‘নৈতিক স্খলনের’ দায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের পর প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি সংসদ সদস্য পদ হারাচ্ছেন, নাকি ওই পদে বহালই থাকছেন?
গত দেড় দশকে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন এমন একাধিক সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন নজির।
বহিষ্কারের পর কোনো এমপি স্বপ্রণোদিত হয়ে সংসদ সদস্য পদ ছেড়েছেন। আবার দেখা গেছে উলটো চিত্রও।
দল থেকে বহিষ্কারের পরও আইনি ও রাজনৈতিক ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে পূর্ণ মেয়াদই এমপি হিসেবে টিকে গেছেন কেউ।
ভিন্ন ভিন্ন নজিরের কারণেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য হিসেবে টিকে থাকা না থাকার বিষয়টি।
এখন দেখার বিষয়, জামায়াতে ইসলামের মনোনয়নে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচিত হওয়া গাজী নজরুলের বিষয়টি সমাধান হয় কোন উপায়ে।
আলোচনার কেন্দ্রে ভিডিও ফাঁস
একজন নারীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিতর্কিত ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরপরই তোলপাড় শুরু হয় পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বাংলাদেশের ইন্টারনেট দুনিয়ার আনাচে-কানাচে ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো।
একদল এই ঘটনাকে একজন এমপির নৈতিক স্খলন হিসাবে দেখছেন। অন্যদিকে ভিডিও ফাঁসের মাধ্যমে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নও তুলছেন আরেকদল।
বিতর্কের এই ঝড়ের মুখেই দলীয় এমপিকে নিয়ে তড়িৎগতিতে ‘সাংগঠনিক তদন্ত’ শেষ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
“তদন্তেই তার নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়,” আলাপ-কে বলেন দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকেও জানানো হবে বলে জামায়াতে ইসলামীর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী? সংসদ সদস্য কেউ থাকতে পারবেন কি পারবেন না, তা ঠিক করা হবে কীভাবে?
সংসদ সদস্য থাকা না থাকা নিয়ে কী বলা আছে সংবিধানে?
কোনো সংসদ সদস্য কীভাবে পদ হারাবেন, তা উল্লেখ করা আছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে।
সেখানে বলা হয়েছে, “কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।”
কিন্তু এখানে বহিষ্কারের কথা উল্লেখ নেই। তাই দল কাউকে বহিষ্কার করলে তখন কী হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে অতীতে। তখন সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ টেনে আনারও নজির আছে।
৬৬ অনুচ্ছেদের এক অংশে বলা হয়েছে, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে কিনা, সে সম্পর্কে কোন বিতর্ক দেখা দিলে শুনানী ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে।”
শেখ হাসিনার পরিবার ও ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করে ২০১৪ সালে বিতর্কের কেন্দ্রে আসেন তখনকার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।
আওয়ামী লীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করার পর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য স্পিকারকে চিঠি পাঠানো হয়। লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্পিকার আবার চিঠি পাঠান প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে।
নির্বাচন কমিশন ব্যাখ্যা চায় আওয়ামী লীগ ও লতিফ সিদ্দিকীর কাছে। দুই পক্ষই যুক্তি হাজির করে। এরমধ্যে পার হয়ে যায় প্রায় এক বছর। অবশেষে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন লতিফ সিদ্দিকী।
এরপর ২০১৯ সালে সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা দেখা যায় সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে নিয়ে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাকসুর সাবেক এই ভিপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিজয়ী হন। কিন্তু নির্বাচনের পর ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন সুলতান মনসুর। এরপরই ‘দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ’ এনে তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে বহিষ্কার করা হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি থেকেও।
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর একাদশ সংসদের পুরো মেয়াদই এমপি পদ টিকিয়ে রাখেন।
গাজী নজরুল কি সংসদ সদস্য থাকবেন?
উপরের দুই দৃষ্টান্ত থেকেই প্রশ্ন আসছে, বহিষ্কারের পরও গাজী নজরুল ইসলাম যদি স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ না ছাড়েন তাহলে কি তিনি টিকে থাকবেন?
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা আইনজীবী শিশির মনির মনে করছেন, এই অবস্থার পর সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারবেন না গাজী নজরুল।
বুধবার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিকস্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।”
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘বহিষ্কার’-এর বিষয় পরিষ্কার না থাকলেও ব্যারিস্টার ওমর ফারুক মনে করছেন, ওই ধারাবলেই সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না গাজী নজরুল ইসলাম।
“পদত্যাগ করা মানে দলে না থাকা। আবার বহিষ্কার মানেও দলে না থাকা।”
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, বিদ্যমান কাঠামোতে দলীয় পরিচয়ে এমপির ’দলত্যাগ’ বা ‘বহিষ্কার’- যেকোনো ক্ষেত্রেই তিনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না।
তবে এইক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন মতামত দিয়েছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
তিনি বলেছেন, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা, সেখানে বলা আছে যদি কোন সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করেন বা দলের বিপক্ষে ভোট দেন তাহলে তিনি সদস্য পদ হারাবেন।”
“তাকে বহিস্কার করা হয়েছে, তিনি পদত্যাগ করেননি। দুটো বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই,” ফেইসবুকে লিখেছেন তিনি।
গাজী নজরুলে এমপি পদ থাকা না থাকার বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদও টেনে এনেছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার বা পদে থাকার যোগ্যতা, অযোগ্যতা বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। নৈতিক স্খলনের বিষয়ে বলা আছে ৬৬(১)(ঘ) অনুচ্ছেদে। কিন্তু সেটি আদালত কর্তৃক সিদ্ধান্ত হতে হবে। সেরকম কোন সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে নেই।”
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলছেন, “তবে, সংবিধানের এই দুই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যার বাইরে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এখানে নৈতিক স্খলনের বিষয় আছে। সেক্ষেত্রে তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কিনা তা নির্ধারণের জন্য অনুচ্ছেদ ৬৬(৪), সংসদ সদস্যের বিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ১৯৮০ এর ৩ ধারা এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি এর ১৭৮ বিধি মোতাবেক মাননীয় স্পীকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করবেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।”