ধরুন, আপনি এমন এক দেশে থাকেন, যেখানে ব্যবসায়ীদের রাজত্ব চলে। গুটিকয়েক ধনকুবের মিলে নীতিনির্ধারণ করে, দেশ চালায়, এবং নিজেদের বিত্তের ভাণ্ডার আরও বাড়ায়। সাধারণ বা দরিদ্র মানুষের রাষ্ট্রে অংশগ্রহণের জায়গা থাকে না। থাকে না সমাজে ওপরে ওঠার তেমন সুযোগ। সব সুবিধা যেন বরাদ্দ সেই হাতেগোনা ধনী ব্যক্তি ও তাদের কাছের মানুষদের জন্য। এমন ব্যবস্থাকে বলা হয় অলিগার্কি।
মানে, এ এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা থাকে ধনীদের হাতে, এবং ক্ষমতা ও আইনের কাঠামোতে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ থাকে অনুপস্থিত। প্রথমে শুনে এটিকে মধ্যযুগীয় কোনো রাজ্যের গল্প বা কাল্পনিক কোনো দূর দেশের কাহিনী মনে হতে পারে। তবে অলিগার্কির অস্তিত্ব যেমন ইতিহাসে আছে, তেমনি অনেকের মতে তা বর্তমানেও বিভিন্ন রূপে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আড়ালে লুকিয়ে আছে।
প্রশ্ন আসতে পারে, আধুনিক গণতন্ত্রে যখন সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করে, সেখানে অলিগার্কি কীভাবে থাকতে পারে? আধুনিক বিশ্বে যেসব বিত্তবানরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাস করে, এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে অনেক সময় বেআইনিভাবে নিজেদের বিত্ত বাড়ায়, এসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘অলিগার্ক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
একটা উদাহরণ ধরা যাক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী। মন্ত্রী হিসেবে বেতন থেকে তার বার্ষিক আয় ছিলো ১৩ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা। এখান থেকে তার মাসিক আয় ধরা যায় প্রায় ১,১০০ ডলার বা ১ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা। এই বেতন নিয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ছিলো যুক্তরাজ্যে ৩৬০টি বাড়ি, যার মধ্যে ৮৯টিই তিনি কিনেছিলেন ২০২৪ সালে। আল জাজিরার অনুসন্ধানী দলের সাংবাদিকদের গোপন ক্যামেরায় নেওয়া সাক্ষাৎকারে তাকে নিজের মুখেই তার এসব বাড়ি, বিত্ত ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক নিয়ে গর্ব করে বলতে শোনা যায়।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী একা নন। শেখ হাসিনার শাসনামলে দূর্নীতি, অর্থ পাচার ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ‘অলিগার্ক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ পরিবার ও ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এসব অপরাধের অভিযোগ তদন্তে দূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে ১১টি দল গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীণ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এক সাক্ষাৎকারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ‘অলিগার্ক’ বলে সম্বোধন করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ২০২৪ সালের নভেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “অলিগার্ক শ্রেণীকে না ভাঙলে কোনো সংস্কার সম্ভব না।”
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগেও এই শব্দচয়ন শোনা গেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সেই সময়ের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এক সম্মেলনে বলেন, “ব্যাংকিং খাতে অলিগার্কদের উত্থানের কারণে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অবনতি হয়েছে।” একই বছর বাংলাদেশ নিয়ে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে অর্থনীতির অবক্ষয়ের জন্য ‘রাজনৈতিক এলিটদের অলিগার্কি’কে দায় দেওয়া হয়।
এই অলিগার্কি কী, অলিগার্ক বলতে কাদের বোঝানো হয়, এবং কী কী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য থাকলে একজন ব্যক্তির নাম অলিগার্কদের খাতায় লেখানো হয়, তা বুঝতে হলে আমাদের আরেকটু পুরনো আলোচনায় যেতে হবে।
অলিগার্কি কী ও অলিগার্ক কারা?
অলিগার্কির কথা প্রথম বলেছিলেন গ্রিক দার্শনিকরা। বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো ও তার ছাত্র দার্শনিক অ্যারিস্টটল এর সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। প্লেটোর মতে অলিগার্কির উত্থান হয় শিক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং সুশীল সমাজের অবক্ষয়ের কারণে। সেখানে কায়েম হয় এমন এক ব্যবস্থা যেখানে বিত্তবানদের হাতে শাসনক্ষমতা থাকে এবং দরিদ্রদের সব ধরনের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়।
অ্যারিস্টটল অলিগার্কিকে বলেছিলেন গণতন্ত্রের বিপরীত ব্যবস্থা। কেননা গণতন্ত্রে শাসনের ক্ষমতা থাকার কথা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং দরিদ্রদের হাতে, যেখানে অলিগার্কিক ব্যবস্থায় তা থাকে অল্প কিছু ধনীর হাতে। তাদের জন্মভূমি অ্যাথেন্সেই প্রথম অলিগার্কি প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে স্পার্টার কাছে অ্যাথেন্স যুদ্ধে হারার পর সেখানে স্পার্টানরা ৩০ জন বিত্তবান ব্যক্তির একটি সংসদকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলো। ‘থার্টি টাইর্যান্টস’ নামে পরিচিত এই বিত্তবানরা অ্যাথেন্সের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিষ্ক্রিয় করে ফেলে, এবং তাদের শাসনামলে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।
এসব আলোচনার আলোকে বাংলাদেশকে দেখা যাক। অল্পসংখ্যক বিত্তবান মানুষের সরাসরি শাসন এখানে ছিলো না। তবে বিগত আমলে কিছু ধনকুবেরদের প্রভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অসদ্ব্যবহার করে তাদের বিত্ত বাড়ানোর দিক দিয়ে হয়তো গ্রিক দার্শনিকদের অলিগার্কির ধারণার সাথে বাংলাদেশকে মেলানো যায়।
তবে গ্রিক দার্শনিকদের আলোচনার দুই হাজারের বেশি বছর পর বাংলাদেশ প্রথম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না যেখানে অলিগার্কির অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে প্রথম অলিগার্কির আলোচনা এসেছিলো রাশিয়ায়। এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্র, উক্রেইন ও অন্যান্য দেশেও অলিগার্কি থাকার অভিযোগ এসেছে।
সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়ায় এবং নতুন বিশ্বে অলিগার্কি
১৯৯০ এর দশকে ‘অলিগার্ক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছিলো নতুন এক শ্রেণীর রুশ ব্যবসায়ীদের সাথে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ছিলো রাষ্ট্রের মালিকানাধীন। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, তেল ও গ্যাস ফিল্ড, মাইনিং প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের মালিক ছিলো রাষ্ট্র। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক কে হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নতুন রাশিয়ান সরকার একটি ‘প্রাইভেটাইজেশন প্রোগ্রাম’ বা বেসরকারিকরণ কর্মসূচি শুরু করে। ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এইসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে পুরোনো সরকারের সদস্যদের হাতেই যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সাধারণ মানুষের হাতে যায়নি।
রাশিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়েভগেনি ইয়াসিন তার ‘ডেমোক্র্যাটস টু দ্য এক্সিট’ বইয়ে লেখেন, ১৯৯৫ সালে বোরিস ইয়েলৎসিনের সরকার অর্থসংকটে পড়ে কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাছে ঋণ নেন। ঋণের বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দেওয়া হয়। ইয়াসিন লেখেন, এই ঋণ কখনো পরিশোধ করা হয়নি, অর্থাৎ সেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারগুলো সেই ব্যবসায়ীদের কাছেই রয়ে যায়। ‘৯৬ সালে ইয়েলৎসিনের পুননির্বাচনের ক্যাম্পেইন এই ব্যবসায়ীরাই অর্থায়ন করেন।
টাকা দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব কেনা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাগিয়ে নেওয়া এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর নির্বাচনের ক্যাম্পেইন অর্থায়ন করা এই বিত্তবানদেরই তখন অলিগার্ক বলা হয়েছিলো।
২০০০ সালে রাশিয়ার ক্ষমতায় আসেন ভ্লাদিমির পুতিন। তখন রাষ্ট্রের সাথে অলিগার্কদের সম্পর্ক বদলে যায়। পুতিন অলিগার্কদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কমিয়ে দেন এবং অনেক অলিগার্ককে নির্বাসনে যেতেও বাধ্য করেন। তবে অনেক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, সেই সময় রাশিয়ায় নতুন এক শ্রেণীর অলিগার্কের জন্ম হয় যারা শুধু পুতিনের অনুগত।
উক্রেইনের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ অনেক এমন অলিগার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উক্রেইনও অলিগার্কির আলোচনার বাইরে নেই। অলিগার্কি নিয়ে সবচেয়ে সুপরিচিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছিলেন আমেরিকারই দুইজন গবেষক - অধ্যাপক মার্টিন গিলেন্স ও বেঞ্জামিন পেইজ। তারা ১৯৮১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে উত্থাপিত বিভিন্ন বিল পর্যবেক্ষণ করেন। সেইসাথে বোঝার চেষ্টা করেন যে, পাস হওয়া বিলগুলোতে সাধারণ মানুষের ইচ্ছা ও স্বার্থ বেশি প্রতিফলিত হয়, নাকি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর ইচ্ছা ও স্বার্থরই জয় হয়।
তাদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকার সিনেটে যেসব প্রস্তাব আইনে রূপান্তরিত হয়, তার বেশিরভাগেই ব্যবসায়ী এলিট শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়।
আমেরিকায় অলিগার্কির কথা বলেছিলেন খোদ সেই দেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট। নির্বাচনে হেরে জো বাইডেন তার ফেয়ারওয়েল স্পিচে বলেন, “বিপুল অর্থ, প্রভাব ও ক্ষমতাশালী একটি অলিগার্কি আমেরিকায় দানা বাঁধছে”। এই অলিগার্কি আমেরিকার গণতন্ত্র, মানুষের মৌলিক অধিকার ও সমান সুযোগের অধিকারের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জো বাইডেন।
অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান সারাবিশ্বে অলিগার্কির অস্তিত্ব নিয়ে সতর্কবার্তা দেন। তিনি লিখেন, “আমাদের আশেপাশের সব উপসর্গ বলছে, আমরা এমন একটি বিশ্বে বসবাস করছি যেখানে কিছু সংখ্যক অলিগার্ক আছেন। তাদের বিত্তের পরিমাণ এত বেশি যে তা কয়েক দশক আগে চিন্তাই করা যেতো না।”
২০২১ সালে উক্রেইনে প্রথমবারের মতো অলিগার্কি শব্দটি আইনে নথিভুক্ত করা হয়। দেশটির তখনকার প্রেসিডেন্ট ভেরখোভনা রাদার প্রশাসন অলিগার্কদের নাম নথিভুক্ত করে তাদের সব ধরনের রাজনৈতিক অর্থায়ন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, “অলিগার্কিক ব্যবস্থাকে ভাঙতে না পারলে উক্রেইন কখনো দারিদ্র্য অতিক্রম করতে পারবে না এবং ইউরোপের সাথে পুরোপুরি মিলতে পারবে না।”
রাশিয়া, আমেরিকা ও উক্রেইনের প্যাটার্ন থেকে বোঝা যায়, এখানে অলিগার্কি বলতে এমন এক ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অল্পকিছু বিত্তবান ব্যক্তির মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়। এসব ব্যক্তি রাষ্ট্রের কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে নিজেদের বিত্ত বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। এই লেন্সে এবার বাংলাদেশকে দেখা যাক।
বাংলাদেশের অলিগার্কি ও অলিগার্কদের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলে, এস আলম গ্রুপ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় সাতটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলো। এসব ব্যাংক থেকে নামমাত্র জামানতে ঋণ নিয়ে সেই ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশে পাচার করা হয়। টাকায় যা দাঁড়ায় ২ লক্ষ কোটির বেশি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে, যার মধ্যে শুধু এস আলম গ্রুপ অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার সরিয়েছে। এই পাচারে গোয়েন্দাসংস্থা ডিজিএফআইয়ের সহযোগিতা ছিলো বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে।
সিঙ্গাপোরের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি অভিযোগ এনেছে, এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম মাসুদ সিঙ্গাপোরসহ অন্যান্য দেশে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি পাচার করেছে। যদিও তার আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইনের অংশ’ বলে দাবি করেছেন।
এছাড়া, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর অর্থ পাচার এবং শেখ পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্তের কথা শুরুতে বলা হয়েছে।
এখানে অলিগার্কির একই প্যাটার্ন দেখা যায় - বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং মন্ত্রী, যারা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজেদের বিত্ত বাড়িয়েছেন। তাদের সহযোগিতা করেছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং গোয়েন্দা সংস্থা। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভুক্তভোগী হয়েছে দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ।
বাংলাদেশ, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, উক্রেইন - চারটি দেশের প্যাটার্ন একই রকম। অ্যাথেনসের থার্টি টাইর্যান্টসের মতো হয়তো সরাসরি কিছু বিত্তবানকে নিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসানো হচ্ছে না। তবে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের সংজ্ঞার সাথে মিল দেখা যায়। বিপুল বিত্তবান ব্যক্তি রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের তোয়াক্কা না করা, এবং এর ফলে দরিদ্রদের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার দিক দিয়েই হয়তো পুরনো অলিগার্কির সাথে বর্তমান বিশ্বের মিল দেখা যায়।
বাংলাদেশে যাদেরকে এখন খোলাখুলিভাবে অলিগার্ক বলা হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই এখন অপসৃত ও পলাতক। তাদের ওপর তদন্ত চলছে, অনেকের বিত্ত ও সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে, অনেক সম্পত্তি জব্দ করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। তবে এই ব্যক্তিরা যখন ক্ষমতার কাঠামোর অংশ ছিলেন, তখন অল্প সংখ্যক মানুষকেই তাদের অলিগার্ক ডাকতে শোনা যায়। তাই বর্তমান সময়েও প্রশ্ন থেকে যায় - ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, তবে এখনো কি বাংলাদেশ অলিগার্কির ছায়া থেকে মুক্ত, নাকি পুরনো অলিগার্কদের জায়গায় এসেছে নতুন অলিগার্করা?