ছোটকালে পড়া এক শিক্ষামূলক কৌতুক বলি। শিশুদের স্কুল। স্কুলের একটি রুম অনেক কিছু দিয়ে সাজানো। যেমন ফুল, ফুটবল, খেলার ব্যাট, ছবি, দেয়াল ঘড়ি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, গিটার, বাঁশি, খেলনা গাড়ি এমন আর কী। শিশুদের একজন একজন করে রুমে ঢোকানো হলো। কেউ কিছু জিনিস নেড়ে চেড়ে দেখলো। যে ফুটবল নিতে চাইলো, তার সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে সে বড় হয়ে খেলাধুলায় ভালো করবে। যে গিটার বাজালো বা নিতে চাইলো তার সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে বড় হয়ে সে মিউজিশিয়ান হতে পারে। কিন্তু গোল বাধলো এক শিশুকে নিয়ে। সে তখনই সবকিছু তার বাসায় নিয়ে যেতে চাইলো। এই শিশুর সম্পর্কে ধারণা বড় হয়ে সে মন্ত্রী বা রাজনীতিবিদ হতে পারবে।
এখানে কোনো একটা নিতে চাওয়া এক জিনিস আর সবটা নিতে চাওয়া আরেক জিনিস। তবে একটা কারণে কলেজ জীবনের বাংলার শিক্ষককে এখনও খুব মনে পড়ে। কারণ তিনি আমাকে ইংরেজি দুটো শব্দের খাঁটি বাংলা শিখিয়েছিলেন।
ইংরেজি শব্দ দুটি হচ্ছে ‘সিম্পটম’ আর ‘সিনড্রোম’। ডাক্তারি ভাষায় পড়ানো হয় বিভিন্ন রোগের লক্ষণসমূহ। প্রত্যেক রোগের আলাদা আলাদা লক্ষণ বা সিম্পটম আছে। তেমনই আমাদের উপর জেঁকে বসে আছে ‘সিনড্রোম’।
সিনড্রোম তাহলে কী? সবচেয়ে সহজ উদাহরণ রাজনীতি। তবে তার আগে ছোট্ট আরেক উদাহরণ। বাংলার শিক্ষককে মনে করার কারণও এই সিনড্রোম। স্যার বলেছিলেন ইদিপাসের গল্প। বাবার হত্যাকারী হিসেবে জন্মের পরে ইদিপাসকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সে বেঁচে থাকে, দূরের এক বনের কাছে লালিত পালিত হয়।
বড় হবার পরে একযুদ্ধে তার বাবা লাইয়ুস তার হাতে নিহত হন। মা’র সাথে তার বিয়েও হয় যার নাম জোকস্তা এবং ঘটনা জানার পর নিজে অন্ধ হয়ে যান ইদিপাস। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের জনক খ্যাত সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাহেবের মতে ছেলে শিশুরা তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত তার মাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, বাবার প্রতি ঈর্ষাবোধ করে। ফ্রয়েড সাহেব এটার নাম দিয়েছিলেন ‘ইদিপাস কমপ্লেক্স’।
মেয়ে শিশুরা বাবাকে ভালোবাসে বলে এটাকে বলা হয় ‘ইলেকট্রা কমপ্লেক্স’। ইদিপাস কমপ্লেক্স থেকেই এসেছে ‘ইদিপাস সিনড্রোম’। প্রথমে যে কৌতুক বলা হলো সেখানে যে শিশু সব নিয়ে বাসায় যেতে চাইলো সে আসলে কোন সিনড্রোমে ভুগছে? সরাসরি বলে দেওয়া যেতো যে ‘ইশরাক সিনড্রোম’। আরো ভালো ভাবে বলে দেওয়া যায় যে ‘ক্ষমতার সাইড ইফেক্ট সিনড্রোম’।
কোনো না কোনোভাবে এই সিনড্রোম অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। হাজার বছর আগে থেকেই এমন উদাহরণ আছে। ৫০০ বছর আগের ঘটনা। ধরুন বাদশা হুমায়ুন। তার পিতা বাবর তখনও বেঁচে আছেন। বাবর ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করেছেন। এই আনন্দে যুবরাজ হুমায়ুন দিল্লি ও আগ্রায় থাকা ইব্রাহিম লোদীর কোষাগার লুট করেন, যেখানে কোহিনুর হীরাও ছিল। অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। বাবর সাহেবের পায়ের নিচে সেসব সোপর্দ করেছিলেন হুমায়ুন। যদিও বাবর তা ছেলেকেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। হুমায়ুন যখন গুজরাটের বাহাদুর শাহকে পরাজিত করেন তখনও এক সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা বিশাল ধনরত্ন লুট করেন। আসলে ক্ষমতার সিনড্রোমই এমন কিংবা ‘পৃথিবীতে রাজারাই সব, পৃথিবীতে রাজাদের ছাড়া জমে না তো কোনো উৎসব’।
এবার ৬০-৬৫ বছরের আগের কথায় আসেন। গওহর আইয়ুব ছিলেন পাকিস্তানের নিষ্ঠুর একনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানের পুত্র। তখন পাকিস্তানের গাড়ি কারখানার মালিক বনে যান। যেটা নিয়ে সমালোচনা ছিল অনেক। গওহর আইয়ুব পরবর্তীকালে পাকিস্তানের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। ক্ষমতার সাইড ইফেক্ট কি এড়ানো যায় না?
স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের ভূমিকা কেমন ছিল? মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যেমন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কমিশন লাভ করেছিলেন, যেমন সেতার শিখতেন, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যেমন আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি কোনো একরাতে ঢাকা শহরে ‘সর্বহারা’ ধরতে নেমে পুলিশের গুলি খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
যদিও তখন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলি খেয়েছিলেন যা এখনও অনেক মানুষ বিশ্বাস করে।
সর্বহারা ধরতে যাওয়া বা বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফাকে ধাওয়া দেওয়া কি শেখ কামালের কাজ ছিল? নাকি ক্ষমতার ‘সাইড ইফেক্ট’ বা ‘রাজকুমার সিনড্রোম’ এমনই?
ক্ষমতা প্রয়োগের এই সাইড ইফেক্ট অন্তর্বর্তী সরকার ড. ইউনূসের আমলেও দেখা গিয়েছিল ঢের।
এনসিপি নেতা সারজিস আলম শত শত গাড়ির বহর নিয়ে গিয়েছিলেন নিজ এলাকায়। ছাত্রলীগে গুপ্ত থাকাকালীন তার অবস্থা কেমন ছিল আর অন্তর্বর্তীকালে সারজিস সাহেবের অবস্থা কেমন হয়েছিল?
যাইহোক, বিশাল এই গাড়িবহরের শোডাউনেও তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। বছরখানেক আগে যার চলার মতো তেমন টাকা ছিল না। সেই তিনি এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন অস্ত্রের ম্যাগজিনসহ! আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। যে যায় লংকায় সেই হতে চায় রাবন?
৯১ থেকে ৯৬ বা ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও কিছু সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তার আমলে কী দেখলাম আমরা? ক্ষমতার ‘সাইড ইফেক্ট’, ‘মিষ্টি বা ইশরাক সিনড্রোম’ তিনি পছন্দ করেননি। পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন দ্রুত। একথা এখন পুরোনো হয়ে গেছে যে মিরপুরের রাড্ডায় রাতের আধারে পঞ্চাশ বছরের পুরোনো এক চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পত্র পত্রিকা বা টেলিভিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী এই কাণ্ডের জন্য সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগ করতে বলেন এবং মিষ্টি তা করতে বাধ্য হন। মিষ্টিদের সব কাজ আসলে মিষ্টি নয়!
এরপর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেন মাদক নির্মূলে নামেন নিজস্ব পিস্তল নিয়ে। যেভাবে হামলে পড়েছিলেন সেটা নিয়েও তুমুল সমালোচনা হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। পদত্যাগ করার আগে ইশরাক হোসেন যা বলেছেন তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। মিষ্টি বা ইশরাকের এই দুই ঘটনাকে কী বলা যায়? ক্ষমতা প্রয়োগের সাইড ইফেক্ট সিনড্রোম?
রাজনীতিতে ক্ষমতাই আসল। ক্ষমতা থেকে ছিটকে গেলে চেনা রাজপথও অচেনা মনে হয়। যে রাজনীতি রাজ্য বা দেশ চালায় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় সেই রাজনীতি নিয়েই। আর তাই রাজনীতি আর ক্ষমতা হারানোর গল্প বলে বিদায় নেওয়া যায়।
মনে রাখা ভালো রাজনীতি নিয়ে কোনো নতুন গল্প নেই। আছে পুরোনো ইতিহাসের শিক্ষা নেওয়া কিংবা না নেওয়ার ব্যাপারটা।
এক. মৃত্যুর পর এক স্বৈরাচার গেছেন স্বর্গ আর নরকের প্রবেশমুখে। তিনি হাঁটাহাঁটি করে দেখলেন। স্বর্গ আর নরকের রক্ষীর কাছে জানতে চাইলেন, এখানে অর্ডার পালন করার কে আছে? আমার দেশে আমি যা অর্ডার করতাম সবই হয়ে যেতো।
স্বর্গ আর নরকের রক্ষীদের একজন বললো এসব পৃথিবীতে হয়। স্বর্গ বা নরকে হয় না।
স্বৈরাচার বললেন, তাহলে আমার জন্য নরকই ভালো। পৃথিবীটা স্বর্গ মনে করে আমি নরকেই থাকবো।
দুই. এক সময়ের তুখোড় প্রেমিক প্রেমিকার পনেরো বছর পর দেখা। প্রেমিক রাজনীতি আর ব্যবসা করতো। প্রেমিকা ছিল মডেল। স্মৃতি মনে করতে করতে বাসায় গেলো তারা। প্রেমিক আইসক্রিম এনে বললো-
-মনে আছে এই আইসক্রিম তুমি কতটা ভালোবাসতে?
-বাসতাম। কিন্তু এখন আর খাই না।
-(প্রেমিক) কীভাবে পারলা?
-(প্রেমিকা) উইল পাওয়ার!
প্রেমিক এবার হাভানা চুরুট নিয়ে এলো। নিজে ধরিয়ে বললো-
-মনে আছে তুমি এটা আমাকে খেতে শিখিয়েছিলে? তুমিও ধরাও।
-না। এখন আর খাই না।
-কীভাবে সম্ভব?
-ওই যে উইল পাওয়ার।
এরপর আঠারো বছরের পুরোনো হুইস্কি নিয়ে এলো প্রেমিক। প্রেমিকা জানালো সে মদ পান করা বাদ দিয়ে দিয়েছে। তার আছে উইল পাওয়ার। বিদায় নেবার আগে প্রেমিকা খুব রোমান্টিক ভাবে বললো পনেরো বছর আগের মতো একবার নেবে আমাকে?
প্রেমিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো এখন আর সম্ভব না। আমি ‘পাওয়ার ফেইলর’ সিনড্রোমে ভুগছি!
রাজনীতিতে একবার ‘পাওয়ার ফেইলর’ সিনড্রোমের দেখা মিললে ফিরে আসা খুব কঠিন। কোনো ওষুধে আর কাজ হয় না!
লেখক: সাংবাদিক
[মতামত লেখকের নিজস্ব]