মতামত

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা আমাদের কী দেখালো?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশে কয়েকটি ইট রাখা হয়েছিল। মাটির ওপর বিছানো হয়েছিল কিছু কার্পেট ও জায়নামাজ। ওপরে টানানো হয়েছিল ত্রিপল। অজুর জন্য রাখা হয়েছিল পানির ড্রাম। সাদা কাগজে লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ‘নামাজের জায়গা’। স্থানীয়দের ভাষ্য ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থাপনাটি তৈরি করেছিলেন রাজীব শাহ নামের এক ব্যক্তি। 

তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলোতে দাবি করা হয়েছিল, তিনি উদ্যান থেকে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কুড়িয়ে আনা ইট দিয়ে জায়গাটি তৈরি করেছিলেন। তবে এই নির্দিষ্ট দাবির মূল ভিডিও বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়নি; তাই এটিকে প্রচারিত ভাষ্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

বস্তুগত অর্থে সেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিলো না। কিন্তু কনটেন্ট হিসাবে সেখানে প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদানই উপস্থিত ছিলো: একজন দরিদ্র মানুষ, কষ্টার্জিত অর্থ, আল্লাহর ঘর নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা, কয়েকটি ইট, একটি আবেগঘন গল্প এবং দর্শকের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করার সুযোগ। ফলে কয়েকটি ইট ও একটি ত্রিপল দ্রুত একটি শক্তিশালী ডিজিটাল আখ্যানে রূপ নেয়, ‘দেখুন, বোতল কুড়িয়ে মসজিদ বানালেন এক অসহায় মানুষ।’

তারপর ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হতে থাকে। একই গল্প ভিন্ন শিরোনাম, কণ্ঠস্বর ও আবেগঘন বর্ণনায় ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম দেখায়, এই দৃশ্যমান কনটেন্টগুলোতে রাজীব শাহের ত্যাগ, মানুষের সহানুভূতি এবং তাকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়; সংবাদ প্রতিবেদনেও তার সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হওয়া ও অর্থ পাওয়ার কথা এসেছে। তবে অনুদানের পরিমাণ, সংগ্রাহক বা হিসাবের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। স্থাপনাটি তখন আর শুধু নামাজের জায়গা ছিলো না; এটি হয়ে উঠেছিল আবেগ, ধর্ম, দান এবং ভিউয়ের মিলিত বাজার।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, ২৬এ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের যৌথ অভিযানে ওই নামাজের স্থানসহ উদ্যানের অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং উদ্যানের ভেতরে আগে থেকেই একটি মসজিদ রয়েছে। তাদের অভিযোগ ছিলো, অস্থায়ী নামাজের স্থান নির্মাণের নামে সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে নিয়মিত অবস্থান করা হচ্ছিল। তবে হুমকি বা ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি; এগুলোকে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। সমর্থনমূলক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি স্থাপনাটির বৈধতা, প্রয়োজন ও অর্থ সংগ্রহের স্বচ্ছতা নিয়ে সমালোচনামূলক প্রশ্নও সংবাদ প্রতিবেদনে দৃশ্যমান ছিলো। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ শুধু ওই নামাজের স্থান নয়, উদ্যানের অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাটও উচ্ছেদ করে। ফলে ঘটনাটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো স্বতন্ত্র পদক্ষেপের চেয়ে অনুমতিহীন দখল, অস্বচ্ছ উদ্যোগ এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা কনটেন্ট-নির্ভর আবেগের পরিণতি হিসেবেই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক উচ্ছেদ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কয়েকটি ইট ও একটি ত্রিপল কীভাবে এত দ্রুত ‘মসজিদে’ পরিণত হলো; একজন অজানা মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ কীভাবে জনসাধারণের ধর্মীয় প্রকল্পের মর্যাদা পেলো; এবং যাচাই, বৈধতা, প্রয়োজন কিংবা জবাবদিহির প্রশ্ন না তুলে মানুষ কেন সেখানে অর্থ দিতে প্রস্তুত হলো?

একটি মুখ, একটি গল্প

মানুষ সাধারণত বিমূর্ত সমস্যার তুলনায় একটি চেনা মুখ ও নির্দিষ্ট গল্পে বেশি আবেগপ্রবণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে প্রায়ই ‘আইডেন্টিফায়াবল ভিক্টিম ইফেক্ট’ বলা হয়, এই বিষয়ে দেখিয়েছেন ডেবোরাহ স্মল নামে এক গবেষক তার এক নিবন্ধে। কোনো শহরে বহু দরিদ্র মানুষ আছে, এটি একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষ বোতল কুড়িয়ে মসজিদ বানাচ্ছেন, এটি একটি গল্প। প্রথমটি দারিদ্র্যের কাঠামোগত প্রশ্ন তোলে; দ্বিতীয়টি সহানুভূতি, বিস্ময় এবং তাৎক্ষণিক দানের তাগিদ সৃষ্টি করতে পারে।

মসজিদ-যখন-কনটেন্ট-সোহরাওয়ার্দী-উদ্যানের-ঘটনা-আমাদের-কী-দেখালো.jpg

এই প্রভাব সব পরিস্থিতিতে সমান শক্তিশালী, গবেষণায় এমন নিঃশর্ত সিদ্ধান্ত নেই। ২০২৩ সালে গবেষক ম্যাক্সিমিলিয়ান মায়ার, ইক চুন ওং ও গিলাদ ফেল্ডম্যান মূল গবেষণাটির প্রতিলিপি তৈরির চেষ্টা করে প্রভাবটির পক্ষে সমর্থন পাননি। তারা এর মাত্রা ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তবে ২০০৭ সালে ডেবোরা এ. স্মল, জর্জ লোয়েনস্টাইন ও পল স্লোভিকের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নাম, মুখ ও দৃশ্যমান কষ্ট পরিসংখ্যানের তুলনায় মানুষের মনোযোগ ও সহানুভূতি সহজে আকর্ষণ করতে পারে। এ ঘটনার ভাইরাল বয়ানের বড় অংশে প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন, জমির বৈধতা বা নতুন মসজিদের প্রয়োজনীয়তার বদলে রাজীব শাহের দৃশ্যমান সংগ্রামই সামনে এসেছে। একাধিক ডিজিটাল গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। মানুষ যেন প্রকল্পটির চেয়ে গল্পটির মধ্যেই দান করেছে। 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাৎক্ষণিক নৈতিক পরিতৃপ্তি। হাদিসে মসজিদ নির্মাণকে পরকালে পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; ফলে মুসলমানদের কাছে মসজিদ নির্মাণে অর্থ দেওয়া বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দান হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ‘বোতল কুড়িয়ে আল্লাহর ঘর বানানো মানুষটিকে সাহায্য করুন’, এই আহ্বান দাতার সামনে সহজ একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত হাজির করে। জমির কাগজ, পরিচালনা কমিটি বা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই বিকাশ বা নগদে কিছু টাকা পাঠিয়ে তিনি নিজেকে একটি পুণ্যময় কাজে অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখতে পারেন।

এখানে দান শুধু অপরকে সাহায্য করে না; দাতাকে নিজের নৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও আশ্বস্ত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হলে নৈতিক তৃপ্তির সঙ্গে সামাজিক স্বীকৃতিও যুক্ত হতে পারে। তবে প্রতিটি প্রকাশ্য দানকে ভণ্ডামি বা আত্মপ্রদর্শন বলা যাবে না। প্রকাশ্য দান অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কাজটির বাস্তব উপযোগিতা ও বৈধতার চেয়ে নিজের অংশগ্রহণের দৃশ্যমানতা বড় হয়ে ওঠে।

ভিউ ব্যবসার জন্য আদর্শ ধর্মীয় পণ্য

এই ঘটনাকে কেবল সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সবচেয়ে ক্ষমতাবান পক্ষটি আড়ালে থেকে যাবে, কনটেন্ট নির্মাতারা।

সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও অর্থনীতিতে কনটেন্ট নির্মাতাকে নিয়মিত নতুন দৃশ্য, চরিত্র ও আবেগ হাজির করতে হয়। তার দৃশ্যমানতা, সম্ভাব্য আয় এবং প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যৎ পৌঁছ নির্ভর করতে পারে মানুষ ভিডিওটি কতক্ষণ দেখছে, কতবার শেয়ার করছে এবং কী পরিমাণ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে তার ওপর। ২০২০ সালে উইলিয়াম জে. ব্র্যাডি, মলি জে. ক্রকেট ও জে জে ভ্যান বাভেল দেখিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমের নকশা মানুষের মনোযোগ ও নৈতিক-আবেগঘন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে শক্তিশালী করতে পারে। ২০২১ সালে উইলিয়াম জে. ব্র্যাডি, কিলিয়ান ম্যাকলাফলিন, তুয়ান এন. ডোয়ান ও মলি জে. ক্রকেটের গবেষণায় আরও দেখা যায়, সামাজিক পুরস্কার ও অন্যদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ অনলাইনে নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করতে পারে। ফলে বাস্তবতা কনটেন্ট নির্মাতার কাছে অনুসন্ধানের বিষয় হওয়ার আগেই কাঁচামালে পরিণত হয়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থাপনাটি ছিলো প্রায় নিখুঁত কাঁচামাল। এখানে দারিদ্র্য ছিলো, ধর্ম ছিলো, ত্যাগের দৃশ্য ছিলো এবং দর্শকের অপরাধবোধ জাগানোর সুযোগ ছিলো। সবচেয়ে বড় কথা, গল্পটি বোঝাতে কোনো জটিলতার প্রয়োজন হয়নি। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতেই বলা সম্ভব: সামর্থ্য নেই, তবু বোতল কুড়িয়ে মসজিদ বানাচ্ছেন; আসুন তাকে সাহায্য করি।

নৈতিকতা ও আবেগের ভাষা সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের বিস্তারের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিয়ে ২০১৭ সালে উইলিয়াম জে. ব্র্যাডি, জুলিয়ান এ. উইলস, জন টি. জস্ট, জশুয়া এ. টাকার ও জে জে ভ্যান বাভেলের একটি গবেষণা ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, পোস্টে নৈতিক-আবেগমূলক শব্দের উপস্থিতি পুনঃপ্রচারের বেশি হারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো। গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে ‘মরাল কন্টাজিয়ন’’ বা নৈতিক আবেগের সংক্রমণ বলেছেন।

এখানে কনটেন্ট নির্মাতা শুধু বিদ্যমান আবেগ ধারণ করেন না; তিনি আবেগকে সম্পাদনা করেন, তীব্র করেন এবং বাজারযোগ্য করে তোলেন। ব্র্যাডি ও তার সহগবেষকদের ২০১৭ ও ২০২০ সালের গবেষণা এই আবেগঘন কনটেন্টের বিস্তার এবং প্ল্যাটফর্মের পরিবর্ধনমূলক ভূমিকা বুঝতে সহায়তা করে। ‘এক ব্যক্তি নামাজের অস্থায়ী জায়গা করেছেন’, এটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল কনটেন্ট।

‘বোতল কুড়িয়ে অসহায় মানুষ আল্লাহর ঘর বানালেন’, এটি শক্তিশালী কনটেন্ট। প্রথম ভাষ্যটি প্রশ্ন তুলতে বলে; দ্বিতীয়টি প্রশ্ন তোলার আগেই দর্শকের নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে দেয়।

এরপর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। একজন ভিডিও করলে অন্যজনকে আরও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য, আরও নাটকীয় বর্ণনা কিংবা আরও বড় অনুদানের সংবাদ আনতে হয়। এক পর্যায়ে ঘটনাটি আর সংবাদ থাকে না; ধারাবাহিক বিনোদনে পরিণত হয়। দর্শকের চোখে রাজীব শাহ হয়ে ওঠেন একটি চরিত্র, স্থাপনাটি হয়ে ওঠে সেট, আর আবেগ হয়ে ওঠে দর্শক ধরে রাখার উপায়।

এটি সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকতা হলে প্রশ্ন উঠতো: জায়গাটির মালিক কে? নির্মাণের অনুমতি আছে কি? উদ্যানে আগে থেকে মসজিদ আছে কি না? সংগৃহীত অর্থ কে গ্রহণ করছেন? তার হিসাব কোথায় থাকবে? স্থাপনাটি ভবিষ্যতে কে পরিচালনা করবেন? অগ্নিনিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, নারী ও প্রতিবন্ধীদের প্রবেশ কিংবা জনচলাচলের ব্যবস্থা কী হবে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক অবস্থা কী? কিন্তু এসব প্রশ্ন গল্পটির আবেগ নষ্ট করতে পারে। তাই কনটেন্ট ব্যবসা বাস্তবতাকে যাচাই না করে তার সবচেয়ে লাভজনক সংস্করণটি বিক্রি করেছে।

আবেগের চাপে দখলকে বৈধতা দেওয়া যায় না

মসজিদ নির্মাণ নিঃসন্দেহে মুসলিম সমাজে মর্যাদাপূর্ণ কাজ। কিন্তু কোনো কাজের ঘোষিত ধর্মীয় উদ্দেশ্য তার পদ্ধতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ করে না। ভালো উদ্দেশ্য অন্যের জমি, সরকারি সম্পত্তি বা জনসাধারণের অধিকার ব্যবহারের অবাধ অনুমতি দেয় না।

সূরা বাকারার ১৮৮ নাম্বার আয়াতে, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করেছে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে (২৪৫৩) অন্যায়ভাবে সামান্য পরিমাণ জমি দখলের বিরুদ্ধেও কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। এসব দলিলের সরল নৈতিক তাৎপর্য হলো, পবিত্র উদ্দেশ্যের দাবিও সম্পত্তির অধিকার ও জনস্বার্থ লঙ্ঘনের অনুমতি দেয় না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কমের সংবাদ অনুযায়ী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাধীন একটি ঐতিহাসিক জনপরিসর; উচ্ছেদ অভিযানের সরকারি ভাষ্যেও জনস্বার্থ ও উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হয়েছে। এর ওপর একজন ব্যক্তির যেমন একক অধিকার নেই, তেমনি আবেগতাড়িত একটি জনতারও নেই। সেখানে মসজিদ, মন্দির, দোকান, রাজনৈতিক কার্যালয় বা ব্যক্তিগত আশ্রয়, যা-ই নির্মাণ করা হোক, অনুমোদন ও জনস্বার্থের প্রশ্ন এড়ানো যায় না। ধর্মীয় পরিচয় কোনো স্থাপনাকে আইন, পরিকল্পনা ও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলতে পারে না।

এখানে একটি ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য জরুরি। কোনো স্থানে নামাজ আদায় করা এবং সেই স্থানকে স্থায়ী মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। একটি স্থায়ী মসজিদ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জমির বৈধ ব্যবহার, মালিকের সম্মতি, স্থায়ী উৎসর্গ, পরিচালনা এবং জনঅধিকারের প্রশ্ন জড়িত। 

কাতারের জেনারেল ডিরেক্টরেট অব এনডাওমেন্টস প্রকাশিত ১৯৯৬ সালের ওয়াক্‌ফ আইনে মসজিদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমির মালিকের স্পষ্ট বা পরোক্ষ সম্মতি এবং জনসাধারণের জন্য স্থানটি উন্মুক্ত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ভারতের ১৯৯৫ সালের ওয়াক্‌ফ আইনের সংশোধিত সংজ্ঞায় বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তিকে ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব কয়েকটি ইট, কার্পেট ও ত্রিপল রেখে কোনো স্থানকে ক্যামেরার সামনে ‘আল্লাহর ঘর’ ঘোষণা করাই তাকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক মসজিদে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

'রিয়া' শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়

এই ঘটনায় কার নিয়ত কী ছিলো, তা আমরা জানি না। রাজীব শাহ সত্যিই ধর্মীয় আবেগ থেকে কাজটি করে থাকতে পারেন। দাতারাও আন্তরিকভাবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে অর্থ দিতে পারেন। কনটেন্ট নির্মাতাদের কেউ কেউ প্রকৃত সহানুভূতি থেকেও ভিডিও করে থাকতে পারেন। মানুষের অন্তরের নিয়ত সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই।

কিন্তু ইসলাম শুধু নিয়তের কথা বলে থেমে থাকে না; কাজের পদ্ধতি ও ফলাফলও বিবেচনা করে। কুরআনের সুরা আল-মাউন (১-৭) নামাজ ও সামাজিক নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে। সেখানে লোকদেখানো ইবাদতের পাশাপাশি সামান্য মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়ার কথাও এসেছে। এই সুরার তাৎপর্য শুধু এই নয় যে গোপনে ইবাদত করতে হবে। বরং ইবাদতের দৃশ্যমানতা যদি ন্যায়, দায়িত্ব ও মানুষের অধিকারের বিকল্প হয়ে ওঠে, তবে ধর্মীয় প্রদর্শন নিজের নৈতিক ভিত্তিই হারায়।

ডিজিটাল যুগে 'রিয়া' বা প্রদর্শনের প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তির অন্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও অংশ। ক্যামেরা ধার্মিকতার দৃশ্য ধারণ করে, অ্যালগরিদম তা ছড়িয়ে দেয়, দর্শক আবেগ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কনটেন্ট নির্মাতা ভিউ ও পরিচিতি পান। এই প্রতিক্রিয়া আবার একই ধরনের কনটেন্ট তৈরির প্রণোদনা বাড়াতে পারে। ২০২০ সালে উইলিয়াম জে. ব্র্যাডি, মলি জে. ক্রকেট ও জে জে ভ্যান বাভেল দেখিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমের নকশা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণকারী নৈতিক-আবেগঘন কনটেন্টের বিস্তারকে শক্তিশালী করতে পারে। ২০২১ সালে উইলিয়াম জে. ব্র্যাডি, কিলিয়ান ম্যাকলাফলিন, তুয়ান এন. ডোয়ান ও মলি জে. ক্রকেটের গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক পুরস্কার ও অন্যদের প্রতিক্রিয়া অনলাইনে নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করতে পারে।

তবে গবেষণাগুলো সরাসরি ধর্মীয় 'রিয়া' নিয়ে নয়; এগুলো প্ল্যাটফর্মের পুরস্কার, নৈতিক আবেগের প্রকাশ এবং সেই আচরণের পুনরাবৃত্তির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। এই প্রক্রিয়া থেকে অনুমান করা যায়, একটি আন্তরিক ধর্মীয় কাজও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবস্থায় প্রবেশ করে ক্রমে প্রদর্শনযোগ্য ও বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত হতে পারে।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘রাজীব শাহ লোক দেখিয়েছেন কি না’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমাদের ডিজিটাল সংস্কৃতি কি ধর্মীয় কাজকে এমনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে, যাতে কাজটি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য কিনা তার চেয়ে ক্যামেরায় কতটা আবেগময় দেখায় সেটিই মুখ্য হয়ে উঠছে?

এতে ধর্মের ক্ষতি কোথায়?

প্রথম ক্ষতি হলো, ধর্মীয় প্রতীকের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। যখন অনুমতিহীন দখল, অস্বচ্ছ অর্থ সংগ্রহ বা ব্যক্তিগত উদ্যোগকে প্রশ্ন থেকে রক্ষা করতে ‘মসজিদ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন পবিত্র একটি প্রতিষ্ঠান কৌশলগত ঢালে পরিণত হয়। পরে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলে সহজেই বলা যায়, ‘মসজিদে হাত দেওয়া হয়েছে’। এতে ঘটনা আর জমি ব্যবস্থাপনা বা জনস্বার্থের প্রশ্ন থাকে না; রাষ্ট্র বনাম ইসলামের সংঘাতে রূপ নেয়।

দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ধর্মীয় প্রয়োজন আড়ালে পড়ে। একটি মসজিদ নির্মাণ শুধু ইট বসানো নয়। এর প্রয়োজন নির্ধারণ, জমির বৈধতা, নির্মাণব্যয়, ইমামের বেতন, বিদ্যুৎ-পানি, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এসব বাদ দিয়ে দৃশ্যমান স্থাপনা তৈরিতে দান করলে ধর্মীয় দান পরিকল্পিত কল্যাণের বদলে আকস্মিক আবেগের হাতে চলে যায়।

মসজিদ-যখন-কনটেন্ট-সোহরাওয়ার্দী-উদ্যানের-ঘটনা-আমাদের-কী-দেখালো-3.jpg

তৃতীয়ত, দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করার বদলে তাকে কনটেন্টের চরিত্রে পরিণত করা হয়। দৃশ্যমান ভাইরাল বয়ান ও নির্বাচিত সংবাদে রাজীব শাহের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক সহায়তা, মসজিদ নির্মাণের গল্পের সমান গুরুত্ব পায়নি। তার দারিদ্র্য দূর করার চেয়ে দারিদ্র্যের দৃশ্যটি যেন বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। কারণ সমাধান হয়ে গেলে কনটেন্ট শেষ হয়ে যায়; কিন্তু অসহায় মানুষের আবেগঘন উপস্থিতি বারবার দেখানো যায়।

চতুর্থত, ধর্মপ্রাণ মানুষের সরল বিশ্বাস শোষিত হতে পারে। ধর্মীয় কাজের বিরোধী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা অনুদানের বৈধতা ও হিসাব নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এই সংকোচই অস্বচ্ছ উদ্যোগের পুঁজি হয়ে উঠতে পারে। অথচ অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কে হিসাব রাখছে এবং কাজটি বৈধ কি না, এসব প্রশ্ন করা ধর্মবিরোধিতা নয়; বরং আমানত রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

আবেগ নয়, দায়িত্বশীল ধর্মীয় জনপরিসর

এই ঘটনার শিক্ষা মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করা নয়। শিক্ষা হলো, ধর্মীয় আবেগকে জবাবদিহির বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে না। কেউ মসজিদ নির্মাণে আগ্রহী হলে প্রথম কাজ ক্যামেরা ডাকা নয়; জমির বৈধতা, স্থানীয় প্রয়োজন, অনুমোদন, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কেউ দান করতে চাইলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রকল্পটির হিসাব ও দায়িত্ব কার কাছে? কনটেন্ট নির্মাতার কাজ হওয়া উচিত আবেগ বাড়ানো নয়, প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা।

কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব আছে। শুধু উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে গৃহহীন বা অসহায় হলে তার পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার প্রশ্ন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি নোটিশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশকে ‘বহিরাগত অসাধু ভবঘুরে’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল; কিন্তু আইন প্রয়োগের ভাষায় এমন অবমাননাকর ও সামগ্রিক পরিচয় আরোপ গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি জায়গা রক্ষা এবং দুর্বল মানুষকে মর্যাদাহীন করা এক বিষয় নয়। আইন প্রয়োগের সঙ্গে মানবিক দায়িত্বের বিরোধ নেই।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কয়েকটি ইট শেষ পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ নামাযের স্থান কিন্তু হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে। এখানে ধর্মীয় আবেগ আছে, কিন্তু ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব দুর্বল। দান করার আগ্রহ আছে, কিন্তু যাচাইয়ের অভ্যাস নেই। দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি আছে, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনা নেই। আর সবকিছুর ওপর আছে ক্যামেরা, যে ক্যামেরা দুঃখকে গল্প, ধর্মকে আবেগ এবং আবেগকে ভিউয়ে রূপান্তর করে।

ধর্মের ক্ষতি সব সময় প্রকাশ্য বিরোধীরা করে না। কখনো কখনো ধর্মের নামে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য নির্মাণকারীরাও তা করে, যখন তারা ইবাদতকে দায়িত্ব থেকে, দানকে জবাবদিহি থেকে এবং মসজিদকে ন্যায়সংগত সামাজিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি মুখরোচক কনটেন্টে পরিণত করে।

(মীর হুযাইফা আল মামদূহ ধর্ম, গণমাধ্যম, পরিচয় ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কাজ করা একজন গবেষক ও সাংবাদিক। তার গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজ, ধর্মীয় ডিসকোর্স এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব।)

 

[মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব]