সাংবাদিকতা থেকে ইস্তফা দিয়েছিলাম। ছেড়ে দিয়েছিলাম বিবিসি বাংলায় বারো বছরের পুরনো চাকরিটি। ভেবেছিলাম আর ফিরবো না। কেন সাংবাদিকতায় ফিরতে চাইনি সেটা অন্য প্রসঙ্গ। তবে পেশাটা বদলাতে চেয়েছিলাম।
তিন বছর ছিলাম সাংবাদিকতা থেকে দূরে।। ২০২২ থেকে ২০২৪। এই তিন বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার চাকরি, শিক্ষকতা, ইউটিউবে ভ্লগিং এমনকি ব্যবসা করারও চেষ্টা করেছি। কিন্তু এসব করতে গিয়ে আমার একটাই উপলব্ধি- আমি আসলে সাংবাদিক। যখন ব্যবসার চেষ্টা করছিলাম, তখন কেউ পেশা জিজ্ঞাসা করলে ইতস্তত বোধ করতাম। এক পর্যায়ে বলে ফেলতাম আমি আসলে সাংবাদিক। তাই সাংবাদিকতায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেই। পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে শিক্ষকতা অব্যাহত রাখব।
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে আমাকে সাংবাদিকতায় ফেরার সুযোগ দেন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী গ্রুপ, শেলটেকের উদ্যোক্তারা। তারা আমাকে তাদের নবগঠিত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ দেন গত মার্চ মাসে। তারপর আমাকে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম গড়ে তোলার অ্যাসাইনমেন্ট দেন। আমাদের সেই উদ্যোগের নাম ‘আলাপ’। একটি নতুন ভাবনা- যেখানে সাংবাদিকতা হবে নতুন সময়ের, নতুন প্রজন্মের জন্য। তাদের পছন্দের ফরমেটে। বহু বছর ধরে আমাদের চেনা যে ফরম্যাট সেরকম নয়।
সুযোগ ছিল আলাপকে একটি টেলিভিশন চ্যানেল করার। নিদেনপক্ষে একটি ইংরেজি বা বাংলা ছাপা পত্রিকা হিসেবেও আলাপের জন্ম হতে পারতো। আমরা যখন আলাপ করছিলাম, তখন আলাপের চেহারা কেমন হবে, মাধ্যম কী হবে সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছি। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি ৩৬০ ডিগ্রি ডিজিটাল গণমাধ্যম বানাবো। অর্থাৎ ‘আলাপ’ হবে একটি ৩৬০ ডিগ্রি ডিজিটাল গণমাধ্যম, যেখানে আপনি পাবেন ভিডিও, অডিও, টেক্সট এবং গ্রাফিক্স। কী হল, কখন হল, কে করলোর বদলে কেন হলো, কীভাবে হল, এরপর কী হবে বা হতে পারে। সে বিষয়ে থাকবে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, পডকাস্ট ইত্যাদি। আমাদের গল্প বলার স্টাইল হবে ছাপা ও ভিজ্যুয়াল গণমাধ্যমের সংমিশ্রণে তৈরি নতুন ভাবনার। যেখানে থাকবে ‘রিড বিটুইন দ্য লাইনের’ সংযোগ। অপ্রকাশিত গল্পে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী থাকবে আলাপ।
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার ফলাফল বলছে, বিশ্বজুড়েই মানুষের সংবাদ পাঠ বা দর্শন বিষয়ক অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালে রয়টার্স ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট দেখিয়েছে, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ- বিশেষ করে তরুণেরা সংবাদ পড়ছেন বা দেখছেন মূলত মোবাইল ফোনে। তাদের সংবাদের উৎস ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের মত সোশ্যাল মিডিয়া। ওই রিপোর্ট আরো বলছে, ৫০ শতাংশেরও বেশি তরুণ এখন টেলিভিশনে খবর দেখেন না। বরং নিজের হাতে ফোন ধরে নিজের মতো করে খবর খোঁজেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টার ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় আমেরিকায় প্রচলিত গণমাধ্যমের ভোক্তার সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উল্টোদিকে বিরাট উল্লম্ফন হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমের ভোক্তার সংখ্যায়। আমেরিকায় ১৯৪০ এর দশকে ছাপা পত্রিকার সাপ্তাহিক পাঠকের সংখ্যা যেখানে চার কোটির উপরে ছিল, ২০২০ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে দুই কোটিতে। পরিবর্তন এসেছে আমেরিকানদের টিভি দেখার অভ্যাসেও। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে যেখানে আমেরিকান টেলিভিশনগুলোর সান্ধ্যকালীন সংবাদের গড় দর্শকসংখ্যা ছিল চল্লিশ লাখের উপরে; ২০২০ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ত্রিশ লাখে। দর্শক ও পাঠকসংখ্যা কমার চাপ পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের উপরে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপন ও সাবস্ক্রিপশন বাবদ আয় কমতে কমতে তলানীতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু এরকম পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠানের ভোক্তা বেড়েছে শুধু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যারা মানিয়ে নিতে পেরেছে তাদের। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টের কথা। এদের ছাপা প্রকাশনার পাঠক কমে গেছে বিরাট সংখ্যায়। কিন্তু সেটা তারা পুষিয়ে নিচ্ছে তাদের ডিজিটাল অপারেশন দিয়ে। ২০২২ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশনে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩২শতাংশ। ওই বছর তাদের ডিজিটাল ওনলি সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়।
ইউরোপে দেখুন। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের টেলিভিশন, রেডিও ও পত্রিকার অপারেশন ছোট করে ফেলছে। মনোযোগ বাড়াচ্ছে ডিজিটালে। যেমন বিবিসি। বাংলাদেশে অনেকের ধারণা বিবিসি বাংলা তাদের অপারেশন বন্ধ করে দিয়েছে। বিবিসি ছাড়ার তিন বছর পর এসেও আমাকে অনেকের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, “আচ্ছা বলেনতো দেখি বিবিসি বন্ধ হয়ে গেল কেন?”
আসলে কি বন্ধ হয়েছিল বিবিসি? না। বাংলাদেশের মানুষ বিবিসি বাংলাকে চিনতেন তাদের রেডিও অনুষ্ঠানের কারণে। কিন্তু এই অনুষ্ঠানটি এক পর্যায়ে শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছিল। বছর বছর কমছিল দর্শকসংখ্যা। ২০১১ সালে আমি যখন বিবিসি বাংলায় যোগ দেই তখন এর রেডিও অনুষ্ঠানের সাপ্তাহিক দর্শক ছিল ৭০ লাখের উপর। ২০১৮ সাল নাগাদ সেই অনুষ্ঠানের সাপ্তাহিক দর্শক নেমে আসে ত্রিশ লাখের নীচে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই কমছিল। শুধু বাংলা না। বিবিসির সব ভাষা বিভাগেই টেলিভিশন ও রেডিওর দর্শকসংখ্যা কমছিল। অথচ ‘ভিশন টোয়েন্টি-টোয়েন্টি’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় বিবিসি পরিকল্পনা করে ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে সাপ্তাহিক ভোক্তার সংখ্যা সাড়ে তিনশ মিলিয়ন থেকে পাঁচশো মিলিয়নে নেয়ার। টেলিভিশন বা রেডিও দিয়ে এটা অর্জন করা সম্ভব ছিল না তাদের জন্য। তাই তারা অব্যর্থ কৌশলটি গ্রহণ করে। তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে ডিজিটাল প্লাটফর্মকে শক্তিশালী করতে। শেষ পর্যন্ত বিবিসি তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছিল।
এই যাত্রায় বিবিসি আরো একটি উপলব্ধি করেছিল - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সফল প্রযুক্তি রেডিওর দিন শেষ। বিংশ শতাব্দির সপ্তাশ্চার্যের একটি বলে পরিচিত টেলিভিশনের সর্বশক্তিমান দিনও যায় যায়। তাই ২০২১ সালের শেষভাগে বিবিসি তাদের প্রায় সব রেডিও অপারেশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। টিভি অপারেশনের বরাদ্দে করেছিল ব্যাপক কাটছাঁট। একইসাথে তারা ব্যয়ও বাড়িয়েছিল- যার প্রায় সবটা গিয়েছিল ডিজিটাল উন্নয়ণে। বিবিসি বাংলার রেডিও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তখনই। কিন্তু বহু বহু গুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে তাদের ডিজিটাল অপারশেন। বিবিসি বাংলাতো বন্ধ হয়ইনি বরং তাদের কর্মীসংখ্যা সংস্থাটির ৮৫ বছরের ইতিহাসে এখন সবচাইতে বেশি। ঢাকায়, কলকাতায় এবং দিল্লিতে বিবিসি বাংলার এখন রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী এবং ব্যাপকমাত্রার কর্মযজ্ঞ।
ডিজিটাল গণমাধ্যমের এই উত্থান এবং প্রচলিত গণমাধ্যম বা লিগ্যাসি মিডিয়ার ভগ্নদশা (পত্রিকা, টিভি ও রেডিও) পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে সব জায়গাতেই কমবেশি একই। টেলিভিশনকে আধুনিক তরুণরা এখন একমুখী, ধীরগতির এবং পুরনো ধাঁচের বলে মনে করেন।
আমার দশ বছর বয়েসী কন্যার কথা বলতে পারি- ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের কয়েকদিন যখন সারাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউন করে রেখেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার- তখন বাসায় কয়েকদিনের জন্য স্যাটেলাইট কানেকশন চালু করা হয়েছিল। মেয়ের স্কুল নেই, কোথাও যেতে পারে না, তাই বেশিরভাগ সময় তার কাটে টেলিভিশনের সামনে। ওই প্রথম সে আবিস্কার করে একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান দেখার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট চ্যানেলে ঢুকতে হবে তাকে। এর আগে বা পরে হলে হবে না। বিশ্বাস করুন ওই ঘটনার আগে তার টেলিভিশনের ওই চরিত্র একেবারেই অজানা ছিল। সে ইউটিউবের একজন লয়াল দর্শক। যখন ইচ্ছে যে অনুষ্ঠান ইচ্ছে দেখে। ইচ্ছে হলে একই দৃশ্য বারবার দেখে। কোন দৃশ্য দেখতে ভাল না লাগলে এড়িয়ে যায়। আর আমাদের ছোটবেলাতে টেলিভিশনে কোন ভৌতিক বা সহিংস দৃশ্য হঠাৎ সামনে চলে এলে আমাদের টিভি বন্ধ করা বা চোখ-কান বন্ধ করে রাখা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। সেই আশি-নব্বইয়ের দশকে তো টেলিভিশনের চ্যানেল সুইচ করারও সুযোগ ছিল না।
সারা দুনিয়ার মত দক্ষিণ এশিয়াতেও টেলিভিশনের একই দশা। এখানে যদিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আছে এবং বড় বাজেটের নতুন নতুন আরো টেলিভিশন চ্যানেল আসার কথা শোনা যাচ্ছে- কিন্তু বাস্তবতা হলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই দেশে লিগ্যাসি মিডিয়া এখন শ্বেতহস্তী ছাড়া আর কিছু না। বাংলাদেশের এই সময়ের জনপ্রিয় টেলিভিশনগুলোর আয়ের উল্ল্যেখযোগ্য অংশই আসছে গুগল ও মেটা থেকে।
বাংলাদেশে গুগল এবং মেটাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে বর্তমানে ব্যবসার আকার ১১শ কোটি টাকা। যা প্রতিবছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পূর্বাভাস বলছে বাজারের এই আকার আগামী কয়েক বছরে দ্বিগুণ হবে।
অন্যদিকে প্রচলিত বিজ্ঞাপনের বাজার দিনকে দিন ক্ষীণ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে টেলিভিশন ও সংবাদপত্রকে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সংবাদ ব্র্যান্ডগুলোও বলছে- digital first, print optional। তাই যারা এরইমধ্যে বাস্তবতা অনুধাবন করেছেন তারা নিজেদের প্রাসঙ্গিক করার উদ্যোগ নিচ্ছেন।
ছাপা পত্রিকার বড় ব্র্যান্ডগুলো অবস্থান ধরে রাখতে চালু করেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশে প্রথম আলোর মত বড় ব্র্যান্ড তাদের ডিজিটাল অপারেশনকে আলাদা করে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করে তুলছে। আজকাল ডেইলি স্টারের ডিজিটাল অপারেশন দেখে মনে হচ্ছে তারা এই খাতে বরাদ্দ ও তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
তাহলে প্রিন্ট ও টেলিভিশনের দিন কি শেষ? না। কিন্তু তাদের সর্বশক্তিমান যুগ শেষ। প্রিন্ট এখন মূলত ব্যাখ্যামূলক, বিশ্লেষণধর্মী, লং-ফর্ম কনটেন্টের জায়গায় টিকে আছে। টেলিভিশন এখন “লাইভ” এবং “ব্রেকিং” ধরনের খবরের জন্য কার্যকর। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন সংবাদপ্রাপ্তির মূল মাধ্যম এখন স্মার্টফোন। এই পরিবর্তন অস্বীকার করা মানে সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আমরা সেই ভুল করিনি।
বাংলাদেশের অনেক মানুষ ডিজিটাল গণমাধ্যমকে ব্যঙ্গ করে বলেন ডটকম সাংবাদিকতা। এটা সত্যি গত পনের বছরে বাংলাদেশে ডিজিটাল গণমাধ্যমে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। কত হাজার ডিজিটাল গণমাধ্যম আছে বাংলাদেশে তা কারো পক্ষে অনুমান করা সম্ভব না। তবে তথ্য মন্ত্রণালয় নিবন্ধন দিয়েছে এমন স্বাধীন অনলাইন, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অনলাইন এবং বেসরকারি টেলিভিশনের অনলাইনের মোট সংখ্যা স্রেফ ৪৫৮টি। নিঃসন্দেহে এই সংখ্যাটিকে আইসবার্গের চূড়া বললে বেশি বলা হবে। বরং বিরাট খড়ের গাদায় পড়ে থাকা একটি ছুঁচের সাথে তুলনা করলেই উপযুক্ত হবে।
বাংলাদেশে পাঁচ-দশ হাজার টাকা খরচ করেই একটি ডিজিটাল গণমাধ্যমের মালিক বনে যাওয়া সম্ভব। ফলে অনলাইন গণমাধ্যম কিংবা ইউটিউব সাংবাদিকতার বাম্পার ফলন এখানে। বুম বা মাইক্রোফোনকে লোগোসহ ব্রান্ডিং করার ব্যবসা জমজমাট। প্রত্যন্ত উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে গিয়েও আপনি দুই-চারজন সম্পাদকের দেখা পেয়ে যেতে পারেন। এই বাম্পার ফলনে মিসইনফর্মেশন ও ডিসইনফর্মেশনে পাঠক-দর্শকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ফলে পাঠকের আস্থা তৈরি করার পরিবর্তে বারবার বিশ্বাস ভেঙেছে ডিজিটাল গণমাধ্যম।
সংবাদের ভোক্তা ডিজিটাল মাধ্যম থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে ঠিকই কিন্তু এখনো তারা সেটা যাচাই করার জন্য অপেক্ষা করে মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের জন্য। ডিজিটাল গণমাধ্যম বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাই ডটকম সাংবাদিকতা বা সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট- যা দেখা যাবে কিন্তু বিশ্বাস করা যাবে না।
অবশ্য সবাই যে এমন অবিশ্বাসের শিকার হয়েছে তা নয়। ক্রমাগত বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার মধ্যে দিয়ে ভোক্তাদের আস্থার জায়গায় পরিণত হতে পেরেছে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর’সহ হাতে গোনা কিছু ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম। আর আজকাল যেহেতু মূলধারার সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের ডিজিটাল প্লাটফর্ম আছে, তাই যে ব্র্যান্ডের ওপর পাঠক-দর্শকের যত বেশি আস্থা সেই ব্র্যান্ডের ডিজিটাল মাধ্যম পাঠক-দর্শকের কাছে সেই মাপে প্রিয় ও আস্থাভাজন।
ডটকম সাংবাদিকতা, ইউটিউব-ফেসবুকের লাখো কন্টেন্ট, হাজারে-বিজারে কন্টেন্ট প্রোডিউসার, ইনফ্লুয়েন্সার, ক্লিকবেইটের ভীড়ে একটি নতুন ডিজিটাল গণমাধ্যম নিয়ে হাজির হওয়ার সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা আজকাল এমন এক উৎপাতের নাম যে টিকে থাকার জন্য বড় বড় মিডিয়া আউটলেটও মাঝে মাঝে পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাঠক-দর্শক ধরার যুদ্ধে নেমে তারাও পড়ছে ক্লিকবেইটের ফাঁদে। আবার কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েই ক্লিকবেইট করছে। এমনকি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকও আছে, যাদের ছাপা পত্রিকা একরকম আর সোশ্যাল মিডিয়া পাতাগুলোতে ঢুকলে মনে হবে ভিউবাণিজ্যই একমাত্র ব্রত।
অবশ্য ‘বেইট’ করে ‘ক্লিক’ করিয়ে যদি সংখ্যা ও উপার্জন বাড়ানো যায় তাহলে কেন করবেন না? করবেন না- কারণ সাংবাদিকতা টিকে থাকে আস্থার ওপর, বিশ্বাসের ওপর এবং জনস্বার্থ সেখানে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তার ওপর। তাই আমরা, অর্থাৎ টিম আলাপ ঠিক করেছি, আমরা ক্লিকবেইট করবো না। না মানে না। একেবারেই না।
তাহলে আমরা কী করবো? আমরা বিশ্বাস করি- সংবাদ শুধু জানানো নয়, সংবাদ হচ্ছে বোঝানো, প্রেক্ষাপট দেওয়া, প্রশ্ন করা এবং গণমানুষকে সঠিকভাবে সচেতন করা।
আমরা ঠিক করেছি আমরা কোন খণ্ডিত বা বিকৃত উদ্ধৃতি ব্যবহার করবো না, যেমনটি করে বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরাগভাজন হয়েছে। যার কারণে বিবিসির মহাপরিচালক এবং আরেকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা যদি কারো বক্তব্য থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করি তাহলে সেটা হবে অপরিবর্তিত। যদি তার কথায় ব্যাকরণ বা ভাষাগত ভুল থাকে, আমরা সেই ভুল ব্যাকরণের, ভুল ভাষার উদ্ধৃতি অবিকল প্রচার করব।
আমরা সংবাদ প্রচারের চিরাচরিত প্রথায় ক্রমাগত কুঠারাঘাত করবো। সংবাদ যেহেতু নতুন প্রজন্মের কাছে কন্টেন্ট হয়ে উঠেছে, আমরা তাই নতুন প্রজন্মের জন্য সংবাদকে কন্টেন্ট করে তুলবো, যা হবে সুখপাঠ্য, উপভোগ্য। আমরা ট্রেন্ড অনুসরণ করবো কিন্তু ভাইরালের স্রোতে গা ভাসাবো না। আমরা তথ্য বিকৃত করবো না।
আমাদের প্রতিটি সংবাদ কন্টেন্টকে করা হবে চুলচেরা সম্পাদনা। সাংবাদিকতার মৌলিক শিক্ষা আমরা অনুসরণ করবো। একপেশে সংবাদ আমরা প্রচার করবো না। এখানে প্রতিটি পক্ষের থাকবে ‘রাইট টু রিপ্লাই’ অর্থাৎ জবাব দেবার অধিকার। হোন তিনি অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগী।
আমরা প্রচুর কথা বলব। আমার কোন কন্টেন্টকে সময়সীমা বা শব্দসীমা দিয়ে আটকে ফেলবো না। সব পক্ষের কথা বলতে সব দিক তুলে ধরতে একটা ভিডিও বা পডকাস্টকে যতটা দীর্ঘ করা প্রয়োজন ততটা আমরা করব। যত হাজার শব্দ লিখতে হয় লিখবো।
তবে হ্যাঁ, আপনার সময় যাতে অকারণে নষ্ট না হয় সেজন্য আমরা অতিরঞ্জন করবো না। নিম্নমান, তাড়াহুড়ো, ভুলভ্রান্তি- এগুলো থেকে আমরা দূরে থাকবো।
কেন এখন আলাপ?
এই সময়ে মানুষ শুধু জানতে চায় না। বুঝতে চায়। প্রতিদিন অগণিত ভিডিও, পোস্ট, নিউজফিড, লাইভের মধ্যে সত্যের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চাই আমরা।
ছোট আকারের হলেও বিশ্বমানের একটি ডিজিটাল গণমাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই আলাপকে। আলাপ শুধু একটি ওয়েবসাইটই হবে না- এটি হতে যাচ্ছে একটি নিউজরুম যেখান থেকে পাঠকের আস্থার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
এই যাত্রা কঠিন। ঝুঁকিপূর্ণ। সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ এখানেই। আমরা সেই ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ালাম। আলাপ শুরু হলো। কথা চলুক।