ে মাঝে মাঝেই পত্রিকায় খবর আসতো, তারেক রহমানকে রিমান্ডে নির্যাতন করা হচ্ছে। আঠারো মাস পর যখন জামিনে মুক্তি পান, তখন তিনি হাসপাতালের প্রিজন সেলে। হাঁটতে পারেন না।

মা খালেদা জিয়া তারেককে দেখতে যান শাহবাগের পিজি হাসপাতালে। সেখানে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মুক্তি পাওয়ার চারদিন পর ১১ই সেপ্টেম্বর হুইলচেয়ারে চড়ে কাঁদতে কাঁদতে লন্ডনগামী উড়োজাহাজে উঠেছিলেন তারেক।

তারেক রহমানকে কী পরিমাণ নির্যাতন করা হয়েছিল? 

ওই সময় অনেক পত্রিকাতেই ছাপা হয় আদালতে দেয়া জবানবন্দি। 

আদালতে দেওয়া তারেক রহমানের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাতে লেখা হয়, “রিমান্ডের সময় আমাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই হাত ও চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল… আমাকে বেঁধে রুমের ছাদের সাথে ঝুলিয়ে আবার ফেলে দেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।”

রিমান্ডের সময় নির্যাতনে তারেক রহমানের শারীরিক অবস্থা কতটা ভয়াবহ হয়েছিল, সেই আভাস পাওয়া যায় চিকিৎসকদের একটি মেডিকেল রিপোর্টে।

ওই রিপোর্টে বলা হয়, নির্যাতনে তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের ছয় ও সাত নম্বর হাড় ভেঙে গেছে এবং আরও কয়েকটি হাড় বেঁকে গেছে।

ছোট ভাইয়ের মৃতদেহটিকেও শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পেলেন না বড় ভাই। বাংলাদেশের রাজনীতি তখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিহিংসাই যেন সব; আবেগ অনুভূতির সেখানে কোনও মূল্য যেন নেই।

আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে বাধার মুখে পড়েন

১১ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার পর টানা ১৭ বছরের বেশি সেখানেই কাটাতে হলো তাকে। মা, ভাই পরিবার থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে।

এরমধ্যে বিদেশে অকালে মৃত্যুবরণ করে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো। ভাইটিকেও শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পেলেন না।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। বিএনপি হয় বিরোধীদল। নতুন করে শুরু হয় চার বছর আগের শেখ হাসিনার ওপর চালানো একটি গ্রেনেড হামলার তদন্ত।

এর আগে দুইবারের তদন্তে এই হামলার সাথে তারেকের কোনো যোগসাজশ পাওয়া না গেলেও এবারের তদন্তে তাকেসহ বিগত সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কয়েকজন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও পুলিশের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম যুক্ত হয়।

দীর্ঘ বিচার শেষে এই মামলার যে রায় আসে, সেখানে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারেক রহমান ও বিএনপি এই মামলার রায়কে বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অভিহিত করে এসেছে। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের দেশে ফেরাটা ক্রমেই সুদূর পরাহত হতে থাকে।

২০১৫ সালের ২৪এ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে নির্বাসিত অবস্থায় অকাল মৃত্যুবরণ করেন তারেকের ছোট ভাই কোকো; তারেক তখন লন্ডনে। মা ঢাকায়, সরকারের রোষে পড়ে বাসভবন হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গুলশানের একটি ভবনে। সেখানে মাঝে মাঝেই পুলিশ দিয়ে, বালিভর্তি ট্রাক ফেলে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় তাকে।

ছোট ভাইয়ের মৃতদেহটিকেও শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পেলেন না বড় ভাই। বাংলাদেশের রাজনীতি তখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিহিংসাই যেন সব; আবেগ অনুভূতির সেখানে কোনও মূল্য যেন নেই।

তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার দেখা প্রায় আট বছর পর গেল জানুয়ারি মাসে; শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তখন লন্ডন গিয়েছিলেন।

মায়ের সঙ্গে দেখা

২০০৮ সালে এক বৈরী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। এরপর আর কখনোই মায়ের সঙ্গে একসঙ্গে দেখা হয়নি দুই ভাইয়ের।

তারেক রহমানের মাথার ওপর তখন অসংখ্য মামলা ও পরোয়ানা। রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে লন্ডনে। আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধেও ছিল একাধিক মামলা ও দণ্ডাদেশ।

মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরলেও সুদূর ইউরোপে বসে অশ্রু বিসর্জন করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না তারেক রহমানের।

২০১১ সালের ১৪ই মে লন্ডন যান খালেদা জিয়া। দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম দেখা হয় মায়ের সঙ্গে।

দ্বিতীয়বার দেখা হয় দুবাই এয়ারপোর্টে ২০১৪ সালের ২০এ জুলাইয়ে; খালেদা জিয়া ওমরাহ পালনের জন্য মক্কা যাচ্ছিলেন। মায়ের সাথে দেখা করতে লন্ডন থেকে দুবাই আসেন তারেক। সেখান থেকে মা-ছেলে একসঙ্গে ওমরাহ করতে যান।

পরের বছর লন্ডনে আবার মায়ের সাথে দেখা হয় তারেকের। কোকো মারা যাওয়ার পর বড় ছেলের সাথে সেটাই প্রথম সাক্ষাৎ খালেদা জিয়ার।

পরেরবার ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবারও দেখা হয়, সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে। দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার আগে ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান তারেক রহমান।

এরপর দীর্ঘদিন দেখা হয়নি। কারণ খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাবন্দি করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। 

তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার দেখা প্রায় আট বছর পর গেল জানুয়ারি মাসে; শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তখন লন্ডন গিয়েছিলেন।

দেড় যুগের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা মানে শুধু বাড়ি ফেরা নয়, রাজনৈতিক অধ্যায়ের এক নতুন সূচনা এটি।

নতুন আশা, নতুন চ্যালেঞ্জ

চব্বিশের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের।

এই পতনের সঙ্গে সঙ্গেই খালেদা জিয়াও বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। তারেক রহমানও অভিযোগগুলো থেকে একে একে নিষ্কৃতি পেতে থাকেন। কিন্তু তার দেশে ফেরা নিয়ে শঙ্কা দূর হয় না।

গত ২৯শে নভেম্বর তারেক রহমান ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন। তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন।

তারেক রহমান কি মাকে শেষবারের মত দেখতে দেশে ফিরবেন,এই জল্পনা চলছে। আর তা দূর করেন তারেক রহমান নিজেই।

তিনি লেখে, “এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে কোনও সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।

“স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”

অবশ্য প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফ থেকে তারেক রহমানের দেশে আসতে বাধা নেই বলে উল্লেখ করে তাকে দেশে ফিরতে সহায়তা করার ও নিরাপত্তা দেবার আশ্বাস দেওয়া হয়।

এর কয়েকদিন পর বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করা হয় তারেক রহমানের দেশে ফেরার।

অবশেষে তিনি ফিরলেন, দেড়যুগ পর, এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে বিএনপির ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের ইতি ঘটবারও ষোলো মাস পর।

তারেক রহমান বিদেশে থাকায়, অনেকেই ভেবে নিয়েছিলেন- সেখানেই হয়ত তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি ঘটবে। কিন্তু তা হয়নি। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।

প্রবাসে থেকেও ধীরে ধীরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তারেক রহমান। ২০০৯ সালে হন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে যখন কারাবন্দি করা হয়, তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও দল পরিচালনার এক নতুন মডেল দাঁড় করান।

ডিজিটাল যোগাযোগ, ভার্চুয়াল সভা, কৌশলগত নির্দেশনা- তারেক রহমানের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বিএনপিতে বদলে যায় নেতৃত্বের ধরন।

প্রবাসজীবনে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষ্যেও পরিবর্তন আসে। আগের তুলনায় তিনি বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে।

তার বক্তৃতা ও লিখিত বার্তায় বারবার উঠে আসে - রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার কথা।

সমর্থকদের মতে, এই সময়েই তারেক রহমান একজন ‘পরিণত রাজনৈতিক নেতা’ হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন।

লন্ডনের নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমানের সাদামাটা জীবন - ছোট একটি কামরায়, ছোট একটি টেবিলে, আর সাধারণ একটি চেয়ারে বসে দলীয় কার্যক্রম চালানো - এই ছবি বহু মানুষকে আপ্লুত করেছে, উদ্দীপ্ত করেছে।

তারেক রহমানের পোষা বেড়াল জেবু, বা তার প্রাণীপ্রেম, সাধারণ মানুষের মতো বাসে ট্রেনে করে ঘুরে বেড়ানো - এসব কিছুর মাধ্যমে তার পিতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছাপ তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে পান তার অনুসারীরা।

তারেক রহমানের গল্প কোনো সরল সাফল্যের গল্প নয় - ক্ষমতাধর পরিবারের সমর্থন নিয়ে তরতর করে উন্নতির সোপান পার হওয়ার গল্প নয়। এটি উত্থান ও পতনের, বিতর্ক ও প্রত্যাশার, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের গল্প।

তিনি কারও কাছে আশার প্রতীক, কারও কাছে প্রশ্নবিদ্ধ এক নাম।

কিন্তু এ বিষয়ে দ্বিমত নেই যে, বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ কারও নেই।

দেড় যুগের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা মানে শুধু বাড়ি ফেরা নয়, রাজনৈতিক অধ্যায়ের এক নতুন সূচনা এটি। এই অধ্যায় এখন কীভাবে লেখা হবে, সেটি দেখার জন্য এখন শুরু হলো নতুন এক অপেক্ষার প্রহর।