স্মরণে ১৭৭৮: হুগলির কালো কালি থেকে স্ক্রিনের নীল আলো— বাংলা মুদ্রণ অক্ষরের আড়াইশো বছরের যাত্রা

একবার ভাবুন তো— আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি হঠাৎ যদি বাংলা লিখতে না পারে? ফেসবুকের পোস্ট বাংলায় হবে না, মেসেঞ্জারে ‘কেমন আছো?’ লেখা যাবে না, ইউটিউবের বাংলা শিরোনাম পড়া যাবে না। কিবোর্ডে আঙুল ছুটবে, কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে উঠবে না একটি বাংলা অক্ষরও। একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে, তাই না?

আমরা যারা আজ বুড়ো আঙুলের কয়েকটি টোকায় সেকেন্ডের মধ্যে স্ট্যাটাস লিখে ফেলি, মিম শেয়ার করি, রিলের ক্যাপশন দিই কিংবা প্রিয় মানুষকে বাংলায় ‘ভালোবাসি’ লিখে পাঠাই—তারা হয়তো খুব কমই ভাবি, এই ডিজিটাল বাংলা এত সহজে আমাদের হাতে এল কীভাবে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের স্ক্রল করতে হবে না—ফিরে যেতে হবে প্রায় আড়াইশো বছর পেছনে। কোনো ওয়াই-ফাই নেই, কোনো স্মার্টফোন নেই, এমনকি বিদ্যুতের আলোও নেই। আছে শুধু একটি ছাপাখানা, ধাতব অক্ষর, কালো কালি এবং কিছু মানুষের অসম্ভব ধৈর্য।

সাল ১৭৭৮। তারিখ ৬ সেপ্টেম্বর। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এমন এক যাত্রা, যার শেষ এখনো হয়নি—বরং যার সর্বশেষ অধ্যায়টি হয়তো আপনি এই মুহূর্তে নিজের স্ক্রিনেই পড়ছেন। হুগলির কালো কালি থেকে আপনার ফোনের নীল আলো—বাংলা অক্ষরের সেই যাত্রার বয়স আজ প্রায় আড়াইশো বছর।

১৭৭৮: বাংলা অক্ষরের মুদ্রণযুগে প্রবেশ

সময়টা আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগের কথা, ১৭৭৮ সালের এই দিন ৬ সেপ্টেম্বর। স্থান—অবিভক্ত বাংলার হুগলি, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা। তখন ছিলো না স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট কিংবা ডিজিটাল কিবোর্ড। বাংলা ভাষার অধিকাংশ লেখা ছড়িয়ে পড়তো হাতে লেখা পুঁথির মাধ্যমে। একটি লেখা নকল করতে সময় ও শ্রম লাগত, আর তা সীমিত সংখ্যক মানুষের কাছেই পৌঁছাতে পারতো। এই বাস্তবতায় বাংলা হরফকে যান্ত্রিক মুদ্রণের উপযোগী করে তোলার কাজ ছিল যুগান্তকারী। চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের প্রচেষ্টায় বাংলা হরফ ধাতব টাইপে রূপ পেতে শুরু করে। বাংলা লিপির বাঁক, মাত্রা, কারচিহ্ন ও যুক্তাক্ষরকে ক্ষুদ্র ধাতব ছাঁচে রূপ দেওয়া ছিল অত্যন্ত জটিল ও শ্রমসাধ্য কাজ। অসীম ধৈর্য, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং নিখুঁত কারিগরির মাধ্যমে বাংলা অক্ষর প্রথমবারের মতো যন্ত্রের সঙ্গে এক নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে। সেদিন কেবল কিছু অক্ষর তৈরি হয়নি; বাংলা ভাষার সামনে খুলে গিয়েছিল জ্ঞান ও যোগাযোগের নতুন এক দিগন্ত।

পুঁথি থেকে মুদ্রিত বই: জ্ঞানের বিস্তার

মুদ্রণপ্রযুক্তির আগে জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারের প্রধান মাধ্যম ছিলো হাতে লেখা পুঁথি। ফলে বইয়ের সংখ্যা সীমিত ছিল এবং জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ার গতিও ছিল ধীর। মুদ্রণযন্ত্র এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে দেয়। একটি লেখা একবার মুদ্রণের উপযোগী হয়ে গেলে তার বহু কপি তৈরি করা সম্ভব হলো। বই, পাঠ্যপুস্তক, ধর্মীয় রচনা এবং নানা ধরনের জ্ঞানমূলক লেখা বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেল। বাংলা মুদ্রণ তাই শুধু বই তৈরির প্রযুক্তি ছিল না; এটি ছিল জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। জ্ঞান আর কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকলো না।

 মুদ্রণ থেকে সংবাদপত্র: জনমত ও সাংবাদিকতার উত্থান

মুদ্রণপ্রযুক্তির বিস্তার পরবর্তীকালে সংবাদপত্রের জন্মের পথ তৈরি করে। ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকির বেঙ্গল গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এ অঞ্চলে সংবাদপত্রের নতুন যুগ শুরু হয়। সংবাদপত্র শুধু খবর প্রকাশের মাধ্যম ছিল না; এটি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল। অন্যায়, দুর্নীতি ও শাসকের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা সম্ভব হয়েছিল। এই স্বাধীনচেতা সাংবাদিকতার মূল্যও হিকিকে দিতে হয়েছিল কারাবরণ ও প্রেস বাজেয়াপ্ত হওয়ার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে দিগদর্শন, সমাচার দর্পণ, রাজা রামমোহন রায়ের সংবাদ কৌমুদী এবং মিরাতুল আখবার জ্ঞানচর্চা ও সমাজসংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। যে বাংলা অক্ষর একসময় হাতে লেখা পুঁথির পাতায় সীমাবদ্ধ ছিলো, তা এখন সমাজসংস্কার, শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমতের বাহনে পরিণত হলো।

মুদ্রণ ও নতুন পাঠকসমাজের জন্ম

মুদ্রণযুগের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিলো নতুন পাঠকসমাজের সৃষ্টি। বই ও সংবাদপত্র সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে পড়ার অভ্যাস বাড়তে থাকে। মানুষ নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়, প্রশ্ন করতে শেখে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মতামত গঠন করতে শুরু করে। বাংলা নবজাগরণের চিন্তা, শিক্ষা ও সংস্কারের বিস্তারের পেছনেও মুদ্রণপ্রযুক্তির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক অর্থে বাংলা মুদ্রণ শুধু বই নয়— পাঠকও তৈরি করেছে। সেই পাঠকসমাজই পরবর্তীকালে নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করেছে, নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে এবং সমাজের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

 ধাতব হরফ থেকে আধুনিক ছাপাখানা

বাংলা অক্ষরের প্রযুক্তিগত যাত্রা ধাতব টাইপেই থেমে থাকেনি। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে ছাপাখানার প্রযুক্তিও পরিবর্তিত হয়েছে। হাতে সাজানো হরফের যুগ পেরিয়ে এসেছে যান্ত্রিক কম্পোজিং, টাইপরাইটার এবং আধুনিক অফসেট প্রিন্টিং। প্রথম যুগে একটি পৃষ্ঠা ছাপাতে প্রতিটি অক্ষর আলাদা করে সাজাতে হতো। পরবর্তীকালে প্রযুক্তি সেই কাজকে দ্রুত ও সহজ করে দেয়। কিন্তু প্রযুক্তি যতই বদলাক, বাংলা অক্ষরের সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। বাংলা লিপির বাঁক, মাত্রা এবং যুক্তাক্ষরের জটিলতা তাকে একটি অনন্য লিপিতে পরিণত করেছে।

 কম্পিউটারের যুগ: অক্ষর যখন কোড

বিশ শতকের শেষভাগে কম্পিউটারের আগমন বাংলা অক্ষরের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় তৈরি করে। ধাতব হরফের যুগে অক্ষর ছিলো স্পর্শযোগ্য—তাকে হাতে সাজানো যেত, কালিতে ডুবিয়ে কাগজে ছাপা যেত। কিন্তু কম্পিউটারের যুগে বাংলা অক্ষর ধীরে ধীরে ডিজিটাল সংকেতে রূপ নেয়। অক্ষর এখন আর শুধু সীসায় নয়—অক্ষর এখন কোডেও। প্রথমদিকে বাংলা কম্পিউটিংয়ের নানা সীমাবদ্ধতা ছিলো। বিভিন্ন ফন্ট ও সফটওয়্যারে বাংলা লেখা সবসময় একইভাবে দেখা যেত না। যুক্তাক্ষর ও কারচিহ্নের সঠিক ডিজিটাল উপস্থাপনও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতি বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল জগতে আরও শক্তিশালী অবস্থান এনে দেয়।

ইউনিকোড থেকে স্মার্টফোন: ডিজিটাল বাংলার বিস্তার

ইউনিকোডভিত্তিক ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে বাংলা অক্ষর আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পরিবেশে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে বাংলায় লেখা সম্ভব। একজন মানুষ স্মার্টফোন থেকে কয়েক সেকেন্ডে একটি লেখা তৈরি করে তা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ, অনলাইন সংবাদপোর্টাল, ই-বুক এবং ডিজিটাল ম্যাগাজিন বাংলাকে নতুন পাঠক ও নতুন পরিসর দিয়েছে। ১৭৭৮ সালের ধাতব টাইপ যেন আজ ডিজিটাল কোডে নতুন জীবন পেয়েছে।

সীসার টাইপ থেকে অ্যালগরিদমের যুগ

এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটেছে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। মুদ্রণযুগ ছিলো অনেকটাই ‘সম্পাদকের যুগ’। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সম্পাদনা ও প্রুফ দেখার মতো বিভিন্ন ধাপ পার হতে হতো। বস্তুনিষ্ঠতা, তথ্যের সত্যতা এবং সম্পাদকীয় প্রজ্ঞা সংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিলো। আজ ডিজিটাল প্রযুক্তি সংবাদ প্রকাশকে বহুগুণ দ্রুত করেছে। একটি ঘটনা ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একজন সাধারণ মানুষও এখন একই সঙ্গে পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং কখনো কখনো সংবাদদাতা। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে নতুন সংকট। কোন সংবাদ মানুষের সামনে আসবে, কোন বিষয় বেশি ছড়িয়ে পড়বে এবং কোন শিরোনাম বেশি ক্লিক পাবে—এসব ক্ষেত্রে অ্যালগরিদম, ক্লিক, স্ক্রিন-টাইম এবং ব্যবহারকারীর মনোযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় তথ্যের সত্যতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে ক্লিকবেইট বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রযুক্তি বদলেছে, সত্যের প্রয়োজন বদলায়নি

আড়াইশো বছর আগে মুদ্রণপ্রযুক্তি তথ্য ও জ্ঞানকে সীমিত নিয়ন্ত্রণ থেকে বৃহত্তর মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তিও তথ্যপ্রকাশকে আরও গণতান্ত্রিক করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে যাচাইহীন তথ্য, বিভ্রান্তি এবং অ্যালগরিদমনির্ভর তথ্যপ্রবাহের নতুন চ্যালেঞ্জ। আজ তাই সাংবাদিকতার সামনে প্রশ্ন হলো—কীভাবে প্রযুক্তির গতি গ্রহণ করা যাবে, কিন্তু সত্য ও দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা হারানো যাবে না? প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু স্বাধীন চিন্তা ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রয়োজন বদলায়নি।

কালি থেকে কোড: বাংলা অক্ষরের অভিযোজন

এই আড়াইশো বছরের ইতিহাস আমাদের শেখায়, বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতা। পুঁথির যুগ থেকে ছাপাখানা, ছাপাখানা থেকে সংবাদপত্র, টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটার, কম্পিউটার থেকে স্মার্টফোন এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ—প্রতিটি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলা ভাষা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। একসময় একটি লেখা ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন হতো ছাপাখানা, ধাতব টাইপ এবং বহু মানুষের শ্রম। আজ একজন মানুষ নিজের মোবাইল ফোন থেকেই কয়েক সেকেন্ডে লেখা তৈরি করে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

মাধ্যম বদলেছে—সীসার টাইপের জায়গা নিয়েছে সিলিকন চিপ। কালো কালির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্ক্রিনের নীল আলো। কিন্তু শব্দের প্রাণ একই রয়ে গেছে।

প্রতিটি বাংলা অক্ষরে ১৭৭৮-এর স্মৃতি

হুগলির সেই কালির গন্ধমাখা মুদ্রণযাত্রা শুধু বাংলা বই বা সংবাদপত্রের ইতিহাস নয়। এটি বাঙালির জ্ঞানচর্চা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সমাজসংস্কার এবং আত্মপরিচয়ের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ আমরা কাগজের গন্ধের চেয়ে স্ক্রিনের নীল আলোতেই বেশি অভ্যস্ত। তবু গভীর রাতে ফোনের কিবোর্ডে আঙুল ছুঁইয়ে যখন কাউকে বাংলায় লিখি—‘ভালোবাসি’ কিংবা ‘কেমন আছো?’—তখন অজান্তেই আমরা যুক্ত হয়ে যাই সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার সঙ্গে। আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা ডিজিটাল বাংলার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেই কালিমাখা হাতগুলোর শ্রমে, যারা বাংলা অক্ষরকে প্রথম যন্ত্রের ভাষায় রূপ দিয়েছিল।

উপসংহার: হুগলির কালি থেকে স্ক্রিনের আলো

১৭৭৮ থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা অক্ষরের এই যাত্রা আসলে কালি থেকে কোডে পৌঁছানোর ইতিহাস। একসময় অক্ষর তৈরি হতো ধাতুর ছাঁচে, তারপর কালো কালিতে কাগজের ওপর ছাপা হতো। আজ সেই একই অক্ষর ডিজিটাল কোডে রূপ নিয়ে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের আলোকিত পর্দায় ভেসে ওঠে। তাই ১৭৭৮ কেবল একটি সাল নয়। এটি বাংলা অক্ষরের আধুনিক যাত্রার এক প্রতীকী সূচনা। হুগলির কালো কালি থেকে স্ক্রিনের নীল আলো—এই দীর্ঘ আড়াইশো বছরের পথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু ভাষার আত্মা বেঁচে থাকে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, ভালোবাসা ও প্রতিবাদের মধ্যে।

প্রযুক্তি বদলাবে। আজকের স্মার্টফোন হয়তো একদিন জাদুঘরে যাবে, কিবোর্ডের জায়গা নেবে নতুন কোনো প্রযুক্তি, আর স্ক্রিনের নীল আলোও হয়তো বদলে যাবে অন্য কোনো আলোয়। কিন্তু বাংলা অক্ষরের যাত্রা থামবে না। কারণ, ১৭৭৮ সালে হুগলির একটি ছাপাখানায় যে অক্ষর কালো কালিতে প্রথম যন্ত্রের ভাষা শিখেছিল, সেই অক্ষর আজ সিলিকন চিপের ভেতর দিয়ে আলোর গতিতে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেদিন বাংলা অক্ষর ছাপা হয়েছিল কাগজে। আজ তা জ্বলছে স্ক্রিনে। মাধ্যম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু অক্ষরের স্পন্দন বদলায়নি। তাই, প্রতিবার যখন আমরা ফোনের কিবোর্ডে একটি বাংলা বর্ণ লিখি, মনে রাখা দরকার—আমরা শুধু একটি অক্ষর টাইপ করছি না; আমরা আঙুলের ডগায় বহন করছি প্রায় আড়াইশো বছরের এক ইতিহাস।

হুগলির সেই কালো কালি যেন ইতিহাসের এক দীর্ঘ রাত—আর সেই রাতের বুক চিরে আজ আমাদের ডিজিটাল স্ক্রিনে জ্বলে ওঠা বাংলা অক্ষরগুলোর নীল আলো যেন নীল জোনাকির মতো, অন্ধকার পেরিয়ে যে বহন করে চলেছে আড়াইশো বছরের আলোর যাত্রা।


লেখক: রাজীব নন্দী, সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত। ইমেইল: rajibnandy@cu.ac.bd