রায়েরবাজারের নামহীন গণকবর, এখনো নিখোঁজদের অপেক্ষায় স্বজনেরা

মর্গের হিমঘরে রাখা বিকৃত একটি ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন মুক্তা বেগম। শাহবাগ থানার পুলিশ আর মর্গের কাগজপত্র সামনে, কিন্তু তারপরও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, এই কি তার ছেলে মুন্না? ছেলেকে খুঁজতে থানায় গেছেন, ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, এমনকি প্রতারকদের ফোনেও বিভ্রান্ত হয়েছেন। আর এখন, একটি ঝাপসা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছেন, যাকে তিনি খুঁজছিলেন, তাকে হয়তো পাওয়া গেছে অনেক আগেই। শুধু কেউ তাকে জানায়নি।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর রাজধানীর রায়েরবাজার গণকবরে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল ১১৪টি মরদেহ। দেড় বছর পর, সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তাদের মধ্যে মাত্র আটজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ১০৬ জনের পরিবার আজও জানেন না, তাদের প্রিয়জন এই কবরে শুয়ে আছেন, নাকি এখনো কোথাও, কোনোভাবে বেঁচে থাকার ক্ষীণ সম্ভাবনা অবশিষ্ট আছে।

যাদের পরিচয় পাওয়া গেলো

কাঁচপুরে বাবা-মা আর ছোট বোন সুমাইয়ার সঙ্গে থাকতেন ২৪ বছর বয়সী সাব্বির মুন্না। বাবা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে একই পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের সেই উত্তাল সকালে, মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান মুন্না। যোগ দেন যাত্রাবাড়ির প্রবেশমুখে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। এরপর আর ফেরেননি।

"আমি আগে বুঝতে পারলে ছেলেকে ঘর থেকে বের হতে দিতাম না," বুকে পাথর চেপে বলছিলেন মুক্তা বেগম।

মুন্নার মরদেহ পুরো এক বছর পড়ে ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের হিমঘরে, অজ্ঞাত পরিচয়ে। মুক্তা বেগম কয়েক দফায় মর্গে গিয়েও ছেলেকে শনাক্ত করতে পারেননি।

ছেলের সন্ধান চেয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর তার কাছে আসতে থাকে ভুয়া ফোন কল। কেউ কেউ দাবি করে, মুন্না সীমান্ত পার হতে গিয়ে গুলিতে মারা গেছেন, লাশ ফেরত পেতে হলে বিকাশে টাকা পাঠাতে হবে। ছেলে হারানোর যন্ত্রণার মধ্যেই প্রতারকদের শিকার হতে হয়েছে তাকে। তারপর ১৮ই আগস্ট সোনারগাঁও থানায় ছেলের নিখোঁজ ডায়েরিও করেছিলেন, তাতেও লাভ হয়নি।

এক বছর পর অবশেষে খবর আসে, হিমঘরে পড়ে থাকা ছয়টি অজ্ঞাত লাশের একটি মুন্নার, যা ইতিমধ্যে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে গেছে জুরাইন কবরস্থানে। সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয় সত্যিটা: মুক্তা বেগমের ছেলে জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। তবু তাকে সমাহিত হতে হয়েছে নাম-পরিচয়হীন হয়ে।

ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে একইভাবে দাফন হওয়া আরও আটজন শহীদের পরিচয় দেড় বছর পর নিশ্চিত হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষায়। তাদের একজন ৩৮ বছর বয়সী পোশাক ব্যবসায়ী সোহেল রানা। আন্দোলনের এক সন্ধ্যায় রায়েরবাগের বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে যান তিনি। ভাই জুয়েল ফোনে পাচ্ছিলেন না তাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, আতঙ্ক আর হতাশায় দিন গোনে পরিবার। এক পর্যায়ে তার আরেক ভাই আলভীর হাতে আসে একটি ভিডিও, সেখানে এক শিশুর রক্তাক্ত শরীরের পাশে নিথর পড়ে আছেন সোহেল। ভাইয়ের মৃত্যু নিশ্চিত হয় সেই ভিডিওতেই।

এরপর শুরু হয় আরও কঠিন এক অধ্যায়। হাসপাতাল, থানা, কোথাও বাদ রাখেননি আলভীরা। কাকরাইলের আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে গিয়ে নথিভুক্ত তথ্যের সঙ্গে ভাইয়ের ছবি মিলিয়ে দেখেন তারা। ততদিনে পার হয়ে গেছে ৩৪টি দিন। ডিএনএ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অবশেষে ভাইয়ের কবর খুঁজে পান আলভীরা। কিন্তু মা রাশেদা বেগমের কান্না আজও থামেনি।

উনিশে জুলাই আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে স্ট্রেচারে আসে এক রক্তাক্ত মরদেহ, নাম অজানা। ময়নাতদন্তে জানা যায়, গুলিতে মৃত্যু। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে "অজ্ঞাত" হিসেবে মৃত্যু সনদ ইস্যু হয়, দাফন হয় রায়েরবাজারে। আসলে তিনি ছিলেন রিকশাচালক মাহিন মিয়া। ১৮ই জুলাই মোহাম্মদপুরের টাউন হল এলাকায় আন্দোলনে ছিলেন তিনি, এরপর নিখোঁজ। আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে ছবি দেখে পরিবার নিশ্চিত হয় মাহিন মারা গেছেন।

ভাই আব্দুল জব্বার ঘটনা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ধরে রাখতে পারেননি। চোখ মুছতে মুছতে জানান, মাহিনের মৃত্যুর মাত্র ১৫ দিন পরই জন্ম হয় তার প্রথম সন্তানের। নিয়ম মেনে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষার পরই ভাইয়ের কবর শনাক্ত হয়।

যারা আজও নিখোঁজ

মিরপুর দুয়ারীপাড়ার ঈসমাইল হাসান আর মৌসুমী আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান মারুফ আহমেদ, ছোটবেলাতেই বাবা হারানো এক কিশোর, ২০২৪ সালে রূপনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। 

একুশে জুলাই সকাল দশটায় মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয় মারুফ। বিকেল তিনটায় শেষবারের মতো ফোনে কথা হয় মায়ের সঙ্গে। এরপর থেকে সে নিখোঁজ। ফোন দিলে ভেসে আসত অচেনা এক কণ্ঠ। পরে সিলেট থেকে এক যুবকের কাছ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে মারুফের ফোনটি। সে জানায়, উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ফোনটি কুড়িয়ে পেয়েছিল সে।

এখনো-সনাক্ত-হয়নি-রায়েরবাজারে-বেওয়ারিশ-১০৬-মরদেহের-3.jpg

"আমি কিছুদিনের জন্য সিলেট ছিলাম, সেই সময় ডিএনএ টেস্টের জন্য সিআইডি থেকে ফোন দেয়। পরে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি,"আলাপ-কে বলেন মারুফের মা মৌসুমী।

এখন একটি চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান তিনি, ছেলের খোঁজ আজও পাননি।

 যাত্রাবাড়ির রায়েরবাগ এলাকার মিথিলের ভাই, ২১ বছর বয়সী মিরাজ, ২০২৪ সালের ২৭এ জুলাই থেকে নিখোঁজ। গুলিস্তানের এক দোকানের কর্মচারী মিরাজ সেদিন সকাল ৯টায় কাজে যেত বের হয়েছিলেন, দুপুর ১২টায় দোকান থেকে ফোন আসে, মিরাজ পৌঁছাননি। তারপর তাকে খুঁজতে কোনো জায়গা বাদ রাখেনি পরিবার, তবে ফলাফল শূন্য।

মিথিল বলেন, "যখন সরকারের উদ্যোগে রায়েরবাজার গণকবর ঘিরে ডিএনএ পরীক্ষা শুরু হয়, তখন আমাদের আরেক ভাই সেখানে গিয়ে সিআইডি কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাতে ব্যর্থ হন। এরপর ওই টিমের একজনের নাম্বারে বারবার ফোন দিয়েছি, কোনো সাড়া পাইনি।"

সিস্টেমটা যেভাবে কাজ করে এবং যেখানে থমকে যায়

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০২৫ সালে রায়েরবাজার গণকবর থেকে লাশ উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ শুরু করে সিআইডি। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় এবং গণকবর তদন্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিনাসোটা প্রোটোকল মেনে চালানো হয় এই ফরেনসিক কার্যক্রম। ৭ই ডিসেম্বর থেকে ২৭এ ডিসেম্বর, ২০২৫, এই কুড়ি দিনে সংগ্রহ করা হয় ডিএনএ নমুনা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান, অধ্যাপক ডা. কাজী মোখলেসুর রহমান বলেন, "এই ধরনের কাজ বেশ কঠিন ছিল। একটা ভালো টিমওয়ার্কের ফল হিসেবে ধাপে ধাপে ১১৪টি বেওয়ারিশ লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে আটজনের ডিএনএ স্বজনদের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তাদের পরিচয় সনাক্ত সম্ভব হয়েছে।"

এখনো-সনাক্ত-হয়নি-রায়েরবাজারে-বেওয়ারিশ-১০৬-মরদেহের-4.jpg

তিনি জানান, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে প্রতিদিনই অসংখ্য ময়নাতদন্ত করতে হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। শরীর থেকে পাওয়া গেছে রাইফেল, শটগান, পিস্তলের গুলি ও পিলেট। সেই সময় ছয়টি নাম-পরিচয়হীন লাশ পুলিশের অনুরোধে বছরখানেক ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, পরে আইনি প্রক্রিয়া মেনে হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে।

কিন্তু বাকি ১০৬টি মরদেহের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব জানান, এই লাশের কোনো দাবিদার বা স্বজন এখনো পাওয়া যায়নি, কেউ যোগাযোগও করেননি। তবে প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে সংরক্ষিত আছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা জানান, থানা বা ডিসি অফিসে নতুন করে কেউ নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে আসেননি। নিখোঁজ কারো সন্তান বা স্বজন চাইলে সিআইডিতে সংরক্ষিত নমুনার সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে দেখার আবেদন করতে পারেন।

তবে তিনি বলছেন যে বাকি লাশের সবাই যে গণঅভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন, বিষয়টা এমন নাও হতে পারে। কারণ নৌ পুলিশ প্রায়ই নদী থেকে বেওয়ারিশ মরদেহ উদ্ধার করে, রাস্তা থেকেও পাওয়া যায় নাম-পরিচয়হীন লাশ, যেগুলো আইনি প্রক্রিয়া মেনে আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে হস্তান্তরের পর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়। যাচাই-বাছাই এগোলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।

রায়েরবাজার কবরস্থানের ইমাম মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "আগে প্রায়ই অনেকে এখানে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে আসতেন। ইদানীং আর কেউ এসে খোঁজখবর করেন না। এখন শুধু যে আটজনের পরিচয় সনাক্ত হয়েছে, শুধু তাদের স্বজনরাই কবর জিয়ারতে আসেন।"

বাকি ১০৬টি কবরে, কেউ আসে না।