২০১১ সালের নভেম্বরে কায়রোর মোহাম্মদ মাহমুদ স্ট্রিটে সেনাবাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে পঞ্চাশজনের বেশি মানুষ মারা যান। রাস্তাটা তাহরির স্কয়ার থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে গেছে, মাত্র কয়েকশো মিটার, কিন্তু সেই কয়েকশো মিটারই মিশরের রাজনৈতিক ভূগোলের সবচেয়ে বিতর্কিত জায়গা হয়ে উঠেছিল। সরকার রাস্তার মুখে কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে দিল, যাতে বিক্ষোভকারীরা তাহরির থেকে মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতে না পারে। উদ্দেশ্য ছিল সমাবেশের স্বাধীনতা রোধ করা।
কিন্তু যে কংক্রিট আটকানোর জন্য বসানো হয়েছিল, সেই কংক্রিটই পরদিন থেকে হয়ে উঠল ক্যানভাস। আম্মার আবু বকর আর আলাউদ্দিন আওয়াদ নামের দুই শিল্পী সংঘর্ষের মধ্যেই আঁকতেন, পাথর ছোড়ার ফাঁকে তুলি ধরতেন। শহীদদের মুখ আঁকা হলো ফেরাউনীয় শিল্পরীতিতে, ডানাওয়ালা, স্বর্গে আরোহণরত, প্রাচীন মিশরীয় শোকার্ত নারীদের পাশে। একটা সমাধিফলকে লেখা ছিল শহীদের নাম, মৃত্যুর তারিখ, আর নিচে একটাই বাক্য, ‘ডোন্ট ফরগেট হোয়াই আই ডাইড’। ‘ভুলে যেওনা আমার মৃত্যুর কারণ’।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা ঢাকার দেয়াল দেখেছেন, তাদের কাছে এই গল্প অচেনা লাগবে না। ভাষা আলাদা, শহর আলাদা, কিন্তু ঘটনাটা প্রায় হুবহু এক। রাষ্ট্র গুলি চালাচ্ছে, দেয়ালে ফিরে আসছে নিহতদের মুখ।
এই দেয়ালচিত্রগুলো দেখলে বোঝা যায়, গ্রাফিতি একটা বিকল্প ইতিহাসচর্চা। রাষ্ট্র যে মৃত্যুকে পরিসংখ্যানে পরিণত করে, গ্রাফিতি সেই মৃত্যুকে পরিচয় ফিরিয়ে দেয়। রাষ্ট্র যে স্মৃতিকে মুছে ফেলতে চায়, দেয়াল সেই স্মৃতিকে জনপরিসরে ফিরিয়ে আনে।
কিন্তু কায়রোর গল্প আরও লম্বা। মিশরীয় সরকার বারবার সাদা রং দিয়ে দেয়ালচিত্র মুছে দিয়েছে। শিল্পীরা পরদিন আবার এঁকেছেন। সরকার আবার মুছেছে। এই মোছা-আঁকার চক্র নিজেই একটা রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
রাষ্ট্র যখন জনপরিসরের প্রতিটি দেয়াল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, বিলবোর্ড, সরকারি বিজ্ঞপ্তি, নজরদারি ক্যামেরা, রাজনৈতিক পোস্টার। তখন সেই দেয়ালে একটা অননুমোদিত ছবি আঁকা কেবলই শৈল্পিক কাজ না, একটা রাজনৈতিক কর্ম। গ্রাফিতি সবসময়ই রাষ্ট্রের ভাষার বিপরীতে জনগণের ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
এই সংগ্রামটা কায়রোতে যেমন ঘটেছে, তেমনই ঘটেছে বার্লিনে, সান্তিয়াগোতে, হংকংয়ে, ঢাকায়। প্রতিটা জায়গায় দেয়ালের চরিত্র আলাদা, রঙের ভাষা আলাদা, ঝুঁকির মাত্রা আলাদা। কিন্তু প্রতিটা জায়গায় একটা জিনিস এক, রাষ্ট্র দেয়াল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আর মানুষ সেই নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে চায়।
২.
শহরের দেয়াল, সেতু, রেলস্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি ভবনের বহির্ভাগ কেবল কি স্থাপত্যের অংশ? না। এগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আদর্শ ও কর্তৃত্বের দৃশ্যমান প্রকাশ। কোন বক্তব্য সত্য বলে বিবেচিত হবে, কোন ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাবে, কোন প্রতীক জনসমক্ষে দৃশ্যমান থাকবে, এসবই ক্ষমতার কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত। রাষ্ট্র পতাকা, স্মৃতিস্তম্ভ, বিলবোর্ড, সরকারি বিজ্ঞপ্তি, রাজনৈতিক পোস্টার সবই নিজের করে নেয়, একইভাবে নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে জনপরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ন্ত্রণ দেয়ালের নিয়ন্ত্রণ যেমন, তেমনই মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক কল্পনারও নিয়ন্ত্রণ।
কায়রোর মোহাম্মদ মাহমুদ স্ট্রিটে এই নিয়ন্ত্রণের একটা নির্মম উদাহরণ ছিল ‘আই স্নাইপার’। সেনাবাহিনীর একজন স্নাইপার পরিকল্পিতভাবে বিক্ষোভকারীদের চোখে গুলি করত। আক্ষরিক অর্থেই দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া, যে চোখ দিয়ে মানুষ দেখে, প্রতিবাদ করে, সাক্ষী থাকে, সেই চোখকেই ধ্বংস করা। প্রতিক্রিয়ায় কিশোর বিক্ষোভকারীরা আইপ্যাচ পরতে শুরু করল সংহতির চিহ্ন হিসেবে। দেয়ালে আঁকা হলো আইপ্যাচ-পরা মুখ। রাস্তার নাম হয়ে গেল, স্বাধীনতার চোখের রাস্তা। রাষ্ট্রের কেড়ে নেওয়া চোখ দেয়াল ফিরিয়ে দিল।
গ্রাফিতিকে এসব মিলিয়ে নিশ্চিতভাবেই, যা ফুকোর ভাষায় ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা প্রতিপক্ষীয় ভাষা, তা নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার বলে স্বীকার করতে হয়। গ্রাফিতি রাষ্ট্র-অনুমোদিত ভাষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রান্তিক কণ্ঠকে দৃশ্যমান করে তোলে। তবে এই প্রতিপক্ষীয় ভাষা যেমন বিষয়বস্তুগত, তেমনই রূপগতও।
কায়রোর দেয়ালচিত্রে শহীদদের ফেরাউনীয় শিল্পরীতিতে আঁকা হয়েছে, প্রাচীন মিশরীয় সমাধি-মন্দিরের দেয়ালচিত্রের ধরনে, যেখানে শোকার্ত নারীরা সারকোফ্যাগাসের পাশে দাঁড়িয়ে, শহীদেরা দেবদূতের ডানা নিয়ে স্বর্গে উঠছে। এই রূপকল্প দুটো কাজ একসঙ্গে করে, প্রথমত, বর্তমানের সংগ্রামকে মিশরের হাজার বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থাপন করে, যা রাষ্ট্রীয় দমনের বিরুদ্ধে একটা বৈধতার ভাষা তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র যে ইতিহাসকে পর্যটনের পণ্য বানিয়ে রেখেছে, ফেরাউনীয় সভ্যতা, পিরামিড, মমি, সেই ইতিহাসকেই প্রতিরোধের হাতিয়ারে পরিণত করে।
ঢাকার দেয়ালও একই কৌশলে নিজের ইতিহাস থেকে বৈধতা নিয়েছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’, একুশের গানের এই পঙক্তি জুলাইয়ে এসে নতুন শব্দ পেল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো জুলাই।’ বায়ান্নর সঙ্গে চব্বিশকে গেঁথে দেওয়া মানে আন্দোলনকে রাষ্ট্রের চেয়ে পুরনো একটা ন্যায্যতার ধারায় দাঁড় করানো। কায়রোর শিল্পীরা ফেরাউনীয় রীতি দিয়ে ঠিক যে কাজটা করেছিলেন।
মোছার রাজনীতিটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কায়রো প্রাদেশিক সরকার মোহাম্মদ মাহমুদের দেয়ালচিত্র একাধিকবার মুছে দিয়েছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব কায়রো একদিকে দেয়ালচিত্র সংরক্ষণের কথা বলেছে, অন্যদিকে নিজেদের পুরনো বিজ্ঞান ভবন ভাঙতে গিয়ে কিছু বিখ্যাত মুর্যাল ধ্বংস করেছে। সাম্প্রতিক ‘বিউটিফিকেশন প্রজেক্টে’র নামে শহরকেন্দ্রের দেয়ালচিত্র মুছে ফেলার পরিকল্পনা হয়েছে। ‘সৌন্দর্যায়ন’ শব্দটাই এখানে একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার। রাষ্ট্রের ভাষ্যে, দেয়াল পরিষ্কার করা হচ্ছে, আসলে পরিষ্কার করা হচ্ছে স্মৃতি।
৩.
চিলির গল্পটা আরেকটু গভীরের। সেখানে দেয়ালচিত্র প্রতিবাদের ভাষার ঊর্ধ্বে একটা পুরো সাংগঠনিক কাঠামো। ১৯৪৬ সালে সান্তিয়াগোর বুলনেস স্কোয়ারে একদল নাইট্রেট খনি শ্রমিকের সমর্থনে বিক্ষোভ চলছিল। পুলিশ গুলি চালাল। বিশ বছরের কমিউনিস্ট নারী রামোনা পারা নিহত হলেন। তার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। রাজনৈতিক প্রান্তিকতার শিকার মানুষের জীবন সচরাচর নথিভুক্ত হয় না। কিন্তু তার মৃত্যু একটা প্রতীকে পরিণত হলো। ১৯৬৮ সালে চিলির কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ সদস্যরা তার নামে গঠন করলেন মুর্যালিস্ট ব্রিগেড। ব্রিগাদা রামোনা পারা। সংক্ষেপে বিআরপি।
ষাটের দশকের শেষে চিলির রাজনৈতিক উত্তাপে বিআরপি সান্তিয়াগোর দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকত। ১৯৭০ সালে সালভাদোর আইয়েন্দের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের দেয়ালচিত্র প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। শ্রমিক, কৃষক, বোল্ড আউটলাইন, প্রাথমিক রঙের বিস্ফোরণ, দেয়াল হয়ে উঠেছিল গণআন্দোলনের মুখপত্র।
তারপর ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, জেনারেল অগুস্তো পিনোশের সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট আইয়েন্দে নিহত হলেন। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হল। আনুমানিক তিন হাজার চিলিয়ান নিহত বা ‘নিখোঁজ’। বিআরপি-র সদস্যদের ওপর নেমে এলো নির্যাতন, গ্রেফতার, নির্বাসন। তাদের আঁকা প্রতিটি মুর্যাল মুছে ফেলা হলো, সাদা রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। যাকে চিলিয়ান শিল্প ইতিহাসবিদ গুইসেলা লাতোরে বলেছেন নান্দনিক সেন্সরশিপ।
এই মুহূর্তে গ্রাফিতির চরিত্র বদলে গেল। বড় মুর্যাল আঁকা অসম্ভব হয়ে পড়ল, সামরিক টহল, কারফিউ, গুপ্তচর। তখন বিআরপি-র সদস্যরা একটা ন্যূনতম ভাষা তৈরি করলেন, দেয়ালে শুধু একটা ‘R’ অক্ষর, পাশে একটা বৃত্ত, তার পাশে একটা তারা। R মানে resistance, বৃত্ত মানে ঐক্য, তারা মানে ব্রিগেডের প্রতীক।
প্রথমত, পিনোশের শাসনে সান্তিয়াগোর দেয়াল ছিল রাষ্ট্র-উৎপাদিত স্থানের সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ। দেয়ালে কী থাকবে আর কী থাকবে না, সেটা সামরিক সরকার ঠিক করত। মুর্যাল মোছা মানে শুধু রং মোছা না, এটা একটা রাজনৈতিক ইতিহাস মোছা। বিআরপি-র সেই ‘R’ অক্ষরটা ছিল এই মোছার বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রতিরোধ। পুরো বাক্য লেখার সুযোগ নেই, তাই একটা অক্ষরেই পুরো বক্তব্য চেপে দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, নির্বাসন প্রসঙ্গ। হাজার হাজার চিলিয়ান বামপন্থী ইউরোপে পালিয়ে গেলেন। সেখানে তারা আমস্টারডাম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, লিডস, মিলান, বেলগ্রেড, শিকাগোর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও থিয়েটারের দেয়ালে চিলির ম্যুরাল আঁকলেন। পঞ্চাশ বছর পর সেই ম্যুরালের চিহ্ন আজও আছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন নিজের ভূখণ্ডের দেয়াল পরিষ্কার করে ফেলল, তখন নির্বাসিতরা অন্য দেশের দেয়ালে সেই স্মৃতি স্থানান্তরিত করলেন। স্থান-তত্ত্বের এই দিকটা কম আলোচিত, স্থান কেবল দখল বা পুনর্দখলের বিষয় না, স্থান স্থানান্তরযোগ্যও। একটা দেয়ালচিত্র সান্তিয়াগো থেকে মুছে গিয়ে আমস্টারডামে জন্ম নিতে পারে।
৪.
জাক রঁসিয়ের একটা ধারণা দিয়েছেন যেটা গ্রাফিতি বোঝার জন্য অপরিহার্য। ডিস্ট্রিবিউশন অব দ্য সেন্সিবল বা সংবেদনযোগ্যের বণ্টন। তার মতে, রাজনীতি মূলত নির্ধারণ করে কে দৃশ্যমান হবে, কার কণ্ঠ শোনা যাবে এবং কে জনপরিসরে উপস্থিত থাকার অধিকার পাবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা কেবল আইন প্রণয়ন করে না, এটি দৃষ্টির সীমারেখাও নির্ধারণ করে। কে জনপরিসরের অংশ, আর কে অংশ না, এই বিভাজনটাই ক্ষমতার সবচেয়ে মৌলিক কাজ।
এই ধারণাটা বিমূর্ত শোনালেও এর সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ পাওয়া যায় স্মৃতিস্তম্ভের রাজনীতিতে। প্রতিটি শহরে কিছু মূর্তি দাঁড়িয়ে থাকে, জেনারেল, রাষ্ট্রপতি, ঔপনিবেশিক শাসক। এই মূর্তিগুলো কেবল ইতিহাসের প্রতীক কি? নিশ্চিতভাবেই না।
এগুলোই নির্ধারণ করে কার ইতিহাস দৃশ্যমান থাকবে আর কার থাকবে না। ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কনফেডারেট জেনারেলদের মূর্তিতে ‘BLM’ লেখা হলো, স্প্রে পেইন্টে ঢেকে দেওয়া হলো। রিচমন্ডে রবার্ট ই. লি-র মূর্তি, মায়ামিতে কলম্বাসের মূর্তি, প্রতিটিতে গ্রাফিতি। লিডস বেকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টম হাউসম্যান এটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, বিকৃতিকরণ একটা রাজনৈতিক কর্ম, যেখানে বর্তমানে ইতিহাসের উপস্থিতিকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়।
গ্রাফিতি এই সীমারেখা ভেঙে দেয়। রাষ্ট্র যাদের অদৃশ্য করে রাখতে চায়, নিহত ছাত্র, শ্রমিক, নিপীড়িত নারী, সংখ্যালঘু কিংবা আন্দোলনকারী মানুষ, গ্রাফিতি তাদের মুখ, নাম এবং স্মৃতিকে জনপরিসরে পুনরায় উপস্থিত করে।
কায়রোতে এটা ঘটেছে সবচেয়ে আক্ষরিক অর্থে। সেনাবাহিনীর স্নাইপার বিক্ষোভকারীদের চোখে গুলি করে দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে, দেয়ালচিত্র সেই চোখ ফিরিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র ছিল আরেকটা, ইন্টারনেট। ১৮ই জুলাই রাত থেকে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলো। কে মরছে, কোথায় গুলি চলছে, কেউ জানতে পারছে না। যে রাষ্ট্র চোখে গুলি করে না, সে চোখের সামনে থেকে তথ্যটাই সরিয়ে নেয়। এবং ঠিক তখনই দেয়াল ফিরে এল তার সবচেয়ে পুরনো ভূমিকায়, যে মাধ্যম বন্ধ করা যায় না। ফেসবুক ব্লক করা যায়, দেয়াল ব্লক করা যায় না।
চিলিতে দৃষ্টির লড়াইটা ছিল আরও দীর্ঘমেয়াদি। পিনোশের শাসনে আনুমানিক তিন হাজার মানুষকে ‘নিখোঁজ’ করা হয়েছে। তাদের মৃত্যুর কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না, সমাধি নেই, কোনো নথি নেই। তারা রাষ্ট্রের হিসাবে অস্তিত্বহীন। কিন্তু সান্তিয়াগোর দেয়ালে তাদের মুখ ফিরে এসেছে। শহীদ সংগীতশিল্পী ভিক্তর হারা, প্রেসিডেন্ট আইয়েন্দে, কবি পাবলো নেরুদা।
হার্ভার্ডের আর্কাইভে সংরক্ষিত আন্দ্রেস রমেরো স্পেথম্যানের ফটোগ্রাফগুলোতে দেখা যায়, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে সান্তিয়াগোতে শত শত প্রতিবাদী ম্যুরাল আঁকা হয়েছে, জ্বলন্ত মোনেদা প্রাসাদ, শেকলমুক্ত হাত, নিখোঁজদের প্রতিকৃতি। রাষ্ট্র যাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চেয়েছিল, দেয়াল তাদের ফিরিয়ে এনেছে। রঁসিয়েরের ভাষায় বলতে গেলে, এই দেয়ালচিত্রগুলো যারা গণনার বাইরে, যারা রাষ্ট্রের হিসাবে নেই, তাদের দৃশ্যমান করে তোলে। এই কারণেই গণআন্দোলনের সময় দেয়াল হঠাৎ করেই ইতিহাসের বিকল্প আর্কাইভে পরিণত হয়।
ঢাকার দেয়ালেও এই পুনর্বণ্টন ঘটেছে, এবং একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তকে ঘিরে। ১৬ই জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশের শটগানের সামনে। বুক পেতে দেওয়া সেই ভঙ্গি কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে ফিরে এল, রাষ্ট্রীয় ভাষ্য তখনো বলছে ‘দুষ্কৃতকারী’, আর দেয়াল আঁকছে শহীদ। মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, পানি?’, একটা সাধারণ প্রশ্ন, যেটা তার শেষ কথা হয়ে গেল, দেয়ালে লেখা হয়ে সেটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভারী অভিযোগে পরিণত হলো। কায়রোর ব্রেড বয়ের মতোই, শিল্পী গানজির এঁকেছিলেন একটা সেনা ট্যাঙ্ক, তাক করে আছে একটি সাইকেলচালক ছেলের দিকে, যে মাথায় রুটির ট্রে নিয়ে যাচ্ছে। রুটি-ওয়ালা ছেলে কায়রোর রাস্তায় দৈনন্দিন জীবিকার প্রতীক। ট্যাঙ্কের বিপরীতে সাইকেল, শটগানের বিপরীতে প্রসারিত দুই হাত, গুলির বিপরীতে পানির বোতল, তিনটি শহরে একই ব্যাকরণ। যে মানুষ রাজনৈতিক আলোচনায় অনুপস্থিত, যার কণ্ঠ শোনা যায় না, সে দেয়ালে উপস্থিত হয়ে পুরো ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এল জেফট নামের আরেক শিল্পীর ‘পিস মেশিন’ ম্যুরালের একটা মেশিনগান থেকে গুলির বদলে বেরিয়ে আসছে সাদা ঘুঘু। এখানে সহিংসতার যন্ত্রকে শান্তির প্রতীকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। যেটা শুধু একটা সুন্দর ছবি না, একটা রাজনৈতিক দাবি। দেয়ালচিত্র বলছে, আমরা এই যন্ত্রকে অন্যভাবে কল্পনা করতে পারি।
৫.
হংকংয়ের প্রসঙ্গ আনলে গ্রাফিতির চরিত্র সম্পর্কে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। ২০১৪ সালে হংকংয়ের আম্ব্রেলা আন্দোলনের সময় সরকারি ভবনের কাছে একটা দেয়ালে পোস্ট-ইট নোট লাগানো শুরু হলো। রঙিন কাগজের ছোট ছোট টুকরো, প্রতিটাতে হাতে লেখা বার্তা। এটাকে বলা হলো ‘লেনন ওয়াল’, প্রাগের সেই দেয়ালের নামে যেখানে ১৯৮০ সালে জন লেননের হত্যার পর চেক তরুণরা গান, কবিতা আর প্রতিবাদী বার্তা লিখতে শুরু করেছিল, তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে।
কিন্তু ২০১৯ সালে হংকংয়ে যা ঘটল, সেটা ২০১৪-কে ছাড়িয়ে গেল। প্রত্যাহার আইন সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল, আর তার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল লেনন ওয়াল, শহরের আঠারোটি জেলায় শতাধিক। আন্ডারপাস, স্কাইব্রিজ, মেট্রো স্টেশনের বাইরে, বাস স্টপ, শপিং সেন্টারের সামনে, এমনকি রেস্তোরাঁর ভেতরেও। পোস্ট-ইট নোটের পাশাপাশি এল স্টিকার, হ্যান্ডবিল, অরিগামি শূকর, চক ড্রয়িং, রাজনীতিকদের মুখের ছবি মেঝেতে আটকানো যাতে মানুষ তাদের ওপর দিয়ে হেঁটে যায়।
এখানে গ্রাফিতির চরিত্র আমূল বদলে গেল। চিলির বিআরপি-তে প্রশিক্ষিত ম্যুরালিস্ট দরকার ছিল, কায়রোতে আম্মার আবু বকর-আওয়াদের মতো শিল্পীরা সংঘর্ষের মধ্যে ছবি আঁকছিলেন, বার্লিনে ২১ দেশের পেশাদার শিল্পী এসেছিলেন। কিন্তু হংকংয়ে একটা পোস্ট-ইট নোট আর একটা কলম হলেই যে কেউ অংশ নিতে পারে, বৃদ্ধ, শিশু, গৃহিণী, অফিসযাত্রী, পর্যটক। কোনো শৈল্পিক দক্ষতা লাগে না। এটা গ্রাফিতিকে শিল্পীর একক কর্ম থেকে সম্মিলিত নাগরিক কর্মে রূপান্তরিত করল।
আগস্টের ঢাকাও এই দ্বিতীয় ধরনের শহর। ৫ই অগাস্টের পর যারা রং-তুলি হাতে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই জীবনে প্রথম দেয়ালে আঁকছে, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, পাড়ার কিশোর, চারুকলার সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ ছবি আঁকছে, কেউ শুধু রং ধরে দিচ্ছে, কেউ স্লোগান বানান করে দিচ্ছে। টিএসসি থেকে মেট্রোরেলের পিলার পর্যন্ত শহরটা কয়েক সপ্তাহের জন্য একটা উন্মুক্ত কর্মশালায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে অংশগ্রহণের একমাত্র যোগ্যতা ছিল উপস্থিত থাকা।
আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্ব এখানে নতুন অর্থ পায়। গ্রামশি বলতেন, রাষ্ট্র কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে না। বরং সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং প্রতীকের মাধ্যমে মানুষের সম্মতি অর্জন করে তার আধিপত্য বজায় রাখে। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফলে রাষ্ট্রের ভাষা ধীরে ধীরে সমাজের ‘স্বাভাবিক’ ভাষায় পরিণত হয়। গ্রাফিতি এই স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে পাল্টা-সংস্কৃতি নির্মাণ করে। কিন্তু হংকংয়ের লেনন ওয়াল আর ঢাকার অগাস্ট এই তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়, পাল্টা-সংস্কৃতি নির্মাণে ‘শিল্পী’ লাগে কি না? নাকি যেকোনো নাগরিকই সেই ভাষার রূপকার হতে পারেন?
২০১৪ সালের আম্ব্রেলা আন্দোলন মূলত তরুণ ও ছাত্রকেন্দ্রিক ছিল। ২০১৯-এ তা ছড়িয়ে পড়ল সব বয়স ও পেশার মানুষে। লেনন ওয়ালে শ্রমের বিভাজনও ছিল, কে উপকরণ আনবে, কে নোট লাগাবে, কোন দল ওয়াল ছিঁড়ে ফেলা হলে আবার সাজাবে। একটা স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু সংগঠিত নাগরিক কর্ম।
তবে হংকংয়ের গল্পের শেষটা অন্যরকম। ২০২০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার পর সব লেনন ওয়াল মুছে দেওয়া হলো। UNSW-র গবেষক ইয়াও-তাই লি বলেছেন, ‘তারা শুধু দেয়ালগুলোয় সুসংগত রঙ লাগিয়ে দিল, যেন কিছুই হয়নি।’
৬.
ঢাকার দেয়ালের নিজস্ব স্মৃতি আছে, এবং সেই স্মৃতি জুলাইয়ের চেয়ে অনেক পুরনো।
১৯৫২ সালে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা হয়েছিল এই শহরের দেয়ালে। চুন, আলকাতরা, যা হাতের কাছে ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে দেয়াল ছিল, একাত্তরে ছিল, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছিল। এই অঞ্চলের প্রতিটি রাজনৈতিক মোড়ে দেয়াল কথা বলেছে। ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্ররা যখন রং হাতে নামল, তারা নতুন কোনো মাধ্যম আবিষ্কার করেনি। একটা পুরনো মাধ্যমকে জাগিয়ে তুলল।
আন্দোলনের প্রথম পর্বে দেয়ালে লেখা হচ্ছিল সরাসরি স্লোগান, ‘স্টেপডাউন হাসিনা’। রাতে লেখা হতো, দিনে মুছে দেওয়া হতো, ঠিক কায়রোর মতো। পরদিন আবার লেখা হতো। এই মোছা-আঁকার চক্রই বলে দিচ্ছিল রাষ্ট্র দেয়ালকে কতটা ভয় পায়, মিছিল ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু রাতে লেখা চারটে শব্দ সকালে হাজার মানুষ পড়ে ফেলে।
তারপর ৫ই অগাস্ট, যাকে আন্দোলন নিজেই নাম দিয়েছে ৩৬ জুলাই, ক্যালেন্ডার অমান্য করাটাও এক ধরনের গ্রাফিতি, সময়ের দেয়ালে লেখা। এবং তার পরের সপ্তাহগুলোতে ঢাকা পরিণত হলো সম্ভবত পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের বৃহত্তম উন্মুক্ত গ্যালারিতে। টিএসসি, নীলক্ষেত, শাহবাগ, আজিজ মার্কেট, মেট্রোরেলের পিলার, পাড়ার স্কুলের সীমানাপ্রাচীর, আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত, শহীদদের মুখ, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। এবং এমন স্লোগানও, যেটা আন্দোলন পেরিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার আদিবাসী সুরক্ষার দায়িত্ব সবার।’ এটা আর প্রতিবাদ না, এটা একটা ইশতেহার।
কিন্তু এই প্রবন্ধের বাকি শহরগুলোর গল্প জানার পর ঢাকার দেয়ালের দিকে তাকালে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়ানো যায় না, এরপর কী? বার্লিন দেখিয়েছে বিজয়ী গ্রাফিতির একটা পরিণতি। সংরক্ষণ, পর্যটন, সেলফি, কফি-টেবিল বই। কায়রো দেখিয়েছে আরেকটা, নতুন শাসকের ‘সৌন্দর্যায়ন’। ঢাকায় দুটো টানই ইতিমধ্যে উপস্থিত। জুলাইয়ের গ্রাফিতি নিয়ে অ্যালবাম ছাপা হচ্ছে, প্রদর্শনী হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠছে, যা একদিকে সংরক্ষণ, অন্যদিকে সেই অননুমোদিত, ঝুঁকিময় চরিত্রের সমাপ্তি, যেটাই গ্রাফিতিকে গ্রাফিতি বানিয়েছিল। আবার কোথাও কোথাও পুরনো লেখার ওপর নতুন রাজনীতির লেখা উঠছে, কোথাও রোদে-বৃষ্টিতে রং ফিকে হয়ে আসছে এবং কেউ আর নতুন করে আঁকছে না। দেয়াল কারো একার সম্পত্তি থাকে না, এটাই তার শক্তি ছিল, এটাই তার ঝুঁকি।
৭.
সংবাদপত্র বন্ধ করা যায়, টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়, কিন্তু একটা শহরের প্রতিটা দেয়ালকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই ইতিহাসে দেখা যায়, স্বৈরাচারী শাসন, সামরিক শাসন কিংবা গণঅভ্যুত্থানের সময় দেয়ালই হয়ে ওঠে মানুষের প্রথম সংবাদমাধ্যম। রাতের অন্ধকারে আঁকা একটা প্রতীক, একটা মুখচ্ছবি কিংবা কয়েকটা শব্দ পরদিন হাজারো মানুষের কাছে রাষ্ট্রের গোপন করা সত্য পৌঁছে দেয়। গ্রাফিতি আনুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থার বাইরে একটা বিকল্প জনপরিসর তৈরি করে।
কিন্তু এই বিকল্প জনপরিসরের একটা দ্বিতীয় জীবন আছে, এবং সেই দ্বিতীয় জীবনটা প্রায়ই প্রথম জীবনের বিপরীত। বার্লিন প্রাচীরের কথা ধরা যাক। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯, আটাশ বছর ধরে এই প্রাচীর পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনকে ভাগ করে রেখেছিল। পশ্চিম দিকের দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা ছিল স্বাধীনতার চিহ্ন, থিয়েরি নোয়া আর ক্রিস্তফ বুশে আশির দশকের শুরুতে বড় বড় রঙিন ছবি আঁকতেন, যাতে প্রাচীরের ধূসর দমনের রঙ ঢাকা পড়ে।
কিথ হেরিং ১৯৮৬ সালে তিনশো মিটার দেয়ালজুড়ে মানুষের শৃঙ্খল এঁকেছিলেন, জার্মান পতাকার হলুদ, লাল, কালো রঙে, ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। পরদিনই সেই ছবি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। হেরিং বলেছিলেন, ‘গ্রাফিতি ইজ টেম্পোরারি আর্ট’। এই বাক্যটা গ্রাফিতির চরিত্রের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হতে পারে। কিন্তু পূর্ব দিকে দেয়াল ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা। সেখানে আঁকা তো দূরের কথা, স্পর্শ করাও নিষিদ্ধ ছিল। ডিডিআর-এর সীমান্তরক্ষীরা কখনো কখনো দেয়ালের ছোট দরজা দিয়ে পশ্চিম দিকে এসে শিল্পীদের টেনে নিয়ে গিয়ে গ্রেফতার করতেন।
১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর প্রাচীর পড়ল। কয়েক মাসের মধ্যে ২১টি দেশের ১১৮ জন শিল্পী প্রাচীরের পূর্ব দিকে, যে দিকটা আটাশ বছর ফাঁকা ছিল, ছবি আঁকলেন। ১৯৯০ সালের ২৮এ সেপ্টেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হলো, নাম হলো ইস্ট সাইড গ্যালারি। ১,৩১৬ মিটার দীর্ঘ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত শিল্পকর্ম। দমিত্রি ভ্রুবেলের বিখ্যাত ছবি, সোভিয়েত নেতা ব্রেঝনেভ ও পূর্ব জার্মান নেতা হোনেকারের ঠোঁটে-ঠোঁটে চুম্বন, নিচে লেখা, ‘হে ঈশ্বর, এই মারণ প্রেম থেকে বেঁচে ফিরতে আমাকে সাহায্য করো।’
প্রাচীর ভাঙার পর ‘দেয়াল-কুড়ানো’ শুরু হলো, মানুষ স্মারক হিসেবে টুকরো ভেঙে নিচ্ছিল। তারপর এলো বাণিজ্য। পূর্ব জার্মানির বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা লিমেক্স দেয়ালের খণ্ড বিক্রি করে নয় লাখ মার্ক আয় করল। ম্যানাকোতে নিলামে বিক্রি হলো থিয়েরি নোয়া আর কিডি সিটনির মিউরালসহ দেয়ালের বড় বড় টুকরো, শিল্পীদের অনুমতি ছাড়া। পরে দুজনেই মামলা করে লাভের অংশ আদায় করেন। আজ বার্লিন প্রাচীরের টুকরো পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘর, লাইব্রেরি ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে আছে।
ইস্ট সাইড গ্যালারি এখন বছরে ত্রিশ লাখ পর্যটককে নিয়ে যায়। ভ্রুবেলের চুম্বনের সামনে সেলফি তোলা বার্লিন ভ্রমণের অবশ্যকরণীয় তালিকায়। ২০০৯ সালে দেয়ালের পেছনের রাস্তায় ভবন নির্মাণ ও মার্সিডিজ-বেঞ্জ এরিনার নৌকা-ঘাটের জন্য গ্যালারির কিছু অংশ সরানো হলো। রিস্টোরেশনের সময় মূল চিত্রকর্মগুলো ধ্বংস করে দেয়ালের গাঁথুনি মেরামত করা হলো, তারপর শিল্পীদের বলা হলো আবার আঁকতে। আটজন শিল্পী অস্বীকার করলেন। তাদের যুক্তি ছিল, মূল ছবির ক্ষয়, তার ওপর পড়া অন্যের গ্রাফিতি, আবহাওয়ার দাগ, এসবই ইতিহাসের অংশ। একটা প্রতিলিপি মূলের জায়গা নিতে পারে না।
এখানেই প্রশ্নটা দাঁড়ায়, যেটা কায়রোতে বকর ও আওয়াদের বিতর্কেও ছিল, গ্রাফিতি কি সংরক্ষণযোগ্য? গ্রাফিতির শক্তি তো তার অননুমোদিত চরিত্রে, তার ক্ষণস্থায়িত্বে, তার ঝুঁকিতে। যে মুহূর্তে সেটা সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে যায়, সেলফি-পটভূমি হয়ে যায়, পোস্টকার্ডে ছাপা হয়, সেই মুহূর্তে কি তার মূল রাজনৈতিক চরিত্র মরে যায়?
ব্যাঙ্কসি এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তিনি নিজে বলেছেন: ‘বাণিজ্যিক সাফল্য একজন গ্রাফিতি শিল্পীর ব্যর্থতার চিহ্ন।’ অথচ তার প্রিন্ট সথবিতে কোটি ডলারে বিক্রি হয়। ২০১৮ সালে সথবির নিলামে তার 'গার্ল উইথ বেলুন' ছবি বিক্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেমে লুকানো শ্রেডার চালু হয়ে ছবিটা অর্ধেক কেটে ফেলল, পণ্যায়নের বিরুদ্ধে একটা পারফরম্যান্স। কিন্তু সেই ছেঁড়া ছবি পরে আরও বেশি দামে বিক্রি হলো। প্রতিরোধ নিজেই পণ্য হয়ে গেল।
জেফরি আই. রসের ভাষায়, গ্রাফিতির পণ্যায়ন একটা ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া। প্রথমে শিল্পী নিজে আয়ের চেষ্টা করেন, তারপর সাংস্কৃতিক শিল্প তাকে নিজের পণ্যে অন্তর্ভুক্ত করে, তারপর ফ্যাশন ব্র্যান্ড তার নান্দনিকতা ধার করে, এবং শেষে শহর নিজেই গ্রাফিতিকে পর্যটনের হাতিয়ার বানায়। ইস্ট সাইড গ্যালারি এই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশন ২০১৮ সাল থেকে এটা পরিচালনা করছে, ২০২৫ সালে নতুন প্রদর্শনীর নাম, বিটউইন অরিজিনাল এন্ড কপি। নামেই স্বীকারোক্তি।
তিনটি শহরে তিনভাবে দেয়াল পরিষ্কার করা হয়েছে। বার্লিনে প্রাচীর ভাঙার পর যে ছবিগুলো মুক্তির উল্লাস নিয়ে আঁকা হয়েছিল, সেগুলো এখন ত্রিশ লক্ষ পর্যটকের সেলফির পটভূমি। দেয়ালের টুকরো নিলামে বিক্রি হয়েছে শিল্পীদের অনুমতি ছাড়া। কায়রোতে প্রাদেশিক সরকার ‘সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প’-এর নামে বিপ্লবের দেয়ালচিত্র মুছে দিয়েছে। ‘সৌন্দর্যায়ন’ শব্দটাই এখানে রাজনৈতিক, কারণ রাষ্ট্র বলছে দেয়াল পরিষ্কার করা হচ্ছে, আসলে পরিষ্কার করা হচ্ছে স্মৃতি।
আর হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের পর লেনন ওয়ালগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে, ‘সুসংগত রঙ’ দিয়ে। যেন ওই দেয়ালে কোনোদিন কিছু ছিলই না।
ঢাকার দেয়ালের দ্বিতীয় জীবন এখনো লেখা হচ্ছে। কোন পথে যাবে, বার্লিনের, কায়রোর, নাকি নিজের কোনো পথে, সেই উত্তর এই জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে কারো জানা নেই।
৮.
গ্রাফিতির রূপ প্রতিটি জায়গায় আলাদা। কায়রোতে ফেরাউনীয় সমাধিচিত্র, চিলিতে রাতের অন্ধকারে দেয়ালে একটিমাত্র ‘R’ অক্ষর, হংকংয়ে পোস্ট-ইট নোট, বার্লিনে ১,৩১৬ মিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত ক্যানভাস, ঢাকায় মেট্রোরেলের পিলারে আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত। কিন্তু প্রতিটি জায়গায় একটা জিনিস আছে, আঁকা, মোছা, আবার আঁকা।
গ্রাফিতি যদি ক্ষণস্থায়ী শিল্প হয়, কিথ হেরিং যেমনটা বলেছিলেন, তাহলে তাকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা কি তার চরিত্রেরই বিরোধী? চিলির বিআরপি-র সেই ভূগর্ভস্থ ‘R’ অক্ষর কোনো আর্কাইভে নেই, সেটা আঁকা হয়েছে আর মুছে গেছে একই রাতে। কিন্তু হুয়ান ত্রালমা আজও মনে করেন সেই রাতের কথা। কায়রোর বকর নিজেই নিজের ম্যুরাল মুছে ফেলেছেন। হংকংয়ের দশ হাজার পোস্ট-ইট নোট এখন একটি গবেষণা ডেটাবেসে বেঁচে আছে। আর ঢাকার দেয়ালে জুলাই এখনো লেগে আছে, কোথাও উজ্জ্বল, কোথাও ফিকে, কোথাও নতুন রঙের নিচে চাপা পড়ে।
দেয়াল মুছে যায়। কিন্তু দেয়ালে যা লেখা ছিলো, সেটা কি মুছে যায়?
(সিলভিয়া নাজনীন: শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক)