দিল্লিতে লাইভ হাসিনা, ঢাকার কড়া প্রতিক্রিয়া

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগদানের পর ক্ষুব্ধ ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, “পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ”।

৫ই অগাস্ট সন্ধ্যায় ঘন্টাখানেকের কিছু বেশি দীর্ঘ ওই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঢাকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর যেদিন ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে চলে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, তার দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনটিকেই ভারতের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) বেছে নেয় সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের জন্য। এই সংবাদ সম্মেলন নিয়ে গত কয়েকদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্তর ক্যাম্পেইন ও বিতর্ক হয়েছে। 

আগে থেকেই এফসিসি ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল, এ সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সরাসরি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেবেন এবং প্রশ্নের জবাব দেবেন।

এ প্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র রনধির জয়সোয়াল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আলোচ্য অনুষ্ঠানটি একটি ‘প্রাইভেট মিডিয়া এনটিটি’ আয়োজন করেছে। সরকারের এর সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 

“এই অনুষ্ঠানে যেসব মতামত আসতে পারে সেগুলোকে সরকার অনুমোদন করে না", বলেন রনধির জয়সোয়াল। 

গত তেসরা অগাস্ট দিল্লির সহযোগিতা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, যাতে শেখ হাসিনা যাতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন। 

এহেন কার্যক্রম দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন উপদেষ্টা।

দৈনিক প্রথম আলো কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে লিখেছে, গত ২৯এ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতেও শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি তোলে বাংলাদেশ। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড যে অস্বস্তি কাটিয়ে দু’দেশের সম্পর্কের ‘নতুন শুরুর’ পথে বাধা, তা ঐ দিন বাংলাদেশ জোরালোভাবে তুলে ধরে - লিখেছে প্রথম আলো।

কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যোগ দেন, ইংরেজিতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। শেখ হাসিনা শুধু অডিওর মাধ্যমে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন, তার চেহারা দেখা যায়নি। 

ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর গত দুই বছর শেখ হাসিনাকে কখনো প্রকাশ্যে তো দেখা যায়ইনি, এমন কী সরাসরি কথা বলতেও শোনা যায়নি। যদিও তার কিছু ফোনকল রেকর্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় বের হয়েছিল, আর দলীয় কিছু ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে তিনি মাঝে মাঝে রেকর্ড করা বক্তব্য দিয়েছেন। এই প্রথম তাকে সরাসরি কথা বলতে শোনা গেল। পুরো আলোচনাই হয়েছে ইংরেজিতে।  

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি আরো যোগ দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি সাকিব আল হাসান।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী সশরীরে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের অনুষ্ঠান মঞ্চে।

পুরো বক্তৃতায় শেখ হাসিনাকে একবারের জন্যও ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্ট মাসের ঘটনাপ্রবাহের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। বরং তিনি এই ইস্যুতে নিজেকে একজন ভিক্টিম হিসেবে দাবি করেন। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া

দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের ওই আয়োজন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে একটি ইংরেজি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। 

প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভাষা ছিল অত্যন্ত কড়া। এতে শেখ হাসিনাকে ‘অ্যাবস্কনডিং কনভিকটেড জেনোসাইডার’ বা পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী বলে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্যদের উল্লেখ করা হয় তার ‘হেঞ্চমেন’ বা অনুগত সহযোগী হিসেবে।

যে গণঅভ্যুত্থানের ফলে শেখ হাসিনা ও তার সরকার উৎখাৎ হয়েছিলেন, সেটিকে ‘জুলাই রেভ্যুল্যুশান’ বা ‘জুলাই বিপ্লব’ বলেও উল্লেখ করা হয় প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে। এই প্রথম কোনো সরকারি দলিলে চব্বিশের জুলাই-অগাস্টের ঘটনাপ্রবাহকে ‘বিপ্লব’ বলে উল্লেখ করা হলো।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখেছে, “যে দিনটিকে বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী হিসেবে পালন করছে, সেই দিনটিতেই ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার এই মিথস্ক্রিয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জুলাই বিপ্লবের শহীদদের গুরুতর অবমাননা করার শামিল”। 

মূলত বাংলাদেশের সরকার ভারতের সরকারের দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলে, শেখ হাসিনাকে এ রকম একটি অনুষ্ঠানে যোগদানের অনুমোদন দেওয়ার জন্য।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখেছে, “বাংলাদেশ সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক, পারস্পরিক কল্যাণকর ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।” 

“তবে দুঃখজনকভাবে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধের এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং তাকে যেকোনো অজুহাতে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে যা বাংলাদেশ-ভারতের সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।”