তফসিল ঘোষণার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটল নির্বাচনের ট্রেন। তবে এর আগেই নির্বাচনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল জামায়াত, বিএনপি এবং সবশেষ এনসিপির প্রার্থী তালিকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। আর সেই তালিকা থেকে আলোচিতদের স্বপ্নভঙ্গ যাত্রার শুরুতেই চড়িয়ে দিয়েছে সেই ট্রেন ইঞ্জিনের তাপমাত্রা।
রুহুল কবির রিজভী, রুমিন ফারহানা, হাবীব উন নবী খান সোহেল, আবদুস সালাম, মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের পর এনসিপির প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন সামান্তা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত মীর মুগ্ধর ভাই মীর স্নিগ্ধ ও আলোচিত স্যালুট রিক্সচালক সুজন।
অন্যদিকে জামায়াতের সংযোজন বিয়োজনে প্রাথমিক তালিকায় ঠাঁই পেয়েও বাদ পড়েছেন মাওলানা মুখলিছুর রহমান, মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ।
অবশ্য কোনো তালিকাই চূড়ান্ত নয়, যতদিন না মনোনয়ন দাখিলের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। যাদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে অন্যতম ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন।
প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দলগুলো। আর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের শুরু হয় দলের ভেতর এবং মাঠ পর্যায়ের জনসংযোগ।
প্রফেসর ইউনূসের সরকার ২০২৫ এর শুরুতেই নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানালে সবার আগে ১০০ আসনে প্রার্থী তালিকা নিয়ে হাজির হয় জামায়াত। প্রাথমিক সেই তালিকা এরপর বেড়েছে। যার কাটা ছেঁড়ায় সবশেষ সংযোজন মুসলিম প্রার্থী সরিয়ে হিন্দু প্রার্থীর মনোনয়ন।
ফেব্রুয়ারিতে জামায়েতের পর, নভেম্বরে ২৩৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দৃশ্যপটে হাজির হয় বিএনপি।
যে তালিকায় পরের মাসে আরও ৩৬ আসন যোগ হয়। ২৭২ আসন শেষ হলেও ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি অনেক আলোচিত নেতার। নাম ওঠেনি নির্বাচনের তালিকায়।
ইতোমধ্যে এনসিপি তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করছে যেখানে নাম নেই তরুণ দলটির হেভিওয়েট অনেকের।
নির্বাচনের প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় হেভিওয়েট প্রার্থীদের বাদ পড়া কোনো কৌশল নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো হিসাব নিকাশ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়া বলেন, “দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন এর পেছনে অনেক কারণ কাজ করেছে। এক একটি দলের ক্ষেত্রে এই সমীকরণ এক এক রকম। বিএনপির ক্ষেত্রে যে বাস্তবতা, এনসিপির জন্য সেই হিসাব ভিন্ন। আবার জামায়াত দ্রুত নির্বাচন ক্যাম্পেইন শুরু করলেও তারা নতুন করে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছে।”
“তবে হেভিওয়েট বা আলোচিতরা প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন এখনই তা বলা যাচ্ছে না, কারণ মনোনয়ন দাখিল এবং ভোটের মাঠের জোট নিয়ে এখনও নানারকম সমীকরণ রয়ে গেছে।”
বিএনপির মনোনয়ন বার্তা
বিএনপি দুই দফায় মনোনয়ন তালিকা ঘোষণা করলেও এখনও সেই তালিকায় ঠাঁই হয়নি দলটির হেভিওয়েট অনেক নেতার নাম।
গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম ও মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবীব উন নবী খান সোহেল, সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন মনোনয়ন পাননি।
মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানারও তালিকায় ঠাঁই হয়নি। অথচ আওয়ামী লীগ শাসনামলে একমাত্র যে নির্বাচনে বিএনপি যোগ দিয়েছিল সেই নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের মনোনয়ন পেতে নির্বাচনি দৌড়ঝাঁপও শুরু করেছিলেন।
এছাড়া আবদুস সালাম ঢাকার মোহাম্মদপুর, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বরিশাল, রুহুল কবির রিজভী রাজশাহী, হাবীব উন নবী খান সোহেল ঢাকায়, আসলাম চৌধুরী চট্টগ্রামে ও কামরুজ্জামান রতন মুন্সিগঞ্জ থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন।
কোন বিবেচনায় তাদের প্রার্থী করা হয়নি, তা জানা যায়নি। তবে তাদের প্রার্থী না করায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন আছে।
প্রার্থীতা না পাওয়া প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সারা জীবন দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলেছি। দল যা ভালো মনে করেছে, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে আমার কোনো বক্তব্য নেই।” আওয়ামী লীগের শাসনামলে যখন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচীর ওপর চরম দমনপীড়ণ চলছিলো, তখন বারবার কারাবরণ করেছেন রিজভী। মাসের পর মাস বাসায় না গিয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাত কাটিয়েছেন।
শুভ কিবরিয়া বলেন, “বিএনপির অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এদের অনেকেরই নির্দিষ্ট কোনো আসন নেই। সোহেল রংপুরের লোক তিনি ঢাকায় আসন চেয়েছেন, রিজভীর জন্ম কুড়িগ্রামে কিন্তু বড় হয়েছেন রাজশাহীতে।”
“বিএনপিতে আবার কিছু আসন খালি রাখা হয়েছে দল পরিচালনা ও জোটের ভাবনা থেকে। অফিস পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবেও কারো থাকতে হবে। দলতো চালাতে হবে। রিজভীকে সেই ভাবনা থেকেও সরিয়ে রাখা হতে পারে। এরা পরবর্তীতে অন্যভাবে পুরস্কৃত হতে পারেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রিজভী টেকনোক্র্যাটে মন্ত্রী হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।”
জামায়াতের কৌশল
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে ১০০টি সম্ভাব্য আসনে প্রাথমিক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীতে সব আসনের জন্যই প্রাথমিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে প্রস্তুতি শুরু করে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন তালিকা চূড়ান্ত করেনি দলটি।
দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “জামায়াত সঠিক সময়ে তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে।”
প্রাথমিক তালিকার পর সংযোজন বিয়োজন করছে দলটি। এরই মধ্যে জামায়াতের প্রার্থী বদল শুরু হয়েছে।
নির্বাসিত প্রবাসী সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে হবিগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া মুখলিছুর রহমান নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
খুলনা-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বটিয়াঘাটা উপজেলা জামায়াতের আমির শেখ আবু ইউসুফকে প্রার্থী ঘোষণা করছিল। কিন্তু প্রার্থী পরিবর্তন করে সেখানে এখন দেওয়া হয়েছে জামায়াতের ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে।
জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে এবারই প্রথম অন্য ধর্মের কোনো ব্যক্তিকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলো। যা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতের ক্ষেত্রে এমন কৌশলকে প্যানেল ভোটের সুবিধা বলে মনে করছেন শুভ কিবরিয়া, “জামায়েতের ভোট প্যানেলভিত্তিক। প্যানেলভিত্তিক বলতে বোঝাচ্ছি যাদের ‘ফিক্সড ভোটার’। অর্থাৎ যে মনোনয়ন পাবে তার হয়েই লড়বে সমর্থকরা। কিন্তু বিএনপির মতো দলের জন্য বাস্তবতা কিন্তু এমন নয়। তা ছাড়া জামায়াতকে জোটসহ আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় রেখে প্রার্থী দিতে হচ্ছে।”
এনসিপির নির্বাচন রাজনীতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথম দফায় ১২৫ জন প্রার্থীর মনোনয়ন তালিকা ঘোষণা করেছে। তবে এই তালিকায় জায়গা পাননি আলোচিত নেতা ও দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
এবারের নির্বাচনে তিনি রংপুর-১ আসনে মনোনয়ন চাইলেও পাননি। অথচ এনসিপি গঠনের শুরু থেকেই নেতৃত্বের প্রথম সারিতে ছিলেন তিনি। দল গঠনের আগে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র ছিলেন।
আলোচিত রিকশাচালক সেই স্যালুট সুজনের নাম প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় রাখেনি এনসিপি। গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের প্রতি স্যালুট দিয়ে ব্যাপক সমর্থন ও আলোচনায় আসা সুজন।
এরপর ঢাকা-৮ আসনের জন্য গত ২০ নভেম্বর এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।
প্রথম ধাপের এই প্রার্থী তালিকায় নেই এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম। তবে নুসরাতের প্রার্থিতার আবেদন করা কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে এখনও প্রার্থী ঘোষণা করেনি দলটি। এনসিপি’র ঘোষিত ১২৫ আসনের তালিকায় স্থান পায়নি কুষ্টিয়ার চারটি সংসদীয় আসন।
নুসরাতের ক্ষেত্রে তার পরিবারের বিএনপি করার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়া, “সামান্তা শারমিন এর বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। কেন তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি সেটা আমার এখনও বোধগম্য নয়। তবে নুসরাতের ক্ষেত্রে তার পারিবারিক ভাবে বিএনপির রাজনীতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিবেচিত হলেও হতে পারে।”