রাশেদ-সামান্তার তোপ: আমির হামজাসহ চাপে জামায়াত

পাঁচই নভেম্বর রাতে দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটল। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন। একই রাতে কুষ্টিয়ার জামায়াত এমপি আমির হামজার কথোপকথন দাবি করে ফেসবুকে একটি অডিওর লিংক দিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন। একজন জোটের ভেতর থেকে, আরেকজন সরকারের ভেতর থেকে, দুজনেই জামায়াতের কাছে জবাব চাইছেন।

জবাব যিনি চাইছেন, সেই রাশেদকে একসময় ছাত্রলীগের নেতারা 'শিবির রাশেদ' বলে আক্রমণ করতেন। আর সামান্তা প্রায় এগারো মাস দলের ভেতরে লিখিত আপত্তি জানিয়ে অবশেষে বেরিয়ে এলেন।

রাজনীতিতে কঠিন সময় পার করছে জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরের গণহত্যা ও গণধর্ষণে দলটির তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশ্ন আজও পিছু ছাড়েনি। সেই ইতিহাসের ভার নিয়েই নির্বাচনের আগে জামায়াত ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলেছিল। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ইশতেহার প্রকাশের দিন দলের আমীর কর্মজীবী মায়েদের জন্য পাঁচ ঘণ্টার কর্মদিবস ও বাকি তিন ঘণ্টায় সরকারি ভর্তুকির প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। এখন নিজেদের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতাদের ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে পরীক্ষায় ফেলছে।

'শিবির' তকমা থেকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাশেদ খাঁন ছিলেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স তাকে জামায়াত-শিবিরের 'এজেন্ট' বলেন, আর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা সাকিব হাসান সুইম 'শিবির রাশেদ' বলে হুমকি দেন। সে সময়কার প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠিত হয় কেবল ছাত্রলীগ নেতাদের এই অভিযোগ ও হুমকি, জামায়াতযোগের কোনো প্রমাণ নয়। একই বছর শেখ হাসিনাকে কটূক্তির অভিযোগে এক ছাত্রলীগ নেতার করা মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে তিনি গণঅধিকার পরিষদ গঠনে ভূমিকা রাখেন, দলটির সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেন, আর  গেলো জুলাইয মাসে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর দায়িত্ব পান।

অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও একটি অডিও

এখন সেই রাশেদই জামায়াতের সবচেয়ে প্রকাশ্য সমালোচক। ২৬শে অক্টোবর তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কয়েকজন নেতা বারিধারায় এক ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন। পরওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রমাণ চান, আর জামায়াত বিবৃতি দিয়ে একে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা বলে। 

এর আগে ১৮ই সেপ্টেম্বর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম কটাক্ষ করে বলেছিলেন, রাশেদের ‘কাজই জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে কথা বলা’। ৩১এ অক্টোবর সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে তাকে জড়িয়ে প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদে রাশেদ ফেসবুক ভিডিওতে আমার দেশ পত্রিকার কপি ছেঁড়েন, যাকে পরওয়ার ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ বলেন। 

পরদিন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ রাশেদকে ইঙ্গিত করে 'মজলুম থেকে জালিম' হওয়ার কটাক্ষ করেন। রাশেদের দাবি, ওই প্রতিবেদন ছিল তার গোয়েন্দা বৈঠকের অভিযোগের পাল্টা প্রচার। জামায়াত প্রতিবেদনটি করিয়েছে, এর স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হামজাকে নিয়ে অডিওটি এল এই প্রকাশ্য সংঘাতের মধ্যেই।

জোটের ঘরে ভাঙন

জামায়াতের জন্য আরেক ধরনের চাপ আসছে জোটের ভেতর থেকে। প্রধান শরিক এনসিপির নারী নেত্রীদের সিংহভাগই, যারা চব্বিশের আন্দোলনে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন, একে একে দল ছেড়েছেন। 

২০২৫ সালের ২৭এ ডিসেম্বর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ ছেড়ে ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন তাসনিম জারা। পদত্যাগের ঘোষণায় জামায়াতের নাম না বললেও তিনি পরে প্রথম আলোকে জানান, এনসিপি পুরোনো ধারার রাজনীতির সঙ্গে জোট বাঁধায় দলে থেকে নতুন ধারার রাজনীতি করা সম্ভব বলে তিনি আর মনে করেননি। 

পরদিন যুগ্ম আহ্বায়ক পদ ও দল ছাড়েন তাজনূভা জাবীন এবং নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়ান। তার বড় আপত্তি ছিল জোটের সমঝোতা যেভাবে চূড়ান্ত হয়েছে সেই প্রক্রিয়া এবং আস্থার সংকট নিয়ে। ২০২৬ সালের ৩রা জানুয়ারি দল ছাড়েন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। পদত্যাগপত্রে তিনি অভিযোগ করেন, নেতাকর্মীদের অন্ধকারে রেখে জোট করা হয়েছে এবং দল মধ্যপন্থার প্রতিশ্রুতি থেকে ডানপন্থার দিকে সরে গেছে।

এগারো মাসের আপত্তি, তারপর বিদায়

এই ধারাবাহিকতার সবশেষ নাম সামান্তা শারমিন। জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে তিনি আগেই রাজনৈতিক পরিষদ ও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, ৫ই নভেম্বর ঘোষণা দিয়ে দলও ছাড়লেন। তার ভাষ্য, ভেতরে থেকে তিনি প্রায় ১১ মাস লিখিত আপত্তি ও বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। 

সামান্তার অভিযোগ, এনসিপি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে না পেরে নানা ইস্যুতে জামায়াতের সহায়ক হয়ে উঠেছে। নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোণঠাসা করা এবং কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন নিয়েও তার আপত্তি ছিল। 

৩১এ অক্টোবর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের খুলনামুখী লংমার্চের উদ্বোধনী মঞ্চে এনসিপির কোনো নেতা ছিলেন না। পরে চার প্রতিনিধি গাড়িবহরে যোগ দেন, যদিও আগের দুই লংমার্চে শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছিলেন। দলের একটি সূত্র প্রথম আলোকে বলেছিল, জোটে থেকেও এনসিপি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে চায়। পাঁচদিন পর সামান্তার পদত্যাগে সেই স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রশ্নটিই আবার সামনে এল।

সাতক্ষীরার নজির, কুষ্টিয়ার প্রশ্ন

নারীঘটিত অভিযোগে জামায়াতের সমস্যা ওপরের সারিতেও দৃশ্যমান। ২০এ জুলাই রাতে সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। নজরুলের বক্তব্য ছিল, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। এলাকায় বিক্ষোভ হয়, সাবেক স্থানীয় শিবির নেতার কাছ থেকেও সমালোচনা আসে। ২২এ জুলাই জামায়াত জানায়, সাংগঠনিক তদন্তে 'নৈতিক স্খলন' প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে বিয়ের আগে ওই নারীর সঙ্গে একাধিকবার দেখা করার তথ্য পাওয়া গেছে, আর দল সেটিকে 'পর্দা লঙ্ঘন' হিসেবে দেখেছে।

কুষ্টিয়া–৩ আসনের আমির হামজাকে নিয়ে রাশেদের দাবি, নারীসংক্রান্ত কিছু অডিও ও ভিডিও তিনি পেয়েছেন এবং নিজে যাচাই করেছেন। প্রকাশিত কথোপকথনে একজনকে অনুতাপ প্রকাশ করতে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলতে শোনা যায়, কিন্তু কী ঘটেছিল তা ওই অংশে স্পষ্ট নয়। কণ্ঠটি আমির হামজার কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত হামজা বা জামায়াতের আনুষ্ঠানিক জবাবও পাওয়া যায়নি। সাতক্ষীরার নজির তাই একটি প্রশ্ন তোলে: কুষ্টিয়ার অভিযোগ যাচাই করতে দল কী করবে, আর যাচাইয়ের ফল কীভাবে জানাবে?

ওপরে-নিচে একই প্রশ্ন

একদিকে যেমন টপ টিয়ারের নেতারা নারীঘটিত ব্যাপারে ফাঁসছেন, তেমনি রোকন কিংবা মাঠপর্যায়ের জামায়াত নেতারাও একই ধরনের ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় না থেকেও দলটির অন্তত পাঁচজন স্থানীয় নেতা গত দুই বছরে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা বা যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা কিংবা গ্রেপ্তারের মুখে পড়েছেন। 

রংপুরের মিঠাপুকুরে বালারহাট ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক সহসভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসনাত রতন এক নারী ইউপি সদস্যের ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হন (২০এ মে ২০২৫); উপজেলা জামায়াতের এক নেতা জানান, দল তাকে বহিষ্কার করেছে। 

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে মাধবখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মাহাবুব ধর্ষণচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার হন (১৭ই জুলাই ২০২৬)। পটুয়াখালী সদর উপজেলা যুব জামায়াতের সভাপতি শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক নারী ধর্ষণ ও জোর করে গর্ভপাত ঘটানোর অভিযোগে মামলা করেন (২২শে জুলাই)। 

রাজশাহীর পবায় বড়গাছী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের রোকন ওমর ফারুক এক শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন (পয়লা অগাস্ট)। আর চাঁদপুরের কচুয়ায় আশ্রাফপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের আমির নুরুল আলম এক মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন (১৪ই সেপ্টেম্বর)।

এটি সংবাদপত্রে আসা ন্যূনতম সংখ্যা, দলব্যাপী প্রবণতার প্রমাণ নয়। মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও যাচাই করা যায়নি। তাই মূল প্রশ্নটা সংখ্যার নয়, প্রক্রিয়ার। অভিযোগ উঠলে দল কীভাবে যাচাই করে, কাকে বহিষ্কার করে, আর কেন।

শিবিরের নৈতিকতার মাপকাঠি

এই প্রশ্নের একটি পাশের চিত্র দেখা যায় শিবিরের নিজের সিদ্ধান্তেও। ২০২৫ সালের মার্চে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা শিবিরের সেক্রেটারি মাইনুল ইসলাম পলাশ এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় জনতার হাতে আটক হওয়ার পর নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হন। 

আবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের ঘটনাটি দেখায় মাপকাঠির অস্পষ্টতা। ৩০শে সেপ্টেম্বর শিবিরের নেতারা প্রকাশ্যে আনেন যে, আম্মার শিবিরের 'সাথী' ছিলেন এবং 'পদবাণিজ্য'সহ নৈতিক স্খলনের অভিযোগে এক বছর আগে সেই পদ হারিয়েছেন। 

শিবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। আম্মারের নিজের ভাষ্যে প্রকাশ্য চিঠিতে এসেছে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ও অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার মতো অভিযোগ, যা তিনি অস্বীকার করেছেন। শিবিরের আরেক নেতা অবশ্য কারণ বলেছেন আরও সংক্ষেপে: অনিয়মের অভিযোগে সদস্যপদ স্থগিত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পর তিনি তা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বহিষ্কার। 

একটি বিষয় এখানে স্পষ্ট থাকা দরকার, সিদ্ধান্তটি ছাত্র সংগঠন শিবিরের, জামায়াতের নেতাদের নয়। আর 'অবাধ মেলামেশা' প্রকাশ্যে আসা অভিযোগগুলোর একটি, বহিষ্কারের একমাত্র ঘোষিত কারণ নয়। আম্মারের পাল্টা যুক্তিও ভাবার মতো। তার দাবি, শিবির সাধারণত নারী-কেলেঙ্কারির কারণে কাউকে বহিষ্কার করে না। 

প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জবাব কোথায়

এসবের মাঝখানে জামায়াতের অবস্থান কোথায়, সেটাও বড় প্রশ্ন। দেশজুড়ে একের পর এক মাদ্রাসায় শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনায় দলটি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। ৩রা অক্টোবর আমির বলেছিলেন, 'দুই-একটি অঘটনের' জন্য গোটা আলেম সমাজ বা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক নয়। 

পয়লা নভেম্বর জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স জানায়, দশ মাসে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগে তারা ২৭৪ জন ভুক্তভোগীকে নথিভুক্ত করেছে, যাদের ১৮০ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী। আবাসিক শিক্ষার্থীরা নিরাপদে কার কাছে অভিযোগ করবে আর প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি কীভাবে হবে, এই প্রশ্নে দলের অবস্থান ধোঁয়াশায়।

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনেও একই অসম্পূর্ণতা। ৫ই নভেম্বর জামায়াত ১৫ দফা দেয়, অগ্নিসংযোগের নিন্দা করে এবং কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী নাশকতায় উসকানি দিয়েছে কি-না, তার তদন্ত চায়। কিন্তু আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নে, অর্থাৎ শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি কত হওয়া উচিত, প্রকাশিত দাবিতে দল কোনো অঙ্ক জানায়নি। (এর আগে ২রা নভেম্বর রাশেদ খাঁন মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় উসকানির অভিযোগ তুলে আমিরকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিলেন, আর ৪ঠা নভেম্বর শফিকুর রহমান শ্রমিকদের দাবি দ্রুত মানতে বলেছিলেন)। নিজের এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ কীভাবে যাচাই হবে, আবাসিক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কে দেখবে, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত হবে, এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাবেই বোঝা যাবে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে।

শেষ কথা: ফাঁস করা অডিও আর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন

তবে শেষ কথাটা জামায়াতকে নিয়ে নয়, এই গল্পের শুরুর ঘটনাটি নিয়েই। রাশেদ খাঁন এখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী, সচিব পদমর্যাদার একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি আমির হামজাকে নিয়ে ফেইসবুকে যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন এবং যে অডিও প্রকাশ করেছেন, তা থেকে প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাষ্ট্রের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কি আগের মতোই রয়ে গেছে? অডিওটি কীভাবে তার হাতে এল, তা এখনো অজানা। কিন্তু একজন ক্ষমতাসীন কর্মকর্তা যদি কারও ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেন, তাহলে ব্যক্তিস্বাধীনতা বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। 

মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষার দিক থেকে এটি অনৈতিক, আইনের দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ। জনপ্রতিনিধির আচরণ জনস্বার্থের বিষয় এবং জামায়াতের কাছে স্বচ্ছ জবাব চাওয়া পুরোপুরি ন্যায্য, কিন্তু সেই জবাব চাওয়ার পথ যদি হয় ব্যক্তিগত অডিও ফাঁস, তাহলে আজ যে লক্ষ্য, কাল সে-ই হতে পারে অন্য কেউ, এমনকি আজকের প্রকাশকারীও। আমরা তো এই গণতন্ত্রের মধ্যেও প্রাইভেসি রক্ষার জন্যই লড়ে যাচ্ছি, তাই না?


তন্ময় ইমরান একজন লেখক ও সংবাদকর্মী

[মতামত লেখকের নিজস্ব]