সংসদ নির্বাচন ২০২৬: কমিশন কতটা ‘ক্ষমতাবান’

বাংলাদেশেরর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফল দেয়া পর্যন্ত অসীম ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের হাতে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কতটা চর্চা করতে পারে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন? দুইটি পুরনো ঘটনা জেনে আসি চলুন। 

২০১৬ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় গাজীপুরের ওই সময়ের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়াই তাকে ফের গাজীপুরে পদায়ন করা হয়।

এ নিয়ে ওই সময়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ্যেই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। তবে পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, তিনি নির্বাচনের পরে দায়িত্ব নেবেন।

২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সশস্ত্র বাাহিনী বিভাগকে চিঠি দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। ভোটের দুইদিন আগে থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার জন্য বলা হলেও তা করা হয়নি। ওই সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা ঘটনাটি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন।

পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ, অনিরপেক্ষ, অগ্রহণযোগ্য, বাধাবিপত্তিসঙ্কুল ও একপেশে নির্বাচনের পর বৃহস্পতিবার আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন।

একটি সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় সবাই। বহুল ব্যবহৃত হলেও, প্রত্যাশার পারদের উচ্চতা মাপতে শব্দগুলো বিকল্পহীন।

আশাবাদ তৈরি হয়েছে প্রায় দেড় দশক পর ভোটাররা নিজের সাংবিধানিক অধিকার নির্ভয়ে প্রয়োগ করতে পারবেন। একই সাথে থেকে যাচ্ছে সেই পুরোনো প্রশ্ন - নির্বাচন কমিশন কি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব নির্ভয়ে এবং বিনা বাধায় পালন করতে পারবে? সে কি চর্চা করতে পারবে কিংবা করবে তার উপর প্রদত্ত ‘অসীম’ ক্ষমতা? 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীন তফসিল ঘোষণা উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে অবশ্য বলেছেন, “স্বচ্ছতা নিরপক্ষেতা দৃঢ়তার সাথে দায়িত্ব পালনে বদ্ধ পরিকর”।

নির্বাচনে অংশ নেয়া দল ও প্রার্থীদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন এ ব্যাপারে কোন শিথিলতা বা গাফিলতি দেখানো হবে না”। 

কী ক্ষমতা কমিশনের

তফসিল ঘোষণার পরই কার্যত নির্বাচনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় নির্বাচন কমিশনের হাতে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নিশ্চিত করা আছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত আইন এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যক্ষমতা উল্লেখ করা আছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে। নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব যারা পরিচালনা করেন, তফসিল ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন চাইলে ওই প্রশাসনের মধ্যে রদবদল আনতে পারে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভাগীয় কমিশনার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং তাদের অধস্তন কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা ছাড়া বদলি করা যায় না।

আর সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বদলি করার প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশন লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব সে বদলি কার্যকর করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা সম্পর্কে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম বলেন, “আমাদের যে আইন, আমাদের যে সংবিধান, আমাদের যে বিধিমালাগুলো আছে, এটার মাধ্যমে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, নির্বাচন করা সম্ভব। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব”

তিনি বলছিলেন, “১৯৯১, ১৯৯৬ এর জুন, ২০০১, ২০০৮ সাল যখন কেয়ারটেকার সরকার ছিল তখনকার আইন এখনকার চেয়ে উইক ছিলো, শর্টকামিং ছিল। তখনও আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছি।”

প্রার্থিতা বাতিল

কোনও প্রার্থী যদি নির্বাচনি আইন ও আচরণবিধি না মানেন, সেক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়টিতে নির্বাচন কমিশনের পুরোপরি এখতিয়ার আছে।

সর্বশেষ সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের পরও কোনও সংসদ সদস্যের অযোগ্যতাসংক্রান্ত কোনও বিরোধ তৈরি হলে নির্বাচন কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা অন্য কোনওভাবে অবহিত হয়ে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তি করতে পারবে।

কোনও প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে নির্বাচিত ঘোষণার পরও তদন্ত সাপেক্ষে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।

রিটার্নিং অফিসার

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, একজন রিটার্নিং অফিসারকে নির্বাচন কমিশন যেভাবে দায়িত্ব দেবে, তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য থাকবেন।

কোনও কেন্দ্রে ভোটে অনিয়ম ধরা পড়লে বা ভোটগ্রহণে বাধা তৈরি হলে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারবেন এবং রিটার্নিং অফিসারকে জানাবেন। এরপর কী হবে তা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

ফল বাতিল

ভোট চলার সময় নির্বাচনের কমিশনের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা আছে। কমিশন প্রয়োজন মনে করলে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা স্থগিত রাখতে পারবে। নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে গাইবান্ধায় একটি আসনে উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে সেদিনই ভোটগ্রহণ বাতিল করে নির্বাচন কমিশন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনী ২০২৫ অনুযায়ী, অনিয়ম হলে ইসি চাইলে একটি সংসদীয় আসনের সব কেন্দ্রের ফল বাতিল করতে পারবে। এমনকি প্রয়োজন মনে করলে ৩০০ আসনের সবকটির ফলাফলও বাতিল করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।

আইন কী শেষ কথা?

শুধু সংবিধান বা আইন দিয়ে কি সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব? নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম বলছেন, “সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে আইন, আইনের সঙ্গে পলিটিকাল উইল। যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তার পলিটিকাল উইল। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চাচ্ছে কিনা। এর সাথে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা। এই আইন যেগুলো আছে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করবে। ব্যবহারটা কীভাবে করবে। কেউ যদি আইন না মানে তাকে কীভাবে শক্তহাতে তাকে ‘ট্যাকল’ করবে। শুধু আইন তৈরি করলে হবে না, তার বাস্তবায়ন লাগবে।”

সরকার কথা না শুনলে কী হবে?

নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা নির্বাহী বিভাগের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ যদি ওই সহায়তা না করে তাহলে নির্বাচন কমিশন কী করবে? 

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম বলেন, “সংবিধান ‘ভায়োলেশন’ যদি কেউ করে, কোনও সরকার যদি করে, নির্বাচন কমিশন আদালতে যেতেই পারে। কিন্তু আমাদের এখানে সেই রেওয়াজ, এই প্র্যাকটিসটা নেই।”

এক্ষেতে ভারতের উদাহরণ দেন আবদুল আলীম। বলেন, “যদি সরকার কথা না শোনে, সহযোগিতা না করে, তখন ইলেকশন কমিশন আদালতের কাছে যায়। আদালত নির্দেশনা দেয় এমন উদাহরণ আছে ভারতে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনও ইলেকশন কমিশন, সরকারের কোনও সিদ্ধান্তকে বা ইলেকশন কমিশনের চাওয়াকে সরকার যদি ‘নেগলেক্ট’ করে, সেইটার প্রতিকার চেয়ে কখনই আদালতে যায়নি। কিন্তু যাওয়ার সুযোগ নিশ্চয়ই আছে।”

এবার কী করবে ইসি?

একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে প্রথম থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশন। আবদুল আলীম বলছিলেন, “আমাদেরতো পলিটিকাল গর্ভমেন্ট যখন থাকে তখন নির্বাচন কমিশন সরকারের অনেকটা ইচ্ছানুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করে। তাই তারাও সেটাতে চ্যালেঞ্জ করে না।”

এবারের নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশা জানিয়ে আবদুল আলীম বলছিলেন, “এবার নির্বাচন কমিশন, অন্তবর্তী সরকারও নিজেও যেহেতু চাচ্ছে কোট আনকোট ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ করবে তারা সেটাই আশা করি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যেন বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের যাত্রা শুরু হোক”।