‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় বাংলাদেশ, তবু কেন আশ্রয়ের আবেদন করছেন

মুন্না মিয়া গোপনে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান ১৯৯৮ সালে। অবৈধভাবে অবস্থানের জন্য গ্রেপ্তার হন ২০১০ সালে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়ার পরই নজরে আসে তার অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানের ঘটনা।

যদিও সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-কে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার সময়ই মুন্না  যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। 

দ্য টেলিগ্রাফ আরও জানাচ্ছে, গ্রেপ্তারের পর মুন্না মিয়া মুক্তি পেলেও কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত হাজিরা দেননি। পরে তাকে পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ২০১২ সালের অক্টোবরে তিনি মানবাধিকার বিবেচনায় যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি চান। ২০১৩ সালের মে মাসে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়। এরপর আবার ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মুন্না রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। কিন্তু ২০১৯ সালে হোম অফিস সেই আবেদনও নাকচ করে দেয়। কর্তৃপক্ষ তার বিএনপির সদস্য হওয়ার দাবি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়ার যুক্তি গ্রহণ করেনি।

গত বছরের এপ্রিলে তিনি আবারও ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল স্বীকার করে জানায়, যুক্তরাজ্যের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে জটিলতা ছিলো। তবে মানবাধিকার বিবেচনায় করা তার আবেদন খারিজ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল। 

মুন্না আবারও আপিল করেন। তার অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আইনি ভুল হয়েছে। ‘আপার ট্রাইব্যুনাল’-এর বিচারক তার এ যুক্তির সঙ্গে একমত হন এবং মামলাটি নতুন করে শুনানির নির্দেশ দেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় ভেতর এখনো যুক্তরাজ্যেই আছেন মুন্না । 

মুন্না ঠিক কীভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন তেমন কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও সম্প্রতি বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন ১০ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে দিয়ে নতুন করে আবার আলোচনায় এসেছে ‘অ্যাসাইলাম।’ 

নিরাপদ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম ২০২৬ সালের ৩ই মে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় দেশগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কমে গেছে। 

তার প্রধান কারণ হিসাবে তারা বলেছে, সিরিয়া, বাংলাদেশ ও তুরস্কের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। 

এর আগে ১০ই ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল জানিয়েছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াবিষয়ক বিধিমালায় পরিবর্তন অনুমোদন করেছে। যেন আশ্রয় আবেদন আরও দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষিত নিরাপদ দেশের তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশের। তালিকায় আরও আছে কলম্বিয়া, মিসর, কসোভো, ভারত, মরক্কো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশের নাগরিকদের করা আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত দেশের কোনো আবেদনকারী যদি মনে করেন তার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়, তাহলে তাকে নিজেই প্রমাণ করতে হবে যে নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতনের আশঙ্কা বা ঝুঁকি আছে।

কোথায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন বাংলাদেশিরা 

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ৩৫ হাজার ৩০০ জন বাংলাদেশি পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।    

ইতালিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক ২৭ হাজার ৪৮০ জন বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো অ্যাসাইলামের আবেদন করেছেন। এছাড়াও গ্রিসে ২ হাজার ৮৪০, স্লোভানিয়ায় ৯০ এবং মাল্টায় ৩৫ জন প্রথমবারের মতো আবেদন করেছেন।

কোথায় আশ্রয় খুঁজছেন বাংলাদেশিরা

যুক্তরাজ্যের চিত্রও একই রকম। সেখানে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ২০২৪ সালে রেকর্ড ছুঁয়েছে। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সেই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের আবেদন জমা পড়ে  ৭ হাজার ২২৫টি। 

সর্বশেষ পরিসংখ্যান, হোম অফিসের ইয়ার এন্ডিং মার্চ ২০২৬ (এপ্রিল ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬) সময়ের হিসাবে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন ছিলো ৫ হাজার ৯৪৪টি। যা তার আগের ১২ মাসের (এপ্রিল ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫) ৭ হাজার ২৪৩টি আবেদনের তুলনায় এটি ১ হাজার ২৯৯টি বা ১৮ শতাংশ কম।

যার মান দাঁড়ায়, ২০২৪ সালে ক্যালেন্ডার বছর হিসেবে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠলেও, পরবর্তী এক বছরে সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে।

দেশে ছেড়ে কেন নিচ্ছেন রাজনৈতিক আশ্রয় 

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম মনে করেন রাজনৈতিক কারণে আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। 

“বাংলাদেশের অনেকে যে কোনোভাবেই হোক ইউরোপে ঢুকে পড়তে চায়। তারপর তারা অ্যাসাইলাম চায়। আর এর জন্য যে কারণগুলো তারা সামনে হাজির করেন তার মধ্যে ৯৮ শতাংশের বাস্তব কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না।”

তিনি আরও বলেন, অনেকে ইউরোপের দেশগুলোতে ঢুকে নিজেকে ‘মাইনর’ কিংবা সমকামী দাবি করেন। এমনকি বেদে সম্প্রদায়ের লোক হিসেবেও নিজেকে দাবি করেন। এসবের কোনো বাস্তব ভিত্তি কিংবা প্রমাণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা দেখাতে পারেন না। 

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দুটি ধারার কথা তুলে ধরেন জানান, দেশে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সত্যিকার অর্থে কিছু কেইস থাকে। আবার অন্য অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুবিধা নেন। দ্বিতীয় ধারা হলো, অনেকেই বৈধ উপায়ে গিয়ে নানান কারণ দেখিয়ে অ্যাসাইলাম চান। 

“আমরা যদি ধরি যে ২০২৪ এর পরিবর্তনের পরে একটা ধারা। কেউ কেউ অ্যাসাইলাম আবেদন করতে পারেন। অনেকেই মনে করতে পারেন বিগত রেজিমের রাজনৈতিক আদর্শের হওয়ার কারণে হয়তো তিনি ঝুঁকিতে আছেন। তারা আবেদন করতে পারেন। আর কেউ হয়তো ঝুঁকিতে না থেকেও এর সুযোগ নেন। আবার অনেকে আছেন যাদের মাইগ্রেট করা বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি সুযোগটা কম। তাদের কেউ কেউ অ্যাডভাইস দেয় কিংবা ল’য়াররাও আছেন তারা তখন অ্যাসাইলামের কথা বলেন।” 

তিনিও মনে করেন সাময়িক ভিসায় অনেকেই বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেন। তারপর স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় আশ্রয় নেন, যার মধ্যে একটি হলো অ্যাসাইলাম।

দেশের ভাবমূর্তি কি নষ্ট হচ্ছে 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশ হিসেবে ঘোষণা করার পর প্রক্রিয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে গেছে বলে মনে করেন শরিফুল হাসান। “তারপরও অনেকে যান টাকা খরচ করে। কারণ তারা মনে করেন এক মাস বা ছয় মাস বা এক-দুই বছর সেখানে কাজ করে কিছু টাকা আয় করে নেবেন।” 

নতুন নিয়মেও অনেকেই ভুয়া কাগজপত্র এবং যথাযথ কারণ দেখাতে না পারলে দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান ব্র্যাকের এই সহযোগী পরিচালক।   

“আগের মতো অ্যাসালাইম আবেদন করে লম্বা সময় থাকা এখন সম্ভব হবে না। আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুত তারা জানিয়ে দেবে। যথাযথ কারণ দেখাতে না পারলে তারা সর্বোচ্চ চার সপ্তাহের মধ্যে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। শুধু তাই না ইউরোপ এখন আলোচনা করছে যে তারা ইউরোপের মধ্যে ঢুকতে না দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে রাখবে।” 

তিনি মনে করেন অধিকাংশই অ্যাসাইলাম আবেদন করার পর তেমন কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেন না। তখন দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। 

“যে ছেলে বা মেয়েটা সত্যি সত্যি ইউরোপ বা আমেরিকায় পড়তে যাবে, সেও তখন সন্দেহের শিকার হয়। তখন ভাবেন হয়তো সে পড়া শেষ করে ফিরে আসবে না,” আলাপ-কে বলেন তিনি। 

অন্যদিকে আসিফ মুনীর মনে করেন একদিক দিয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও অন্যদিকে বাংলাদেশি প্রবাসীরা যথেষ্ট সুনাম অর্জন করছেন। “ধরা যাক যারা আগে থেকেই ইতালিতে আছেন, তারা তো সেখানে একটা রেপুটেশন তৈরি করেছেন।” 

তার মতে, মানুষের মধ্যে যখন একটা মরিয়া ভাব কাজ করে তখন সে দেশের কথা চিন্তা করেন না; সেটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পরিবার কেন্দ্রিক চিন্তাই সবাই করে। “বিদেশে গেলে একজন মানুষ ভাবে কীভাবে সেখানে সেটেলড হবেন। সেখানে দেশের ভাবমূর্তির কথা তেমন একটা ভাবেন না।”