মতামত

‘তুই রাজাকার’ থেকে ‘তুই গুপ্ত’

‘গুপ্ত’ এই মুল্লুকে কখনই ‘গুপ্ত’ ছিল না। প্রকাশ্যেই ছিল এবং একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপে আমাদের শাসন করতো। আসল ‘গুপ্ত’-এর সন্ধান পাওয়া যায় এই মুল্লুক বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হওয়ার পর। বিশ্বাস হচ্ছে না?

ভারতীয় উপমহাদেশে ৩২০ সন থেকে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’-এর শাসনকাল শুরু হয়। শ্রীগুপ্ত এই বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেও সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত এবং প্রথম ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে এর বিস্তার আর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। 

তখনই উপমহাদেশকে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করা হয় এবং গুপ্ত বংশের রাজকুমাররা এই প্রদেশগুলো শাসন করতেন। হুন আক্রমণ ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে ৫৫০ সনে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে সাহিত্য, জ্যোর্তিবিদ্যা ও গণিত বিকশিত হয় এবং আমরা কবি কালিদাস ও গণিত এবং জ্যোতির্বিদ আর্য্যভট্ট সম্পর্কে জানতে পারি। সুতরাং সব গুপ্ত খারাপ না এবং একদা গুপ্তরা প্রকাশ্যেই ছিল!

প্রকাশ্যেই কবিতা লিখতেন এবং দৈনিক প্রভাকর সম্পাদনা করতেন বিখ্যাত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯)। আমার মতোই ঈশ্বচন্দ্র গুপ্তেরও ‘রম্য রোগ’ ছিল! 

তিনি লিখেছিলেন, ‘‘কালগুণে এই দেশে বিপরীত সব/দেখে শুনে মুখে আর নাহি সরে রব/একদিকে দ্বিজ তুষ্ট, গোল্লাভোগ দিয়া/আরেক দিকে মোল্লা বসে মুরগী মাছ নিয়া।’’

গুপ্ত সাহেবের সবচেয়ে বিখ্যাত লাইন এমন, ‘‘ভাতৃভাব ভাবি মনে/দেখ দেশবাসীগণে/ প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া/কতরূপ স্নেহ করি/দেশের কুকুর ধরি/বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া!’’

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মারা গেছেন ১৬৭ বছর আগে। বাংলাদেশ এখনো ‘বিদেশি ঠাকুর’ থেকে মুক্ত হতে পারেনি! এই বিদেশি ঠাকুর হিসেবে কখনও আমেরিকা, কখনও রাশিয়া, কখনও ভারত বা পাকিস্তানের নাম উঠে আসে।

যাই হোক, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো থ্রিলার গল্প বা রহস্য সাহিত্য দিয়ে আমাদের প্রকাশ্যে বিনোদন দিতেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত। ভদ্রলোকের জন্ম নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইটনা গ্রামে। 

নীহাররঞ্জন সাহেবের অমর সৃষ্টি ‘কিরীটি রায়’ চরিত্রটি, যাকে নিয়ে একাধিক সিনেমা রয়েছে। কবিরাজ বংশের উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে নীহাররঞ্জন গুপ্ত চিকিৎসা পেশা বেছে নিয়েছিলেন। 

এমন আরো আছেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং জগদীশ গুপ্ত। তবে সব ‘গুপ্ত’ যেমন গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী না তেমনি কবি সমুদ্রগুপ্ত কেন তার নাম ‘গুপ্ত’ করে ফেলেছিলেন সেটা আমার মতো অনেকেই জানেন না। কবি সমুদ্রগুপ্তের আসল নাম ছিল আবদুল মান্নান বাদশা। কবি সমুদ্রগুপ্ত বাংলাদেশ ও ভারতে কিছু পুরস্কারও পেয়েছিলেন। অন্যদিকে রবার্ট লুইস স্টিভেনসন অমর হয়ে আছেন ‘গুপ্তধন’ বিষয়ক উপন্যাস লেখার জন্য যার নাম ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’। কত দেশের কত ভাষায় যে বইটি অনূদিত হয়েছে! 

বাংলাদেশে যে অগনিত জমিদার বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখানকার মাটি খুঁড়ে ‘গুপ্তধন’ বের করা নিয়ে অসংখ্য ঘটনা আছে। লটারি পাওয়ার মতো গুপ্তধন পেয়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার খায়েশ কার না থাকে?

‘গুপ্ত’ নামে যেমন হিন্দি ছবি আছে তেমনি বাংলা ছবির নাম আছে ‘গুপ্ত ঘাতক’। রাজনীতিতে চিরকাল ছিল, আছে এবং থাকবে ‘গুপ্ত খেলোয়াড়’। বলা হয় ‘কিংমেকাররা’ সবসময় থাকে গুপ্ত বা আড়ালে। 

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যারা স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, যার শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ পণ্য বর্জন ও ব্রিটিশদের প্রতি চূড়ান্ত অসহযোগিতা দিয়ে, সেটা রূপ নিয়েছিল বিপ্লবে। এই বিপ্লবের নায়করা গুপ্ত জীবন যাপন করতেন। 

এই উপমহাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকার সময় এর নেতারাও আড়াল বা গুপ্ত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এসব মানুষ ছিলেন দেশ মাতৃকার তরে উৎসর্গীকৃত প্রাণ, মানুষ আজও তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। সুতরাং সব ‘গুপ্ত’ই খারাপ না!

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর ক্রমশ ‘গুপ্ত’ শব্দটা সামনে চলে আসতে থাকে। এবং আরও অনেক দিন এটা থাকবে আলোচনায়। 

অগাস্ট অভ্যুত্থানের একটা শ্লোগান ছিল এমন, ‘‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার।’’ পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে এটা একটু পরিবর্তিত হয়। বলা হয়, ‘‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার!’’

শেখ হাসিনার পলায়নের পর এই শ্লোগানদাতাদের বেশ কয়েকজন ক্রমশ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তারা জানান দেন যে তারা জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য। তাদের অনেকেই ১৭ বছর ছাত্রলীগের ছাতা নিচে কিংবা হেলমেটের ভেতর ‘গুপ্ত’ ছিলেন! এদের অনেকেই তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শেখ হাসিনাকে তুমুল প্রশংসা করে আবেগী কথাবার্তা বলতেন।

ড. ইউনূস ছিলেন এই ‘গুপ্ত’দের সবচেয়ে বড় ‘প্রকাশ্য’ ও একই সাথে ‘গুপ্ত’ আশ্রয়দাতা। তিনি নিজেও আমেরিকার হয়ে ‘গুপ্ত’ ছিলেন কিনা আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তির পর সেই প্রশ্নও ‘গুপ্ত’ থাকেনি।

‘রিসেট বাটন’, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা ‘ছাত্রদের অ্যাপয়েন্টি’ বলে তিনি যেমন প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন, তেমনি ‘গুপ্ত’ভাবে হ্যাঁ ভোট, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভোট, এতদিন আওয়ামী লীগ দেখছি বিএনপি দেখছি এবার একবার জামায়াতকে দেখি’র পেছনে নিজের কর মওকুফের মতো গুপ্তভাবে কত শত কোটি টাকা ঢালছিলেন সেসবও ক্রমশ ‘গুপ্ত থেকে প্রকাশ্যে’ আসছে। 

ইউনূস সাহেব যে নিরাপত্তার নামে ‘এসএসএফ’ সুবিধা নিয়েছেন সেটাও গুপ্ত ভাবে। ২০২৪ সালে এসে কি ‘গুপ্তদের’ সন্ধান প্রথম পাওয়া যায় নাকি এসব আসলে ধারাবাহিকতা?

‘গুপ্তদের’ নিয়ে আলোচনাটা আসলে ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। একারণে প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম ‘বিশ্বাস হচ্ছে না?’ প্রথম গুপ্তদের দেখা মেলে স্বাধীন দেশে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যায়  রাজাকার, আল-বদর আল-শামস বাহিনীর মাধ্যমে সহায়তা, কয়েক লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন, দেশজুড়ে আগুন সন্ত্রাস আর বুদ্ধিজীবী নিধনে পূর্ণ সহযোগিতার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ এক ডজনের বেশি পাকিস্তান সমর্থিত ধর্মাশ্রয়ী দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। 

জামায়াতে ইসলামী করতেন এমন একাধিক ব্যক্তির লেখা থেকে জানা যায় স্বাধীনতার পর মুখচেনা নেতাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়ে বিচারের আওতায় আসেন, কেউ কেউ বিদেশে পালান আর অনেক সমর্থকরা মানুষের স্রোতে মিশে যান ‘গুপ্ত’ হয়ে।

এই অগনিত গুপ্তরা তখন বিরোধী স্রোতে, বিশেষ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) , চাইনিজ বাম বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাথে মিশে যান। বর্তমান জামায়াত প্রধান ডা. শফিকুর রহমান নাকি জাসদ করতেন। 

স্বাধীন বাংলাদেশে সিরাজ শিকদারসহ আরও অনেক নেতা বা দল ‘গুপ্ত’ রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। তাই বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতি আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমান বয়সী। 

২০২৪ সালের অগাস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতা ও সমর্থকদের কপালও একইরকম। কেউ কেউ পলাতক, কেউ কেউ জেলে আর কোটি সমর্থকরা নীরব বা ‘গুপ্ত’! 

তবে যে কোনও কালে, যে কোনও দেশে বিশ্বাসঘাতক বা গুপ্তচরদের ভালো চোখে দেখা হয় না। আরব ঐতিহ্য বা ধর্মের চোখে বিশ্বাসঘাতক ও গুপ্তচরদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইরান আমেরিকার এই যুদ্ধকালে ইরানের যারা ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে কাজ করেছে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

‘গুপ্ত’ নিয়ে আলোচনার এইসময়ে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে। সেটি একটি শ্লোগান। বাংলাদেশ টেলিভিশনে যখন রাজাকার শব্দটা ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না তখন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পাখির মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন ‘তুই রাজাকার।’ ডায়ালগটা ভয়াবহ জনপ্রিয় হয়, হয় হাজারো খবরের শিরোনাম। ‘তুই রাজাকার’ এর জায়গায় ‘তুই গুপ্ত’ স্থান করে নিচ্ছে কিনা সময়ই তা বলে দেবে!

 

[মতামত কলামে প্রকাশিত লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন]