চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক ও পাহাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়, যা বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘ইন্দো-বার্মা হটস্পট’ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। প্রায় সতেরশো একর আয়তনের এই ক্যাম্পাসে রয়েছে গগনচুম্বী পাহাড়, প্রাকৃতিক ঝরনা, চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও ছড়া।
এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ক্যাম্পাসটি অসংখ্য বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখানে শতবর্ষী গাছপালার পাশাপাশি কয়েক শ’ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ পাওয়া যায়। প্রাণীকূলের মধ্যে এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য বানর, চশমাধারী হনুমান, মায়া হরিণ, অজগর, মেছোবাঘ এবং অসংখ্য সরীসৃপ। পাখিদের জন্য এই ক্যাম্পাস এক স্বর্গরাজ্য, যেখানে দেড় শতাধিক প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখির দেখা মেলে। এ কারণেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি জীবন্ত গবেষণাগার বা প্রাকৃতিক জাদুঘর বলা হয়।
ছাত্রজীবনে ২০০৪ সালে প্রথম যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল আমি যেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, বরং এক বিশাল জীবন্ত অরণ্যে প্রবেশ করেছি। শহরের ইট-কাঠের ক্লান্তি পেরিয়ে পাহাড়ি পথ, ঝর্ণা, ছড়া, বন আর নৈঃশব্দ্যের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এই ক্যাম্পাস তখন আমার কাছে ছিল এক অন্য পৃথিবী। তখনো জানতাম না, এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে আমার জীবনের এত গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে। সৌভাগ্যক্রমে আমার জন্মও ক্যাম্পাসের পাশে হাটহাজারীতে, তাই একে চিনেছি নিবিড়ভাবে।
শিক্ষক হিসেবে এখন চৌদ্দ বছর পার করেছি, আক্ষরিক অর্থেই এ যেন ‘রামের বনবাস’। এর আগে ছয় বছরেরও বেশি সময় ছিলাম শিক্ষার্থী। ছাত্রজীবনে এই ক্যাম্পাসে তুমুল সাংবাদিকতা করেছি, মাঠে নেমে প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লড়াই করেছি, আবার কলমেও করেছি প্রতিবাদ। সেই সময় কিছু অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। গাজী সৈয়দ আসমতের মতো প্রাজ্ঞ শিক্ষক, হালদা গবেষক মনজুরুল কিবরীয়া, ফরেস্ট্রি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক জসীম উদ্দীন, আল আমীন ও কামাল হোসাইনের মতো শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখেছি, প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু গবেষণা নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক অবস্থান।
সেই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সত্যিকার অর্থে এক জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। রাতের আঁধারে হরিণ দেখা যেত।
রাস্তা পার হতো বন্য শুকর। ঝোপের ভেতরে নিশ্চিন্তে পড়ে থাকতো অজগর। অসংখ্য পাখির ডাক শুনে ভোর হতো। পৃথিবীর বিরল প্রজাতির ব্যাঙ আবিষ্কৃত হয়েছিল এই ক্যাম্পাসে। নতুন নতুন অর্কিডের সন্ধানে গবেষকরা এখানে ছুটে আসতেন।
আমি এখনো ভাবি, বাংলাদেশের কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের এমন জীববৈচিত্র্যের পরিচয়ে গর্ব করতে পারে?
আজও মাঝেমধ্যে কোনো অজগর ‘ধরা পড়লে’ সংবাদ হয়, “সাপটিকে জঙ্গলে অবমুক্ত করা হয়েছে।” এই বাক্যটি আমাকে অদ্ভুতভাবে ভাবায়। কারণ পুরো ক্যাম্পাসটিই তো জঙ্গল। এই পাহাড়, ছড়া, ঝোপঝাড়,সবই তো তাদের আদি বাসস্থান। তাহলে আমরা কাকে উদ্ধার করছি? সাপকে, নাকি নিজেদের অপরাধবোধকে?
আসলে আমরাই তো বহিরাগত। আমরাই তাদের ঘরে ঢুকে পড়েছি। পাহাড় কেটেছি, বন কমিয়েছি, আলো-শব্দ আর কংক্রিট দিয়ে তাদের নিরাপদ আবাস সংকুচিত করেছি। তারপর কোনো সাপ বা অজগর মানুষের সামনে চলে এলে আমরা সেটিকে “রেসকিউ” করি। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, তারাই তো এখানে স্বাভাবিক বাসিন্দা।
হরিণ উদ্ধারের ঘটনাগুলো নিয়েও আমার একই অনুভূতি হয়। সংবাদে বলা হয়, “হরিণটিকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” কিন্তু পুরো ক্যাম্পাসই তো জঙ্গল। হরিণটিকে কি আসলে কোথাও ফিরিয়ে দেওয়া হয়, নাকি সে তার নিজের বাড়িতেই ফিরে আসে?
এই ক্যাম্পাস বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল। কিন্তু আমরা কি সত্যিই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি “ইকো-ফ্রেন্ডলি ক্যাম্পাস” হিসেবে ভাবতে শিখেছি? নাকি ধীরে ধীরে এটিকেও আরেকটি কংক্রিট শহরে পরিণত করছি? বছর দশেক আগেও সন্ধ্যার পর রাস্তায় চললে গুইসাপ, বেজি, গিরগিটি, কাঠবিড়ালির দেখা মিলতো। গভীর রাতে শিয়াল, বাগডাশ, হুতুম ও লক্ষ্মীপেঁচার ডাক শুনে মনে হতো জীবনানন্দের কবিতার মধ্যে হাঁটছি। এখন সেই শব্দগুলো কমে যাচ্ছে। পাহাড় শাসন করে যাত্রী ছাউনির দৃশ্য দেখি। নির্বিচারে গাছ কমে যেতে দেখি। আর তখন মনে হয়, আমরা কি ধীরে ধীরে এই ক্যাম্পাসের আত্মাকেই মুছে দিচ্ছি?
আমি আশাবাদী। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান নিজেই একজন জীববিজ্ঞানী ও গবেষক। উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে উঠে আসা এই শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই তাঁর নেতৃত্বে হয়তো এই ক্যাম্পাসকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আমি কোনো ব্যক্তির প্রশংসা করতে চাই না। আমার প্রত্যাশা কেবল একটাই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি ক্যাম্পাস হোক, যেখানে শুধু মানুষ নয়, সাপ-পাখি-হরিণও নিজেদের নিরাপদ মনে করবে। যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন নয়, বরং জীববৈচিত্র্যের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
শিক্ষকতায় আসার আগে আমি পরিবেশ ও জলবায়ু বিটে সাংবাদিকতা করেছি। সেই সময় দেশজুড়ে পরিবেশ রক্ষার নানা লড়াই কাছ থেকে দেখেছি। ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরীর মতো কর্মকর্তাদের দেখেছি, যারা পরিবেশ দূষণ রোধ ও জনস্বার্থ রক্ষায় আপসহীন ছিলেন। তখন বুঝেছি, পরিবেশ রক্ষা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি নৈতিক দায়বদ্ধতা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসি, নাকি শুধু “সংরক্ষণ” শব্দটি উচ্চারণ করি? প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু বৃক্ষরোপণ নয়; তার বাসিন্দাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া, তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা এবং এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, সেই বিনয়টুকু শেখা।
আমরা অনেকেই চাই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক ক্যাম্পাস হোক, যেখানে কোনো অজগর ধরা পড়লে সেটিকে “উৎপাত” মনে হবে না; বরং মনে রাখা হবে, সে এখানকারই বাসিন্দা। কোনো হরিণকে উদ্ধার করে “জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া”র ভাষা নয়, তৈরি হোক সহাবস্থানের ভাষা, যেখানে মানুষ বুঝবে, এই পাহাড়, বন আর ছড়াগুলো শুধু আমাদের একার সম্পত্তি নয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস নয়; এটি সাপ-পাখি-ব্যাঙ-হরিণ-গাছপালা আর অগণিত নীরব প্রাণেরও আবাসভূমি। সাপ আর মানুষের সম্পর্ক ভয় কিংবা বৈরিতার না হয়ে হোক সহাবস্থানের। পাখির ডাক, শিয়ালের হাঁক, হরিণের ছুটে চলা কিংবা রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে চলে যাওয়া অজগর, এসব যেন ক্যাম্পাস জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে থাকে। কারণ জীববৈচিত্র্য হারালে শুধু কিছু প্রাণী হারাবে না; হারিয়ে যাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা, নৈঃশব্দ্য, সৌন্দর্য ও প্রাণ।
হয়তো এ কারণেই প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরায় গুরুকূল কখনো নগরের কোলাহলে গড়ে ওঠেনি। মহাভারতের হস্তিনাপুরের রাজশক্তি ও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে দ্রোণাচার্য যে অরণ্যপীঠে রাজপুত্রদের শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল এক ধরনের তপোবন, যেখানে মানুষ প্রকৃতির ভেতর থেকে শিখবে বিনয়, সহাবস্থান ও আত্মসংযম। সেই গুরুকূল ছিল রাষ্ট্রের প্রভাব থেকে দূরে, এক অর্থে স্বশাসিত জ্ঞানভূমি; যেখানে অরণ্য শুধু পটভূমি নয়, শিক্ষার অংশ।
আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ও তো এক ধরনের গুরুকূল। তার আত্মা কেবল ভবন, সিলেবাস বা প্রশাসনে নয়; লুকিয়ে থাকে তার চিন্তায়, নৈঃশব্দ্যে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের ভেতর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও সেই অর্থে এক অরণ্যপীঠ, যেখানে পাহাড় আছে, বন আছে, ছড়া আছে, পাখির ডাক আছে, নিশাচর প্রাণের চলাচল আছে।
এই ক্যাম্পাস তপোবনের মতো হয়ে উঠুক, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বৈরিতা নয়, সহাবস্থান থাকবে; সাপকে দেখে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জন্মাবে; হরিণের ছুটে চলা বা পেঁচার ডাক “অস্বাভাবিক” মনে হবে না; শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বুঝবে, জ্ঞান কেবল বই থেকে আসে না, আসে অরণ্যের নীরবতা থেকেও।
‘নিঝুমপুরীর জ্ঞানরাজ্য’ খ্যাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সেই অরণ্যপীঠ হয়ে উঠুক, পরিবেশ দিবসে এই চাওয়া।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
সাবেক পরিবেশ সাংবাদিক ও নিউ মিডিয়া গবেষক