কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফাহিমের গ্রেপ্তারের পর যেসব প্রশ্ন উঠছে 

রাজধানীর মিরপুর থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরএস ফাহিমকে আটকের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কনটেন্ট নির্মাতাদের আইনি ঝুঁকি ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া।

এর আগে হিরো আলম, তৌহিদ আফ্রিদি কিংবা সাব্বির সরকারের মতো পরিচিত ক্রিয়েটরদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা আবার সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে অনেকেই মনে করছেন, কনটেন্ট আর কেবল বিনোদন বা ব্যক্তিগত প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অভিযোগ থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার হওয়াই স্বাভাবিক। তবে মব তৈরি করে আটক বা অস্পষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীল কনটেন্ট এবং আইনি জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

কয়েক বছর আগেও সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট ছিল বিনোদন বা কমিউনিটি সংযোগের জায়গা। এখন সেটা অনেক সময়ই পরিণত হচ্ছে ঝুঁকির মঞ্চে। 
আরএস ফাহিমের ওপর ‘মব তাণ্ডব’ এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এই ঘটনায় কেউ কেউ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আবার কেউ এটাকে দেখছেন, আইন-শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল কনটেন্টের প্রসঙ্গ হিসেবে।
ফাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। আর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে বলেও প্রশ্ন উঠছে।  

ফাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ

রবিবার রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকা থেকে ফাহিম চৌধুরীকে আটক করে কয়েকজন তরুণ শাহ আলী থানার পুলিশের হাতে তুলে দেয়। 
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তাকে শুধু আটক করেছেন তারা। এরপর গুলশান থানার ওসি ফাহিমকে নিয়ে গেছেন। সেই থানায়ই মামলা করা হয়েছে।

গুলশান থানায় যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। মামলা নম্বর ২৮। তিনি এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গুলশানের শাহজাদপুরে সুবাস্তু মার্কেটের সামনে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা মিছিল করছিলেন। আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।

এ সময় মো. ইমরান নামের এক ব্যক্তি কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে মিছিলের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে স্লোগান দিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে তিনি মারা যান।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলার আসামি হিসেবে ফাহিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

ইউটিউবারদের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ

ফাহিমের ঘটনাই প্রথম নয়, গত এক দশকে বিভিন্ন সময়েই কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ইউটিউবভিত্তিক পরিচিত ব্যক্তিদের আইনি জটিলতায় পড়তে দেখা গেছে।
বাংলাদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে আলোচিত নামগুলোর একটি হিরো আলম, যার প্রকৃত নাম আশরাফুল হোসেন আলম। 
সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট দিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। পরে চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেও আলোচনায় চলে আসেন।

তবে এই জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একাধিকবার আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তার গান ও ভিডিও কনটেন্টকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে আটক করে।  তার গাওয়া কিছু গান বিকৃতভাবে পরিবেশন ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে তাকে সতর্ক করা হয় এবং পরবর্তীতে তিনি কিছু কনটেন্ট সরিয়েও নেন। এসব ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও কনটেন্টের সীমা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

আরেক আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি মূলত ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিচিতি পান। তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে এবং তিনি টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনাতেও যুক্ত হন।

তবে ২০২৫ সালে একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্তের ভিত্তিতে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্তবর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া এই ইউটিউবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করেছেন। 
একই ধরনের একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল। ইউটিউবার সাব্বির সরকারকে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বাদী মুনতাসির মামুন গত ২৩ মার্চ বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এতে অভিযোগ করা হয়, সাব্বির তাঁর ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুনতাসিরকে ভারতের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত বলে প্রচার করেন।

ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, বনানীর একটি অফিসে বসে কয়েকজন ব্যক্তি মিলে রাষ্ট্রবিরোধী পরিকল্পনা করছেন এবং সেনাপ্রধানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

জেড আই খান পান্না

তদন্তে ডিবির সাইবার স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ সাব্বিরের ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে মুঠোফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।  কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের   কনটেন্টের প্রভাব অনেক সময় রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারের ফলে কনটেন্ট নির্মাতাদের প্রভাব যেমন বেড়েছে, তেমনি তাদের কার্যক্রমও এসেছে বাড়তি নজরদারির মধ্যে।

একটি ভিডিও এখন মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, জনমত তৈরি করতে পারে, এমনকি বিতর্কও উসকে দিতে পারে।

বিশেষ করে ভাইরাল কনটেন্টের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ দৃশ্যমানতা যত বাড়ে, ততই বাড়ে জবাবদিহি ও আইনি ঝুঁকি।

গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশি আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী জেড আই খান পান্নাও মব তৈরির সমালোচনা করেছেন।

আলাপ-কে তিনি বলেন, “এই প্রক্রিয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না। ২৪ এর জুলাইয়ের মামলা ২৬ এ নতুন সরকার আসার পর হয়েছে, এটা অতিরঞ্জিত।”  
“এটা আইনি প্রক্রিয়ায় হয়নি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিচার হবে সেটাই স্বাভাবিক।”  

মব সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরীও।

“আইনের দৃষ্টিতে, আইন তার ব্যবস্থায় চলবে। আপনি যদি আইনের বাস্তবায়ন করতে চান, তাহলে মব কালচারকে বাতিল করতে হবে।”

এখনো কয়েক জায়গায় মব হচ্ছে উল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, আগে হয়তো বেশি হতো। কিন্তু এখনো সেই ভয়ংকর প্র্যাকটিসটা থেকে গেছে। 
তিনি বলেন, যদি অভিযোগ থাকে, আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হয়, তবে বিচার হবে। গতকালের যেটা পুলিশের হ্যান্ডওভার করা হলো। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী সে কথা আমরা জানতে পারলাম না। তার বিরুদ্ধে কি তাহলে অপরাধযোগ্য কোনো অপরাধ নেই।

“অন্য মামলায় একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আরেকটা অপরাধে শাস্তি দেওয়া আইনিভাবে ঠিক না।”

নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তো মামলা হচ্ছে না মন্তব্য করেন সাইফুল আলম চৌধুরী।

সাইফুল আলম চৌধুরী

“মামলা করার মতো যদি অভিযোগ না থাকে তাহলে তো অন্য প্রশ্ন সামনে আসে। আগে মব করে শারীরিকভাবে অ্যসলট করা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পর্যন্ত জুতার মালা পরানো হয়েছে।”  

তিনি বলেন, যে কেউ অ্যান্টি-স্টাবলিশমেন্ট বক্তব্য দিতে পারে। সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। কারণ সরকারকে আপনি ট্যাক্স দিবেন, নাগরিক হবেন, সমালোচনা করতেই পারেন।

“তবে অ্যান্টিস্টাবলিশমেন্ট অর্থ এই নয় যে, কারো কাউকে ব্যক্তিগতভবে আক্রমণ করা। এটা যদি ভায়োলেট হয় তাহলে সেটা আইনের দৃষ্টি আটক করা ঠিক আছে।”

সাইফুল আলম আরো বলেন, “আমি সোশাল মিডিয়াতে যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারি না। যদি আপনার প্রমাণ থাকে, তাহলে আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনাকে অ্যাটাক করবো কেন।  আমি সেই মামলা কনসার্ন অথরিটিকে দিব।”

কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার কনটেন্টে কী বলেছেন তা বিচার করে গ্রেপ্তার করা যায় না বলে মত দিয়েছেন জেড আই খান পান্নাও।

সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, “অ্যান্টিস্টাবলিশমেন্ট হলেই গ্রেফতার করা যায় না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মামলা হবে, গ্রেপ্তার হবে।”