বুড়ো কর্তা মারা যাচ্ছেন। দেশসুদ্ধ মানুষের চিন্তা, তিনি চলে গেলে তাদের কী হবে! শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা হলো, কর্তা ভূত হয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে থাকবেন। মানুষও নিশ্চিন্ত। নিজের ভাবনা নিজে ভাবার দায় নেই। বরং যারা ভাবতে যায়, তাদের জন্য আছে ভূতের কানমলা। রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’ গ্রন্থের ‘কর্তার ভূত’ গল্পে একসময় প্রশ্ন ওঠে, এই শাসন আর কত দিন? কর্তার কাছে মুক্তি চাইতে গেলে, তিনি বলেন, ‘‘তোরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।’’ কিন্তু ছাড়তে যে ভয় করে! কর্তা বলেন, ‘‘সেইখানেই তো ভূত।’’
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশের একাংশের সবসময়েই যে আপত্তি, তার ১০ শতাংশ মানুষের মনস্তত্ত্ব আসলে এই গল্পটি দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বড় অবলম্বন। তার গান গাওয়া কিংবা জন্মবার্ষিকী পালনের সঙ্গে নিজের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অধিকার জড়িয়ে গিয়েছিল। বাঙালির মুসলমান পরিচয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিরোধ আছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিপরীতে রবীন্দ্রচর্চা পেয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের শক্তি।
সেই পাকিস্তানি কর্তারা বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের সাংস্কৃতিক সন্দেহের ভূতটি পুরোপুরি যায়নি। এ দেশের মানুষের একাংশের ঘাড়ে সেটি এখনো বসে আছে। রবীন্দ্রনাথকে দেখলেই যারা হিন্দুয়ানি কিংবা মুসলমানের পরিচয় হারানোর ভয় দেখতে পান, তাদের কথায় পুরোনো কর্তাদের কণ্ঠস্বর ফিরে আসে। শাসকের পতন ঘটলেই তার আনুগত্যের লোক ও ভাবধারার পতন সহসা ঘটে না। বাংলাদেশে যারা ভারতবিরোধী রাজনীতি করেন, তাদেরও খই ভাজার একটি বড় উপলক্ষ রবীন্দ্রনাথ।
তবে এটিকেই আজকের রবীন্দ্রবিরাগের প্রধান বা একমাত্র কারণ বলে বসলে ভুল হবে। রবীন্দ্রনাথকে অপছন্দ করা প্রত্যেক তরুণ পাকিস্তানপ্রেমী নন। কারও সাহিত্য বা গান ভালো না লাগা রাজনৈতিক অপরাধও নয়। ব্যক্তিগত অপছন্দ কখন সমবেত ক্রোধ হয়ে ওঠে, একজন কবিকে আক্রমণ করে মানুষ আসলে কাকে প্রত্যাখ্যান করে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। সেখানে জাতীয়তাবাদ যেমন আছে, তেমনি আছে শ্রেণি, পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্যবাজার এবং মানুষের ক্ষোভকে পণ্য বানানোর ডিজিটাল ব্যবস্থা।
বিতর্কের শুরু দেশভাগেরও আগে
রবীন্দ্রবিতর্ক পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবিষ্কার নয়। রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকতেই তার ভাষা, সাহিত্যরুচি, রাজনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তার অবস্থান সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বাংলার ঐক্যের পক্ষে গান লিখেছেন, রাখিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতৃত্বের একটি অংশ নতুন প্রদেশে শিক্ষা, চাকরি ও প্রশাসনিক সুযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখেছিল। একই ঘটনাকে দুই সামাজিক অবস্থান থেকে ভিন্নভাবে দেখার এই বাস্তবতা বাদ দিলে ইতিহাস বোঝা যায় না।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সমালোচনা করা তাই বৈধ ঐতিহাসিক আলোচনা। কিন্তু ১৯০৫ সালের অবস্থানকে সরাসরি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ বিরোধিতা বলা সময়ের ব্যবধান মুছে ফেলে। রবীন্দ্রনাথ মারা যান ১৯৪১ সালে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। তার রাজনীতির সমালোচনা করতে হলে তার নিজের সময়, লেখা ও কাজের ভিত্তিতেই করতে হবে।
এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, অনেক রবীন্দ্রবিরোধী তার বঙ্গভঙ্গ রদের পক্ষের অবস্থানকে এভাবেও ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না!
অন্যসব আলাপ বাদ দিলেও, বঙ্গভঙ্গ না হলে যে বরং আরও অনেক বৃহৎ ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল, সে কথা তারা ভাবেননি, নাকি বেমালুম চেপে যান সেটা বলা মুশকিল।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সাহিত্যিক বিদ্রোহকেও আবার ধর্মীয় বিরোধিতা বলা যাবে না। বিংশ শতকের বিশের দশকে কল্লোলের তরুণেরা নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতা, শরীর, সংশয় ও ভাষা নিয়ে লিখতে চাইছিলেন। ১৯২৬-২৭ সালের দিকে বাংলা সাহিত্যজগতে 'কল্লোল' ও 'কালিকলম' গোষ্ঠীর তরুণ লেখকদের বিরুদ্ধে প্রবীণ ও রক্ষণশীল সাহিত্যিকদের যে "অশ্লীলতার" অভিযোগ ও আক্রমণ শুরু হয়েছিল, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক অমল হোম ছিলেন তার অন্যতম প্রধান অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। পরবর্তী বিতর্কের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্যধর্ম’ ও ‘সাহিত্যে নবত্ব’ প্রবন্ধ আসে। জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণায় এই সংঘাতের বিবরণ আছে। এখানে প্রশ্ন ছিল, সাহিত্যে নতুনত্বের বিচার কে করবেন এবং কোন অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যযোগ্য মনে করা হবে।
বড় লেখকের প্রভাব পরবর্তী লেখকদের ভাষা তৈরিতে সাহায্য করে, আবার তার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনও তৈরি করে। এই দ্বন্দ্ব সাহিত্যের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অতিক্রম করতে চাওয়া এবং তাকে বাঙালির সংস্কৃতি থেকে বহিষ্কার করতে চাওয়া আলাদা রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক প্রকল্প। আজকের বিতর্কে এই পার্থক্যটি প্রায়ই হারিয়ে যায়।
দেশভাগের পর আটটি উল্লেখযোগ্য পর্ব
দেশভাগের পর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ঠিক কতবার ‘বড় ঝামেলা’ হয়েছে, তার সর্বসম্মত হিসাব নেই। রাষ্ট্রীয় নিষেধ, সাহিত্যিক তর্ক, জাতীয় সংগীত বিতর্ক ও স্থাপনায় হামলা এক ধরনের ঘটনা নয়। তবু পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসে আটটি উল্লেখযোগ্য পর্ব ধরে বিষয়টি বোঝা যায়। এটি সম্পূর্ণ ঘটনাপঞ্জি বা একই উদ্দেশ্যে সংঘটিত আটটি আক্রমণের তালিকা নয়।
১.পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংঘাত
১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ধর্মকে প্রধান ভিত্তি করার চেষ্টা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। এই পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের হিন্দু পরিচয় এবং পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তার সংযোগকে সন্দেহের বিষয় করা হয়। ভাষা আন্দোলনের সব ঘটনাই রবীন্দ্রবিতর্ক ছিল না, কিন্তু মাতৃভাষার অধিকার এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্ন একই রাজনৈতিক পরিসরে এসেছিল। ছায়ানটের নিজস্ব ইতিহাসেও প্রতিষ্ঠার পটভূমি হিসেবে এই সাংস্কৃতিক চাপের কথা আছে।
২. জন্মশতবর্ষে প্রতিরোধের সংগঠন
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপন সরকারি বৈরিতার মধ্যেও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একত্র করে। সেই অভিজ্ঞতার ধারায় ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়। সুফিয়া কামাল, সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্যোগে রবীন্দ্রচর্চা সংগঠিত নাগরিক প্রতিরোধের শক্তি পায়। তবে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক পরিসর রবীন্দ্রসংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নজরুলসংগীত ও অন্যান্য সংগীতধারার চর্চাও তার কার্যক্রমে জায়গা পায়।
৩. বেতারে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন পাকিস্তানের আদর্শের সঙ্গে অসংগত বিবেচিত রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ এবং অন্য রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার কমানোর নীতির কথা জানান। এর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিবাদ হয়। ঘটনাটিকে সংক্ষেপে ‘রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ’ বলা হলেও সিদ্ধান্তের ভাষার এই পার্থক্য মনে রাখা দরকার। রাষ্ট্র কোন গানকে নিজের আদর্শের উপযুক্ত বলবে, সেই কর্তৃত্বই হয়ে উঠেছিল বিরোধের কেন্দ্র।
৪. স্বাধীনতার পর জাতীয় পরিচয়ের পুনর্বিন্যাস
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আন্দোলনে “আমার সোনার বাংলা” গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায় এবং স্বাধীন দেশে জাতীয় সংগীত হয়। এরপর বিশেষত ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতিযোগিতা রবীন্দ্রনাথের প্রতীকী অবস্থানকে নতুনভাবে প্রভাবিত করে। এটি এক দিনের নিষেধাজ্ঞা নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্ব। জাতীয় পরিচয়ে ভাষা, ভূখণ্ড ও ধর্মের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে তর্কের ভেতর রবীন্দ্রনাথও ফিরে আসেন।
৫. রমনার বটমূলে হামলা
২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এটি কেবল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক ছিল না, ছিল বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ। রবীন্দ্রসংগীত যে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ, সেটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল বলেই ঘটনাটি এই ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক। একটি সাংস্কৃতিক পরিসরে হামলা এবং কোনও লেখকের সাহিত্য নিয়ে আপত্তিকে এক পাল্লায় রাখা যায় না।
৬. জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা ও গণহত্যার প্রতীক হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তোলেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা জানান, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই। জামায়াতে ইসলামীও আযমীর বক্তব্যকে দলের অবস্থান নয় বলে জানায়। একজনের বক্তব্যকে গোটা সরকার কিংবা সব সমর্থকের অভিন্ন সিদ্ধান্ত বলা তাই ঠিক হবে না।
৭. শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িতে হামলা
২০২৫ সালের জুনে শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়ির মিলনায়তন ও দপ্তরে ভাঙচুর হয়। সংবাদ প্রতিবেদনে দর্শনার্থীর সঙ্গে প্রবেশমূল্য বা পার্কিং নিয়ে বিরোধ এবং মারধরের অভিযোগকে তাৎক্ষণিক পটভূমি বলা হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা নিন্দনীয়, কিন্তু তদন্তসাপেক্ষ উদ্দেশ্যকে আগেই নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রবিরোধিতা বলা যাবে না। এই ঘটনাও দেখায়, রবীন্দ্রনাথের নাম যুক্ত হলে স্থানীয় বিরোধ দ্রুত জাতীয় সাংস্কৃতিক সংঘাতে রূপ পেতে পারে।
প্রতিরোধের রবীন্দ্রনাথ থেকে রাষ্ট্রের রবীন্দ্রনাথ
পাকিস্তান আমলে বামপন্থী ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। কিন্তু তাকে শুধু বাম রাজনীতির সম্পত্তি বললে জাতীয়তাবাদী, উদারপন্থী এবং দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা শিল্পীদের ভূমিকা বাদ পড়ে। একইভাবে বামপন্থীদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের শ্রেণিগত অবস্থান ও জমিদার পরিচয় নিয়ে সমালোচনার ইতিহাস আছে। রবীন্দ্রচর্চার রাজনৈতিক জগৎ কখনোই পুরোপুরি একরঙা ছিল না।
স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি বদলায়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের প্রতীক রাষ্ট্রের নিজের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠেন। জাতীয় সংগীত, পাঠ্যপুস্তক, সরকারি অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তার উপস্থিতিকে নিয়মিত করে। এই পরিবর্তনে তার সাহিত্য নতুন পাঠক পায়। পাশাপাশি তাকে প্রশ্নাতীত জাতীয় আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগও তৈরি হয়। প্রতিরোধের স্মৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব একই প্রতীকের মধ্যে বাস করতে শুরু করে।
আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখেছে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ আওয়ামী লীগের আগে ও বাইরে বিস্তৃত একটি ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথও কোনও দলের সম্পত্তি নন। দীর্ঘ শাসনকালে দল, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে গেলে শাসকবিরোধী ক্ষোভ সাংস্কৃতিক প্রতীকের ওপর পড়তে পারে। তখন কবির লেখা না পড়েও তাকে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রতিনিধি মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। এটি রাজনৈতিক ব্যবহারের ফল, লেখকের রচনার স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যেও স্বাধীন ভূখণ্ড, নাগরিকত্ব এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করার যুক্তি আছে। এর সব সমর্থককে পাকিস্তানপ্রেমী বলা অসংগত। তবে এই পরিচয় নির্মাণে মুসলমান ও বাঙালিয়ানাকে প্রতিপক্ষ করা হলে পুরোনো সাংস্কৃতিক বর্জনের প্রবণতা ফিরে আসতে পারে। বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয়কে অনিবার্য শত্রু বানানো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও একজন মানুষের জীবনে দুটি পরিচয় পাশাপাশি থাকা সম্ভব।
সাহিত্যের রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ নিজে কোথায়
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে রাজনীতি বুঝতে তার নিজের লেখার রাজনীতিও পড়া দরকার। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে স্বদেশপ্রেম, ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সম্পর্ক আছে। সন্দীপের উত্তেজক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে নিখিলেশের নৈতিক আপত্তি দেশকে ভালোবাসার অধিকার অস্বীকার করে না। বরং দেশের নামে অন্য মানুষের স্বাধীনতা ও জীবিকা বিপন্ন করার প্রশ্ন তোলে। ‘গোরা’-তে ধর্মীয় পরিচয়ের দৃঢ় বিশ্বাস নড়ে ওঠে জন্মপরিচয়ের উন্মোচনে। ‘চার অধ্যায়’ বিপ্লবী সংগঠনের কর্তৃত্বের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ককে অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে আনে।
‘ন্যাশনালিজম’ বক্তৃতামালায় রবীন্দ্রনাথ সংগঠিত জাতীয় স্বার্থের নামে মানুষের ওপর ক্ষমতার বিস্তারের সমালোচনা করেছেন। তার দেশপ্রেম এবং আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের প্রতি সংশয় পাশাপাশি ছিল। ফলে তাকে কোনও জাতীয়তাবাদী দলের প্রস্তুত মুখপাত্র বানালে তার চিন্তার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে। যে কবির গান জাতীয় আন্দোলনের শক্তি হয়েছে, সেই কবিই জাতীয় আবেগকে নৈতিক বিচারের ঊর্ধ্বে তুলতে রাজি ছিলেন না।
আজকের পাঠকের কাছে এর তাৎপর্য আছে। কোনও প্রতীকের জনপ্রিয়তা তার ব্যবহারকারীদের সব কাজের বৈধতা দেয় না। রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া কোনও ব্যক্তির গণতান্ত্রিক আচরণের নিশ্চয়তা নয়। আবার ধর্মীয় আচার পালন করাও তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রবীন্দ্রবিরোধী বানায় না। শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মানুষের রাজনৈতিক আচরণ বিচার করতে আলাদা প্রমাণ লাগে। সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নৈতিক সনদ হিসেবে ব্যবহার করলে এই সাধারণ কথাটিই ভুলে যেতে হয়।
তার জমিদার পরিচয়, নারী চরিত্রের নির্মাণ, গ্রামীণ সমাজ দেখার অবস্থান কিংবা সাহিত্যের মানদণ্ড নিয়ে আপত্তি তোলা যায়। কিন্তু জীবন ও রচনার জটিলতা যাচাই না করে একটি পরিচয় থেকে সব সিদ্ধান্ত টানা সমালোচনাকে দুর্বল করে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মর্যাদা যেমন দায়মুক্তি নয়, তেমনি তার সামাজিক সুবিধাও প্রতিটি রচনাকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করে না। সাহিত্যের রাজনীতি বলতে কে কথা বলছেন, কাদের অভিজ্ঞতা দৃশ্যমান হচ্ছে এবং কারা বাইরে থাকছেন, সেই প্রশ্নগুলোকে একসঙ্গে পড়তে হয়।
শৈশবের গল্পে ভারত ও মুসলমান পরিচয়
রবীন্দ্রনাথকে অনেকে প্রথমে সাহিত্যে পান না, পান অন্যের মুখে। পরিবার, বন্ধু, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আলোচনা থেকে শোনেন তিনি কাদের কবি, কাদের শত্রু। শৈশবে শেখা এই পরিচিতি পরবর্তী পাঠের ছাঁকনি হতে পারে। আগে থেকেই কাউকে মুসলমানবিরোধী মনে হলে তার লেখার একটি বিচ্ছিন্ন বাক্য সহজে অভিযোগের প্রমাণ হয়ে ওঠে। বিপরীত উদাহরণ তখন ব্যতিক্রম বলে সরিয়ে দেওয়াও সহজ হয়।
তবে মুসলমান পরিবার বা ধর্মীয় শিক্ষাকে এককভাবে এই মনোভাবের উৎস বলা যাবে না। বাংলাদেশের অসংখ্য মুসলমানই রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী, শিক্ষক, পাঠক ও গবেষক। সমস্যা ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, পরিচয়কে সাংস্কৃতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করায়। ‘মুসলমান হলে রবীন্দ্রনাথকে কেন পড়বে’ এবং ‘বাঙালি হলে রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে’, দুটি বাক্যই ব্যক্তির বিচারক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাও বৈধ। সীমান্ত, পানি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভের দায় রবীন্দ্রনাথের ওপর চাপাতে হলে কবি, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দলের মধ্যে কৃত্রিম সমতা তৈরি করতে হয়। ১৯৪১ সালে মৃত একজন লেখক আজকের দিল্লির নীতিনির্ধারক নন। তবু জনতার রাগের জন্য জটিল রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের চেয়ে পরিচিত একটি মুখ অনেক সময় বেশি কার্যকর লক্ষ্য।
বাংলা পরিভাষা নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ঘরের বই এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা
শিক্ষিত বাঙালির ঘরের বইয়ের তাকের একটি পরিচিত ছবি কল্পনা করা যায়। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’, ‘সঞ্চয়িতা’, ‘গীতবিতান’ বা ‘গল্পগুচ্ছ’; নজরুলের ‘সঞ্চিতা’ ও ‘অগ্নিবীণা’; শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ বা রচনাবলি; বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’; জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ বা ‘রূপসী বাংলা’। বাংলাদেশের পরিসরে এর সঙ্গে জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’, সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ এবং প্রজন্মভেদে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসও যুক্ত হতে পারে।
এটি সব বাঙালি পরিবারের বইয়ের তালিকা কিংবা জরিপভিত্তিক জনপ্রিয়তার ক্রম নয়। অনেক ঘরে ধর্মীয় বই, পুঁথি, গোয়েন্দা কাহিনি, অনুবাদ বা অন্য ধরনের সাহিত্যই প্রধান। কিন্তু প্রথম তালিকাটির বইগুলো একটি বিশেষ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের চিহ্ন হতে পারে। এগুলো পড়া হয়, উপহার দেওয়া হয়, উত্তরাধিকারেও পাওয়া যায়। কখনো বইয়ের উপস্থিতি তার নিবিড় পাঠের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়।
এখানে কাজে লাগে সমাজতাত্ত্বিক ধারণা ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’। শিক্ষা, ভাষাভঙ্গি, শিল্পজ্ঞান ও রুচি সামাজিক মর্যাদা এবং স্বীকৃতির সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রসংগীত জানা বা কবিতা উদ্ধৃত করতে পারা কোনও পরিসরে সহজে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিতে পারে। কিন্তু এই সুবিধা থেকে বলা যায় না, বাংলাদেশের সব অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক এলিট রবীন্দ্রচর্চা থেকে উঠে এসেছেন। ব্যবসা, আমলাতন্ত্র, সামরিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের নিজস্ব ক্ষমতাবৃত্ত আছে।
ক্ষোভ জন্মাতে পারে যখন একটি গোষ্ঠী নিজের রুচিকে সবার যোগ্যতার মাপকাঠি করে। ব্যান্ডসংগীত, লোকগান, ওয়াজ, র্যাপ কিংবা জনপ্রিয় উপন্যাসের পাঠককে তুচ্ছ করলে সাংস্কৃতিক ব্যবধান ব্যক্তিগত অপমান হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তখন সেই অপমানের প্রতীক হয়ে যান। আবার রবীন্দ্রচর্চার সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে অভিজাততন্ত্র বলে বাতিল করলেও দীর্ঘদিনের শ্রম, জনসম্পৃক্ততা ও মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা অস্বীকার করা হয়।
একটি বাড়িতে বই কেনার অর্থ আছে, গান শেখানোর সময় আছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাতায়াতের সুযোগ আছে। অন্য বাড়িতে এগুলো নেই। প্রথম বাড়ির শিশুটি পরবর্তী জীবনে যে স্বাচ্ছন্দ্যে শিল্প নিয়ে কথা বলতে পারে, তার পেছনে ব্যক্তিগত মেধার পাশাপাশি পারিবারিক সুযোগও কাজ করে। পিয়ের বুর্দিয়ুর সাংস্কৃতিক পুঁজির ধারণা এই অর্জন ও উত্তরাধিকারের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।
কিন্তু সুযোগের পার্থক্যকে যখন জন্মগত রুচির শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়, তখন সামাজিক সুবিধা আড়াল হয়ে যায়। সেই আড়াল থেকে অপমানের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। সমাধান সংস্কৃতিচর্চার মর্যাদা কমানো নয়, আরও মানুষের কাছে পাঠাগার, সংগীতশিক্ষা ও নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। যে তরুণ প্রতিষ্ঠানের দরজায় অবজ্ঞা পেয়েছেন, তার সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হলে আগে সেই অভিজ্ঞতা শুনতে হবে। শুধু রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব বোঝালে তার অপমানের জবাব দেওয়া হয় না।
পাঠ্যপুস্তক কি কবির প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে?
একজন শিশু কবিতার আনন্দ আবিষ্কারের আগেই যদি শব্দার্থ, ভাবসম্প্রসারণ, প্রশ্নোত্তর ও পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে কবিকে পায়, সম্পর্কটি বাধ্যতামূলক হয়ে উঠতে পারে। একই নাম বারবার পড়া তখন আনন্দের নিশ্চয়তা নয়। পাঠদানের ধরন, বয়সের উপযোগিতা এবং নিজের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কবিতার একটিমাত্র ‘সঠিক অনুভূতি’ নির্ধারণ করে দিলে শিক্ষার্থী লেখার বদলে শিক্ষকের প্রত্যাশা মুখস্থ করতে শেখে।
মনোবিজ্ঞানে ‘সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাকট্যান্স’ বলে একটি টার্ম আছে। এর মানে হচ্ছে স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে মনে হওয়ার পর সেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রতিক্রিয়া। কাউকে কিছু পছন্দ করতেই হবে বলা হলে তিনি উল্টো সেটিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসা যদি সংস্কৃতিমান হওয়ার বাধ্যতামূলক শর্ত হয়, কারও ক্ষেত্রে তাকে অপছন্দ করাই নিজের স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এটিকে বাংলাদেশের তরুণদের ওপর প্রতিষ্ঠিত গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। পাঠ্যপুস্তক রবীন্দ্রবিরাগ সৃষ্টি করেছে কি না জানতে পাঠাভ্যাস, শিক্ষাদান ও রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। পরিচিতি কারও বিরক্তি বাড়ায়, আবার কারও ভালোবাসাও তৈরি করে। একই কবিতা এক শিক্ষকের ক্লাসে শাস্তির মতো লাগতে পারে, অন্য শিক্ষকের ক্লাসে ব্যক্তিগত আবিষ্কার হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া হলো কবির সঙ্গে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার সংযোগ তৈরি হওয়া। পরীক্ষার ভয়, প্রকাশ্যে অপমান কিংবা জোর করে আবৃত্তি করানোর স্মৃতি সাহিত্যের অনুভূতিকে ঢেকে দিতে পারে। পরবর্তী জীবনে কেউ সেই কবির নাম শুনে নিজের পুরোনো অসহায়তার প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করতে পারেন। এই ব্যাখ্যাগুলো সম্ভাবনা হিসেবে উপকারী, কিন্তু প্রত্যেক সমালোচককে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার উপায় নয়।
বইমেলায় মৃত কবির সঙ্গে জীবিত লেখকের প্রতিযোগিতা
বাংলাদেশের তরুণ লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ক্ষোভের আরেকটি সম্ভাব্য উৎস সাহিত্যবাজার। নতুন লেখককে পাঠকের কাছে নিজের প্রয়োজন প্রমাণ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথের নাম আগে থেকেই পরিচিত। তার একটি সংকলন প্রকাশ করলে বইটির পরিচিতি তৈরির কিছু কাজ ইতিহাসই করে রেখেছে। বিপরীতে নতুন কবির বইয়ের জন্য সম্পাদনা, প্রচার ও পাঠক তৈরিতে আলাদা উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিচিত নামকে নিরাপদ মনে করার প্রকাশনাগত প্রবণতা নতুন লেখকের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষত বইমেলার স্টল, প্রদর্শনের জায়গা, ক্রেতার সময় ও ক্রয়ক্ষমতা সীমিত। একজন তরুণ দেখতে পারেন, তার নতুন কবিতার বইয়ের পাশে আবারও ‘সঞ্চয়িতা’, ‘গীতাঞ্জলি’ বা ‘গল্পগুচ্ছের’ নতুন মলাট। তার মনে হতে পারে, জীবিত লেখকের জায়গাটিও মৃত মহীরুহ দখল করে আছেন। এটি সম্ভাব্য অভিজ্ঞতার একটি চিত্র, বিক্রির পরিসংখ্যান নয়। ‘বইমেলার বাজার রবীন্দ্রনাথের দখলে’ বলতে হলে লেখকভিত্তিক বিক্রি ও প্রকাশনার নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
এই প্রতিযোগিতা সরল যোগবিয়োগও নয়। যিনি রবীন্দ্রনাথ কিনছেন, তিনি বইটি না কিনলে অবশ্যই নতুন কবির বই কিনতেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। ক্লাসিক পড়তে এসে কেউ নতুন সাহিত্যেও আগ্রহী হতে পারেন। সমস্যা তাই কবির অস্তিত্বে নয়, নতুন লেখককে পাঠকের সামনে আনার ব্যবস্থায়। বইয়ের দোকান, সাহিত্যপাতা, সমালোচনা, গ্রন্থাগার এবং প্রকাশকের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এখানে জরুরি।
নতুন লেখকের ক্ষোভকে নিছক ঈর্ষা বলে উড়িয়ে দেওয়াও অন্যায়। স্বীকৃতির দরজা সংকীর্ণ হলে প্রতিষ্ঠিত নামকে আক্রমণ করে পরিচিতি পাওয়ার প্রলোভন তৈরি হয়। রবীন্দ্রবিরোধী চটকদার বক্তব্য তখন সাহিত্যিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত প্রচারের কাজ একসঙ্গে করতে পারে। তবে কারও সমালোচনার পেছনে বাজারি উদ্দেশ্য আছে কি না, সেটিও প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যায় না।
বাংলা ভাষা এবং আরবি ফারসির প্রশ্ন
বাংলা ভাষা উর্দু, ফারসি ও আরবির বিরুদ্ধে লড়াই করেই জন্মেছে, এমন বিবরণ ভাষার ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে। বাংলার গঠনপ্রক্রিয়া পাকিস্তানের উর্দুকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনীতির বহু শতাব্দী আগের। বাংলায় ফারসি ও আরবি উৎসের শব্দ এসেছে বাণিজ্য, প্রশাসন, ধর্ম এবং দৈনন্দিন যোগাযোগের পথে। সংঘাতের পাশাপাশি সহাবস্থান ও আদানপ্রদানও ছিল। মুসলিম শাসনামলে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাসও রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতা বিস্তৃত করেছেন। তার অর্থ বিদেশি উৎসের শব্দ মুছে ফেলা নয়। তার গানে ফারসি উৎসের ‘শরম’, ‘পেয়ালা’, ‘লাগাম’, ‘আরাম’, ‘রাস্তা’ প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার নিয়ে আলম খোরশেদের আলোচনা আছে। এই যেমন আমাদের এ প্রবন্ধটির শুরুর ‘কর্তার ভূত’ গল্পেই ‘আব্রু’, ‘ইজ্জৎ’, ‘ইমান’ পাওয়া যায়। এই শব্দগুলোর উৎস এক নয়, কিন্তু বাংলার ব্যবহারে তারা পাশাপাশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ কত গোঁড়া হিন্দু ছিলেন সেটি প্রমাণ করতে চান এ কথা বলে যে, রবীন্দ্রনাথ কখনও তার লেখায় আরবি, পারসি শব্দ ব্যবহার করেননি। তার শব্দগুলোই নাকি হিন্দুয়ানি! যদিও শব্দের উৎসকে লেখকের ধর্মীয় আনুগত্যের প্রমাণ বানানো সম্পূর্ণ অর্থহীন।
বাংলা পরিভাষা নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রবীন্দ্রসাহিত্যে মুসলমান কি কেবল অনুপস্থিত
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে আরেকটি ভিত্তিহীন অভিযোগ হলো, তার লেখায় মুসলমান প্রধান চরিত্র নেই। তার কালজয়ী গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’-এর রহমত গল্পের আবেগের কেন্দ্রে। আফগান এই ফল বিক্রেতার সঙ্গে মিনি ও তার বাবার সম্পর্কের মধ্যে দূরদেশের মানুষের পিতৃত্ব দৃশ্যমান হয়। এবার হয়তো অভিযোগকারীরা বলবেন, রহমত তো বাঙালি মুসলমান নন। তাকে দেখিয়ে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকসমাজের যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব হয়ে গেছে বলা যাবে না।
এর বিপরীতে কেউ যখন রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘মুসলমানীর গল্প’-এর হবির খাঁ এবং কমলার মেহেরজান হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ টানবেন তখন বলা হবে, হাজার হাজার গল্পের মধ্যে ওই অল্প দুয়েকটা আর কি!
অথচ আশ্রয়, জাতপাত, ধর্ম ও সামাজিক বর্জনের প্রশ্ন রয়েছে এই গল্পটির কেন্দ্রে। ‘সমস্যাপূরণ’-এর অছিমদ্দি বিশ্বাস ও মির্জাবিবির মাধ্যমে জমিদারি সম্পর্কের সঙ্গে গোপন পারিবারিক ইতিহাস জড়িয়ে যায়। মুসলমান চরিত্র সেখানে কেবল দৃশ্যপট পূরণের জন্য নেই।
‘দুরাশা’-এর নবাবকন্যার বয়ানে প্রেম, ধর্মীয় আকর্ষণ এবং আদর্শভঙ্গের অভিজ্ঞতা আসে।
সমালোচনার আরও ক্ষেত্র আছে। রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখা বা মন্তব্যে মুসলমান সম্পর্কে সাধারণীকরণ আছে কি না, থাকলে কোন সময়ে ও প্রেক্ষাপটে, তা পরীক্ষা করা যায়। তার মানবতাবাদী অবস্থানের সঙ্গে সীমাবদ্ধতা পাশাপাশি পড়াই সৎ সমালোচনা। কয়েকটি ইতিবাচক চরিত্র দিয়ে সব অভিযোগ খারিজ করা যেমন দুর্বল, তেমনি অসংখ্য রচনা উপেক্ষা করে তাকে একমাত্রিক মুসলমানবিদ্বেষী বানানোও দুর্বল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্পটি কেন এত কার্যকর
প্রচলিত অভিযোগ, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৯১২ সালের ২৮এ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। কুলদা রায় ও এম এম আর জালাল তাদের ‘কালি ও কলম’-এর প্রবন্ধে প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’, চিঠিপত্র ও হিসাবের সূত্র ধরে দেখিয়েছেন, ওই সময় রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে ছিলেন। তারা ২৮এ মার্চ শিলাইদহ থেকে জগদানন্দ রায়কে লেখা চিঠির উল্লেখও করেছেন। ফলে নির্দিষ্ট সভায় সভাপতিত্বের দাবির সঙ্গে তার অবস্থানের তথ্য মেলে না।
এই কাহিনি প্রচারের একটি চিহ্নিত সূত্র মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম এ মতিনের ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’ বই। মতিন ছিলেন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। সামরিক পদমর্যাদা রবীন্দ্রগবেষণার প্রমাণ নয়। তার বইয়ের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা ও ব্যবহৃত সূত্র পরীক্ষা না করে তাকে কাহিনিটির প্রথম উদ্ভাবকও অবশ্য বলা ঠিক হবে না।
অভিযোগটি আবেগগতভাবে কার্যকর, কারণ এটি শিক্ষার অধিকার এবং মুসলমানের ঐতিহাসিক বঞ্চনাকে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাজায়। কিন্তু কোনও অভিযোগ মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়া তার ঐতিহাসিক সত্যতার বিকল্প নয়। ভুল তথ্য খণ্ডন করলে প্রকৃত বৈষম্যের ইতিহাস অস্বীকার করা হয় না। বরং সঠিক সমালোচনাকে মিথ্যার বোঝা থেকে মুক্ত করা হয়।
‘অ্যাংগারটেইনমেন্ট’ কীভাবে কাজ করে
গত এক দশকে সামাজিক মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ কিংবা তার কাজ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে বহুবার।
এড কোপারের ‘Angertainment: How Social Media Outrage Ruined Everything’ বইয়ে লেখক দেখিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভকে মনোযোগ, অর্থ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবে কীভাবে রূপান্তর করা হয়। ‘অ্যাংগারটেইনমেন্টে’, অ্যাংগার অর্থাৎ রাগ এবং এন্টারটেইনমেন্ট বা বিনোদন মিলেছে। রাগ বা ক্ষোভ এখানে শুধু অনুভূতি নয়, নিয়মিত দেখা, ভাগ করা এবং উপভোগ করার বিষয়ও।
কেউ একটি উত্তেজক অভিযোগ তুললেন। সমর্থকেরা শেয়ার করলেন নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য। বিরোধীরা শেয়ার করলেন প্রতিবাদ করতে। মন্তব্যের পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে আরও মানুষ এলেন। মূল দাবির সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই বক্তার পরিচিতি বেড়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে ভুল সংশোধনের চেয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি করা তার কাছে বেশি লাভজনক মনে হতে পারে।
উইলিয়াম ব্র্যাডি ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের পর সামাজিক পুরস্কার এবং গোষ্ঠীর প্রচলিত আচরণ পরবর্তী ক্ষোভ প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ কেবল রাগ প্রকাশ করে না, কোন ধরনের রাগে স্বীকৃতি মেলে তা-ও শেখে। এই গবেষণাটি থেকে বাংলাদেশের সব তরুণের রবীন্দ্রবিরাগের কারণ নির্ধারণ করা যাবে না। এটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি বোঝার সহায়তা দেয়।
কেননা রবীন্দ্রনাথ এ ব্যবস্থায় সুবিধাজনক বিষয়। নামটি প্রায় সবার পরিচিত, তাকে নিয়ে আবেগ প্রবল, পক্ষবিভাজনও প্রস্তুত। তার কোনও দীর্ঘ প্রবন্ধের প্রেক্ষাপট বোঝাতে সময় লাগে। একটি চটকদার অভিযোগ বা অপমানজনক বাক্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া পায়। পাল্টা পক্ষ যখন সবাইকে অশিক্ষিত বলে আক্রমণ করে, তারাও উত্তেজনার জোগান দেয়। সাহিত্যপাঠ পিছিয়ে যায়, নিজের শিবিরকে সন্তুষ্ট করা সামনে আসে।
এখানে প্রকৃত রাগ ও অভিনীত রাগের সীমারেখাও সব সময় পরিষ্কার থাকে না। একজন প্রথমে বিশ্বাস থেকেই কথা বলতে পারেন। পরে সেই বক্তব্যে জনপ্রিয়তা পেয়ে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। অন্যজন বিতর্কে অংশ নেন প্রতিবাদের জন্য, কিন্তু ক্রমে নিজের অনুসারীদের প্রত্যাশায় আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। ফলে সবাইকে পরিকল্পিত প্রচারক না ধরেও একটি সম্মিলিত উত্তেজনার ব্যবস্থা কীভাবে টিকে থাকে, তা বোঝা সম্ভব।
এ ব্যবস্থায় তথ্য সংশোধন প্রয়োজনীয়, তবে সেটিই যথেষ্ট নয়। কারও কাছে একটি অভিযোগ তার নিজের অপমান বা বঞ্চনার প্রতীক হয়ে গেলে অভিযোগটির ভুল দেখানোকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা অস্বীকার হিসেবে নিতে পারেন। তাই দুই কাজ একসঙ্গে দরকার: ভুল ইতিহাস সংশোধন এবং যে বাস্তব ক্ষোভের ওপর ভুলটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি শোনা। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন বলে মিথ্যা প্রচার খণ্ডন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রবেশের অসম সুযোগ নিয়ে তরুণদের প্রশ্নটিও রাখতে হবে।
পপুলিজম বা জনরঞ্জনবাদের সহজ বিভাজন
পপুলিজম বা জনরঞ্জনবাদকে শুধু জনপ্রিয় কথা বলা হিসেবে দেখলে ধারণাটি অসম্পূর্ণ থাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাস মুডের সংজ্ঞায় সমাজকে নৈতিকভাবে বিশুদ্ধ ‘জনগণ’ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ‘এলিট’, এই দুই বিরোধী গোষ্ঠীতে ভাগ করা এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। জনতার একক ইচ্ছার প্রতিনিধি হওয়ার দাবিও এতে থাকে।
রবীন্দ্রবিতর্কে এই ছক প্রয়োগ করলে একদিকে দাঁড় করানো যায় ‘সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি’, অন্যদিকে ‘এলিটের চাপানো রবীন্দ্রনাথ’। শ্রেণিগত বৈষম্যের বাস্তব অভিজ্ঞতা তখন একটি পরিচিত প্রতীকের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষও নানা রুচি ও বিশ্বাসের মানুষ। তাদের মধ্যে রবীন্দ্রপ্রেমী যেমন আছেন, তেমনি অনাগ্রহীও আছেন। কারও পছন্দ তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের বাইরে নিয়ে যায় না।
একইভাবে রবীন্দ্রনাথের পক্ষ নিয়ে সকল সমালোচককে সংস্কৃতির শত্রু ঘোষণা করলে প্রশ্ন করার জায়গা সংকুচিত হয়। জাতীয় কবি, বিশ্বকবি বা জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হওয়া কোনও লেখককে ঐতিহাসিক পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেয় না। তবে সমালোচনার স্বাধীনতা ভুল তথ্য ছড়ানোর দায় থেকেও কাউকে অব্যাহতি দেয় না।
জনরঞ্জনবাদের আরেকটি সুবিধা হলো, জটিল সমস্যার জন্য সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়া যায়। নতুন লেখকের প্রকাশক না পাওয়া, পাঠকের হাতে বই কেনার অর্থ কম থাকা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিচিতির প্রভাব, প্রতিটি সমস্যার আলাদা সমাধান দরকার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে সরালেই জায়গা খালি হবে বললে একটি মুখের বিরুদ্ধে সহজে ক্ষোভ সংগঠিত করা যায়। সেই চেহারা সরলেও প্রতিষ্ঠানের অস্বচ্ছতা বা বাজারের সংকীর্ণতা থেকে যেতে পারে।
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে রক্ষার আলোচনা যদি কেবল তার সম্মান রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তা যথেষ্ট হয় না। কারা প্রকাশিত হচ্ছেন, কারা পুরস্কার পাচ্ছেন, কাদের ভাষাকে শুদ্ধ বলা হচ্ছে এবং কাদের অভিজ্ঞতা সাহিত্যপাতায় জায়গা পাচ্ছে, সেসব প্রশ্নও জরুরি। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিজের কাজের জবাবদিহি না করে শুধু মহান লেখকের মর্যাদার আশ্রয় নিলে কবির ওপর জমতে থাকা ক্ষোভের একটি উৎস অক্ষত থাকে।
ভূত ছাড়ানোর কাজটি কার
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তরুণদের সব ক্ষোভের একটিমাত্র উৎস নেই। কারও মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সাংস্কৃতিক সন্দেহ কাজ করতে পারে। কারও ক্ষোভ রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে, কারও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি, কারও সাহিত্যবাজারে প্রবেশের বাধা নিয়ে। আবার কেউ সত্যিই তার সাহিত্য পছন্দ করেন না। এই ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে এক করে ফেললে রাজনৈতিক স্লোগান পাওয়া যায়, ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
সুস্থ আলোচনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে পড়ার সুযোগ যেমন প্রয়োজন, তাকে ভালো না বাসার অধিকারও প্রয়োজন। নতুন লেখকের জন্য জায়গা দরকার, প্রতিষ্ঠিত লেখককে মুছে ফেলার নির্দেশ নয়। মুসলমান চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দরকার, চরিত্র নেই বলে মিথ্যা প্রচার নয়। জাতীয় পরিচয় নিয়ে তর্ক দরকার, কবিকে বর্তমান কোনও রাষ্ট্রের দূত বানানো নয়।
‘কর্তার ভূত’ গল্পের শক্তি এখানেই। কর্তৃত্ব শুধু বাইরে থেকে চাপানো হয় না, ভয় ও অভ্যাসের মধ্যেও টিকে থাকে। রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্নাতীত করে রাখার অভ্যাস যেমন বিচারক্ষমতা সংকুচিত করতে পারে, তেমনি তাকে ঘৃণা করার উত্তরাধিকারও পারে। ভূত ছাড়ানোর কাজটি তাই নিজের ভাবনা নিজে ভাবার। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসি কি না, তার আগে দেখা দরকার, আমার ভালোবাসা কিংবা রাগের ভাষাটি আসলে কার শেখানো।
প্যারাডক্সিকাল রবীন্দ্রনাথ
২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় মূলত ‘আদর্শ প্রকাশনী’ ও ‘নালন্দা প্রকাশনী’কে কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপ নিয়ে বড় ধরনের গোলযোগ শুরু হয়। তৎকালীন সরকারের নীতি ও উন্নয়নের সমালোচনা করে বই প্রকাশের দায়ে বাংলা একাডেমি শুরুতেই ‘আদর্শ প্রকাশনী’কে মেলায় স্টল বরাদ্দ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পেছনে মূলত লেখক ফাহাম আব্দুস সালামের ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ‘অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবনীয় কথামালা’ এবং জিয়া হাসানের ‘উন্নয়ন বিভ্রম’- এই তিনটি বই বিক্রি নিয়ে একাডেমির তীব্র আপত্তি ছিল। এর পাশাপাশি, মেলা চলাকালে ১৪ই ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির টাস্কফোর্স কমিটির নির্দেশে ‘নালন্দা প্রকাশনী’র স্টল থেকে প্রবাসী লেখিকা জান্নাতুন নাঈম প্রীতির লেখা ‘জন্ম ও যোনির ইতিহাস’ বইটি ‘নীতিমালার পরিপন্থী এবং ব্যক্তিগত আক্রমণমূলক’, এমন যুক্তিতে নিষিদ্ধ করে মেলা থেকে তুলে নেওয়া হয়।
মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বইমেলায় এ ধরনের সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথের একটি অস্থায়ী ভাস্কর্য স্থাপন করেন। ভাস্কর্যটিতে রবীন্দ্রনাথের মুখে টেপ লাগানো ছিল এবং তার হাতে থাকা গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে পেরেক ঠোকা ছিল। এটি ছিল মুক্তচিন্তা ও বাক্স্বাধীনতার ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিবাদ।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাস্কর্যটি সরিয়ে দেয়। পরে ভাঙা অংশ উদ্ধার করে সেটি পুনঃস্থাপন করা হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, ভাস্কর্য স্থাপনের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগ রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আইডল হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। সেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধেই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের ভাষা। আরও মজার বিষয় হলো, তখন একটি পক্ষ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে বেছে নেওয়ায় জোরালো সমর্থন দিয়েছিল। সেই সমর্থন দেওয়া পক্ষেরই একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রবীন্দ্র-সমালোচনায় মুখর। এটি ‘কনফিউসিয়াজম’ (বিভ্রান্তিবাদ, যদিও এটি পলিটিক্যাল সায়েন্সে মূলধারার শব্দ নয়), চীনা ‘কনফুসিয়াজম’ নয়।
শেষ কথা
রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও অন্য দেশের জাতীয় সংগীত লেখার নজির আরও দুইজনের আছে। যেমন, নাইজেরিয়ার জাতীয় সংগীতের কথা লিখেছেন ব্রিটিশ নাগরিক লিলিয়ান জিন উইলিয়ামস। আর স্কটিশ অভিবাসী পিটার ডডস ম্যাককরমিক লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীত। সেসব নিয়ে এত হইচই দেখবেন না কখনো।
মজার বিষয় হলো, যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকও ছিলেন না, স্বাধীন ভারতেরও ছিলেন না। তিনি জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায়। সেই হিসেবে তিনি ব্রিটিশ প্রজা ছিলেন। তাই তর্ক জিততে ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কার প্রদান-অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে ‘অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কবি’ বলার প্রসঙ্গ টেনে তাকে কেউ কেউ ‘ব্রিটিশ’ও বলতে পারেন। আর কে না জানে, ব্রিটিশ বলতে আমরা বুঝি ‘জিলাপির প্যাঁচ’!
তন্ময় ইমরান একজন লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী
[মতামত লেখকের নিজস্ব]