‘‘যুদ্ধ শুরু হলে রাজনীতিবিদেরা অস্ত্র দেয়, ধনীরা রুটি দেয় আর গরিবেরা দেয় তাদের সন্তান। যুদ্ধ শেষে রাজনীতিবিদেরা হাত মেলায়, ধনীরা রুটির দাম বাড়ায় আর গরিবেরা খুঁজে বেড়ায় তাদের সন্তানের কবর।’’ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আরও একবার নির্মম সত্য হয়ে ধরা দেয় সার্বিয়ান এই বিখ্যাত প্রবাদটি।
ঢাকার যেকোনো রাস্তায় আজও জ্বলজ্বলে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোর চিহ্ন। যে দিনগুলোতে দল মত, শ্রেণি ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাস্তায় নেমেছিলো মুক্তিকামী মানুষের ঢল। শিক্ষার্থী, নারী, গার্মেন্টস কর্মী, রিকশাচালক, পেশাজীবী, শিল্পী থেকে শুরু করে বাম ও ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মী, সবাই দাঁড়িয়েছিলো ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। বুলেটের সামনে বুক পেতে অর্জন করেছিলো এক ঐতিহাসিক মুক্তি।
অভূতপূর্ব সেই গণঅভ্যুত্থানের ঠিক দুই বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দেখা যায় এক চরম বৈপরীত্য। যে সাধারণ জনতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীরা রাজপথে রক্ত দিয়ে ক্ষমতার পতন ঘটিয়েছিলো, রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিসর থেকে তারা আজ প্রায় সম্পূর্ণ নিখোঁজ। রাজনৈতিক আলোচনায় আজ শুধু দেখা যায় সুশীল সমাজের মধ্যবিত্ত অংশ, ডানপন্থি এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক, রাজনৈতিক এলিটদের।
ফ্রানৎস ফানোঁর চোখে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ
বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ক্ষমতার রূপান্তরকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন উপনিবেশবিরোধী চিন্তাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও বিপ্লবী ফ্রানৎস ফানোঁ। ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ বইয়ে ফানোঁ দেখিয়েছিলেন কীভাবে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম বা স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও অবহেলিত শ্রেণি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ঘটেছিল ঠিক একই ঘটনা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথ দখলে নেমেছিলো রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, ফুটপাতের হকার, বস্তিবাসী তরুণ এমনকি পথশিশুরাও। প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলো নিজেদের শ্রেণিগত ‘রাজনৈতিক শক্তি ও ক্ষমতার সাথে।’
ফ্রানৎস ফানোঁ তার ‘সিট অব পাওয়ার’ তত্ত্বে বলেছিলেন, যে জনতা একবার বুঝে যায় কীভাবে রাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়া যায়, তারা নতুন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর জন্যও স্থায়ী হুমকি। তাই নতুন ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর তাদের প্রথম কাজই হয় বিপ্লবী এই শ্রেণিকে নিস্তব্ধ করা। তাই রাষ্ট্র তাদের চিহ্নিত করে ‘বিশৃঙ্খলাকারী’, ‘অপশক্তি’ বা ‘মব’ হিসেবে।
ফানোঁর এই সতর্কবাণী বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের দুই বছরের মাথায় অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়া ও পরবর্তী রাজনীতিতে নারী, শ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা তরুণদের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। উল্টো, যখনই শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য মজুরি বা অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামছে, কিংবা যখনই আন্দোলনকারী তরুণরা তাদের দাবি তুলছে, রাষ্ট্রযন্ত্র ও নতুন এলিট গোষ্ঠী তাদের চিত্রায়িত করছে ‘মব’ হিসাবে। ঠিক যেমন ফানোঁ বলেছিলেন, বিপ্লব বা অভ্যুত্থান শেষে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রথম লক্ষ্য থাকে বিপ্লবী শ্রেণিগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের শোষিত শ্রেণিতে রূপান্তর করা।
নারীদের অন্তর্ধান
আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নেয় সেদেশের নারীরা। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই সেসব নারীদের আবারও ঐতিহ্যবাহী পর্দা ও গৃহস্থালি কাজের পুরোনো জেন্ডার রোলে ফেরত পাঠায় পুরুষতান্ত্রিক আলজেরিয়ার সমাজ ও শাসকগোষ্ঠী।
জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশেও পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সেই আলজেরীয় ট্র্যাজেডির। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রী, শিক্ষিকা, গৃহিণী এবং পেশাজীবী নারীদের উপস্থিতি ছিলো অভূতপূর্ব। আন্দোলন যখন প্রায় স্তিমিত, হলের গেট ভেঙে নারী শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসার দৃশ্য বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের চেহারা। বিপ্লব চলাকালীন যে নারীদের ‘অগ্নিকন্যা’ বলে প্রশংসা করা হয়েছিল, আন্দোলন থামার পরই মোরাল পুলিশিং, পোশাকের স্বাধীনতা খর্ব করা, এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের দোহাই দিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় রাজপথ ও জনপরিসর থেকে। অন্তর্বর্তী কাঠামো থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে আন্দোলনকারী নারীরা হয় চরমভাবে বঞ্চিত।
এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রখ্যাত দার্শনিক জুডিথ বাটলার। ‘পারফরমেটিভ থিওরি অব অ্যাসেম্বলি’ বইয়ে বাটলার বলেন, “রাস্তায় এসে রাজপথ দখল করা নারীদের এই ‘এম্পাওয়ার্ড পাবলিক প্রেজেন্স’ বা ক্ষমতায়িত উপস্থিতি প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়। ফলে আন্দোলন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পিতৃতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে নারীদের পুনরায় ‘প্রাইভেট স্ফিয়ার’ বা ঘরোয়া পরিসরে ফেরত পাঠাতে”।
‘মাল্টিটিউড’ বনাম ‘হোমোজেনাইজেশন’
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক আন্তোনিও নেগরি ও আমেরিকান চিন্তাবিদ মাইকেল হার্ড তাদের বই ‘মাল্টিটিউড’য়ে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে কোনো একক নেতৃত্ব ছাড়াই বিভিন্ন মত, পথ, লিঙ্গ, সামাজিক শ্রেণি ও সংস্কৃতির মানুষ একজোট হয়। জুলাই আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল এই ‘মাল্টিটিউড’। ‘মাল্টিটিউড’কে প্রচলিত কোনো ছকে বাঁধা যায় না। আর সেকারণেই একে ভয় পায় প্রথাগত রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক দলগুলো।
রাষ্ট্রযন্ত্র সবসময় চায় সমাজকে ‘হোমোজেনাইজেশন’ বা একরৈখিক করে ফেলতে। যাতে একটি নির্দিষ্ট একক আদর্শিক বয়ান সমাজে চাপিয়ে দেওয়া যায়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াই দৃশ্যমান। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া শক্তি ইতোমধ্যেই সমাজে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক, লিঙ্গীয় ও বিকল্প চিন্তার স্থানগুলোকে সংকুচিত করে এনেছে। প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে ভিন্নমত, সংখ্যালঘু, সাব-কালচার ও বাম-প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলোকে।
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ থেকে সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াই ছিলো না। ছিলো দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ, ভয় ও নীরবতার বিরুদ্ধে এক যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। রাজপথের স্লোগান, দেয়াললিখন, কার্টুন, গান, কবিতা এবং পারফর্মিং আর্ট হয়ে উঠেছিলো প্রতিবাদের নতুন অস্ত্র। র্যাপ, হিপহপ কিংবা রক ঘরানার গানগুলোতে তোলা হয়েছিলো ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নিপীড়ন, বৈষম্য এবং কাঠামোগত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশ্ন। এতদিন যে র্যাপ মিউজিককে সাংস্কৃতিক এলিটরা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে অবমূল্যায়ন করতো, জুলাইয়ের প্রেক্ষাপটে সেই কণ্ঠগুলোই হয়ে ওঠে পুরো জাতির মূল কণ্ঠস্বর।
ইতালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক অ্যান্তোনিও গ্রামশি তার ‘হেজিমনি’ তত্ত্বে বলেন, যখন গণঅভ্যুত্থান বা বড় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে, তখন পুরোনো শাসকশ্রেণির সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত আধিপত্য ভেঙে পড়ে। প্রথাগত ‘কমনসেন্স’ হয় প্রশ্নবিদ্ধ। আর ঠিক এই শূন্যস্থান দখল করে নেয় প্রান্তিক, অবাধ্য এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলো। হয়ে ওঠে গণমানুষের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা।
আন্দোলন পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে, তারা নতুন এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘হেজিমনি’ তৈরি করতে চায়। প্রান্তিক সেই কণ্ঠগুলোকে সমাজের ‘মূলধারা’ থেকে ধীরে ধীরে ‘সাইডলাইন’ করে দেয়। কারণ প্রান্তিক কণ্ঠগুলো স্বভাবগতভাবেই বিদ্রোহী, অবাধ্য ও প্রশ্নমুখী। যা স্থিতিশীল রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিলম্বিত ‘জুলাই সনদ’ ও গ্রামশির ‘প্যাসিভ রিভোলিউশন’
অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে দাবি উঠেছিল মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের।
‘জুলাই সনদ’ নামক সংস্কার প্রস্তাবে রাজিও হয়েছিলো প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দল। কিন্তু সেই সংস্কার আজও হয়নি।
আন্তোনিও গ্রামশি এই প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছিলেন ‘প্যাসিভ রিভোলিউশন’। গ্রামশি বলেছিলেন, শাসকশ্রেণি গণঅভ্যুত্থানের মুখে কিছু লোক দেখানো পরিবর্তন করে, কিন্তু অপরিবর্তিত রাখে পুরোনো শোষণমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো। সময়ক্ষেপণ করা হয় দীর্ঘমেয়াদী আইনি ও সংস্কার কমিশনের নামে, যাতে গণমানুষের বিপ্লবী উত্তেজনা ও ক্ষোভ ধীরে ধীরে থিতিয়ে পড়ে। আর এই সময়ে দেশের মূল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর মালিকানা সুদৃঢ় করে পুরোনো ব্যবস্থার ধনিক ও এলিটরা।
তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার পর সমাজে চলে আসে একধরনের মানসিক ক্লান্তি। আর এই সুযোগে বিপ্লবের স্বপ্নকে ধামাচাপা দিয়ে পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয় পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল শক্তিগুলো।
ইতিহাসবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘থার্মিডোরিয়ান রিয়্যাকশন’।
‘ফিউজড গ্রুপ’ থেকে ‘সিরিজ’-এ রূপান্তর
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিপ্লবীদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধুলিস্যাৎ হলেও তারা কেন চুপ হয়ে থাকে? কেন তারা পুনরায় রাজপথ দখল করে না?
ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র তার ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেক্টিক্যাল রিজন’ বইয়ে ব্যাখ্যা দেন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক রূপান্তরের।
সার্ত্রর মতে, সমাজে মানুষ সাধারণত বিচ্ছিন্ন একক মানুষের সমষ্টি হিসেবে থাকে, যাদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো গভীর সংযোগ বা অভিন্ন লক্ষ্য থাকে না। কিন্তু সংকট, বিপ্লব বা কোনো ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুহূর্তে এই বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো একটি অভিন্ন শত্রু বা লক্ষ্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। সার্ত্র এই সংঘবদ্ধ মানুষের নাম দেন ‘ফিউজড গ্রুপ’। এই অবস্থায় মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে একক শক্তিতে পরিণত হয়।
সার্ত্র’র মতে একটি ফিউজড গ্রুপ চিরকাল স্থায়ী হতে পারে না। বিপ্লব বা সংকট কেটে যাওয়ার পর যখন রাষ্ট্র বা সমাজকে নিয়মশৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে চলতে হয়, তখন সেই স্বতঃস্ফূর্ত ফিউজড গ্রুপ ধীরে ধীরে নিজ নিজ শ্রেণি ও দলে ফেরত যেতে থাকে।
সার্ত্র লিখেন, ‘এই কাঠামোগত রূপান্তর ও আমলাতান্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ায় বিপ্লবী দলটি আবার বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবর্গের একটি সমষ্টিতে পরিণত হয়’। সার্ত্র এর নামকরণ করেন ‘সিরিজ’ হিসেবে। সার্ত্র বলেন, ‘এই প্রক্রিয়াই বিপ্লবের আসল প্রাণশক্তিকে হত্যা করে’।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্ম কিংবা ছাত্র জনতার রাজনৈতিক মোর্চাগুলো যখনই কার্যালয়, পদ পদবি, কমিটি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করল, তখনই তারা ফিউজড গ্রুপ থেকে পরিণত হলো সিরিজ-এ।
গ্রামশি দেখেছেন, যখন নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও তরুণ বিপ্লবীরা দেখেন রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের পুরোনো ব্যবস্থা এতই শক্ত যে তাদের স্বাধীন চিন্তার আর কোনো স্থান নেই, তখন তারা এক গভীর হতাশায় ভোগেন। এই হতাশা থেকে তারা স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে চলে যান ‘পলিটিক্যাল অ্যাপাথি’ বা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তায়।
বাংলাদেশে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পীদের নিষ্ক্রিয়তা গ্রামশির এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেরই এক চরম বাস্তবতা।
চরম ডানপন্থার উত্থান
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতা হলো রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি ও চরম রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর অভাবনীয় উত্থান। যে বামপন্থি ও উদারনৈতিক প্রগতিশীল শক্তিগুলো আন্দোলনে নীতিগত সমর্থন দিয়েছিল, তারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিপ্লবের পর বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করলে সাধারণ মানুষ যেকোনো মূল্যে ‘শৃঙ্খলা’ ফেরত চায়। এ সময় সমাজে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে। মানুষ তখন ঝুঁকে পড়ে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দক্ষিণপন্থি শক্তিগুলোর দিকে।
ফরাসি বিপ্লবের জাকোবিনদের পতন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম দেখিয়েছিলেন, বিপ্লবীরা যখন অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ জনতা বিপ্লবের আদর্শিক উদ্দীপনা ছেড়ে দিয়ে ধাবিত হয় রক্ষণশীল সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার দিকে।
বাংলাদেশেও উদারপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনীতি বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে সমাজের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে। ফলে সেই শূন্যস্থান দ্রুত দখল করেছে নতুন চেহারা পাওয়া ডানপন্থি দলগুলো।
শ্রমিকের চিরকালীন বঞ্চনা
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো শ্রমজীবীরাও। আন্দোলন পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও গুণগত কোনো পরিবর্তন আসেনি গার্মেন্টস কর্মী, রিকশাচালক ও দিনমজুরদের জীবনযাত্রায়। মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবে একইরকম দুর্বিষহ তাদের জীবন।
অর্থনৈতিক শ্রেণি বিশ্লেষণে কার্ল মার্ক্স দেখিয়েছিলেন কীভাবে বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে বুর্জোয়া ও পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রোলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণিকে।
কিন্তু বিপ্লব সফল হওয়ার সাথে সাথেই মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়া সমাজ মনোযোগ দেয় নিজেদের ধনতান্ত্রিক সম্পত্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সুরক্ষায়। ফলস্বরূপ, যে শ্রমিক শ্রেণি রক্তের বিনিময়ে বিপ্লব এনেছিল, তারা আবারও নিক্ষিপ্ত হয় আগের মতো প্রান্তিক, উপেক্ষিত ও শোষিত অবস্থানে। আর ক্ষমতার মসনদে নতুন মোড়কে পুনরুৎপাদিত হয় পুরোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। কিন্তু দুই বছর পর, আর এক জুলাইয়ে এসে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিসর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে ২৪ এর বিপ্লবী শিক্ষার্থী, নারী, শ্রমিক, শিল্পী ও প্রান্তিক জনতা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, রাজপথে এসে নিজেদের সম্মিলিত শক্তির সাথে পরিচিত হওয়া জনতাকে সাময়িকভাবে দমন করা যায়, কিন্তু বৈষম্য ও শোষণের কাঠামো ভাঙার যে আকাঙ্ক্ষা একবার জাগ্রত হয়, তা চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।
সাময়িক এই স্তব্ধতা হয়তো কোনো স্থায়ী পরাজয় নয়, বরং ইতিহাসের আরেক নতুন অধ্যায়ের নীরব প্রস্তুতি।