‘ইতিহাসের বৃহত্তম’ জনসমাবেশের আশা বিএনপি'র, জনদুর্ভোগের জন্য আগাম দুঃখ প্রকাশ

প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেরার পর দেশের ‘ইতিহাসে বৃহত্তম জনসমাবেশের’ প্রত্যাশা করছে দলটি। তবে এজন্য যে জনদুর্ভোগ হতে পারে সেজন্যও আগাম দুঃখ প্রকাশ করেছে তারা।

“জনদুর্ভোগ লাঘবেই রাজধানীর একপাশে ৩০০ ফুট সড়কের সার্ভিস লেনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে,” বলছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

বুধবার তিনি জানান, জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করেই তারেক রহমান ২৫এ ডিসেম্বর তার ফেরার দিন ঠিক করেছেন, কারণ সেদিন সরকারি ছুটি আর তারপর দুইদিন সাপ্তাহিক ছুটি।

তিনি বলেছেন, “আপনারা জানেন তিনি এর আগেই যুক্তরাজ্যে দলের নেতাকর্মীদের হিথ্রো বিমানবন্দরে তাকে বিদায় না জানাতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।”

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান বুধবার বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে লন্ডন থেকে রওনা হয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ১১.৫০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তারেক রহমানের। তার সঙ্গে আসার কথা আছে স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানের।

“ইনশাল্লাহ! বাংলাদেশ ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাবেশের সাক্ষী হতে চলছে। যেই ইতিহাস দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে”, বলেন সালাহউদ্দিন, যিনি তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক, মোড়, অলিগলি ব্যানার-পোস্টারে ভরে গেছে।

তারেক রহমানের তিনদিনের কর্মসূচিতে যা থাকছে

বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানাবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।

সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি সরাসরি যোগ দেবেন ‘৩০০ ফিট’ বলে পরিচিত সড়কের গণঅভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। 

“সেই আয়োজনে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কোন বক্তা থাকছেন না,” বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি জানান, অভ্যর্থনা শেষে তারেক রহমান তার মা, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন এবং সেখান থেকে বনানীর কাকলি হয়ে বাসভবনে পৌঁছাবেন।

ঢাকায় ফিরে তারেক রহমান থাকবেন গুলশান অ্যাভিনিউর বাড়িতে। পাশেই ‘ফিরোজা’তে থাকেন তার মা।

পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার বাবা, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করবেন তিনি। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন তারেক রহমান।

২৭ ডিসেম্বর শনিবার তিনি এনআইডি কার্ড এবং ভোটার হওয়ার সমস্ত কাজগুলো করবেন জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এরপর ইনকিলাব মঞ্চের আহবায়ক শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করবেন তারেক রহমান।

বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আসার আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে।

জনদুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ

কর্মসূচি ঘিরে জনদুর্ভোগের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

“জনাব তারেক রহমান এমন কোনও কর্মসূচিকে সমর্থন করেন না, যা জনদুর্ভোগের কারণ সৃষ্টি হতে পারে।"

এর আগে যুক্তরাজ্যে বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের হিথ্রো এয়ারপোর্টে তাকে বিদায় জানাতে না যেতে তারেক রহমানের অনুরোধের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশেও আমাদের কোনও কর্মসূচি যেন জনদুর্ভোগের কারণ সৃষ্টি না করে, তারেক রহমান এমন নির্দেশনা দিয়েছেন,” 

তবে এই নির্দেশ ‘একশ ভাগ প্রতিপালন করতে পারিনি’ বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। 

“আমাদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও এই আয়োজনে যতটুকু জনদুর্ভোগ হবে, সেজন্য আমরা আন্তরিকভাবে জাতির কাছে, সকলের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি।” 

সারাদেশ থেকে কর্মী-সমর্থকের ঢল নামাতে প্রস্তুতি

জনসমাগমের দিক দিয়ে অতীতের সব রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের রেকর্ড ভাঙার প্রত্যাশা করছেন বিএনপি নেতারা।

সংবর্ধনায় অন্তত ৫০ লাখ মানুষের উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন তারা। বিশেষ করে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের শক্তি দেখানোর লক্ষ্যও রয়েছে এই আয়োজনের পেছনে। মঙ্গলবার ৩০০ ফিটে গণসংবর্ধনা মঞ্চ পরিদর্শন শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আশা করছি, অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতি হবে।

এরই মধ্যে সারাদেশ থেকে নেতাকর্মী ঢাকা আসতে শুরু করেছেন।

বিএনপি’র চট্টগ্রাম নেতারা বলছেন কমপক্ষে এক লাখ নেতা-কর্মী-সমর্থক ঢাকায় আসছে। দলের পক্ষ থেকে ভাড়া করা ট্রেন, বাস ও গাড়িতে করে গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা পৌঁছাচ্ছেন তারা।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, দুটি ট্রেনের সম্পূর্ণ, আরেকটির অর্ধেক টিকেট তারা বুক করেছে।

“মহানগর থেকে ১০০টি বাস ও দেড়শ মাইক্রোবাস ভাড়া করা হয়েছে। এর বাইরে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকেও নিজ উদ্যোগে নেতাকর্মীরা বাস–মাইক্রোতে লোকজন নিয়ে যাবেন। এ রকম আরও ১০০ বাস ও শতাধিক মাইক্রো যাবে। আসলে যে হারে মানুষ যেতে চাচ্ছে গাড়ি না পাওয়ায় সেভাবে আমরা সাপোর্ট দিতে পারছি না।” 

বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বগুড়া থেকে প্রায় অর্ধলক্ষ কর্মী-সমর্থক ঢাকায় আসছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।

নেতাকর্মীদের পরিবহনের পাঁচ শতাধিক বাস ও অন্যান্য যানবাহন ভাড়া করা হয়েছে। গত দুই দিন ধরে এসব পরিবহনে তারা ঢাকায় যাচ্ছেন, বুধবার রাত পর্যন্ত তাদের যাত্রা অব্যাহত থাকবে, বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বরিশাল থেকে পাঁচ লাখের বেশি নেতাকর্মী ঢাকায় রওনা হবেন বলে আলাপকে জানিয়েছেন, বরিশাল বিভাগ এবং ঝালকাঠি জেলার মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা মো. আরিফ।

বুধবার রাত আটটার দিকে লঞ্চে তারা রওনা দিবেন বলে জানান তিনি।

ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে দুই লাখের বেশি কর্মী সমর্থক ঢাকার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবার কথা রয়েছে।

“ময়মনসিংহ থেকে ২ লাখের বেশি মানুষ আসবে। এর মধ্যে বিভিন্ন আসন থেকে তাদের লোকজন নিয়ে আসবে। বেশিরভাগই ৩০০ ফিট এবং তার আশেপাশে অবস্থান করবে,” বিএনপি মিডিয়া সেলের সোশ্যাল মিডিয়ার কোঅর্ডিনেটর আপেল মাহমুদ আলাপ-কে বলেন।

রাজশাহী মহানগর ও জেলা থেকে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার নেতাকর্মী ঢাকায় যাবেন। এর মধ্যে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বাসগুলো বুধবার রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে, বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

নেতাকর্মীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাজশাহী থেকে কোনও স্পেশাল ট্রেন না থাকলেও নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান।

ঢাকার ‘৩০০ ফিট’ বলে পরিচিত গণঅভ্যর্থনায় তারেক রহমান ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় বক্তা থাকবে না বলে জানিয়েছে বিএনপি।

প্রস্তুত গণঅভ্যর্থনার মঞ্চ

বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলমুখী ৩০০ ফিট সড়কের একটি অংশজুড়ে মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। যা বুধবার রাতের মধ্যে শেষ হবে। প্রায় ৯০০টি মাইক লাগনো হবে রাজধানীতে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে আবদুল্লাহপুর, বিশ্বরোড, বনানী হয়ে মহাখালী, যমুনা ফিউচার পার্ক, ৩০০ ফিটের রাস্তা ধরে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত লাগানো হচ্ছে এসব মাইক। পুরো এলাকা সিসিটিভির নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

শহরজুড়ে থাকবে এলইডি ডিসপ্লে

নেতাকর্মীদের ঢল ৩০০ ফিট ছাড়িয়ে বিমানবন্দর, উত্তরা, বনানী পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এজন্য মাইকের পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডিজিটাল এলইডি ডিসপ্লে স্থাপন করা হবে। এছাড়া লাখ লাখ নেতাকর্মীর জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করেছে বিএনপি। এছাড়া ফিল্ড হসপিটালও থাকবে বলে জানানো হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের তেসরা সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান।

এক সপ্তাহ পরে, ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।

দীর্ঘসময় ধরে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের 'মিথ্যা মামলা ও বাধার' কারণেই তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি দেশে ফিরছেন না কেন, এই প্রশ্ন ও কৌতূহল ক্রমশ জোরালো হচ্ছিলো।

এর আগে গত অক্টোবরের শেষে বিএনপি জানিয়েছিল, তারেক রহমান নভেম্বর মাসের মধ্যেই দেশে ফিরবেন বলে তারা আশা করছে। কিন্তু নভেম্বরে তিনি ফেরেননি।

তারেক রহমানের সাথে তার মা খালেদা জিয়ার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল লন্ডনে ২০২৫ সালে জানুয়ারি মাসে।

নভেম্বরে শেষ দিকে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি ও তার শারীরিক অবস্থার অবনতির পরও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

ওই সময় ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, মায়ের অসুস্থতার মধ্যেও তার দেশে ফেরার বিষয়ে 'সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়'।

যদিও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে 'পরিস্থিতি যাই হোক' তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, এ কথা বলে আসছিলেন বিএনপি নেতারা।