ঢাকার মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষের ভিডিও। নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।
শুরুতে বাকবিতণ্ডা। এরপর স্লোগান, আর একপর্যায়ে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সব মিলিয়ে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও উত্তেজনা। জামায়াতের দাবি এই ঘটনায় ১৬ জন কর্মী আহত হয়েছে তাদের। তবে বিএনপি বলছে, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে একাধিক পক্ষ বিভিন্ন দাবি তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ, বিএনপি ও জামায়াত, সবার ভাষ্যে ঘটনার চিত্র একরকম নয়। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মাঠ পর্যায়ের সাক্ষ্যে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান।
কী ঘটেছিল
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার এই সংঘর্ষ মূলত নির্বাচনি প্রচার চালানোকে কেন্দ্র করে শুরু। ঘটনার সূত্রপাত হয় দুপুরে। তখন মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায় ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন জামায়াতের নারী কর্মীরা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, তিনজন নারী বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছিলেন। এমনই এক বাসায় গিয়ে ভোটারদের মোবাইল নাম্বার ও এনআইডি কার্ড চান। কিন্তু তারা এমন করতে পারেন কি-না এবং পরিচয় জানতে চাইলে তারা পালানোর চেষ্টা করেন।
তাদের মধ্যে একজন পালিয়ে যান, বাকি দুজনকে আটক করা হয়। এলাকাবাসী জড়ো হলে তারা জানান যে জামায়াতের হয়ে নির্বাচনি প্রচার করছিলেন তারা। সে সময় তাদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপিকর্মীদের বাকবিতণ্ডা হয়। এক সময় স্থানীয় জামায়াতের আমিরকে সেখানে ডাকা হয়।
কথা কাটাকাটি থেকে ধাক্কাধাক্কিতে পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। এরপর সন্ধ্যায় পীরেরবাগের আল মোবারক মসজিদ এলাকায় আবারও দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে পরস্পরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে খবর পেয়ে পুলিশ–র্যাব গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাজীব হোসেন জানিয়েছেন, “আমরা যখন গেছি, তখন অস্থিতিশীল ছিল। পরে সেনাবাহিনী এসেছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি।”
তবে হতাহতের কোনো কথা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। তিনি জানিয়েছেন, তারা যাওয়ার পর কেউ হতাততের শিকার হননি।
যা বলছে জামায়াত ও বিএনপি
ইসলামী ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই সংঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। শিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, তরুণরা প্রতিবাদ করতে গেলে ‘বিএনপি সন্ত্রাসী’রা তাদের ওপর হামলা চালায়। সাধারণ মানুষদের ওপরও নির্যাতন করা হয় বলেও দাবি করেছেন এই শিবির নেতা।
তিনি আরও বলেন, একটি জনগোষ্ঠী যারা বিভিন্ন চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারাই এই হামলা চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই মামলা করা হবে।
“ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা প্রতিরোধ গঠন করলে এই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়”, বলেন তিনি।
এই ঘটনা কীভাবে শুরু হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কিছু নারী ছিলেন তাদেরকে তারা হেনস্থা করেছেন। আমরা জেনেছি তারা বিএনপির সঙ্গে জড়িত। তারাই হেনস্থার সঙ্গে জড়িত।”
এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে ইসলামী ছাত্রশিবির ও স্থানীয় মানুষজন জড়ো হয়েছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু এই ঘটনা কেন ঘটেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কোনো কারণ লাগে না।”
এই ঘটনায় ১৬ জন আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। সে সময় সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন যে অভিযোগ রয়েছে, ওই নারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি ও ফোন নাম্বার চাচ্ছিলেন। এমনটা করতে পারেন কি না।
জবাবে সিবগাতুল্লাহ বলেন, “স্বাধীন দেশে যে কেউ, যে কারও সঙ্গে তথ্য বিনিময় করতেই পারে। এটা কোনো সমস্যা না।”
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতা মোসলে উদ্দিন সাগর বলেন, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগেই জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করছেন।
৯৪ নাম্বার ওয়ার্ড বিএনপির এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানালে জামায়াত নেতা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।”
এই নির্বাচনি আসন থেকে জামায়াতের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বিএনপির হয়ে লড়ছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন।
মঙ্গলবারের ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী ও আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন, “ঢাকা-১৫ আসনে ভোটের পরিবেশ বিনষ্ট করার সকল প্রকার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহবান জানাচ্ছি। আশা করতে চাই, শুভবুদ্ধির উদয় হবে।”