জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই গত দুই বছরে বেশ কিছু প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বলাই বাহুল্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক গোষ্ঠী এবং মতাদর্শিক অংশ তাদের নিজস্ব স্বার্থ, অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার জায়গা থেকে প্রশ্নগুলো করেছে। কে জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিনিধি? কার অবদান বেশি? জুলাই বিপ্লব না গণঅভ্যুত্থান? পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হবে কি না? সংবিধান সংশোধন হবে নাকি পুনর্লিখন হবে? এই প্রশ্নগুলোর প্রতিটিই আসলে ক্ষমতা, বৈধতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী স্টেকহোল্ডারদের মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। এই বিভাজন একেবারে চূড়ান্ত নয়। গ্রুপগুলোর মধ্যে কিছু ওভারল্যাপ আছে। আন্দোলনটির সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বোঝার জন্য এই চারটি অংশ আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
প্রথম অংশটি ছিল সরাসরি রাজনৈতিক। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ আওয়ামী লীগবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং তাদের কর্মী-সমর্থকেরা এই অংশে ছিলেন। দ্বিতীয় অংশটি ছিল ছাত্রছাত্রীদের সরব উপস্থিতি। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়েছিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আন্দোলন যখন দমন-পীড়নের মুখে পড়ে এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি করে দেওয়া হয়, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনটিকে আবার রাস্তায় ফিরিয়ে আনে। তৃতীয় একটি বড় অংশ ছিল দিনমজুর, রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, হকার এবং অন্যান্য ইনফরমাল সেক্টরের কর্মীরা। তাদের অনেকে কোনো দলীয় পরিচয় বা দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে আন্দোলনে আসেননি। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ থেকে তারা রাস্তায় নেমেছিলেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণই আন্দোলনটিকে একটি বৃহত্তর নগর গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। চতুর্থ অংশ ছিল ডায়াস্পোরা কমিউনিটি। তারা সরাসরি বাংলাদেশের রাস্তায় না থাকলেও আন্দোলনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, তথ্য প্রচার, বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ, প্রবাসী প্রতিবাদ, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন এবং রাজনৈতিক লবিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
জুলাইয়ের ছত্রিশ দিনের আন্দোলন মূলত নগরকেন্দ্রিক ছিল। ঢাকা ছিল এর প্রধান কেন্দ্র। বড় ও মাঝারি জেলা শহরগুলোতেও আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। এই অর্থে জুলাইকে একটি নগরকেন্দ্রিক কিন্তু জাতীয় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া গণঅভ্যুত্থান বলা যায়। এর সামাজিক শক্তি এসেছিল শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ মানুষের একটি সাময়িক কিন্তু শক্তিশালী সংযোগ থেকে। আন্দোলনের পরে এই বৃহৎ জোট আর একইভাবে থাকেনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী তাদের পড়াশোনায় ফিরে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, যাদের আন্দোলনের সংকটপূর্ণ সময়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল, তারা কোনো কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি না করে আবার নিয়মিত অ্যাকাডেমিক জীবনে ফিরে যায়। দিনমজুর, রিকশাচালক ও শ্রমিকেরা ফিরে যায় তাদের জীবিকার কাছে। ডায়াস্পোরা কমিউনিটির অনেকে আবার তাদের স্বাভাবিক পেশাগত ও পারিবারিক জীবনে ফিরে যায়।
ফলে জুলাইয়ের পর যে অংশগুলো সংগঠিত ছিল, রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পারত এবং মিডিয়া ও রাষ্ট্রের কাছাকাছি অবস্থান করতে পেরেছিল, তারাই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সমন্বয়কদের একটি অংশ পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি গঠন করে। এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা আর সেই আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক মালিক হওয়া এক কথা নয়। আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছিল বহুমাত্রিক, কিন্তু আন্দোলনের পর ন্যারেটিভ তৈরির ক্ষমতা কয়েকটি সংগঠিত গ্রুপের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। জুলাইয়ের পর জুলাইয়ের অর্থ নির্ধারণ এবং তার মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে।
এই প্রতিযোগিতায় জামায়াতে ইসলামী খুব দ্রুত এবং খুব জোরালোভাবে জুলাইকে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর পেছনে একটি রাজনৈতিক স্মৃতির প্রশ্ন রয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নিজেদের একটি প্রতিষ্ঠাকালীন বা বিজয়ের মুহূর্ত তৈরি করতে চায়। ১৯৭১ সাল আওয়ামী লীগের প্রধান বিজয়ের মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বের দাবি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল। বিএনপি একদিকে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার উত্তরাধিকার দাবি করে, অন্যদিকে ৭ নভেম্বরকে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের মুহূর্ত হিসেবে দেখে। জামায়াতের জন্য ১৯৭১ রাজনৈতিক ও নৈতিক পরাজয়ের একটি ঐতিহাসিক বোঝা। ফলে দলটির সামনে এমন একটি নতুন মুহূর্ত প্রয়োজন ছিল, যেটিকে তারা নিজেদের পুনর্জন্ম, বৈধতা এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
জুলাই সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। তাই জামায়াতের একটি বড় রাজনৈতিক প্রয়াস ছিল জুলাইকে নিজেদের বিজয়ের মুহূর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর অর্থ এই নয় যে জুলাই কেবল জামায়াতের আন্দোলন ছিল। বরং জুলাইয়ের বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের ওপর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে। রাজনৈতিক স্মৃতি নিয়ে এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে।
জুলাই নিয়ে আরেকটি অংশ খুব সরব হয়ে ওঠে, যাকে রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায় ফার রাইটের বিস্তৃত অংশ বলা যায়। সব রক্ষণশীল মুসলমান, সব কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বা সব ইসলামপন্থি দলকে ফার রাইট বলা তাত্ত্বিকভাবে ভুল। ফার রাইট বলতে মূলত সেইসব গোষ্ঠী ও প্রবণতাকে বোঝানো হচ্ছে যারা বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে। এরা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে নাগরিকদের শ্রেণিবিন্যাস করতে চায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার অস্বীকার করে। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতাকে বৈধ রাজনৈতিক উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। এই বিস্তৃত বলয়ের মধ্যে কিছু কট্টরপন্থী ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের নির্দিষ্ট নির্বাচনি লক্ষ্য নাও থাকতে পারে। তবে এই দল রাষ্ট্র ও সমাজকে একটি কঠোর ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে এমন কিছু ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কও রয়েছে, যারা প্রকাশ্য বা পরোক্ষভাবে আল-কায়েদা, আইএস কিংবা তালেবানের রাজনৈতিক স্বপ্ন, প্রতীক ও শাসনব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতি দেখায়। জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই ফার রাইট গ্রুপ গুলো সহিংস মব, প্রতিশোধমূলক হামলা এবং বিচারবহির্ভূত সামাজিক শাস্তির ঘটনা ঘটিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এতে জামাত, এনসিপি ও বিএনপির স্থানীয় নেতা কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছে।
জুলাইয়ের হিস্যা কার বেশি আর কার কম, সেই প্রতিযোগিতায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়েছে বামপন্থিরা। অথচ জুলাইয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরিতে বামপন্থী শিক্ষক, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের শক্তিশালী ভূমিকা ছিল। বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, শ্রমের মর্যাদা, নাগরিক অধিকার, কর্তৃত্ববাদ এবং পুলিশি সহিংসতা নিয়ে যে ভাষা আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছে, তার বড় অংশ দীর্ঘদিনের বাম ও প্রগতিশীল চিন্তার ভেতর থেকে এসেছে। কিন্তু বামপন্থিরা এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা রাজনৈতিক সংগঠন এবং জনপরিসরের ন্যারেটিভে রূপান্তর করতে পারেনি। জুলাইয়ের দুই বছর পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ডানপন্থী ও ফার রাইটের একটি অংশ জুলাইকে ‘বিপ্লব’, এমনকি কোথাও কোথাও ‘ইসলামি বিপ্লব’ হিসেবে ফ্রেম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বিএনপি, বামপন্থী এবং মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক অংশ জুলাইকে কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখছে।
বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান, বিদ্রোহ, আন্দোলন এবং সরকার পতন একই জিনিস নয়। বিপ্লব সাধারণত কেবল সরকার পরিবর্তন করে না; রাষ্ট্রের ক্ষমতা, মালিকানা, প্রতিষ্ঠান, শ্রেণিসম্পর্ক এবং বৈধতার কাঠামোতেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। গণঅভ্যুত্থান একটি সরকারকে সরিয়ে দিতে পারে, রাজনৈতিক সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, সেটি নির্ভর করে পরবর্তী প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ওপর। এই জায়গা থেকে জুলাই সফল না ব্যর্থ, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। বড় কোনো গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল দুই বছরের মধ্যে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। এর ফলাফলকে অন্তত তিনটি স্তরে দেখতে হবে: তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফলাফল, প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক ও সামাজিক ফলাফল।
জুলাইয়ের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠা। সেই উদ্দেশ্যের বড় অংশ অর্জিত হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নির্বাচনটি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না, কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় এটি অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক ছিল। জুলাই তার তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্যের একটি বড় অংশ অর্জন করেছে।
জুলাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য কেবল একটি সরকার সরানো ছিল না। মানুষ চেয়েছিল নাগরিকের প্রাণের মূল্য প্রতিষ্ঠিত হোক, রাষ্ট্র নাগরিককে নির্যাতন না করুক, হত্যা না করুক, গুম না করুক, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অধিকার কেড়ে না নিক এবং আইনকে প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করুক। এই লক্ষ্যগুলো কতটা অর্জিত হয়েছে, তা বলার যথেষ্ট সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।
জাতিসংঘের অনুসন্ধান অনুযায়ী, জুলাই-অগাস্টের দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে এবং সাবেক সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস অংশের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদন প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং জুলাই-পরবর্তী অপরাধেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছে। অর্থাৎ ন্যায়বিচারের দাবি একমুখী হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় হত্যার বিচার যেমন করতে হবে, তেমনি সরকার পতনের পরে সংঘটিত প্রতিশোধমূলক অপরাধেরও বিচার করতে হবে।
জুলাই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো সমস্যার অন্তত সাময়িক সমাধান করেছে। শাহবাগ ও শাপলা আন্দোলন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের তীব্র সংঘাত, বিএনপির সঙ্গে সরকারের ক্রমবর্ধমান বৈরিতা এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন মিলিয়ে বাংলাদেশে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচন আর ক্ষমতা পরিবর্তনের কার্যকর মাধ্যম ছিল না। বিরোধী দলের সামনে রাজপথ ছাড়া বাস্তব কোনো পথ থাকেনি, আর ক্ষমতাসীন দলের সামনে ক্ষমতা ছাড়ার কোনো নিরাপদ প্রক্রিয়া ছিল না। জুলাই সেই বন্ধ দরজা ভেঙেছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি স্পেস তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনি রাজনীতি ফিরেছে। কিন্তু জুলাই একটি পুরোনো সংকটের সমাধান করতে গিয়ে নতুন আরেকটি সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে জুলাই-পরবর্তী ক্ষমতাবান অংশ, অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাদের ঘিরে থাকা ন্যারেটিভ নির্মাতাদের কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
জুলাই হত্যাকাণ্ডে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, দলীয় নেতা, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্যের ভূমিকা ছিল, তাদের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হতেই হবে। কিন্তু কোনো দলের লাখ লাখ সমর্থককে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটি বিচার নয়, সমষ্টিগত শাস্তিতে পরিণত হয়। জুলাই-পরবর্তী সময়ে আরেকটি বড় রাজনৈতিক দাবার চাল ছিল সংস্কার নিয়ে অতিরিক্ত রাজনীতি। এখানে সংস্কারের প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং সংসদের কাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। প্রশ্ন সংস্কার হবে কিনা, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, সংস্কার কোন পদ্ধতিতে, কার ম্যান্ডেটে এবং কী ধরনের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে হবে।
জুলাইয়ের পরে সংস্কারের পক্ষে থাকা একটি অংশ এমনভাবে আলাপটি হাজির করেছে যেন শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্র কেবল সংবিধানের ত্রুটির কারণে তৈরি হয়েছিল। তাই সংবিধানের কাঠামো বদলে দিলেই ভবিষ্যতে আর কখনো একনায়কতন্ত্র ফিরে আসবে না। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা এত সরল নয়। সংবিধান অবশ্যই ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করে। একটি দুর্বল সংসদ, অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রী, দলীয় নিয়ন্ত্রণাধীন সংসদ সদস্য, দুর্বল নির্বাচন কমিশন এবং স্বাধীনতাহীন প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্ববাদকে সহজ করে। কিন্তু সংবিধান নিজে কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বৈরশাসক বানায় না। রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের আচরণ মিলেই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা তৈরি হয়।
শেখ হাসিনা সরকার ২০০৮ সালের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক বছর যে আচরণ করেছে এবং ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর যে আচরণ করেছে, তার মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনকালীন ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ, সংসদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করার মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদ ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। অর্থাৎ সংবিধান শেখ হাসিনাকে যান্ত্রিকভাবে অটোক্রেট বানায়নি। বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধীদের দমন এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সরকার সংবিধান ও আইনকে নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছে। এখানে বাংলাদেশের দুর্বল গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই ধ্বংস করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘রিফর্ম’ বা সংস্কার এবং ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ বা সংশোধন শব্দ দুটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশোধন মূলত সংবিধান পরিবর্তনের একটি আইনগত পদ্ধতি। সংস্কার হলো সেই পরিবর্তনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ব্যাপ্তি। বড় ধরনের সংস্কারও বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে হতে পারে। আবার নতুন সংবিধান প্রণয়ন করলে পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে ধারাবাহিকতা রাখা বা সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ, দুটিই সম্ভব। তাই প্রকৃত বিরোধ কেবল শব্দের নয়। আসল বিরোধ হলো, বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ও সংসদীয় কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তন হবে, নাকি গণঅভ্যুত্থান থেকে পাওয়া নতুন গণক্ষমতা বা constituent power-এর ভিত্তিতে একটি আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক অভিজ্ঞতাতেও নতুন সংবিধান তৈরি এবং পুরোনো সংবিধান সংশোধনের পার্থক্য সব সময় পরিষ্কার নয়। বড় প্রশ্ন থাকে আইনগত ধারাবাহিকতা, জনসম্মতি এবং প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে।
বিএনপি মূলত বিদ্যমান সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ভেতরে সংসদের মাধ্যমে পরিবর্তনের কথা বলেছে। অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি আরও কাঠামোগত পুনর্গঠনের পক্ষে ছিল। ফরহাদ মজহার পুরোনো সংবিধান ছুড়ে ফেলার ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর অধ্যাপক আলী রিয়াজের নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়ায় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং একটি বিশেষ সংস্কার পরিষদের ধারণা সামনে আসে।
এই প্রেক্ষিতে আমরা জুলাই জাতীয় সনদ পাই। এতে আশিটির বেশি সংস্কার প্রস্তাব ছিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অনেক প্রস্তাবে একমত হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দিয়েছিল। অর্থাৎ জুলাই সনদ নিয়ে ‘জাতীয় ঐকমত্য’ কথাটি আংশিক সত্য। সংস্কারের প্রয়োজন নিয়ে ঐকমত্য ছিল, কিন্তু প্রতিটি সংস্কারের ধরন, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সাংবিধানিক কর্তৃত্ব নিয়ে ঐকমত্য ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত করে রাজনৈতিক জটিলতাটি আরও বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি তার নিজস্ব সংস্কার ও সাংবিধানিক সংশোধনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অংশগ্রহণ করে এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষেও ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। এর ফলে একটি বাস্তব সাংবিধানিক দ্বৈততা তৈরি হয়েছে। একদিকে জনগণ সংসদে বিএনপিকে শক্তিশালী ম্যান্ডেট দিয়েছে। অন্যদিকে একই জনগণ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, সংসদীয় ম্যান্ডেট কি বিএনপিকে তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ অধিকার দেয়? নাকি গণভোটের ফল অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করতে হবে?
এই দ্বৈত ম্যান্ডেটকে কেবল দুর্ঘটনা বলা কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই বুঝতেন যে একটি সংসদীয় নির্বাচন এবং একটি ব্যাপক সাংবিধানিক গণভোট একই দিনে আয়োজন করলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্বের সংঘাত তৈরি হতে পারে। তারা হয়তো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যৎ সরকারের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিতে চাননি। সেই উদ্বেগ পুরোপুরি অযৌক্তিকও নয়। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য খারাপ প্রাতিষ্ঠানিক নকশাকে বৈধ করে না। গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময়ে সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল একটি পরিষ্কার, আইনগতভাবে টেকসই এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচিত রোডম্যাপ। তার বদলে একই জনগণের কাছ থেকে একই দিনে দুই ধরনের ম্যান্ডেট নিয়ে ভবিষ্যৎ দ্বন্দ্বের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান সংসদ ইতিমধ্যে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সংস্কার পরিষদ, দ্বিতীয় শপথ এবং সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এখানে বিএনপির অবস্থানও সমালোচনার বাইরে নয়। বিএনপি যদি কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংস্কারের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে পাশ কাটাতে চায়, তাহলে সেটি আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের পুরোনো ফাঁদ তৈরি করবে। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া মানেই সংবিধানকে দলীয় ইচ্ছামতো বদলানোর নৈতিক অনুমতি পাওয়া নয়। বাংলাদেশের অতীত দেখিয়েছে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দখলের অস্ত্রও হতে পারে। অন্যদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে বলেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি প্রস্তাব প্রশ্নহীনভাবে বৈধ হয়ে যায় না। গণভোট কোনো পবিত্র দলিল নয়, আর ‘হ্যাঁ’ ভোট কোনো সরকার বা কমিশনকে সীমাহীন constituent power দেয় না। গণভোটের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে সংসদের আইনগত কর্তৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সংসদকে প্রকাশ্য বিতর্ক, জনশুনানি, বিশেষজ্ঞ মতামত, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং প্রস্তাবভিত্তিক ভোটের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
এখানেই জুলাইয়ের ভবিষ্যৎ সাফল্য বা ব্যর্থতার আসল পরীক্ষা। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি আবার প্রতিপক্ষ নিষিদ্ধ করা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মাঠ পরিষ্কার করা, মবকে নৈতিক বৈধতা দেওয়া, সমষ্টিগত শাস্তি প্রয়োগ করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান পরিবর্তনের পথে যায়, তাহলে অভিনেতা বদলাবে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলাবে না। জুলাইয়ের বিচার করতে হলে দেখতে হবে, বাংলাদেশ কি ব্যক্তি ও দলের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখেছে? অপরাধের বিচার কি প্রমাণের ভিত্তিতে হচ্ছে? রাষ্ট্রীয় বাহিনী কি রাজনৈতিক নির্দেশে নাগরিক হত্যা থেকে বিরত থাকার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে? পুলিশ, আদালত, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কি দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়েছে? বিরোধী মত কি নিরাপদ? সংখ্যালঘু, নারী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সাধারণ নাগরিক কি আইনগত সুরক্ষা পাচ্ছে? ক্ষমতা কি শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরের নিয়মিত পদ্ধতি তৈরি হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
(লেখক: শিক্ষক ও গবেষক)